জঞ্জির

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comপৃথিবীটা গোল। আকাশটাও। তবে আকাশটা এখন কালো। পুরো কালো নয়। ফ্যাকাশে কালো। তার মধ্যে দূরে দূরে ফেলানো ছড়ানো কয়েকটা তারা। তারাগুলো মৃদু। যেন ওদের গায়েও আকাশের কালো আলতো করে বুলিয়ে দিয়েছে কেউ। শুধু আকাশের পায়ের কাছে অন্ধকার আরো নিরেট। আরো জমাট। ওটা আকাশ নয় পাহাড়। একটা নয় অনেকগুলো। সোজা চলে গিয়েছে হাইওয়ের দু’ধার দিয়ে। অনেকদূর।

হাইওয়েটা দেখা যায় না এখান থেকে। ঢেকে গিয়েছে ধাবার পেছনের দেওয়ালে। শুধু শব্দ শোনা যায়। ভারি ট্রাকের ইঞ্জিনের আওয়াজ মসৃণ রাস্তার ওপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে চলে যায় বহুদূর অবধি। ছোট ছোট ঝোপঝাড়, মরা ঘাসের ওপর দিয়ে গড়াতে গড়াতে গিয়ে ধাক্কা খায় পাহাড়ের গায়ে। তারপর আবার ফিরে আসে। নতুন ট্রাকের নতুন আওয়াজের শরীরে মিশে যায়। মিশে যায় হাওয়ায়।

হাওয়াটা দোল খায় এপাহাড় থেকে ওপাহাড়ে। আর চলে যাবার সময় আলতো করে নাড়িয়ে দেয় নয়নের চারপাইয়ির চাদরটা। তার চুল। দিদি আজকাল আর তার সঙ্গে শুতে আসে না। শেষ ট্রাকটা ধাবা থেকে চলে গিয়েছে প্রায় ঘন্টা খানেক আগে। ধাবার খাবার ঘড়িতে সময়টা দেখেছিল নয়ন। দেড়টা। ওইরকমই হয় রোজ। মোটা মোটা মকাইয়ের রুটি আর ডাল খেয়ে চলে গিয়েছিল লোকদুটো। ট্রাকের ড্রাইভার আর হেলপার। তার আগে একটা পাঁইটের বোতলও শেষ করেছিল তারা। আজকাল ধাবা মালিক মোহনলাল দিদিকে রাত্রে ড্রাইভারদের সামনে বের হতে দেয় না। নয়নকেই যেতে হয়। খাবারের প্লেটটা লোকদুটোর সামনে রাখতে রাখতে নয়নের হঠাৎ একটা শব্দ মনে পড়েছিল। বাটারফ্লাই। মাথা নীচু করে খাবারটা দেওয়ার সময় লোকগুলোকে একবার দেখে নিয়েছিল সে। না সেই মুখ দুটো নয়। আর সেই মুখ দুটো হলেই বা কী করত? নয়নের কাছে কোনও পিস্তল নেই।

কথাটা ভাবামাত্র নয়নের আবার রাগ হয়। বাটারফ্লা‌ই। ডান হাতটাকে পাকিয়ে নেয় নয়ন। তর্জনির আঙুলটা শুধু সোজা রাখে পিস্তলের মতন। কালো আকাশের দিকে হাতটাকে তাক করে নয়ন। ‘য়ো রাত ভি দিওয়ালি থি। ইস রাত ভি দিওয়ালি হ্যায়। লেকিন কামিনা ম্যায় তুঝে ইতনি আসানি সে নেহি মারুঙ্গা।’

তবে গুলিটাই ছুড়তে হত। লোকদুটোর সঙ্গে গায়ের জোরে পেরে উঠত না সে। কিন্তু গুলি দুটো ছুড়ত কোথায়? লোকদুটোর কপালে? দু চোখের মাঝখানে? গলায়? বুকে? নাকি…

ভেবে উঠতে পারে না নয়ন। তাঁর শুধু রাগ হয়। ভীষণ রাগ। হাতে ধরা ডিস শুদ্ধ ট্রেটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখে নয়ন। লোকদুটো খাবারের দিকে তাকায়। খাবারের প্লেটগুলো লোকগুলোর সামনে এগিয়ে দেয় সে। ড্রাইভার রুটিটা ভাঙে। আর ঠিক তখনই প্যান্টের পেছনে গোঁজা পিস্তলটা বার করে আনে নয়ন। মুহূর্তে পিস্তলটা চালায় একদম লোকটার পেটে। গুলিটা লোকটার পেটটা চিরে দেয়। লোকটার পেটের কাছে জামা ভিজে গিয়েছে। লাল। লোকটা খাবার লাগা হাতটা দিয়েই পেটটা চেপে ধরে। নয়ন আবার গুলি চালায়। এইবার মাথায়। লোকটা চেয়ার শুদ্ধ উলটে পড়ে। হেলপারটার দিকে তাকায় নয়ন। লোকটার মুখে ভয়। খাবার ফেলে সে তখন উঠে দাঁড়িয়েছে। অবিকল হিন্দি সিনেমার মত লোকটা ভয় পেয়ে বলে, ‘মুঝে মাফ কর দো।’ নয়ন হাসে। বলে ‘বাটারফ্লাই’। তারপর আবার পিস্তল চালিয়ে দেয়।

এই সব কিছুই হয় না। পিস্তলের কায়দায় ধরা হাতটাকে মাথায় ঠোকে নয়ন। একটা যদি পিস্তল থাকত। একটা! একটা পিস্তল! তাহলেই সে…।

সোজা আকাশের দিকে পিস্তলটা চালিয়ে দেয় নয়ন। একটা গুলি তার তর্জনি থেকে বেরিয়ে বাতাস চিরে আকাশের দিকে উঠে যায়। একে বেকে গোটা আকাশ জুড়ে খেলা করতে থাকে।

নয়ন উঠে বসে। আবার তাকায় জানলাটার দিকে। আধখোলা জানলার ওপারে কিছু দেখা যায় না। অন্ধকার। ওই জানলা দিয়েই অনেক দিন পর টিভি দেখেছিল নয়ন। সেইদিন সকালে দু’দুটো গ্লাস ভেঙে ফেলেছিল সে। মালিক মোহনলাল তাকে কানের নীচে একটা থাপ্পড় মেরেছিল। আরো মারত হয়ত কিন্তু দিদি এগিয়ে আসে তাকে জড়িয়ে ধরে। মোহনলাল দিদিকেও মেরেছিল। খিস্তি করেছিল খুব। তারপর কখন যেন দিদিকে টেনে নিয়ে গিয়ে জোরে ঠেলে দিয়েছিল দোকানের ভেতরে। নয়ন কে ছেড়ে দিদির দিকেই তেড়ে গিয়েছিল হাত তুলে। তারপর কী যেন ভেবে থমকে দাঁড়িয়েছিল।

সেইদিন সন্ধ্যার পর থেকেই লরি আসা কমে গিয়েছিল। গোটা হাইওয়ে শুনশান। কোথায় যেন গণ্ডগোল হয়েছিল খুব। রাতের পর ধাবা পুরো ফাঁকা। মোহনলাল নিজের ঘরে একটা বোতল নিয়ে বসেছিল। টিভি চালিয়ে। আদুর গায়ে। টিভিতে অমিতাভ বচ্চন নাচছিল। আর সঙ্গে একটা মেয়ে। নাম জানে না নয়ন। একটা পাহাড়ের গায়ে। এখানকার পাহাড়ের মত নয় কিন্তু। সাদা চুন দিয়ে যেন রঙ করা পাহাড়। তারমধ্যে সরু সরু গাছ। সেই গাছের গায়েও সাদা চুন। নয়ন অবাক হয়ে দেখছিল জানলা দিয়ে। গানের পর হঠাতই দিদিকে ডেকেছিল মোহনলাল। দিদি বোধহয় বাসন মাজছিল।

নয়ন ভেবেছিল দিদিকে বোধহয় আবার মারবে মোহনলাল কিন্তু মারেনি। দিদি কেমন গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়েছিল ঘরের ভেতর। দিদিকে কাছে ডেকেছিল মোহনলাল। তারপর জানলা বন্ধ করতে বলেছিল। দিদি এগিয়ে এসে থমকেছিল নয়নকে দেখে। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তাঁকিয়েছিল তার দিকে। তারপরেই হঠাৎ চোখ নামিয়ে দড়াম করে পাল্লাদুটো বন্ধ করে দিয়েছিল।

তারপরেই টিভির আওয়াজ খুব বেড়ে গিয়েছিল। জানলার পাল্লার ফাঁক দিয়ে আসা ঘরের আলোটাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শুধু টিভির আবছা নীল আলো পাল্লার ফুটোগুলোর মধ্যে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে তিরতির করে নাচছিল। আর টিভির আওয়াজের মাঝেই দিদির চাপা কান্নার আওয়াজ পেয়েছিল নয়ন। নয়ন একবার ছুটে গিয়ে ধাবার ভেতর দিয়ে মোহনলালের ঘরের দরজার কাছে গিয়েছিল। দরজার পাল্লাও বন্ধ। দরজার একটু ওপরে হলুদ বাল্বের আলোর দু’ধারে অনেকগুলো কালচে পোকা এসে বসেছিল। নয়নের মনে হয়েছিল দিদিকে হয়ত মেরে ফেলছে মোহনলাল। কিন্তু দরজা ধাক্কাতে সে একবারও সাহস পায়নি। আবার ছুটে গিয়েছিল জানলার পেছনে। সেই টিভির নীল আলো পাল্লার ফুটোগুলো দিয়ে বেরিয়ে আসছিল। নয়ন কিচ্ছু করতে পারেনি। শুধু একটু পিছিয়ে এসে হাত দিয়ে অদৃশ্য পিস্তল ছুঁড়েছিল জানলায়। অনেকবার। সেই পিস্তলের অনেকগুলো গুলির পরও জানলা অক্ষতই রয়ে গিয়েছিল।

নয়নের পাশে, চৌপায়ায় দিদি শুতে এসেছিল অনেক রাতে। দিদিকে দেখে নয়ন তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে বসেছিল। টলতে টলতে এসে দিদি ভূতের মতন শুয়ে পড়েছিল। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর নয়ন দিদিকে প্রশ্ন করেছিল, ‘দিদি ওই চুনের মত সাদা জিনিসটা কী রে?’ দিদি কোনও উত্তর দেয়নি। শুধু হঠাৎ মুখের ওপর হাতদুটো দিয়ে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেছিল।

নয় বছরের নয়ন আর চোদ্দ বছরের সোনালীকে মোহনলালের কাছে দিয়ে গিয়েছিল দিনু সাহা। দিনু সাহা নয়নের বাবার বন্ধু। মুম্বাইয়ের ভাডালা রোড স্টেশন থেকে কয়েক কদম এগোলে যে ঘন বস্তি সেইখানেই থাকত ওরা। রেললাইনের ধার দিয়ে সরু গলির মধ্যে দিয়ে একটু এগিয়ে প্লাস্টারহীন ইঁটের একটা দোতলা বাড়ি। বাড়ি মানে একটা ঘরের ওপর আরেকটা ঘর। নয়নের এখনও মনে পড়ে জায়গাটা। প্রচুর লোক। রেললাইনের ধারে কয়েকটা ঝুপড়ির মধ্যে দোকান। কয়েকটাতে বাংলাতেই সাইনবোর্ড লাগানো।

বাবাকে এখনও রাত্রে মাঝে মাঝে দেখতে পায় নয়ন। ঘুমের ভেতর। বাটারফ্লাই হওয়ার পর থেকে আরো বেশি। নয়ন দেখতে পায় হাইওয়ের ধারে বন্ধ্যা জমিটার ওপর দিয়ে বাবা সোজা হেঁটে যাচ্ছে। বাবার গায়ে কালো লুঙ্গি, চেক টি শার্ট। ওটা দেখেই চিনতে পারে নয়ন। পেছনে দৌড়োয়। ‘বাবা! বাবা!’  এগোতে এগোতে বাবা হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। পেছনে ফেরে। বাবার মাথা নেই। গলার ওপর থেকে কিচ্ছু নেই। নয়ন ভয় পেয়ে যায়।

‘নয়ন! বাবু! কেমন আছিস তুই?’ বাবার মাথাটা বাবার হাতের কাছে। খোলা হেলমেটের মত হাত দিয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে বাবা। কাটা মুন্ডুটাই কথা বলে।

‘দিনু কাকা আমাদের এখানে রেখে চলে গেল বাবা!’

‘দিনু আচ্ছা! দিনুটা হারামি। তোর মাকে বারবার বলেছিলাম।’

‘মার কাছেই নিয়ে আসছে বলেই তো দিনুকাকা এইখানে নিয়ে এল বাবা! মা তো দিনুকাকার সঙ্গে তার কিছুদিন আগে কাজ খুঁজতে চলে গেল। দিনুকাকা ফিরে এল। বলল মা কাজ পেয়েছে। আমাকে আর দিদিকে চলে আসতে বলেছে। কিন্তু মা কোথায় বাবা? মোহনলালকে বললে তো হাসে।’

‘নয়ন কাছে আয়। তোকে একটা কথা বলি।’

বাবার আরো কাছে এগিয়ে আসে নয়ন। বাবা হাত দিয়ে মুন্ডুটা নয়নের দিকে বাড়িয়ে দেয়। কানে কানে কথা বলে ওঠে মুন্ডুটা। ঠিক অমিতাভ বচ্চনের গলা যেন। বাবা বলে ওঠে, ‘য়ো রাত ভি দিওয়ালি থি। ইস রাত ভি দিওয়ালি হ্যায়। লেকিন কামিনা ম্যায় তুঝে ইতনি আসানি সে নেহি মারুঙ্গা।’

নয়ন স্পষ্ট দেখতে পায় একটা ট্রাক লাইন পেরিয়ে চলে এসেছে এদিকের লেনে। বাবার ঠিক পেছন থেকে জোরে এগিয়ে আসছে ট্রাকটা। দুটো আলো ক্রমে এগিয়ে আসছে বাবার পেছন থেকে। আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে যায় নয়নের।

বাবা চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘পিস্তল। তোকে একটা পিস্তল পেতে হবে রে নয়ন। তাহলেই তোর মা, আমি, সোনালি সব ঠিক হয়ে যাব।’

দেখতে দেখতে ট্রাকের আলোটা একদম কাছে চলে আসে। সব কিছু কেমন লন্ডভন্ড হয়ে যায়। নয়ন দেখতে পায় তাদের ওয়াডালার বাড়িতে খেতে বসেছে সে আর দিদি। ডাল দিচ্ছে মা। কে যেন হঠাৎ ছুটে আসে। ‘সুচিত্রা তোর বর ট্রেনে কাটা পড়েছে।’

চিৎকার করে ডালের হাতাটা ফেলে বাইরে ছোটে মা। পেছন পেছন দিদি। নয়ন স্পষ্ট দেখতে পায় ডালের রঙ লাল হয়ে গিয়েছে। রক্ত যেন। তার ভাত রক্তে মাখামাখি।

পরদিন সকালে কলতলায় দিদি পেটে হাত চাপা দিয়ে বসেছিল। উঠতে যেন কষ্ট হয়। দিদিকে ডাকতে গিয়ে নয়ন। দেখেছিল দিদি বমি করছে। হঠাৎ করেই যেন সব বুঝতে পেরেছিল নয়ন। বাটারফ্লাই। দিদিকে বাটারফ্লাই করেছে মোহনলাল। নয়ন দিদির কাঁধে হাত রাখতে চেয়েছিল। নয়ন দিদিকে কিছু কথা বলতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। কেন পারেনি নয়ন? পিস্তল থাকলেও কি ওই কথা বলতে পারত সে?

দিনুকাকা তাদের দুজনকে এইখানে রেখে যাওয়ার কয়েকদিন পরে বর্ষা এসেছিল। রুক্ষ পাহাড়গুলো হঠাৎ যেন ঘন সবুজ হয়ে উঠেছিল। ফুলে ফেঁপে উঠেছিল হাইওয়ের দু’ধারের ঝোপগুলো। মরা ঘাস জীবন্ত হয়ে সবুজ গালিচা বিছিয়ে দিয়েছিল মাটির ওপর। নয়ন আর দিদি তখন ধাবার মধ্যেই শুতো। একদিন রাত্রের দিকে সেই দুটো লোক ট্রাক চালিয়ে এসেছিল। ড্রাইভারটা মোটা। হেলপারটা মাঝারি গড়নের।

খাওয়ার পর মোহনলালকে টাকা দিতে যাওয়ার সময় হেসে কি যেন বলেছিল হেলপারটা। মোহনলাল ঘুরে তাকিয়েছিল নয়নের দিকে। নয়ন প্রথমে একটু ভয় পেয়েছিল। খাবার দেওয়ার সময় কোনও ভুল করেছে নাকি সে? মোহনলাল টাকাগুলো নিয়ে হেসেছিল লোকদুটোর দিকে। তারপর একটা ছাতা দিয়েছিল লোকদুটোকে। বড় কালো কাঠের ছাতা। ছাতাটা নিয়ে লোকদুটো চলে গিয়েছিল। লরিটা কিন্তু যায়নি। দাঁড়িয়ে ছিল। হাইওয়ের ধারে। ধাবা থেকে একটু এগিয়ে।

রাত্রে বাসন মাজার পর নয়নকে ডেকেছিল মোহনলাল। ‘ছত্রি লেকে আ। য়ো ট্রাক সে।’

যাওয়ার আগে আবার ডেকেছিল পেছন থেকে, ‘শোন যদি গা হাতপা টিপে দিতে বলে, তাহলে দিবি।’

নয়ন গিয়েছিল। বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে। প্রায় এক দৌড়ে। লোকদুটো বসেছিল ট্রাকের সামনে। একটা ট্রাঞ্জিস্টর থেকে গান ভাসছিল। লোকদুটো একটা বোতল খুলে বসেছিল।

‘ছাতা! ছত্রি। মালিকনে মাঙ্গা।’

হেলপারটা একগাল হেসেছিল নয়নের দিকে তাকিয়ে। ‘ছত্রি। উঠে আয় লরিতে।’

নয়ন উঠতে চায়নি। ছাতাটা চেয়েছিল।

ড্রাইভার ডেকেছিল এইবার। তার গলায় প্রায় হুঙ্কার। না উঠলে সে মালিককে বলে মার খাওয়াবে। নয়ন তবু ওঠেনি। হেলপারটা নেমে এসেছিল। নয়নকে প্রায় পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে গিয়েছিল লরির মধ্যে।

‘নাম কী তোর?’

‘বয়স কত?’

লোকদুটোর মুখ দিয়ে ভক ভক করে মদের গন্ধ বার হচ্ছিল। ‘ক্যাডবেরি খাবি?’

লরির সিটের পেছনের ফাঁকা জায়গাটায় ছাতাটা রাখা। নয়ন ছাতাটা নিতে এগিয়েছিল। মোটা লোকটা খপ করে ধরে ফেলেছিল নয়নকে।

‘দেখে তো মেয়ে মনে হয়। তুই ছেলে না মেয়ে?’

হেলপারটা হঠাৎ এক টানে খুলে দিয়েছিল নয়নের প্যান্টটা। হাসছিল। ‘ছেলে না মেয়ে?’

নয়ন চিৎকার করে উঠেছিল। ‘না!’

হেলপারটা তার পেছনে চাপড় মেরে মেরে বলেছিল, ‘ মুদূ হ্যায়। বহোৎ মুদূ। বাটারফ্লাই জ্যায়সা।’

লরির ভেতরের আলোটা হঠাৎ নিভে গিয়েছিল। নয়নের মুখটা  হাত দিয়ে চেপে রেখেছিল লোকগুলো। দুটো হাতও। অন্ধকার লরির মধ্যে দিয়ে নয়ন দেখতে পাচ্ছিল হাইওয়ের উজ্জ্বল আলোর সামনে মোটা মোটা বৃষ্টির দানা। সেই দানাগুলোই যেন তার দু’গাল দিয়ে ঝরে পড়ছিল অঝোরে। দানাগুলো বড় হচ্ছিল। আলোটা যেন তার মুখের খুব কাছে সরে এসেছিল। সেই আলোর গরমে যেন মুখটা পুড়ে যাচ্ছিল। বৃষ্টির দানাগুলো তছনছ হয়ে যাচ্ছিল হাওয়ায়। হাইওয়ের ওপর দিয়ে বিরাট একটা হলুদ সবুজ বম্বের ট্রেন ঝমঝম করতে করতে চলে যাচ্ছিল। সেই ট্রেনের ভারে কাঁপছিল মাটি। কাঁপছিল ঘরগুলো। আর লরির জানলার কাচে হঠাৎ ভেসে উঠেছিল একটা কাটামুন্ডু। সেই মুন্ডু থেকে ঝরঝর করে জল পড়ছিল।

সবকিছু অন্ধকার হয়ে যাওয়ার আগে নয়ন একবার চিৎকার করতে পেরেছিল। ‘মা!’

গোটা শরীরটায় অসহ্য ব্যথা। জ্বালা করছিল। শরীরটাকে ঘষটাতে ঘষটাতে নয়ন কোনও রকমে ধাবায় ফিরেছিল। ধাবার ভেতরের আলোটা নেভানো ছিল সেদিন। দিদি বসেছিল চৌপায়ায়। দিদিকে দেখে কেঁদে ফেলেছিল নয়ন। শরীরটাকে কোনভাবে যেন সে ছেড়ে দিয়েছিল চৌপায়ায়।

দিদি তার শরীরটা কাপড় দিয়ে মুছতে মুছতে বলেছিল, ‘কাঁদিস না ভাই, আমরা পালাব এখান থেকে।’

নয়ন কিছু বলতে পারেনি। নয়ন কাউকেই কিছু বলতে পারেনি। শুধু বাটারফ্লাই হওয়ার পর থেকে সে চুপ করেছিল বেশ কয়েকদিন। আর ভেবেছিল একদিন একটা পিস্তল তাকে পেতেই হবে।

একটা পিস্তল পেলে মোহনলালকে গুলি করে মারবে নয়ন। থেঁথলে দেবে ওর চোখ দুটো।

দিদির বমিও থেমে গিয়েছিল ক’দিন পর। দিদিও চুপ করেছিল কয়েকদিন। তারপর এল সেই রাতটা। নয়ন আর দিদি ঘুমোচ্ছিল চৌপায়ায়। সেদিন আকাশে চাঁদ ছিল। চাঁদের আলোয় জেগে উঠেছিল দূরের পাহাড়গুলো। নয়নের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল দিদির চিৎকারে। মদ খেয়ে মাতাল মোহনলাল চলে এসেছিল একদম তাদের বিছানার সামনে। দিদির হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছিল ঘরের দিকে। নয়ন আর পারেনি। সোজা ছুটে গিয়েছিল মোহনলালের দিকে। দিদিকে ধরা অবস্থাতেই পা দিয়ে গদাম করে একটা লাথি মেরেছিল মোহনলাল। ছিটকে গিয়ে পড়েছিল নয়ন। আর দিদিকে টানতে টানতে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল মোহনলাল।

নয়ন আছড়ে পড়েছিল দরজার ওপর। কিল চড় ঘুষি কিছুই মারতে বাকি রাখেনি সে। তারপর কখন একসময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল দরজার ওপর মাথা রেখে।

সকালবেলা দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছিল মোহনলাল। দরজার ওপরে পড়ে থাকা নয়নকে দেখে সে তাকে ফুটবলের মত লাথি মারতে মারতে নিয়ে ফেলেছিল ধাবার বাইরে।

সেদিনের পর থেকে দিদি বদলে গেল। কথা বলা বন্ধ করে দিল একদম। তারপর থেকে একসময় দিদি যেন মেনে নিল তার পরিণতি। কবে থেকে যেন একা পেছনের এই ফাঁকা জমিতে চৌপায়ায় শুয়ে থাকাই অভ্যেস হয়ে গেল নয়নের।

আজকাল নয়নের কান্নাও পায় না। মার কথা মনে হয় মাঝে মাঝেই। ওয়াডালার সেই ঘরটা থেকে কতদূরে চলে এসেছে সে। অন্য একটা জায়গা। গভীর রাতে মায়ের বুকের কাছে শুয়ে থাকত সে। মার শরীর দিয়ে কেমন একটা অদ্ভুত গন্ধ পেত নয়ন। দিনুকাকার সঙ্গে মা যেদিন চলে গেল, নয়ন কেঁদেছিল। দিদি বলেছিল, এত বড় ছেলে কাঁদে নাকি? চলে যাবার আগে মাও কাঁদছিল। কাঁদতে কাঁদতেই নয়নের হাতে পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়েছিল মা। ‘কাজটা হলেই দিনুদা নিয়ে যাবে তোদের। কটা দিন। ভালো করে থাকবি তো?’

মায়ের সঙ্গে আর দেখা হয়নি নয়নের। দিনু সাহা যেদিন তাদের নিয়ে এল এইখানে সেদিন কি আনন্দ তাদের দু’জনের। মা, মা কোথায়?

‘আসবে আসবে। তোর মা শহরে গিয়েছে। চলে আসবে।’ ট্রাকের ওপর উঠতে উঠতেও দিনুকাকা এই কথাই বলে গিয়েছিল তাদের।

পিস্তলটা যেদিন পাবে নয়ন সেদিন সে প্রথমে ফিরে যাবে ওয়াডালায়। প্রথমে খুঁজে বার করবে দিনু সাহাকে। তারপর…

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে একটা গাড়ি কখন যেন হাইওয়ে ছেড়ে চলে আসে ধাবার সামনে। হঠাৎ দুটো হেডলাইটের আলোয় জেগে ওঠে নয়নের চারপাশটা। নয়ন চমকে উঠে বসে।

গাড়িটা থামে ঠিক সামনেটায়। হেডলাইটগুলো বন্ধ করে না। ইঞ্জিনের চাপা আওয়াজও শোনা যায়। কটা লোক নেমে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যায় ধাবার সামনেটায়। নয়ন উঠে পড়ে। ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় ধাবার সামনেটায়। এত রাত্রে কাস্টমার এলে মোহনলাল তাকে এমনিতেও ডাকবে।

ধাবার সামনে দাঁড়িয়ে একটা লোক চাপাস্বরে ডাক দেয়, ‘মোহনলাল, মোহনলাল! এ মোহনলাল।’

মোহনলালের ঘরের লাইটটা জ্বলে ওঠে। দরজা খুলে বেরিয়ে আসে মোহনলাল। খালি গা নয়। শার্ট আর লুঙ্গি পরা। লোকগুলোর সঙ্গে চাপা গলায় কী যেন বলে। একটা লোক পকেট থেকে একটা বড় খাম দেয় মোহনলালকে। মোহনলাল খামটা খোলে। আঙ্গুলের ডগাটা চেটে নেয় জিভ দিয়ে। তারপর টাকাগুলো গুনতে থাকে।

দুটো লোক ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। একটা ট্রাক খুব জোরে এগিয়ে যায় হাইওয়ে দিয়ে। তার আওয়াজে যেন নড়ে ওঠে পুরো ধাবাটা। লোকদুটো বেরিয়ে আসে। পাঁজাকোলা করে ধরা সোনালিকে। সোনালির চোখ বন্ধ। মাথাটা ঝুলে আছে একটু।

মাটির থেকে একটা আধলা ইঁট তুলে নেয় নয়ন। তুলে সোজা ছোঁড়ে মোহনলালের দিকে। ইটটা অতদূর যায় না। একটা টেবিলের ওপর পড়ে শব্দ করে। ইঁটের শব্দ শুনে চমকে ওঠে লোকগুলো। মোহনলাল মুখ তুলে দেখে নয়নের দিকে। লোকগুলো একটু থমকায়। টাকাগুলো প্যান্টের পকেটে গুজে নেয় মোহনলাল। এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা মোটা লাঠি তুলে নিয়ে তেড়ে আসে নয়নের দিকে।

নয়ন মাটির দিকে তাকায়। আর কোনও ইঁট নেই। লাঠির বাড়ি এসে পড়ে নয়নের শরীরে। নয়ন ছিটকে পড়ে। মোহনলাল পাগলের মত মারতে থাকে তাকে। লোকদুটো সোনালিকে ততক্ষণে গাড়ির ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। নিজেরাও উঠে দরজাগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। নয়ন উঠে দৌঁড়ায় গাড়ির দিকে। পেছন থেকে ছুটে এসে তাকে ধরে ফেলে মোহনলাল। হাতে বিরাট থাবা দিয়ে চেপে ধরে মুখটা। খুব জোরে। মোহনলালের নখগুলো চেপে বসতে থাকে নয়নের মুখে। জ্বালা করে ওঠে। গাড়িটা ছেড়ে দেয়। নয়ন হঠাৎ মোহনলালের হাতটা কামড়ে ধরে। রক্ত বার হয়ে যায়। নিমেষে নয়নকে ছেড়ে দেয় মোহনলাল। হাতের মুঠিটা চেপে ধরে অন্য হাত দিয়ে।

গাড়িটা হাইওয়েয় উঠে যায়। দ্রুত এগোতে থাকে। নয়ন দৌঁড়ায়। ধাবার সামনের ফাঁকা জমিটা পেরিয়ে সে এখন রাস্তার উপর। মসৃণ অ্যাসফল্টেড রাস্তাটা ক্রমশ এবড়ো খেবড়ো হয়ে আসে। ধীরে ধীর শুধু খোয়ায় ঢেকে যায়। দু’পাশের পাহাড়গুলো এগিয়ে আসতে আসতে চেপে ধরে হাইওয়েটাকে। ওরা বেঁটে হতে হতে আঁকাবাঁকা বস্তির বাড়ি হয়ে যাচ্ছে। রাস্তার ওপরে আঁকা লম্বা সাদা লাইনটা হঠাৎ একটা রেলওয়ে লাইন হয়ে যায়। নয়ন দেখতে পায় গাড়িটা সেই রেলওয়ে লাইন ধরে ছুটতে ছুটতে এগিয়ে যেতে যেতে কাকে যেন পিষে দেয়। কে যেন খুব জোরে চিৎকার করে ওঠে, ‘সুচিত্রা তোর বর ট্রেনে কাটা পড়েছে।’ রেললাইন ধরে গড়াতে গড়াতে একটা কাটা মুণ্ডু নয়নের সামনে চলে আসে।

কাটা মুণ্ডু নয় একটা পিস্তল। ছুটতে ছুটতেই পিস্তলটা হাতে নিয়ে নেয় নয়ন। সোজা গুলি চালায়। গুলিটা রেললাইন ধরে ভাসতে ভাসতে এদিক ওদিক পাক খেতে খেতে এই জোরে এই আস্তে হয়ে সোজা গিয়ে গাড়িটার পেছনের চাকার টায়ারটা ফাটিয়ে দেয়। গাড়িটার রেললাইনের ওপর থমকে দাঁড়ায়।

নয়ন চিৎকার করে হেসে ওঠে। সে এখন অনেক লম্বা। পায়ে বেলবটস। চুল দুটো কান ঢাকা। পিস্তলটায় ফুঁ দিতে দিতে নয়ন গাড়িটার দিকে এগোতে এগোতে বলে ওঠে, ‘উস রাত তুমহারে হাত ম্যায় পিস্তল থি। আজ মেরে হাত মে হ্যায়। য়ো ভি দিওয়ালিকি রাত থি। অর আজ ভি হ্যায়। লেকিন কামিনে ম্যায় তুঝে ইতনি আসানি সে নেহি মারুঙ্গা।’ 

[ভারতবর্ষে প্রতি মুহূর্তে দশটি শিশুর মধ্যে একজন যৌনলাঞ্ছনার শিকার হয়। প্রতি ১৫৫ মিনিটে একজন ১৬ বয়সের নীচে নাবালক ও প্রতি ১৩ ঘন্টায় একজন ১০ বছরের কমবয়সী নাবালক ধর্ষিত হয়।[i] কিছু গবেষণার দেখা গিয়েছে ভারতবর্ষে প্রায় ৭২০০ শিশু প্রতি বছরে ধর্ষিত হয়। এদের মধ্যে অনেক ঘটনাই নথিভুক্ত হয় না। সরকারি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে ভারতবর্ষের শিশুদের প্রায় ৪০%রই গৃহহারা, পাচার, ড্রাগ, জোর করে শিশুশ্রম বা অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পরার সম্ভাবনা থাকে।[ii] ২০১৫ সালের ন্যাশানাল ক্রাইমরেকর্ডস বুরোর তথ্যে অনুযায়ী ধর্ষিত শিশুদের মধ্যে ২৫%ই শিশুশ্রমিক এবং তাঁদের ধর্ষকরা হয় তাঁদের নিয়োগকর্তা বা সহকর্মী। একই পরিসংখ্যান অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাদের যৌন হয়রানির ঘটনা মাত্র ২%। [iii] ইন্টারন্যাশানাল লেবার অর্গানাইজেশনের মতে ভারতবর্ষে মোট ১.০৩ কোটি শিশুশ্রমিক আছে। এদের ৭০%ই মেয়ে। [iv]২০০৭ এর সরকারি সমীক্ষার মতে শিশুশ্রমিকদের মধ্যে ছেলেদের যৌনলাঞ্ছনার ঘটনা মেয়েদের প্রায় সমান। [v]]

[i]২০০৭ সালের ভারত সরকারের মহিলা ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রকের রিপোর্ট (https://www.childlineindia.org.in/pdf/MWCD-Child-Abuse-Report.pdf)

[ii]Breaking the silence.Child sexual abuse in India. USA, Humans rights watch. 2013 (http://www.hrw.org/sites/default/files/reports/india0113ForUpload.pdf . )

[iii]https://www.savethechildren.in/resource-centre/articles/recent-statistics-of-child-abuse

[iv]http://www.ilo.org/ipecinfo/product/download.do?type=document&id=2099

[v]২০০৭ সালের ভারত সরকারের মহিলা ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রকের রিপোর্ট (https://www.childlineindia.org.in/pdf/MWCD-Child-Abuse-Report.pdf)

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত