Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

সর্বতোভদ্র কথাশিল্পের স্রষ্টা

Reading Time: 6 minutes
সুবোধ ঘোষ 
 

মাঝে মাঝে দেখতে পাই, কোন এক সমালোচক শরৎ-সাহিত্যের জনপ্রিয়তার কারণ নির্ণয় করতে গিয়ে অনেক কথা বলছেন। জানি না, কোনও সমালোচক শরৎ-সাহিত্যকে জাতীয় সাহিত্যের এক বিশুদ্ধ ও আদর্শোচিত প্রতিচ্ছবি বলে অভিহিত করেছেন কিনা। একদা সমালোচনার ক্ষেত্রে এই ধারণার প্রাবল্য দেখা দিয়েছিল যে, দেশ ও জাতির সামাজিক অথবা রাজনীতিক কিংবা অর্থনীতিক কোন অভ্যুদয়ের আকাঙ্খা ও প্রয়াসের ভাবানুপ্রাণিত প্রতিবেদন হল সার্থক ‘জাতীয়’ সাহিত্যের পরিচয়। আজও বোধ হয় সমালোচক অথবা সাহিত্যরসিক সমাজের সকলে মনস্বী রাজনারায়ণ বসুর বিখ্যাত নীতি অনুযায়ী ‘জাতীয়’ সাহিত্যের স্বরূপ নির্ণয় করতে চাইবেন না। কিন্তু মনে হয়, মনস্বী রাজনারায়ণ বসুর বিচারিত অভিমত মান্য করে নিয়ে এই সাধারণ সত্য স্বীকার করা যায় যে, দেশপ্রেমের প্রেরণা সঞ্চারিত করবার কাব্য-কাহিনীই সার্থক ‘জাতীয়’ সাহিত্যের নমুনা নয়। অন্য লেখকের রচনার সঙ্গে তুলনা না করে শরৎচন্দ্রের নিজেরই রচনার দুই নমুনার মধ্যে তুলনা করে বলা চলে যে, ‘পথের দাবী’র তুলনায় ‘পল্লীসমাজ’ জাতীয় সাহিত্যের গুণ লক্ষণ ও তাৎপর্য বেশী বহন করে। কিন্তু প্রশ্ন করে ও বিচার করে বুঝবার প্রয়োজন হয়, শরৎচন্দ্রের মন ও কালিকলমের কোন কৃতিত্বে তাঁর রচিত সাহিত্যকে সত্যিকারের এবং সার্থক ‘জাতীয়’ সাহিত্য হিসাবে গুণান্বিত করেছে।

এক সত্য স্বীকার না করলে ঊনিশ ও বিশ শতকের বাংলা কথা-সাহিত্যের আঙ্গিক সৌকর্য এবং মর্মগত অনুবেদনার যথার্থ নির্ণয় সম্ভব হতে পারে না। স্বীকার করতে হয় যে, ঐ কালের মধ্যে বাংলার সাহিত্যক্ষেত্রে এমন কিছু অতি সুফলপ্রসূ প্রতিভার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, যাদের পক্ষে যথার্থ ‘জাতীয়’ সাহিত্যের মহৎ দৃষ্টান্ত বলে দাবি করবার কোন যুক্তি নেই, অথচ সাহিত্য হিসাবে তাদের অন্য আবেদন ও মনোজ্ঞতার যথেষ্ট চমৎকারিতা আছে। মনস্তাত্বিক বলবেন, এটা বিদেশীয় সাহিত্যের রূপ ও রীতির ঐশ্বর্য আত্মস্থ করবার চমৎকার সফলতার উদাহরণ। এই কৃতিত্ব নিতান্ত পরানুকৃত ভাবনার ক্রিয়াফল বলে নিন্দিত হতে পারে না। মনোজ্ঞতার কারণে, কিংবা আঙ্গিক সৌষ্ঠবের অভিনবতার কারণে জনসমাদরে সুপ্রতিষ্ঠ হয়েছে, এহেন সাহিত্য যে কোন দেশের কিংবা জাতির সাংস্কৃতিক পরিতৃপ্তির এক বড় সম্বল বটে, কিন্তু জাতির যথার্থ হৃদয়সংবেদ্য সম্বল নয়। শরৎ-সাহিত্যের সবচেয়ে বড় মহত্ত্ব নিশ্চয় এই যে, এ সাহিত্যের ভাব অনুভব ও প্রসাদ বৈষ্ণব কবির প্রিয় শ্যামনামের মতো কানের ভিতর দিয়া মরমে প্রবেশ লাভ করে। মাথা ঘামিয়ে কিংবা বুদ্ধি-বিচার ও তাত্ত্বিক বিজ্ঞতা নিয়ে এ কাহিনীর তাৎপর্য বুঝে নেবার চেষ্টা করতে হয় না। শরৎ-রচিত গল্প ও উপন্যাসের আবেগ ঝর্ণার জলের মতো আপন মর্মরোলে উদ্বেলিত। পিপাসী জনের পক্ষে স্বচ্ছ-শীতল তৃপ্তির অঙ্গীকার।

রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রের প্রতিভা ও কৃতিত্বের প্রশংসাময় অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন যে, শরৎ বাঙালীর হৃদয়ে ডুব দিয়েছিলেন, তাই তাঁর গল্প-উপন্যাস (বাঙালী) পাঠকজনের মনের পক্ষে প্রিয়তার আস্পদ এবং সহজগ্রাহ্যতার ও সমাদরের বস্তু। কবির উক্তির সত্যতা স্বীকার করে নিয়েও এক্ষেত্রে ব্যক্তির পক্ষে শরৎ-সাহিত্য সম্বন্ধে ধারণা গ্রহণ করবার বিষয়ে বিশেষ সতর্ক হবার দরকার হবে। অনুমান করতে হয়, কবি নিশ্চয় একথা বলতে চাননি যে, শরৎচন্দ্র বাঙালীয়ানার হৃদয়ে ডুব দিয়েছিলেন। সাহিত্যের সৃষ্টি ও নির্মাণের ইতিহাসে এক নিয়ম বস্ততঃ সার্থক ও সফল কৃতিত্বের এক চিরায়ত অভিজ্ঞানে পরিণত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞান এই যে, তথ্য-সাহিত্যের কথা বাদ দিয়ে প্রত্যেক ভাব-সাহিত্যের ক্ষেত্রে বড় স্রষ্টার প্রতিভা ও মেধার বড় লক্ষণ এই যে, তিনি জনজীবনের হৃদয়ে ডুব দিয়ে রূপ অন্বেষণ করে থাকেন। সামাজিক পরিবেশ, স্থানিক ঘটনা, অর্থনীতিক জনসমস্যার আবর্ত, সবই কথাশিল্পীর দরকারের উপাচার বটে, কিন্তু সৃষ্টি নিশ্চয়ই নয়। সৃষ্টি একান্তভাবে এবং নিতান্ত রূপ হৃদয়ের যাবতীয় ইচ্ছা কামনা ও আবেগের পরাগে সমাকীর্ণ এক ফুলবন। বিস্তারিত করে বললে বলতে হয়, হৃদয়ের অগ্নিস্ফুলিঙ্গও এক স্বাভাবিক প্রয়োজনের উপচার। তত্ত্ব জ্ঞানের দ্বারা নিবেদিত উপন্যাস এবং আঙ্গিক অভিনবতার আতিশয্যে সমুৎকীর্ণ কোন কাহিনীময় আলেখ্য কখনই জনসাধারণের কাছে এবং বৃহত্তর কালের কাছে হৃদয়ের জিনিষ বলে অনুভূত হতে পারে না। আদর্শিক মহত্বের বিপুল বিস্তার এবং বিবাদ থাকলেও চিত্তবিনোদক রম্যতায় উত্তীর্ণ না হয়ে কোন গল্প-উপন্যাস সাধারণের মর্মগত পরিতৃপ্তির সম্বল বলে বিবেচিত ও স্বীকৃত হবে না।

শরৎচন্দ্রকে এজন্য বাংলা সাহিত্যের আঙিনাতে এক সার্থক পুষ্পমালঞ্চের রচয়িতা বলে মনে করা যায়, এবং এক্ষেত্রে তিনি অন্য মহান কৃতীদের তুলনায় বর্ণ-সৌরভের অনেক বেশী সুষমা সঞ্চারিত করেছেন। একথা বিশ্বাস করবার যুক্তি আছে যে, বাঙালীর হৃদয়ে যিনি ডুব দিয়েছিলেন, সেই শরৎচন্দ্র মানবীয় জীবনের বিশ্বজনীন প্রকৃতির উদাত্ত সমতা ও ঐক্য সম্পর্কে কিছু কম রূপের ঐশ্বর্য পরিবেশন করেননি।  রুশ হৃদয়ে ডুব দিয়েছিলেন টুর্গেনিভ ও ডষ্টয়ভস্কি, ফরাসী হৃদয়ে ডুব দিয়েছিলেন ভিক্টর হিউগো, ইংরাজ হৃদয়ে ডুব দিয়েছিলেন চার্লস্ ডিকেন্স—কিন্তু কেউ কি অস্বীকার করতে পারবেন যে, এঁদের রচিত উপন্যাস বিশ্বজনেরও হৃদয়ে ভাব-অনুভবের ব্যাকুলতা উদ্বেলিত করে তুলেছিল? হৃদিরত্নাকরের অগাধ জলে ডুব দিলে মণি-মাণিক্যই পাওয়া যায়। এবং সেটা বিশ্বজনীন আনন্দ ও প্রসন্নতারই এক রূপময় সম্বল। বরং বলা চলে, এবং বিখ্যাত ইউরোপীয় সমালোচকদের অভিমত সংকলিত করলেও প্রমাণিত হবে যে, তাঁরা ‘সিনসিয়ার’ তথা উপলব্ধির অনুগত নিষ্ঠাশীল সাহিত্য বলতে সেই সাহিত্যকেই বুঝেছেন, যে-সাহিত্য মানবীয়  হৃদয়বত্তার সমগ্র বিস্ময় বেদনা ও সৌন্দর্যের পুষ্পমালঞ্চ। স্বদেশ ও স্বজাতির হৃদয় ছাড়া এক্ষেত্রে কোন ব্যক্তির পক্ষে হৃদয়বত্তার শিল্পী হওয়া সম্ভব নয়। এবং কোন সন্দেহ নেই যে, ঐতিহাসিক রূপে ও প্রকৃতিতে হৃদয়বত্তা বিশেষ কোন এক ভৌগোলিক সীমায়তনের মধ্যে বিশেষ কোন জনজীবনের আত্যন্তিক পরিচর্যার সম্পদ নয়। বিশ্বজনীন অনুভবের যত বিস্ময়ের অথবা ব্যাকুলতার স্বাদ ব্যক্তির আপন সমাজজীবনেরই মানুষগুলির হৃদয়ে নিহিত আছে।

মনস্বী রাজনারায়ণ বসুর অভিমতের এক তথ্য আর-একবার স্মরণ করে নিয়ে বলা যায়, আমাদের বাংলা সাহিত্যের অনেক সুন্দর ও সুনির্মিত স্থাপত্য, বস্তুতঃ সুন্দর ও সুনির্মিত পুরানুকরণ। অর্থাৎ বিদেশীয় তথা পাশ্চাত্য ভাব-সাহিত্যের কায়া অনুকরণ করে নবরূপের গল্প এবং উপন্যাসের রচনা। ভারতীয় শিল্পশাস্ত্রে এক বৃহৎ নীতির অনুমোদন এই যে, শুধু তালিকা ও বণিকাভঙ্গের সাফল্যের দ্বারা ছবি এবং মূর্তির রূপন্যাস সম্পূর্ণ হয় না। চাই ‘লাবন্য যোজনা’। শরৎচন্দ্রের কথা-সাহিত্যের বিচারে ভারতীয় শিল্পশাস্ত্রের এই নীতিটিও প্রযুক্ত করলে এই সিদ্ধান্ত স্বাভাবিক সূত্রে এসে পড়ে যে, শরৎচন্দ্র ছিলেন কাহিনীতে এই ‘লাবণ্য যোজনা’র কৃতিত্বে সবচেয়ে বড় সফলতার অধিকারী। সামাজিক জীবনের প্রতিচ্ছবি হিসাবে শরৎচন্দ্রের গল্প-উপন্যাস নিখুঁত বাস্তবতানিষ্ঠ কৃতিত্বের নিদর্শন। সামাজিক ন্যায়-অন্যায়ের সংঘাত ও নরনারীর প্রণয় ও পরিণয়ের নানা মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার বিশ্লেষণও তাঁর উপন্যাসের এক বড় বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এহ বাহ্য এর আগে এগিয়ে যেয়ে বলতে হয়, তিনি নিতান্ত সামাজিক ভাবনার মানচিত্রের মধ্যে বর্ণসাত করে তাঁর কাহিনীর আয়তন নির্মাণ করেননি। তিনি মানবতার বিশ্বজনীন আবেদন রূপান্বিত করেছেন।

শরৎচন্দ্রের গল্প-উপন্যাসের রচনা ও নির্মাণের রীতি-নীতি সম্পর্কে কোন বিজ্ঞ সমালোচকের কোন বিস্ময়ের কথা কখনও শুনেছি বলে মনে পড়েনা। বরং এটাই সাধারণ ধারণা হিসাবে প্রচারিত হয়েছে যে, শরৎচন্দ্রের লিখনভঙ্গীর মধ্যে বিশেষ কোন অভিনবতার প্রমাণ পরিস্ফুট নয়। খুবই সরল ও প্রাঞ্জল বলে শরৎচন্দ্রের লিখনভঙ্গীর প্রশস্তি করা হয়ে থাকে। বলতে হয়, এই প্রশস্তি বস্তুত লেখকীয় প্রতিভার পক্ষে সর্বোচ্চ অভিনন্দন। এই প্রশস্তি নিম্নকণ্ঠে উচ্চারিত হলেও বুঝতে হবে যে, শরৎচন্দ্র কোন বিদেশীয় সাহিত্য-কৃতিত্বের তথ্য ও তত্ত্বের দ্বারা একটুও প্রভাবিত হননি। তাঁর প্রতিভা যেন স্বতঃউৎসারিত আবেগে কল্লোলিত হয়ে জীবনের সঙ্গীত শুনিয়েছে। জীবনের সত্যকে ধরে রাখে, মমতাকে মধুময় করে রাখে এবং প্রীতিকে ত্যাগযুত করে রাখে, মানবীয় হৃদয়বৃত্তির যে অণু-পরমাণু, শিল্পী শরৎচন্দ্র তাই নিয়ে ও তাই দিয়ে কাহিনীর প্রাণ, মন, কায়া ও আত্মার প্রধান রূপণা সুসম্ভব করেছেন। বাংলা সাহিত্যের সৌভাগ্যের বিষয় এবং সম্মানের বিষয় এই যে, শরৎচন্দ্রকে বাংলার ডিকেন্স কিংবা হিউগো বলে আখ্যাত হবার বিড়ম্বনায় আক্রান্ত হতে হয়নি। তিনি ‘সিনসিয়ার’ সাহিত্যের, যথার্থ জাতীয় সাহিত্যের এক মহান শক্তিধর স্রষ্টা। শরৎচন্দ্রের কৃতিত্ব ও জনপ্রিয়তার ব্যাপ্তিতে এই সত্যই প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে শুধু একজন আদর্শোচিত ‘দরদী’ কথাশিল্পী নন, তিনি তাঁর ভাবে অনুভবে কল্পনায় ও উপলব্ধিতে একজন, এবং সম্ভবত একমাত্র, আত্মপ্রতিভায় আশ্রিত এবং স্ব-মহিমান্বিত সাহিত্যিক।

সামাজিক চেতনা সত্যিই মানবিক চেতনার এক আনুষঙ্গিক প্রকার। তাই খুবই স্বাভাবিক আকর্ষণে কথাশিল্পীর মন সমাজের ভাল-মন্দ অবস্থা এবং পরিণামের বিচার করেছেন। সামাজিক সমস্যা অবলম্বন করে সার্থক উপন্যাস রচিত হয়েছে, একথাও সত্য। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এই সত্যও স্মরণ করতে হয় যে, যুগের জীবন এক জায়গায় এবং একই সমস্যার ভারে মন্থর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে না। সমস্যার শেষ সীমা অতিক্রম করে মানবীয় জীবনের আগ্রহ নূতন অন্বেষার পথে এগিয়ে য়ায়। সমস্যা আর থাকে না। কিন্তু জীবন নামক নির্বিশেষ সত্য থেকে যায়। সার্থক কাহিনী-সাহিত্যের গুণ-লক্ষণের সবচেয়ে বড় কথা এই যে, সমস্যার চমৎকার ভূষণ অপসারিত হয়ে গেলেও কাহিনীর ভূষণ থেকে যায়। সমস্যার গুরুত্ব শূন্য করে দিয়েও কাহিনীতে নিহিত জীবনের রম্য নিবেদন এক সুচিরস্থায়ী সম্পদ হয়ে কাহিনীর ভূষণ থেকে যায়। সমস্যার গুরুত্ব শূন্য করে দিয়েও কাহিনীতে নিহিত জীবনের রমা নিবেদন এক সুচিরস্থায়ী সম্পদ হয়ে কাহিনীকে অমরতা প্রদান করে, এবং সেই অমরতা চন্দ্র-সূর্যের মতো চিরায়ু না হয়েও যুগ থেকে অন্য যুগের প্রদীপ হয়ে সাংস্কৃতিক জীবন ভাস্বরিত করে তোলে। শরৎচন্দ্রের কাহিনী-সাহিত্য সম্পর্কেও বলা যায়, যুগজীবনের সমস্যাগুলি যখন আর থাকবে না, তখনও নতুন দিনের ভোরে শরৎচন্দ্রের রচিত কাহিনীর অন্তনির্হিত মানবতার শাশ্বত আবেদনের প্রভাবে পাঠকজনের অনুভবের আকাশ অরুণিত করে রাখবে।

শরৎ-সাহিত্যের সমীক্ষাতে আরও এক সত্য ধরা পড়ে, যাকে এক শিক্ষার সত্য বলে আখ্যাত করা চলে। বিশেষ করে ভারতীয় কথাশিল্পের পরিচর্যা ও প্রয়োজনের বিষয় স্মরণে রেখে এই সিদ্ধান্ত মুক্তকণ্ঠে ঘোষণা করা চলে যে, শরৎচন্দ্রের সাহিত্য ভারতীয় সুধী ও শিল্পীর প্রতিভাকে বাইরের কোন বিশাল কৃতিত্বের প্রতি উদাসীন না হয়েও এক ‘বৈধ অহংকারে’ ঋজু হয়ে থাকবার শিক্ষা দিয়েছে। শক্তিসন্ন প্রতিভাধরের সাংস্কৃতিক চিন্তা এবং আচার-বিচারে অ্যারিষ্টটল যে বৈধ অহংকারের প্রশ্রয় অনুমোদন করেছেন, সেই অহংকার। সাহিত্য অবশ্যই নিকৃষ্ট পরিণামের আবর্তে পড়ে মিথ্যার সম্ভারে পরিণত করে, যদি স্রষ্টা লেখক ও শিল্পীর আন্তরিক স্বভাবের মধ্যে আত্মিক স্বাধীনতার প্রকর্ষ না থাকে। কবি কামিনী রায় হেমচন্দ্রের কার্যকলার আলোচনা করতে গিয়ে আক্ষেপের সুরে এক ধরণের আধুনিক রীতিশীলতার প্রতিবাদ করেছেন। তাঁর অভিমতের কথা—আধুনিককালে কাব্যের বিচার করতে ভাব রূপ ও তাৎপর্যের সৌষ্ঠব ততটা বিবেচিত হয়না, যতটা বিবেচিত হয় কাব্যের আঙ্গিক রীতির অভিনবতা। এক্ষেত্রে রীতির শাব্দিক মুখরতা, যেটা শুধু কানের উপর প্রভাব বিস্তার করে, তারই সমাদর বেশী। শরৎচন্দ্রের রচিত কাহিনী-সাহিত্য মহিলা কবি কামিনী রায়ের প্রস্তাবিত তত্ত্বেরই এক সার্থক সত্যতার নিদর্শন। শরৎচন্দ্রের কাহিনী-সাহিত্য ভাষাতে ও ভঙ্গীতে অবিচ্ছেদ্য-সরসীনীরের মতো নিগূঢ় অথচ স্বচ্ছতায় প্রাঞ্জল। তিনি টেকনিকের বৈভব প্রদর্শিত করবার জন্য চেষ্টাকৃত কোন সাধনা স্বীকার করেছিলেন বলে মনে হয় না। এমন বিখ্যাত গল্প ও উপন্যাসের সংখ্যা কম নয়, যারা নিতান্ত ভঙ্গী তথা টেকনিকের বৈভব সম্ভব করবার ইচ্ছাকৃত অধ্যবসায়ের বড় নমুনা। সন্দেহ করতে হয়, খ্যাতির সম্বল থাকলেও এ ধরণের কারিগরী কারুতায় সমৃদ্ধ কাহিনীগুলির ভাগ্য বড়ই নশ্বর। আমাদের সৌভাগ্য, আমাদেরই ঘরের কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র ঘরোয়া হৃদয়ের সহস্র বর্ণসুষমা দিয়ে সরল ও প্রাঞ্জল যে কাহিনী-সাহিত্য রচনা করেছেন সেটা ভারতীয় শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী নগর নির্মাণের আদর্শোচিত স্থাপত্যের মতো রূপে ও গুণে সর্বতোভদ্র, বাংলার সমাজ জীবনের সুখদুঃখ প্রতিচ্ছবিত করেও বিশ্বজনীন আবেদনে চিরপ্রসন্ন।

     

শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায় শতবার্ষিকী সংকলন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

               

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>