শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখক হয়ে ওঠার গল্প

আজ ১৫ সেপ্টেম্বর কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় বিনম্র শ্রদ্ধা।


বিশ্ববিখ্যাত জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামি একদিন ক্যাফেতে তার নিত্যদিনের কাজ করছিলেন। আর টিভিতে বেজ বল খেলা উপভোগ করছিলেন। হঠাৎ তার মনে হলো, তাকে একটি উপন্যাস লিখতে হবে- এবং এর পরপরই লিখে ফেললেন তার সেই কাঙ্ক্ষিত উপন্যাস। অন্যদিকে ১৯৬৫ সালের জানুয়ারি মাসে দারিদ্র্য ও অস্থির ভুবনের মধ্যে একদিন মার্কেস তার স্ত্রী ও পুত্রকে নিয়ে আলোকাপুলশোর দিকে যাচ্ছিলেন।

গাড়ি ঘুরিয়ে মার্কেস ফিরে এলেন বাড়িতে। নিজের ঘরের মধ্যে বন্দী হয়ে লিখতে শুরু করলেন তার সেই বিখ্যাত উপন্যাস ‘নিঃসঙ্গতার একশত বছর’। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে লিখেছিলেন জীবনের প্রথম গল্প ‘অতসী মামী’। তার লেখাটি ‘বিচিত্রা’ নামক পত্রিকাতে পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে তা ছাপা হয়েছিল। তবে হঠাৎ লেখক হয়ে ওঠা সম্পর্কে স্বয়ং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন- ‘রাতারাতি লেখকে পরিণত হওয়ার ম্যাজিকে আমি বিশ্বাস করি না। লেখক হওয়ার জন্য অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি চলে। লেখক হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আসতে আসতেই কেবল একজনের পক্ষে হঠাৎ একদিন লেখক হিসেবে আত্দপ্রকাশ করা সম্ভব। প্রস্তুতির কাজটি অবশ্য একজন লেখক সচেতনভাবে নাও করতে পারেন। কীভাবে যে প্রক্রিয়াটা ঘটছে এ সম্পর্কে তার কোনো ধারণা পর্যন্ত না থাকতে পারে। জীবন যাপনের সমগ্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকায় লেখক হওয়ার আগে এই প্রস্তুতি প্রক্রিয়ার বিশেষ তাৎপর্য ধরতে না পারাটাই বরং স্বাভাবিক। ‘

শরৎচন্দ্র লেখালেখির প্রেরণা উত্তরাধিকারসূত্রে তার পিতার কাছ থেকে পেয়েছিলেন। যখন তিনি স্কুলের নিচের ক্লাসে পড়তেন সে সময় স্কুলের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি তার পিতার আলমারির দরাজ খুলে গল্পের বই বের করে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তেন। এ সম্পর্কে শরৎচন্দ্র নিজেই বলেছেন- “এবার বাবার আলমারির ভাঙা দরাজ থেকে খুঁজে বের করলাম ‘হরিদাসের গুপ্তকথা’ আর ‘ভবানী পাঠক’ গুরুজনদের দোষ দিতে পারিনে। স্কুলের পাঠ্য নয়, এগুলো বদ ছেলেদের অপাঠ্য পুস্তক। তাই পড়বার ঠাঁই করে নিতে হলো আমাকে গোয়ালঘরে। ” শরৎচন্দ্রের পিতার লেখালেখির অভ্যাস ছিল পুরোদস্তুর কিন্তু তার সব লেখাই ছিল অসমাপ্ত। শরৎচন্দ্র পিতার অসমাপ্ত উপন্যাস, নাটক, গল্প ও কবিতাগুলো প্রায়ই পড়তেন। ওই লেখাগুলোর শেষটা কী হবে কিংবা কী হতে পারে সেটা নিয়ে ভাবতেন। এ প্রসঙ্গে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাবতেন এবং সেই সঙ্গে নিজেই কল্পনার জাল বুনতেন। কখনো তিনি সারা রাত না ঘুমিয়ে পার করে দিতেন। পিতার অসমাপ্ত গল্প বা উপন্যাসের শেষ ভাগে কী হতে পারে! কল্পনার সূত্র ধরেই শরৎচন্দ্র সেই ছেলেবেলা থেকে গল্প লিখতে শুরু করেছিলেন।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিজেই বলেছেন- ‘পিতার কাছ থেকে অস্থির স্বভাব ও গভীর সাহিত্য-অনুরাগ ব্যতীত আমি উত্তরাধিকারসূত্রে আর কিছুই পাইনি। পিতৃপ্রদত্ত প্রথম গুণটি আমাকে ঘরছাড়া করেছিল। আমি অল্প বয়সে সারা ভারতবর্ষ ঘুরেছি আর দ্বিতীয় গুণটির ফলে জীবনভর কেবল স্বপ্ন দেখেই গেলাম। আমার পিতার পাণ্ডিত্য ছিল অগাধ, ছোটগল্প, নাটক, উপন্যাস, কবিতা এককথায় সাহিত্যের সব বিভাগে তিনি হাত দিয়েছিলেন কিন্তু কোনোটাই তিনি শেষ করতে পারেননি। তার লেখাগুলো আজ আমার কাছে নেই, কবে কেমন করে হারিয়ে ফেলেছি সেই কথা আজ মনে পড়ে না। কিন্তু এখনো স্পষ্ট মনে আছে ছোটবেলায় কতবার তার অসমাপ্ত লেখাগুলো নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছি- এগুলো শেষ করে যাননি বলেও কত দুঃখ না করেছি। তার লেখার অসমাপ্ত অংশগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে আমার অনেক বিনিদ্ররজনী কেটেছে। তবে এ কারণেই বোধহয় আমি ১৭ বছর বয়সে লেখা শুরু করি। ‘

১৮৯২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শরৎচন্দ্র যখন মাত্র ১৭ বছর বয়সে পদার্পণ করেন তখন তিনি কলকাতার দেবেন্দ্রপুরে বাস করতেন। তিনি তখন হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুলের ছাত্র। শরৎ লেখালেখিতে সব সময় বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ ও অনুকরণ করতে চেয়েছিলেন। রবিঠাকুরের লেখা শরৎচন্দ্র এতটাই পছন্দ করতেন যে, রবীন্দ্রনাথের বেশভূষা পর্যন্ত অনুকরণ করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতেন। আর সেটা করতে গিয়ে তিনি রবিঠাকুরের মতো বড় বড় চুলও রেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ততদিনে বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তাই নতুন কেউ সাহিত্যাঙ্গনে পা দিলে তাকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তুলনা করা হতো। বঙ্কিমের লেখা পাঠ করে শরৎচন্দ্রের মনে হয়েছিল যে, এসব উপন্যাসের পরও অনেক নতুন বিষয়ে লেখা যেতে পারে। এ কথা সেই সময় তিনি ভাবতে পারেননি।

‘কাকবাসা’ তার লেখা প্রথম গল্প, মামা সুরেন্দ্রনাথ লুকিয়ে লুকিয়ে শরৎচন্দ্রের লেখার এ অভ্যাসটি ধরে ফেলেছিলেন। বাইরে থেকে ঘুরে এসে সুরেন্দ্রনাথ দেখতেন যে, শরৎ তখনো লিখে চলেছেন, পরে অবশ্য গল্পটি শরৎচন্দ্রের পছন্দ হয়নি। পিতার মতো গল্পটি পড়ে ভেবেছিলেন এটা কি রবীন্দ্রনাথের মতো হয়েছে; না হয়নি। যদি না হয় তবে নতুন লিখেই বা কি হবে? যদি লিখতেই হয় তবে তার মতোই লিখব। নইলে নয়। এরপর গল্পটি একদিন কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে নিশ্চিত হলেন। ‘কাশীনাথ’ উপন্যাসটিকেও শরৎ যোগ্য মনে করেননি। দেবেন্দ্রপুর যাওয়ার সময় কয়েকটি ছোটগল্প লিখেছিলেন। ভাগলপুরে এসে সেগুলো কেটেকুটে তার কলেবর বাড়িয়েছিলেন। ‘করেলগ্রাম’ গল্পটি তিনি দেবেন্দ্রপুরে শুরু করেছিলেন কিন্তু ওই নামে গল্পটি ছাপা হয়নি। আস্তে আস্তে লেখালেখির আগ্রহ প্রবল হতে শুরু করল শরৎচন্দ্রের মনে। শরৎচন্দ্র সব সময় মনে মনে ভাবেন এই সংসারে যা কিছু দেখেছি শুনেছি তাকে কি কোনো রূপ দেওয়া যায় না? প্রথম প্রথম শরৎচন্দ্র এ গল্প ও গল্প হতে চুরি করে লিখতেন কিন্তু জীবনের পাঠশালায় অভাবের অগি্নযজ্ঞে যে অভিজ্ঞতা তিনি সঞ্চয় করেছিল সেই অভিজ্ঞতা তার লেখনীতে শক্তি জুগিয়েছিল। একবার তিনি সাধুর দলে যোগ দিয়েছিলেন। সেও বোধহয় অভিজ্ঞতা লাভের নেশায়। শরৎচন্দ্র ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নানা ধরনের গল্প শুনিয়ে মগ্ন করে রাখতেন। ছোটদের কাছে তার গল্প পাঠ করে শুনিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, কেমন লাগছে রে! ছোট ছোট বাচ্চারা সত্যি কিছু বুঝতে পারত কিনা কে জানে? কিন্তু এই অদম্য গল্পবিশারদকে অনায়াসে বলতেই হতো- ‘দাদা খুব ভালো লাগছে। ‘ শরৎচন্দ্র একবার তার এক আত্দীয় লীলা রানী বন্দ্যোপাধ্যায়কে এক চিঠিতে লিখেছেন, ‘১৪ বছর ধরে ১৪ ঘণ্টা ধরে পড়ছি। সেই যে কলেজ জীবনের পরীক্ষা দিতে পারেনি কেবল সেই রাগে। যদিও এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ১৪ বছর ১৪ ঘণ্টা কথাটি আক্ষরিক অর্থে সত্য না হলেও এ কথা ঠিক যে, শরৎচন্দ্র বহু বছর পর্যন্ত পর্যাপ্ত সময় দিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। ‘ তার এই পড়ালেখার কথা উল্লেখ করে রেঙ্গুন থেকে বন্ধু প্রমথনাথ ভট্টাচার্যকে এক চিঠিতে লিখেছেন, ‘পড়িয়াছি বিস্তর প্রায় কিছুই লিখি নাই, গত ১০ বছরে ফিজিওলজি, বায়োলজি অ্যান্ড সাইকোলজি, হিস্ট্রি পড়িয়াছি। শাস্ত্রও কতক পড়িয়াছি। ‘ শরৎচন্দ্র রেঙ্গুন থেকে তার দুই মাতুল সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ও গিরিন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে একই পত্রে লিখিয়াছিলেন ‘বিস্তর পড়িয়াছি, আমার মনে লেখার গর্ব নাই। কিন্তু বিদ্যার গর্ব জন্মেছে, আমার মনে হয় আমার থেকে বেশি বই খুব কম বাঙালি পড়িয়াছে এবং মনে করে রেখেছে। কোনো একদিন হয়তো আমি আমার ফিলোসফির মধ্যে ডুব দিব সেখান থেকে আর ফিরে আসব না। ‘

রেঙ্গুনে শরৎ প্রথমত বার্নাড ফ্রি লাইব্রেরি নামক একটি লাইব্রেরিতে পড়তেন এবং এই লাইব্রেরির নিয়মিত মেম্বার ছিলেন। কিছুদিন তিনি অফিসের পর লাইব্রেরিতে চলে যেতেন এবং লাইব্রেরিতে অনেক রাত অবধি পড়াশোনা করতেন। তারপর বাড়ি ফিরতেন। বই বাসায় এনেও পড়তেন। ১৯৪৩ সালে রেঙ্গুন থেকে যমুনার সম্পাদক ফণীচন্দ্রনাথ পালকে লিখেছিলেন ‘সকালবেলা ছাড়া আমি লিখতে পারি না রাতে আমি শুয়ে শুয়ে পড়ি। ‘ বার্নাড ফ্রি লাইব্রেরিতে বই পড়ার সময় তার মাতুল গিরিচন্দ্রনাথ সরকার তার ব্রহ্মদেশে শরৎচন্দ্র গ্রন্থে লিখেছেন- ‘রেঙ্গুনে বার্নাড ফ্রি লাইব্রেরি থেকে শরৎচন্দ্র ইংরেজি, রাজনৈতিক, দর্শননীতির মোটা মোটা গ্রন্থ সংগ্রহ করে তিনি মনোযোগ সঙ্গে পড়তেন। ‘ আর এভাবেই সচেতন কিংবা অচেতনে শরৎচন্দ্র এক খ্যাতিমান লেখক হিসেবে আবিভর্ূত হন। তবে এখানে এ কথা বলতেই হয় যে, ১৯০৩ সালে রেঙ্গুনে যাওয়ার পূর্বে শরৎচন্দ্র বেশকিছু গল্প, উপন্যাস লিখে সমাজে লেখক খ্যাতি পেয়েছিলেন। তার পাঠকপ্রিয় গল্প উপন্যাসের মধ্যে- ‘বড়দিদি’, ‘চন্দ্রনাথ’, ‘শুভদা’, ‘দেবদাস’, ‘কাশীনাথ’ এবং ‘চরিত্রহীন’র প্রথমাংশ অন্যতম। এক যুগেরও বেশি সময় রেঙ্গুনে অবস্থান করে শরৎচন্দ্র ফিরে আসেন কলকাতায় এবং নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে নিয়োজিত করেন সাহিত্য সাধনায়। এর পরের ইতিহাস আমাদের সবারই জানা। শরৎচন্দ্র একে একে সৃষ্টি করতে থাকেন কালজয়ী সব উপন্যাস। এদের মধ্যে, ‘শ্রীকান্ত’, ‘গৃহদাহ’, ‘পথের দাবি’, ‘দত্তা’, ‘বিরাজ বৌ’, ‘বিপ্রদাস’ অন্যতম।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত