শিমুল সালাহ্উদ্দিনের কবিতা

আজ ১৭ অক্টোবর কবি ও সাংবাদিক শিমুল সালাহ্উদ্দিনের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


চড়ুইকথন

খুব ছেলেবেলায় বড়দা আমাকে ঘরের ঘুলঘুলি থেকে একটি চড়ুইছানা পেড়ে দিয়েছিলেন। কী যে খুশি হয়েছিলাম! চড়ুই বরাবরই ভীষণ মন কাড়তো আমার। চড়ুইছানাটা হাতের মুঠোয় পেয়ে বালকের সব পেয়েছির দেশে পৌঁছে যাবার মতো লাফিয়ে উঠেছিলাম। দৌঁড়ে গিয়েছিলাম পাড়ার সবগুলো উঠোনে। চিৎকার করে বলছিলাম, ‘আমার একটা চড়ুই আছে, আমার একটা …’ ।

বারবার দেখি ওকে, খাওয়াই, গা ধুইয়ে দিই। এই এতটুকুন পাখি! অথচ কী প্রাণবন্ত, চলমান, ছটফটে। মুহুর্মুহু চারিদিকে তাকায় ইতিউতি। একদণ্ড চুপ থাকে না। চড়ুইমালিক হবার আনন্দে মায়ের সাথে স্কুলে গেলাম না। চড়ুইপাখিটা বুকের মধ্যে ধরে সারাসকাল দুপুর সন্ধ্যা ঘুরে বেড়ালাম। খাবার দাবাড়ের কথা যেন ভুলেই গেলাম।

স্কুল থেকে ফিরে মা বারবার বললো, ‘ওটাকে ছেড়ে দে, মরে যাবেতো!’ এতো আদর করে ধরে রেখেছি, মরে যাবে কেনো!’ বুঝতে না পেরে মা’র কথা শোনা হলো না।

কখন যে চড়ুইটাকে বুকে চেপে ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই। ঘুম ভেঙে দেখি আমার বুকের উপর চড়ুইটা মরে পড়ে আছে।

মা বললেন, ‘ভালোবাসার কোনকিছুকে এত গভীরভাবে চেপে ধরতে নেই । ধরলে, মরে যায়।‘


কালস্নান

অস্থিরতা অস্থিকথা কুড়িয়েছি চিতাভষ্ম থেকে সারারাত্রি ঘুরে
নাভি ও অঙ্গারগুলি হাই তোলে ধোঁয়াটে ঢেঁকুড়ে

ঢুকে গেছে আমার ফুসফুসে
যার ডাক শুনে কাঁদি আমাকে সে

শূন্যের মোচড়ে ব্যোম-ভাঁজে-ভাঁজে দিলো ছুড়ে
পুতলো লুব্ধক চাঁদিতে আমার গোল ছিদ্র করে
ঘামরজঃরক্ত শুষে
নীল কালো রাত্রি চুষে চুষে

সাকিনগোত্রহীন রাত্রির চণ্ডাল রাষ্ট্রময় মধ্যস্রোতে দাঁড়িয়েছি
মরা মানুষের নক্ষত্রের দেশে রক্ত মাখা ভাত খেয়ে বেঁচে আছি

এই মরা শহরেও গজায় নতুন পাতা, ফুল ফোটে, প্রজাপতি ওড়ে,
খুব খুব আকাশ উঁচুতে দু-একটা মিষ্টি ফল সোনালিরোদে ওঠে ভরে।


ঢেউ

তুলসী পাকুড় বট— হারিয়ে যেও না
বেতস বৈঁচি বিষকাটালিরা— থাকো, পাশে থাকো
সবচে’ কষ্টে থাকে যেই ফুল কুয়াশা জড়ানো
শিশিরসিক্ত মানবিক লণ্ঠন
এ-তো মণ্ডপ, ও-ই মসজিদ, ষষ্ঠীর বোধন
থাকো, পাশে থাকো।

প্রথম কপোল বেয়ে ঝরে পড়া জল, থাকো।
ফেরানো ময়ূর মুখ, প্রহারের দাগ, সারাদেহ-পিঠ—
থাকো ‘ও অনুগ্রহ’থাকো

পাখি, ও পাখি আমার—
মন, ও মন আমার— স্মৃতিকাতরতা
হারিয়ে যেও না।

যাও, যাও, যাও—
যেমতি চলিয়া ঢেউ যায় একা
ঢেউয়ের মতন রেখে যাও ওগো
আমার চিহ্ন শুধু বালুতটে ছিন্নভিন্ন ফুল
রেখে যাও তুমি যাবার আর্তনাদ
বুকের ওপর তীক্ষ্ণ নখরাঘাত
সিক্ত তিক্ত তিতি-বিরক্ত এ উদভ্রান্ত ঝড়-তুড়ন্ত জলপ্রপাত

এসো, এসো, এসো—
ঘোঁচাতে দূরতা যেভাবে তীব্র তীরে আসে ঢেউ
বহুদূর থেকে ছুটে এসো তুমি অমল-ধবল সাধ
শাদা দাঁতে তুমি বিদ্ধ করো এ সোনালি চিবুক—

পদাঘাত করো শিথিল বালির
অতল পাতাল কলিজা-জঠর চরে; এ-সলীল নায়
যেও না! যেও না! কিছু না বলেই ঢেউ
যেমতি চলিয়া যায় ॥


সতীনের মোচড়

মেঘমেদুর। রোদ্দুর রোদ্দুর। অপেক্ষা। অপেক্ষাশেষে। এক গণ্ডুষ জল। কিংবা খরা। রুখু মাঠে হাঁটতে হাঁটতে। মাঠপারে। মেঘের ডম্বরু। লাল রঙে আঁকা দরোজা তোমার।

তোমার দরোজা থেকে। বলবো বলবো করে ফিরে। ফিরে ফিরে আজ। বলে ফেললাম সেই কথা। কথা। চুপ। কথা। কথা চুপকথা। অমনি নামলো বৃষ্টি, বৃষ্টির বিহ্বল ঠাণ্ডা শীৎকার। স্নান। আর সৎবিৎ ফিরে পেয়ে। মনে হলো। সত্যি বলেছি কি! বলতে কি পেরেছি সেই কথা। কথা। চুপ। কথা? সেই কথা। যা আমার। একান্ত। আমারই?

সুভিক্ষ কথার দুর্ভিক্ষে এসেছে হাহাকার। এসে অনিবার্য প্রগল্ভ সৃষ্টিকে বুকের ফাটল থেকে আচমকাই দিয়েছে ছলকে! বলতে না পারার রহস্যরাস্তায় রাখি এই আনাগোনা। এই আনাগোনা। চকিত দ্বিতীয় স্বত্বা। সঙ্গে দ্বিধা। পেরেছি তো! বলতে পেরেছি তো!

দীপ্ত মোম যেভাবে শিউরে ওঠে আনমনে, সেভাবে শাড়ির খসখসে তুললে হাওয়া— সেই হাওয়া মুচড়ে মুচড়ে ঢুকে পড়ছে। ঢুকে পড়ছে। অলিন্দে। অলিন্দে আমার।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত