শ্রুতি নাটকঃ হেমিংটনের জন্য

চরিত্রঃ ফুলির মা, ফুলি, ফুলির সখী, পদ্মা (ফুলির মেয়ে) , পদ্মার সখী ১,পদ্মার সখী ২, পদ্মার সখী ৩, বৃদ্ধা ফুলি, মংলী ।
(১)

সূত্রধারঃ একশো বছরে চা বাগান । ঘোড়ার খু্রেরর খট খট কিংবা সাহেবের বুটের হুট হাট । একদিন যা ছিল অতি পরিচিত আওয়াজ ।

ফুলির মাঃ ফুলি ও ফুলি যাস কুথাকে ? ঘরকে এতো কাজ – সারহা দিন ধেই ধেই করে নাইচলে হবেক এই বৃষ্টির দিনে তু বাইরে যাস লাই বিটিয়া ।

ফুলিঃ মা আজ মেলায় যাচছি , সারহা দিন পরবে হই হুল্লা করবো …। রাত জেগে লাচ গান দিখবো । তু বাগানের থেকে এসে দেইখবি সব কাজ হইয়ে গেছে । জল তুইল্লে ভাত রেন্ধে সব কাজ সাইরবো । তু যা কেনে মা ।

ফুলির মাঃ বিটিয়া আমার আর বড় হইলো না । কদিন পর বিহা দিব, বর আইসবেক । কুথায় শান্ত হইয়ে বসবি, শ্বশুর ঘরকে যাওয়ার লেইগগে তৈরী হবি তা লা …

ফুলিঃ লা মা আমি বিহা কইরবো লাই । তুকে ছেড়ে কোথাকেও যাব লা আমি …।

ফুলির মাঃ পাগলী বিটি আমার…।

(২)

{নেপথ্যে মেলার গানঃ মকর পরবে মদনা ছোড়া ধামসা বাজাইছে.. (প্রচলিত)}
ফুলির সখীঃ দেখ দেখ ফুলি, সাহেবটা তুকে দিখছে কিমন ? তোর লাচ দেখে চোখ ফিরাইতে পারছে লাই ।

ফুলিঃ যাঃ তুরা থাম কেনে কিযে বুলিস তুরা !
{ নেপথ্যে কবিতাঃ “চোখ কেন তোর কাঁপছে মেয়ে বুক কেন তোর দুলছে.. (বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়- তিন পাহাড়ের স্বপ্ন) }

(৩)

(নেপথ্যে ভোরের সঙ্গীত, পাখির ডাক)
সূত্রধারঃ আকাশে আলো ফোটার আগে নব বধূর সাজে ফিরলো ফুলি । বনফুলের মালায়, মাথা ভর্তি সিঁদুর আলুথালু চুলে স্বপ্নের আবেশে আপ্লুত ফুলি

ফুলিঃ ফুলি ও ফুলি কোথাকে গেলি বাপ? সকাল হল্লো… কি যে করে বিটিয়া আমার

ফুলিঃ মা, মা আমি এসে গেচ্ছি…

ফুলির মাঃ আরে বিটিয়া এ কি সাইজছিস? যাত্রা পালা করে আইসলি নাকি ?

ফুলিঃ না মা, শিব ঠাকুরের থানে সাহেব আমাকে বিহা করেছে । আমি সাহেবের সাথে দূরে চলে যাব …ও আমকে লিয়ে যাবে বুলেছে

ফুলির মাঃ ওগো কে কোথাও আছো গো।। দেখো দেখো আমার বিটিয়া কি বুলছে গো । কি সর্বনাশ হলো গো আমার…।

(নেপথ্যে লোকগানঃ যে জন প্রেমের ভাব জানে না…। )

(৪)

সুত্রধারঃ প্রতীক্ষার বেশ কিছু দিন অতিক্রান্ত … ফুলি আজ আর একা নয় … ফুলি উদাস হয়ে আকাশ দেখে … প্রকৃতির রঙ যেন ধুসর হয়ে যাচ্ছে.. ভুল হয়ে যাচ্ছে পাতা তুলতে… ফুলির মাকে আর শাসন করতে হয় না… খেলার ছলে ঘটে যাওয়া ঘটনা আজ ফুলিকে হঠাত যেন বড় করে দেয়……

ফুলিঃ মা সাহেব এ সেই যে গেল, আর তো এল লাই…। আমার পেটে যে আসলো সি কি তার বাইপকে দেইখবেলাই কুনোদিন

ফুলির মাঃ বিটিয়া তু চুপ কর । এসব কত্থা কাউকে বলিস লাই। তু সাহেবকে ভুলে যা বিটিয়া। আমি দেখে শুনে তোর আবার বিহা দিব । ও সব খেলা ছিল রে । সাহেব তোর সাথে মজা করেচ্ছে । ও কুনওদিন তুকে লিতে আইসবে লাই … আমি যা বইলছি শোন কেনে বিটিয়া…

ফুলিঃ মা তুমি একথা বুলো লাই মা …। ও আসবে ও আমাকে ভালোবাসে মা…।
{লোকগানঃ আমি রব না রব না গৃহে , বন্ধুবিনে প্রাণ বাঁচে না…(প্রচলিত)}

(৫)
সূত্রধারঃ এরপর অপেক্ষার কুড়িটি বছর অতিক্রান্ত …হেমিংটনের অপেক্ষায় ফুলি আজও পথ চেয়ে বসে আছে… নীল চোখের শিশুকন্যা পদ্মাকে পরিত্যাগ করেছিল ফুলি…নদীর চরে তাকে কুড়িয়ে পেয়ে মানুষ করেছে আর এক সন্তানহারা জননী । সেই পদ্মার কোলে আজ জন্ম নিয়েছে নীল চোখের সাদা চামড়ার ছোট্ট বুধা

পদ্মার সখী ১ঃ আরে দেখো দেখো চাঁদের পানা ছেইল্লে দেখো এই বাগানে । সাহেবরা সেই কব্বে চলে গেছে দেশে । ইখানে আব্বার সাহেব এল্লো বটেক…

সখী ২ হ্যাঁ রে …। আমার কোলে দে বটেক । হামি ওকে ঘুম পারাবো …সোহাগ করবো …পদ্মা তু যা কেনে । ই কদিন তোর কাজে ফাঁকি পড়েছে। সরদার রেগে আছে বটেক…তু কাজে যা পদ্মা

সখী ৩ ; পদ্মারে বুধাকে আমার কাছে দে বটেক । নীল চোখ আমাকে টাইনছে … ওর নাম বুধা দিয়ে তু ঠিক করিস লাই … ওর নাম আমি নীলমণি দিলাম বটেক।

সখী ২ঃ আমাদের জামাই কালো, তু কালো , বুধা কি করে সাহেব হল্ল রে পদ্মা ? তোর চোখটো নীল তোর ছেলেরও নীল চোখ । তু কালো বুলে মেম হতে পারলি লাই । তোর ছেইলে নীল চোখের সাহেব কি কি করে হল্ল …আমাকে বুঝাই দে তো পদ্মা ?

পদ্মাঃ তুরা কি যে বলিস। আজ বুধার বাপ এলে তুদের নামে বুলবো । তোদের আইচ্ছা করে ধুল্লাই দেবে। এসব কথা কেনে বলিস । তুদের কাউকে বুধাকে লিতে হবে না । আমি পেটে বিধে লিব । তুরা তুদের কাজে যা কেনে…

সখী (২) ; পদ্মা তুকে যেদিন মাসী কুড়াই পেয়েছিল শুনেছি সেদিনও গ্রামে কথা হইয়েছিল । মাসীর মেয়ে পদ্মা ডুবে মরার পর মাসী পাথথর হয়ে গেছিল । আমারা মাসীকে বললাম তোমার পদ্মা আবার তোমার কোলে আসলো । তারপর মাসী ধীরে ধীরে ভালো হল্ল । এখন এসব কত্থা হইচছে বলে মাসীর ভালো লাইগছে লাই । তু বুধাকে মাসীর কাছে লিয়ে যা পদ্মা …

(৬)

সূত্রধারঃ হেমিংটন সাহেবের জন্য অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ফুলি আজ বৃদ্ধা । বৃদ্ধা ফুলি খবর পেয়েছে পাশের পাড়ায় পদ্মার কোলে জন্ম নিয়েছে সাদা চামড়ার নীল চোখের সাহেব । ফুলির দৃঢ় বিশ্বাস নতুন জন্ম নিয়ে দেখা করতে এসেছে তার প্রিয় হেমিংটন সাহেব ।

{নেপথ্যে গানঃ সাজ সুন্দরী কইন্যা সাজ বিয়ার সাজে রে… (প্রচলিত)}

বৃদ্ধা ফুলিঃ আমাদের পাড়ায় বিয়ার মেলা বসে গেছে । কেউ আর কুমারী রইলো লাই পড়ে । আমি শুধু কুমারী সেজে কাটাই দিলাম এত্তগুলান বছর । আমার সন্তান থেকেও লাই । মরদ সাহেব তো ফিরেও এল্ল লাই । জানিস মংলী আজ আমি আবার কনে সাইজবো ।

মংলীঃ ফুলি মা তুমি কার জইন্যে কনে সাইজবে …। হেমিংটন সাহেবের জইন্যে… হা হা হা সে তো রোজ আসে তোমার স্বপ্নে…

বৃদ্ধা ফুলিঃ না রে মংলী । আজ আমি সত্যি সত্যি হেমিংটন সাহেবের সাথে দেখা কইরবো … তুই হাসছিস।। আরে আমি খবর পেয়েছি…। শোন তুকে কানে কানে বলি । তু কাউকে বলিস লাই যেন…

মংলীঃ কি ফুলি মা … কি বুলছো ?

বৃদ্ধা ফুলিঃ আরে শোন শোন … ও পাড়ার পদ্মার ছেল্লে হইছে।। তার চোখটা নীল । জানিস আমার মন বুইলছে সে ফিরে এসেছে … আমি পদ্মাকে সব খুইল্লে বুলবো …। কেন ওর চোখ নীল ? কেন ওর বেটার চোখ নীল …বইল্বো ওর বাপ কে… মা কে… । আমায় একবার নিয়ে যাবি মংলী ?

মংলীঃ ফুলি মা তুমি ভুইল করছো … তোমার এসব কত্থা এখন কেউ বিশ্বাস যাবে না …তুমি এত্তদিন পদ্মাকে ওর আস্সল পরিচয় জাইন্তে দাও লাই … এখন বুললে ও তোমাকে ঘৃণা কইরবে… ওর ঘরকে আজ্ঞুন লাইগবে … তুমি একাম করো লাই ফুলিমা…।

বৃদ্ধাফুলিঃ কি বইলছিস ! আমার হেমিংটন সাহেবের সাথে আমি দেখা কইরতে যাব লাই…লা লা আমাকে যেতেই হব্বে … মংলী …। ঠিক আছে ঠিক আছে আমি কিছু বইল্বো না বিটিয়াকে । শুধু দূর থেকে দেক্ষে চললে আইসবো …

মংলীঃ ঠিক আছে ফুলি মা কাল সকালে তুমাক্কে লিয়ে যাবো…

(৭)

পদ্মাঃ কে কে ওখানে ? গাছের পাতাগুলান লইড়ছে মনে হচ্ছে । হাওয়া লাই কিছু লাই গাছের পাত্তাগুলান নড়ে কেন…।

বৃদ্ধা ফুলিঃ আমি বিটিয়া তুদের এখানে মন্দিরে একটা মান্নত ছিল। পুজো দিতে এসেছি…। মংলী আমাকে নিয়ে এল্ল… তুরা সব ভালো আছিস তো …

পদ্মাঃ হ্যাঁ গো মাসী … সব্বাই ভালো আছি …

বৃদ্ধা ফুলিঃ এই বুঝি তোর ব্যাটা…। আমাকে একবার দিব্বি? ওকে কোলে লিব…

পদ্মাঃ এ এই যে … এই নাও মাসী সব্বাই দূর দূর থেক্কে দিখতে আইসছে… তুমি বাকী থাকো কেনে?

বৃদ্ধা ফুলিঃ এ…… এই যে লা লা কান্দে কান্দে লা অই অই …আমি তোমার বহু আছি …। তুমি আমাকে লিতে এসেছো … সাহেব… তুমি আমাকে ভোল লাই । সাহেব আমি বাইচঁবো আরো বিশ সাল বাইচঁবো সাহেব…আমি তোমার সঙ্গে ঘর বাইন্দবো সাহেব…ঘর বাইন্দবো ।

সূত্রধারঃ ফুলির আজ বড় আনন্দের দিন । ক্ষনিকের জন্য হলেও। সে ফিরে পায় তার যৌবন। এখন সে আরো বিশ সাল বাঁচতে চায় তার হেমিংটনের জন্যে ।

{নেপথ্যে গানঃ আজ জীবন খুঁজে পাবি ছুটে ছুটে আয়…(ভুপেন হাজারিকা)}

—–

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত