সাঁওতাল বিদ্রোহ

প্রহ্লাদ রায়

‘হুল’ অর্থাৎ বিদ্রোহ। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন সাঁওতাল বিদ্রোহের অন্যতম দুই নেতা সিধু ও কানহু ভাগনাডিহির মাঠে হাজার হাজার সাঁওতাল ও হিন্দু-মুসলিম, চামার, বাগদি সহ নানান ধর্ম ও জাতের মানুষদের ইংরেজ ও ব্যবসায়ী-ব্যাপারীদের মাত্রাছাড়া শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করার ডাক দিয়েছিলেন। এটা ছিল তথাকথিত নিচু জাতের মানুষদের বিদ্রোহ। ভারতের মাটিতে দলিত-আদিবাসীদের প্রথম সংগঠিত আন্দোলন।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে আধুনিক সভ্য মানুষেরা লেনিনের মৃত্যুর প্রায় ষাট-সত্তর বছর পরেও তাঁর কৃত কর্মের জন্য এক তরফা বিরোধী পক্ষের দ্বারা বিচার করে। এবং মৃতদেহকে গুলির আদেশ দেওয়া দেয়। এই সকল সুসভ্য শিক্ষিত আধুনিক ব্যক্তিরা যদি পাগল না হন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ায় উল্লসিত হন এবং সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের বিরুদ্ধে নব নব যুক্তির অবতারণা করেন, তাঁরা কি সাঁওতাল বিদ্রোহের জন্য পুনর্বিচার আহ্বান করবেন? তাঁরা যদি উন্মাদ না হন, তাঁরা যদি অসভ্য না হন, তা হলে সাঁওতাল বিদ্রোহের কেবল পুনর্মূল্যায়নই নয় পুনর্বিচার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন! কারণ এই সকল বুদ্ধিজীবী তথা সুশীল সমাজকে ভালো করেই চেনা আছে। সুশীল সমাজ মানব সমাজেরও কেউ নয়, আবার মানবতাবাদেও বিশ্বাসী নয়। তাঁদের সংবেদন হল নিজের জীবনযাত্রায়। আজকের যে সুশীল সমাজ এরা বংশ পরম্পরায় বাপ-ঠাকুরদার নাম ভাঙ্গিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রেখেছে। তাই এদের অতীত আরো স্বার্থপর ও অসভ্যতায় পূর্ণ। সত্যিকারের মানবতাবাদ কাকে বলে, মানবতাবাদীরা তা জানেন কি? মানবতাবাদ শব্দটি উচ্চারণ করার আগে মানুষ কাকে বলে জেনে নেবেন। কারা মানবজাতি সেটাও জেনে নেবেন। কেবল নিজেকেই মানব ভাববেন, সুসভ্য ভাববেন আর বাকীদের অসভ্য, অমার্জিত বর্বর মনে করবেন তা তো হতে পারে না।

এদেশে ব্রিটিশ উপনিবেশ হওয়ার পর বিশেষ উচ্চবর্ণের কিছু মানুষ রাষ্ট্র শক্তিকে নিজেদের সুবিধামত ব্যবহার করেছে। এদেশীয় বৃহত্তর জনগণকে শোষণ করে ব্রিটিশ বিলাতের সমৃদ্ধি করেছে। এদেশীয় শিক্ষিত শ্রেণিকে ছিঁটে ফোঁটা শোষণ করার সুযোগ দিয়ে কৃতার্থ করেছে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালির নিকট অনেক কিছু প্রত্যাশা ছিল। বিশেষ করে আধুনিক নব্য বাঙালি, ইয়ংবেঙ্গল যাঁরা ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ ঘটিয়েছেন— সেই নব জাগরণ কাদের হয়েছিল? সার্বিক মানুষের সেই জাগরণ কতটা কল্যাণ করেছিল, মনে রাখবেন, শিক্ষাক্ষেত্রে তখনও ব্রাহ্মণ নামক শ্রেণি আধিপত্য করছে। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কায়স্থ ব্যতীত আর কারো পড়ার সুযোগ করতে পারলেন না। জাতি বিন্যাসে জর্জরিত ভারতবর্ষ। আজকে যারা অতীত ঐতিহ্য ও উচ্চবংশ নিয়ে গৌরব দেখান তাঁরা কিন্তু লেনিনের মত বিচার পেলে কেউ ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য নয়।

সেদিনের সমৃদ্ধিশালী জমিদার ও বিত্তবান মাত্রই হাজার হাজার মানুষের শ্রম ও সম্পদ শোষণ করে, অত্যাচার করে, প্রতারণা করে বড়লোক বনে গিয়েছিলেন। তার অট্টালিকা, মন্দির, বড় প্রসাদের মত বাড়িটি আজও হাজার হাজার মানুষের সম্পদ ও শ্রম লুণ্ঠন করে, অত্যাচার করে তৈরী করার সাক্ষ্য বহন করছে। এই পৃথিবীতে কোনো মানুষই জমি কিংবা সম্পদ নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে না। এই পৃথিবীর জমি ও সম্পদকে লুণ্ঠন করে কেউ কেউ কুক্ষিগত করে রাখে। সুতরাং ধন সম্পদের প্রাচুর্যের ঐতিহ্য ও গৌরব মানে নিজেদের পূর্ব প্রজন্মের পাপ কর্মকে স্বীকৃতি দেওয়া, অন্যায়কে বহন করে এগিয়ে যাওয়া। আর সেই ঐতিহ্যকে বজায় রাখার অর্থ হল, মানুষ মানুষকে পায়ের নীচে রেখে শাসন, শোষণ, অত্যাচার করতে আধুনিক যুগেও সমান উৎসাহ পায়।

জাতিভেদ, ধর্মভেদ গায়ের রঙের ভেদ, শরীরের গড়নের ভেদ, বসবাসের অঞ্চল ভেদ, প্রাদেশিকতার ভেদ, গোত্র ভেদ, শ্রেণি ভেদ, বিত্ত ভেদ, সব মিলিয়ে বিভেদময় ভারতবর্ষ। তাই এই বিভেদ দূর করার দু’চারটে উপদেশ ও বাণী দিলেও কেউ এর প্রতিকার করার চেষ্টা করেনি। এই কারণে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত যুক্তিবাদী, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীর অধিকারী হয়েও সকল মানুষকে মানুষ ভাবতে পারেনি। সে দিনের সাঁওতাল শ্রেণিকে বন জঙ্গলের পশুদেরও অধম ভেবেছিল বলে তাঁদের মানুষ বলে মনে করেননি শিক্ষিত তথা তৎকালীন সুশীল সমাজ। তাই ব্রিটিশের চেয়ে বেশী অত্যাচার, অবজ্ঞা ও অবহেলা করেছিল সাঁওতাল সমাজকে তৎকালীন শিক্ষিত মানবতাবাদী সুশীলগণ।

সাঁওতাল জাতিকে যদি এই সকল মানুষেরা মানুষ বলে গণ্য করতেন তা’হলে সাঁওতালদের প্রতি নিষ্ঠুরভাবে শোষণ, প্রতারণা, ঠকানো ও অত্যাচার করার প্রতিবাদ করতেন। শিক্ষিত সুশীল সমাজ এই সকল সাঁওতাল জাতির প্রতি সহমর্মী ও মানবতাবাদী মানবদরদী না হয়ে বরং তাঁদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন ‘সংবাদ প্রভাকরে’, ‘বেঙ্গল হরকরায়’ তৎকালীন বুদ্ধিজীবী তথা সুশীল সমাজের মুখোশ বেরিয়ে পরে।

ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশে প্রথম থেকেই তাঁদের অর্থ নীতি ছিল কৃষি নির্ভর। সেই সময়ে যে’টুকু জমি চাষ যোগ্য ছিল তা তাঁদের কাছে যথেষ্ট বলে মনে হয়নি। তাই সাঁওতাল সহ বন্য আদিবাসীদেরকে উৎসাহিত করল জঙ্গল কেটে, টিলা কেটে জমি হাসিল করার। এতে ব্রিটিশ ও ভারতীয় সভ্য নাগরিকদেরই লাভ হল। সাঁওতালদের কিছু হল না। জঙ্গল কেটে জমি হাসিল করে দামিন-ই-কোহর মত সমতল চাষবাস যোগ্য উপনিবেশ গড়ে তোলায়— ১) স্বাধীন সাঁওতাল জাতিকে ভূমি দাসে পরিণত করা হল। ২) হিংস্র জন্তু জানোয়ারের ভয়ে যে স্থানে ছিল বিপদ তা হয়ে গেল আবাদী জমি। ৩) ইংরেজদের কৃষিজ পণ্য ও অন্যান্য সামগ্রীর উৎপাদন বৃদ্ধি পেল। ৪) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করার জন্য জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় খাজনা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশী হল। ৫) দেশীয় মধ্যবিত্ত, মহাজন, ব্যবসায়ী ও শিক্ষিত প্রতারকদের সুদের ব্যবসা, পণ্যসামগ্রী কম দামে গ্রাস করা ও প্রবঞ্চনা করে একদিকে যেমন উদর পূর্ণ হল তেমনি তাদেরবিত্তবান ও নতুন জমিদার হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হল। ৬) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ততে নতুন নতুন উঠতি বিত্তবান জমিদারে পরিণয় হয়ে ইচ্ছা, খুশিমত খাজনা আদায় করতে লাগল। ৭) পাহাড়-জঙ্গলের মানুষদের খুব নিকট থেকে ছোট জাত, অমানুষ বলে ঘৃণা ও বৈষম্য সৃষ্টির সুযোগ পেল।

সাঁওতালদেরও অনেক আগে থেকে শোষিত, অত্যাচারিত, প্রতারিত ও অবমানিত হচ্ছিল কামার, কুমোর, তেলি,মালো,কৈবর্ত, গোয়ালা, চামার, ভুঁইমালী, বাগদি, হাড়ি, ডোম, মোমিন প্রভৃতি অনগ্রসর সম্প্রদায়। অত্যাচারের ত্রাসে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে না পারলেও সাঁওতাল জাতির ব্যাঘ্র হুংকারে তাঁরাও খানিকটা সাহস পেয়েছিল। তাই তাঁদের যোগদান ছিল সঙ্গত।

সাঁওতাল বিদ্রোহের যে বিক্রম, তেজ ও সাংগঠনিক ঐক্য ছিল তা ভেতরের অভাববোধ, অত্যাচারিত হওয়ার যন্ত্রণা, শোষিত হওয়ার বেদনা ও প্রতিরোধ গড়ে তুলে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করা। এই প্রবল তেজ ও শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে ১৮৫৫ সালের বিদ্রোহ ও ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ পরস্পর মিলে ভারতবর্ষে এক বড় রকমের বিপ্লব হতে পারত। এই কাজে ঐক্য ভাবনা উদ্দীপনা জাগানো ছাড়াও নৈতিক সমর্থন ও নেতৃত্ব দান সহ আইনি সহযোগিতা দিয়ে সাহায্য করতে পারত দেশের শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী সুশীল সমাজ ও তৎকালীন সংবাদপত্রগুলো। কিন্তু সমকালের সুশীল সমাজ সিপাহী বিদ্রোহ নিয়ে যেমন নীরব ভূমিকা পালন করেছে তেমনি সাঁওতাল বিদ্রোহ নিয়ে কটাক্ষ, বিদ্রূপ ও বিরোধিতা সহ রাষ্ট্র শত্রু ও শ্রেণি হিসাবে আক্রমণকারী ভয়াল ভয়ংকর অত্যাচারী হিসাবে সাঁওতাল জাতিকে চিহ্নিত করেছে। সমকালে কেন্দ্রীয় শক্তির পোষা কুকুর হতে তাঁদের নিকট থেকে কেবল সুযোগ সুবিধা নেওয়ার জন্য নিজের মানবিক সত্তাকেও বিসর্জন দিয়েছিল। সেদিন ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় সাঁওতাল বিদ্রোহ নিয়ে যে সকল খবর ও চিঠি প্রকাশ পেয়েছিল তা মানবতাবাদী ও সংবেদনশীল মানুষের নয়, মানুষরূপে সভ্যজগতে কিছু স্বার্থান্বেষী অপদার্থ; অসভ্য বর্বের ভেদ ও বৈষম্য মূলক অত্যাচারীর মুখপাত্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তাঁদের মানবতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে আমার আজও সংশয় আছে। সুতরাং এদের হাতেই আবার ছিল নবজাগরণের উন্মেষ ও জাতীয়তাবোধের উজ্জীবন। হায়রে! সতীদাহ, বিধবা বিবাহ, কৌলীন্য, পণপ্রথা, এই সকল কুৎসিত, বর্বরোচিত অসভ্য ঐতিহ্য বহনকারীরা নিজেদের নিয়েই ছিল ব্যস্ত। যাঁদের নিজেদের মানবিকতা ছিল না, পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল না, মাকে, বোনকে, স্বামীকে হয় পুড়িয়ে মেরেছে, নয় বিধবা পতিতা-নরকের দ্বার বানিয়ে রেখেছে। মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী মহাজন, শিক্ষিত উচ্চবর্ণের ব্যক্তিদের জন্যই সমাজে পতিতা পল্লি ও পতিতাবৃত্তি প্রবর্তিত হয়েছে। নতুবা আদিবাসী সমাজে, নিম্ন বর্ণের সমাজে অমন নিষ্ঠুর, অমানবিক অসভ্যতা কোনো কালে ছিল না। জগতে যাকে আদিমতম ব্যবসা বলা হয়ে থাকে তা মোটেও আদিমতম ব্যবসা নয়, রুচিশীল, শিক্ষিত অবদমনকারীদের অন্ধকার পাপাত্মার সুখ চরিতার্থ করার এক নতুন পদ্ধতি মাত্র। সাঁওতাল সমাজে এগুলি আজও নেই, সাঁওতাল সমাজে ডাইনি প্রথা খারাপ মানলাম কিন্তু পণের লোভে কন্যাসম বধূকে জোর করে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া, গঞ্জনা দেওয়া, নারীকে শরীরী ব্যবসায় লাগানো কি ডাইনি প্রথার চেয়ে কোনো অংশে কম!!!

‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় ১৮৫৫ সালের ১৮ই জুলাই যা প্রকাশিত হয়েছিল তা হল “রাজমহল, অরঙ্গাবাদ, জঙ্গীপুর ইত্যাদি স্থান হইতে আমরা গত দুই দিবস যে সমস্ত পত্র প্রাপ্ত হইয়াছি তাহাতে পার্বতীয় বিদ্রোহীগণের ভয়ানক অত্যাচার ব্যতীত আর কোন কথাই লিখিত নাই। প্রজারা কেবল ত্রাহি ত্রাহি শব্দ করিতেছে, ভাগলপুরের ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব প্রস্থান করিয়াছেন, আমরা লোক কে কোথায় আছে তাহার কিছুই নিরূপণ নাই…।” যদি বলি পার্বতীয়রা কি মানুষ নয়? তাঁরা এই সকল মানুষের চেয়ে কতটা পার্থক্য?? তাঁরা বিদ্রোহী হল কেন?? বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়েছিল? অকারণে বিদ্রোহী হয়েছিল? বিদ্রোহী হতে বাধ্য করেছিল কারা? এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? এই প্রশ্ন কিন্তু সে দিনের সুশীল সমাজ তোলে নি। প্রজারা কেবল ত্রাহি ত্রাহি শব্দ করিতেছে। … কারা প্রজা! যেমন রাজা তেমন তাঁর প্রজা। রক্ত পিপাসু শোষক ও অত্যাচারী ইংরেজদের উপযুক্ত প্রজা হল মহাজন, সুদখোর, বাটপার ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজ! নইলে যারা ভারতের (Son of the soil) আসল মানুষ তাঁরা প্রজা হল না, হাতে গোনা অত্যাচারী বর্বররা প্রজা বলে স্বীকৃতি পেল শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীর নিকট। সুতরাং তাঁদের ত্রাহি ত্রাহি রব আনন্দের বিষয় হতে পারে, দুঃখের নয়। তাদের জন্য চোখের জল ফেলা নয়, হাততালি দেওয়া যেতে পারে।

‘সংবাদ প্রভাকর’-এ প্রকাশিত পত্র থেকে নেওয়া ভাষা আলোচনা করা যাক। ১১ই জুলাই ১৮৫৫, অরঙ্গাবাদ থেকে প্রেরিত চিঠি তো নয়, শিক্ষিত আঁতলেমির চূড়ান্ত। রাজ বিদ্রোহিগণ … ইত্যাদি গ্রাম লুঠ করিতেছে, প্রজাদিগের যতা সর্বস্ব অপহরণ পূর্বক দগ্ধ করিতেছে, অনেকের প্রাণ সংহার করিয়াছে। এইরূপ অত্যাচার কুত্রাহি হয় নাই … রাজা জামাতা অতি সম্ভ্রান্ত ধনাঢ্য লোক, তাঁহার যখন সর্বস্ব গিয়া এইরূপ অবস্থা হইয়াছে তখন প্রজার দুঃখ বিবরণ কি বর্ণনা করিব এই বিষয় লিখিতে কাষ্ঠের লেখনিও ক্রন্দন করিতেছে! অবাক হওয়ার কথা! মানুষকে পদানত করে, দাস বানিয়ে, অত্যাচার, শোষণ করেও যাদের হৃদয় কাঁদে না তাদের কাঠের কলম কেঁদে ওঠে নিজেদের অপকর্মের শাস্তি পেলে। কলমের জোরেই শিক্ষা, কলমের জোরেই সারা পৃথিবীর অপকর্ম, পাপকর্ম, অন্যায়কর্ম সাধিত হয়, সেই কলমে সাধারণ, নিরীহ, অত্যাচারিত অনগ্রসর দলিতের যন্ত্রণা লিপিবদ্ধ কি করে হবে??

সিধু ও কানহু- সাঁওতাল বিদ্রোহের অন্যতম সংগঠক।

সাঁওতাল অসভ্যজাতিরা প্রজাপুঞ্জের প্রতি অতিশয় অত্যাচার করিতেছে … সাঁওতালদের দৃশ্য অতি ভয়ানক, তাঁহারা কেবল কৌপীন পরে, গলায় লাল মালা আছে, তাঁহাদের দেহ প্রকাণ্ড ও শ্যামবর্ণ, সকল প্রকার পশুই আহার করে…।

এই যদি শিক্ষিত আধুনিক মানুষের মানবতা হয়, তা’হলে অসভ্য কারা?? মানুষ হয়ে মানুষকে অসভ্য, পশু বলছে। অথচ এই সকল মানুষ ছিল বলেই উৎপাদন হচ্ছে। সকলে খেতে পাচ্ছে। এই সকল সভ্য প্রজাদের সুশীল বুদ্ধিতে মানুষকে পশু বলা যায়!!

এই সাঁওতাল বিদ্রোহ দমন করতে ব্রিটিশ শক্তি ও দেশীয় মহাজন, জমিদার শিক্ষিত সমাজ যে পরিমাণ গণহত্যা করেছিল তাতে কাউকেই সুসভ্য বলা যায় না।

ব্রিটিশ না হয় বিরোধী, বিদেশী বলে অত্যাচার করছে কিন্তু স্বদেশী কুত্তাগুলো দিনরাত এই সকল নিরীহ সাঁওতাল মানুষদের রক্ত-মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছিল কেন? কারা পশু? কোনো পশু এমন নিষ্ঠুর নয়-শিক্ষিত, সুশীল সমাজ, মহাজন, বাটপার ব্যবসায়ী, জমিদাররা যতটা হিংস্র ও নিষ্ঠুর। কারণ, এরা মানুষ হয়ে মানুষের রক্ত-মাংস খেতে বিবেকেও বাধে না, রুচিতে ও আটকায় না। সুতরাং আজকের সুশীল সমাজকে নিয়েও আমার ঘৃণা হয়। ২০০৭ সালের ১৪ই আগস্ট, সংসদে বিতর্ক চলাকালীন স্বাধীনতার ৬০ বছর পূর্তিতে বড় উৎসব করতে যাবে, তখন সমস্ত সংসদ উত্তাল হয়ে উঠে, বিব্র হয় জাতিভেদ সমস্যায়। প্রাচীন ঐতিহ্য, ভারতীয় ঐতিহ্য পরম্পরা হল, অস্পৃশ্যতা, জাতিভেদ, মানবতাহীন তা বৈষম্য, বঞ্চনা, অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ ও অন্ধসংস্কার ইত্যাদি। কথায় কথায় ভারতীয় ঐতিহ্যকে টেনে আনা হয় তবে তাতে কলঙ্ক আরো বেড়ে যাবে। ঐতিহ্যবাহীগণ কলঙ্কের কালিমায় লিপ্ত হতে চাইলে সহস্র দৃষ্টান্ত তুলে ধরব আপনাদের সামনে। চতুর্দিকে অস্পৃশ্যতা, জাতিভেদ, ধর্মভেদ, প্রাদেশিকতা বৈষম্য দূর করার জন্য সুশীল সমাজের কোনো আন্দোলন নেই। মানবতাবাদী কর্মকাণ্ড নেই, সেদিনও কেন্দ্রীয় আনুগত্য ছিল, আজও কেন্দ্রীয় আনুগত্য আছে। এরা কেবল পরস্পর পিঠ চুলকাতে ব্যস্ত। জাতিতে, ধর্মে, বর্ণে পার্থক্যটা চিহ্নিত করা যেমন সুশীল সমাজের কাজ তেমনি এই ভেদরেখা, অনগ্রসরতা দূর করাও সুশীল সমাজে কাজ। শিক্ষিত আধুনিক যুক্তিবাদী প্রগতিশীল মানুষেরা যদি কিছু না দেখার ভান করে সুশীল সমাজ হয়ে বসে থাকে তাহলে তা হবে হাস্যকর। সুশীল সমাজের অনেক কিছু করার ছিল, এখনো করার আছে।

রাজতন্ত্রের হাত ধরে ভারতবর্ষে জাঁকিয়ে বসেছিল বৈষম্য মূলক শাসনব্যবস্থা। অর্থনৈতিক বৈষম্য, পেশাগত বৈষম্য ও ধর্মসহ জাতিগত বৈষম্য এবং সাম্প্রদায়িক বৈষম্য দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়েছিল এই ভারতবর্ষে, যা পরবর্তীকালে সামন্ত্রতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় আরো প্রকট হয়। বহুদিন যাবৎ ভারতের কৃষকেরা নিজস্ব জমির মালিকানা হিসেবে গৌরব বোধ করত। কারো বেশী জমি কারো কম জমি। জঙ্গল কাটা, নদীর চড়া দখল সব মিলিয়ে একটা সাধারণ পরিস্থিতি ছিল। যখন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হল তখন রাষ্ট্রীয়করণ করা হল সমস্ত জমির। তখন সম্পদ বলতে একমাত্র জমিই বলা চলে। আর কারো ব্যক্তি সম্পত্তি হিসাবে না রেখে ইংরেজ সরকার সমস্ত জমি রাষ্ট্রায়ত্ত করে সেইসব জমি নিয়ে জমিদারদের নিলাম দিল চড়া খাজনার বিনিময়ে। জমিদার আবার লভ্যাংশ বশী পাওয়ার জন্য বন্টন করল। এই সময়ে জমিদারী কর্মচারীরাও বেপরোয়া হয়ে যথেচ্ছাচার খাজনা, অর্থ ও সমস্ত রকম লুণ্ঠন যোগ্য বস্তু প্রজাদের কাছ থেকে লুঠ করত। মহাজন, বাটপার ব্যবসায়ী, শিক্ষিত সমাজও ছিল অমানবিক বর্বর। কলকাতা বা শহরের বাবু, শিক্ষিত সম্প্রদায়ের পিতা বা আত্মীয়, গ্রামের জমিদার, জোতদার, নায়েব, মহাজন, ব্যবসায়ী এরা সকলেই ছিল শোষক, আর ইংরেজ পুলিশ প্রশাসনও ছিল তাদের হাতে। রাজশক্তিকে যখন যারা কব্জা করেছে তারা তখন সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছে এবং বংশ পরম্পরায় তা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। আজও সেই ব্যবস্থা সামনে চলছে। রাজশক্তির মহিমা এমনই পৃথিবীতে ছলে-বলে কৌশলে  যারাই সম্পদের ও ভূমির দখল নিয়েছে তারাই ভালো অবস্থার মধ্যে আছে। সাঁওতাল তথা নিম্ন বর্গীয় জনজাতি হল প্রকৃতির মত সহজ সরল। তাঁদের মধ্যে ঐ সকল অসততা, ছল-চাতুরী কোনোদিন ছিল না, আজও নেই। তাই সেদিনও তাঁরা ছিল প্রতারিত, বঞ্চিত, আজও তাঁরা প্রতারিত বঞ্চিত। আজ হয়তো সাম্যবাদী শাসকের দৃষ্টিতে তাঁরা বেঁচে থাকার, প্রতিবাদ করার, মত বিনিময়ের অধিকার পেয়েছে কিন্তু সার্বিক অধিকার কায়েম করা আজও সম্ভব হয়নি। কারণ সাম্যবাদী শাসকেরা ক্ষুদ্রপরিসরে বৃহত্তর বিপ্লবের স্বপ্ন দেখলেও বাস্তবে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কারণ, সম্পদ ও পুঁজি তাঁর অধিকারে নেই। সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল শক্তি হল সেই সম্পদ।

ধনতান্ত্রিক সমাজে ধনী হল রাজশক্তির বা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকারী। আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী রাষ্ট্রগুলো মূলতঃ ধনতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে। কারণ, পুঁজি ও অর্থ ব্যবস্থার সমবন্টন হয়নি এবং অল্প কিছু লোকের হাতে এই সম্পদ কুক্ষিগত বলে মূলতঃ ধনিকশ্রেণিই দেশের মানুষের ভাগ্যনিয়ন্তা। তাই আমেরিকার পদানত হয় ভারতবর্ষ। টাটা, সালিম গোষ্ঠীর মত, পুঁজিপতিদের কাছে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মস্তক বিক্রয় তথা আত্মবিক্রয় করে সাম্যবাদী, সমাজতন্ত্রী মেহনতী মানুষের সংগ্রামের সেনাপতিরা।

অর্থনীতি, রাজনীতি, বিদ্যাচর্চা ও মর্যাদা লাভা পিছিয়ে পড়া জাতির মধ্যে শিক্ষা ও সাম্যবাদের গান শোনানো নিরর্থক। কারণ, বঞ্চিত, দলিত, অনগ্রসর মানুষের চির আকাঙ্ক্ষা হল সাম্যবাদ ও সমান অধিকার। তাহলে অন্ততঃ বঞ্চনার শিকার হতে হবে না। যারা চিরকাল ক্ষমতা, শিক্ষা, সম্পদ সহ সকল সুযোগ সুবধা নিজেদের কুক্ষিগত করে রেখেছে তাঁদেরকে সাম্যবাদে বাধ্য করাটাই আসল কথা। অধিকারের সাম্যটাই জরুরি। রাষ্ট্র যখন সব নিয়ন্ত্রণ করে তখন রাষ্ট্রকেই বাধ্য করতে হবে সেই অধিকারের সুযোগ দিতে। দেশের সাঁওতাল শ্রেণি এতটাই সহজ, সরল, শান্তিপ্রিয় যে, কোনোরকম উগ্র দাবী নিয়ে হিংসার পথে সে হাঁটেনি। অস্ত্রহাতে সন্ত্রাসীও হয়নি। ১৮৫৫ সালে দেশীয় শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকারের শরণাপন্ন হতে যাওয়ার আগেই তাঁরা বিপন্ন হয়। এমনকি দেশীয় দালাল, উমেদারদের ও জমিদারদের তথা শিক্ষিত সমাজের জন্যই সেদিন ব্রিটিশ তাঁদের প্রতি সুবিচার করার সুযোগ পায়নি। নতুবা সাঁওতাল বিদ্রোহও হত না।

গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনগণ তার নিজ নিজ মতকে স্বাধীনভাবে প্রকাশ করবে এবং নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার বজায় রাখার চেষ্টা করবে। এক্ষেত্রে অর্থনীতি, রাজনীতি দেশের সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই অর্থনীতি ও রাজনীতি মানুষের অধিকার বোধ ও গণতান্ত্রিক চেতনাকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করে। ফলে মানুষ নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রভাবশালী নেতৃত্বের কাছে নিজের গণতান্ত্রিক মত ও বোধকে বন্ধক রাখতে বাধ্য হয়। সেক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক অধিকারে  এক শ্রেণির মানুষ নিজের সমৃদ্ধি ও উন্নতি করার নামে অন্য শ্রেণিকে বঞ্চিত করছে। সেখানে বঞ্চিত শ্রেণি প্রতিযোগিতায় ও প্রতারণার কাছে হার স্বীকার করে। সাঁওতাল শ্রেণি বলিষ্ঠ বীরের জীতি হয়েও শিক্ষাগত, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবে দুর্বল ও পিছিয়ে পড়ে আছে অন্ধকারে। তাই গণতান্ত্রিক ভাবেই সে পিছিয়ে আছে। অসংখ্য মানুষকে একতাবদ্ধ করে তাদেরকে একটা বৃহৎ শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করলে এবং সেই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করলে সেটাও এক ধরনের একনায়কত্ব। এখানে অসংখ্য মানুষের শক্তিহরণ করে চলাটাকেও শক্তি দখলদারী, শক্তি শোষক হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। অসংখ্য শক্তিতে যেমন সে শক্তিশালী তেমনি সেই অসংখ্য মানুষকে সে নিয়ন্ত্রণও করে। তখন সে অসংখ্য মানুষের শক্তি নিয়ন্ত্রক ও তাঁদের শক্তিতে স্বেচ্ছাচারী। সেই অসংখ্য মানুষকে সে চালিত করে বলে তিনিই তখন নিয়ন্তা। জনগণ সূচনাতে যে প্রবল তেজ ও শক্তিতে জোটবদ্ধ হয়েছিল পরে সেই প্রবল তেজ ও শক্তি যেন বন্ধক রাখে নেতৃত্বের কাছে। স্বাধীন ভারতের ঊষালগ্নেই জনপ্রতিনিধি ও নেতৃত্বের এ হেন একনায়কত্ব লাভের ফলে জনগণ হয়ে পড়েছে গৌণ। তাই সাঁওতাল জাতির বীরত্ব ও শক্তি সাহসকে যেমন দেশের নেতৃত্ব ব্যবহার করে তেমনি তাকে সমস্ত কিছু থেকে বঞ্চিত করে অস্পৃশ্য, অপাংক্তেয় ও সামাজিক অমর্যাদাকর অবস্থায় রেখেছে। পৃথিবীর তথ্য প্রযুক্তি ও যন্ত্রসভ্যতার সঙ্গে তাঁদের সামিল না করে আজও বিচ্ছিন্ন বাদ মাথা চাড়া দেয় সুবিধাভোগী মানুষের জন্য। সুবিধাভোগীরা যদি একটু অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করত, তারই মত প্রতিবেশী মানুষগুলোকে সাঁওতাল না ভেবে মানুষ ভাবতো তা হলে এমন পরিস্থিতি হত না। সাঁওতাল জাতির হুল উৎসব কেবল ‘উৎসব’ নয়। এটা আত্মজাগরণ, অধিকার অর্জন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, দেশ ও জাতির রক্ষার্থে মহাসংগ্রামের আহ্বান। স্বাধীনতা সংগ্রাম মানে কেবল ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম নয়, স্বাধীনতা সংগ্রাম হল সমস্ত রকম অন্যায় অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। তাতে যদি দেশীয় শয়তান, শোষণকারী, অত্যাচারী হয় তো কোনো কথা নেই।

১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের অনুসারী স্বাধীনতা সংগ্রাম হত তা হলে ব্রিটিশের চেয়ে বেশী নিষ্ঠুর, অসভ্য, বর্বর, হিংস্র মানুষের হাতে শাসন ক্ষমতা যেত না। সাঁওতাল বিদ্রোহের মত বিদ্রোহ দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতায় দেশীয় কুকুরগুলো নিধন করে ব্রিটিশ তাড়ালে নিরীহ, শান্তিপ্রিয় মানুষেরা সুখে শান্তিতে থাকতে পারত। আসলে বুদ্ধিজীবীর জিঘাংসা, অত্যাচার ও শোষণ অতীব সূক্ষ্ম। তাই তাঁরা হাতে না মেরে ভাতে মারে, ধনে প্রাণে মারে।

ভারতের মত দেশে মার্কসীয় সাম্যবাদের প্রয়োগ হওয়া জরুরী অন্যভাবে। মার্কসের সামনে সমকালে ছিল প্রধানত দুটি শ্রেণি— ১) কৃষক শ্রেণি, ২) শ্রমিক শ্রেণি। তাই তাঁর তত্ত্বে বাঁচার জন্য, অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই শ্রমিক কৃষক ঐক্যবদ্ধভাবে শ্রেণি সংগ্রাম করার কথা বলা আছে, সেটা ধনিক শ্রেণি ও কৃষক শ্রমিক শ্রেণি। অর্থনৈতিকভাবে এই দুটি ধারাতেই সংঘাত ছিল। কিন্তু ভারতের মত দেশে জাতিতে, ধর্মে, গোত্রে, প্রাদেশিকতায়, ভাষায় এত বেশী বিভক্ত ও বৈষম্য যে, অর্থনৈতিক শ্রেণি সংগ্রামের চেয়ে সামাজিক শ্রেণি সংগ্রাম বেশী জরুরী। সামাজিক বিভেদ, অস্পৃশ্যতা ও ধর্ম জাতির দাঙ্গা না থামাতে পারলে কোনো কাজ হবে না। এখন সকলেরই কাশি হয়েছে দেখে যদি কেবল সর্দি-কাশির ওষুধ খাওয়ানো হয় তাহলে কেবল যাদের সর্দি-কাশি হয়েছে সেটাই সারবে, যক্ষ্মা, হাঁপানি তো সারবে না। একই ওষুধ সকলের পক্ষে কার্যকর হয় না। রোগ নির্ণয় করে তবেই ওষুধ দিয়ে সুস্থ করতে হবে। সুস্থ বা সাম্যাবস্থাতে আনাটাই যেখানে মূল উদ্দেশ্য সেখানে মার্কসীয় তত্ত্বের আগে জাতি ও ধর্মভেদের, অস্পৃশ্যতার রোগ সারিয়ে সুস্থ করা জরুরী। নইলে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সাম্য চিরকাল অধরা রয়ে যাবে। আর মার্কসবাদ ব্যর্থ বলে লোক হাসবে।

আজ সাঁওতাল বিদ্রোহের মত আরো বিদ্রোহ হওয়া জরুরী মানবমুক্তির আশায়। মানবমুক্তি ও সব মানুষকে মানুষ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে এক পংক্তিতে না আনতে পারলে এই সভ্যতাটাই ব্যর্থ হবে আগামী বিশ্বের কাছে। আর ভারতীয় প্রাচীন ঐতিহ্যের কথা এনে বারবার নতুন করে কলঙ্কিত হবে না।

 

প্রহ্লাদ রায় বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিভাগের অধ্যাপক।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত