সিলভিয়া প্লাথের গল্প পনেরো ডলারের ঈগল


অনুবাদকঃ কামাল রাহমান


 

উল্কি দেয়ার অনেক কটা দোকান আছে ম্যাডিগান চত্বরে, কিন্তু কারমির দোকানের সঙ্গে আর কোনোটার তুলনা হয় না। সুঁই ও রঙের ব্যবহারে এক খাঁটি কবি সে, হৃদয়বান এক শিল্পী। ক্ষুদে শয়তান, ডক শ্রমিক, শহর-ছাড়া জুটি, এমন সব কাবিলেরা এসে ঢোকে কারমির ওখানে, দোকানের নাকে বসানো একমাত্র জানালার রোয়াকে রাখা এক পাত্র বীয়ারের জন্য হাত বাড়ায়। ‘তোমার একটা স্বপ্ন আছে’ বলে কারমি, ‘কোনো কথা না বলে, হৃদয়ে পরিয়ে নাও, যা খুশি। একমাত্র আমিই পারি এভাবে সাজাতে তোমাকে। কুকুর, নেকড়ে, ঘোড়া, সিংহ, যা খুশি এঁকে নাও হে আমার প্রিয় পশুপ্রেমিকেরা। মেয়েদের জন্য প্রজাপতি, স্বর্গের পাখি, হাসিখুশি শিশুর মুখ, অথবা চোখের কোনায় অশ্র“ধারা, যা পছন্দ তোমার, সবই রয়েছে। গোলাপ, যে কোনো প্রকার। বড়, ছোটো, কুঁড়ি, পূর্ণ-প্রস্ফুটিত, নাম খোদাই সহ গোলাপ, কাঁটা সহ, পাতা ও কোঁকড়ানো পাপড়ি সহ, শীর্ষে কালো ফুটি দেয়া, সবই অপূর্ব হয়ে উঠবে এখানে। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের জন্য রয়েছে সাপ ও ড্রাগনের ছাপ। শুধু বলার জন্যই নয় এসব, রাখাল বালিকা, হাওয়ায় নাচুনে, মৎসকুমারী, সিনে-রানি, চুনি-স্তনবৃন্তে, অথবা খোলা বুকে, যা তোমার ইচ্ছে, সবই করিয়ে নেয়ার জন্য। ব্যবহার করার মতো একটা পিঠ যদি থাকে তোমার, ওখানে ক্রুশবিদ্ধ যিশুকেও জায়গা করে দিতে পারো।’

কারমির ঘরের তিন দেয়ালে, সিলিং থেকে মেঝে পর্যন্ত আঁকা বিশাল চিত্রগুলো বাইরে থেকে দেখা যায়।
‘ঐ ময়ূরীগুলো দেখো না, কি অদ্ভুত সুন্দর!’
‘ধ্যাৎ, উল্কি আঁকার জন্য খরচ করার অর্থ হয় না, জীবনে একবারই আমি ওটা করেছিলাম। বাহুতে একটা অজগর আঁকিয়েছিলাম।’
‘একটা হৃদয় চাও না তুমি? বলবো ওকে কোথায় আঁকবে সেটা?’

কারমির উল্কি আঁকার দোকান নিয়ে অনেক কিছুই লেখা যায়, কিন্তু ছোট্টো এই শহরের আশ্চর্য মানুষটার বিষয়ে লিখে শেষ করা যায় না। চোখ দুটো ওর সমুদ্রের মতো গভীর নীল, আর আকাশের মতো উদার।
‘ষোল বছর ধরে এ কাজটা করছি’ ছবির বইয়ের দিকে ঝুঁকে বলে কারমি ‘বলা যায় এখনো শিখছি। আমার প্রথম কাজ ছিল যুদ্ধকালে সৈনিকদের শরীরে সংখ্যা লেখা।’
‘কেউ কেউ কি সন্ত্রস্ত হয় নি ওদের মধ্যে?’
‘হ্যাঁ, অবশ্যই। অনেকে আবার ফিরেও আসে। ওরকম দুজন এসে উসখুস করা শুরু করে একদিন। ওদের বললাম- তোমরা তো সেদিনও এসেছিলে, সমস্যাটা কি, কোন ছবিটা করিয়ে নিতে চাও?’
‘কি করাতে চাই তা কেনো সমস্যা না, কোথায় চাই সেটাই…’
‘ঠিক আছে, তাই যদি হয়, আমাকে ভরসা করতে পারো’ আমি বলি, ‘একজন ডাক্তারের মতো ভাবতে পারো আমাকে, কত শত মেয়েমানুষও ঘেঁটেছি, তাতে কি?’
‘ঠিক আছে, আমি তিনটা গোলাপ চাই।’ ওদের একজন বলে, ‘একটা পেটে, বাকি দুটো আমার বন্দুকের কাঠের দুপাশে।’
’বড় না ছোট?’
‘ঐ যে ওগুলোর মতো।’
কাজটা করি ওদের ইচ্ছে মতো।

একটার পর একটা ধোঁয়ার রিং তৈরি করে ঘরময় ছড়িয়ে দেয় কারমি। অলস সময় কাটায় ক্ষুদে টমোলিলোকে নিয়ে। আমার বন্ধু নেড ও আমি যোগ দেই ওদের সঙ্গে।
‘একট ফালতু নিয়ম জানতে চাও?’ ও বলে, ‘তোমার যে কোনো জায়গায় উল্কি এঁকে দিতে পারি, সবখানে, কিন্তু মুখ, ও হাত ও পায়ের পাতায় আঁকা যাবে না।’
‘এটা কি রাষ্ট্রীয় আইন?’
‘তাই।’
‘আমার মনে হয়, এটা একটা বাজে আইন, গনতন্ত্রে এমন বিধি থাকা উচিত না। মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। একজন ভদ্রমহিলা যদি হাতের উল্টোপিঠে একটা গোলাপ আঁকতে চায়, আমার মনে হয়…
‘ওকে তা করতে দেয়া উচিত’ কিছুটা উত্তেজিতভাবে বলে কারমি, ‘মানুষের ইচ্ছেমতো কাজ করতে দেয়া উচিত।’

একজন নাবিক পনেরো ডলারের একটা ঈগল আঁকিয়ে নেয় ওর বাহুতে। সবশেষে ছোট্ট এক বালক এক ডলারে নাম লিখিয়ে নেয় ওর কব্জির উল্টোপিঠে। ভালোই যাচ্ছিল দিনটা। উল্কি আঁকার ছবি ঘাটতে ঘাটতে কারমি বলে, ‘প্রজাপতির ছবি আঁকিয়ে নিতে মেয়েরা খুব আনন্দ পায়। এমনকি খরগোশ শিকারের ছবিও এঁকে দিতে পারি আমি। কিছু ছবি আছে, সেগুলোতে একজোড়া সাপ মেয়েদের উরু জড়িয়ে ধরে উপরে উঠে ওদের ভেতর হারিয়ে যায়। কিন্তু প্রজাপতির ছবিগুলোই বেশি মিষ্টি ও আনন্দদেয়া।’
‘কিছু কিছু খেপাটে প্রজাপতি আছে, যা কেউ এঁকে দিতে চাইবে না।’ বলতে বলতে আমার তলপেটের দিকে তাকায় নেড, যেনো খুব দামি পার্চমেন্ট কাগজে জড়ানো ওটা।
‘কোন ধরনের প্রজাপতি, তা কোনো বিষয় না। কথা হচ্ছে, কোথায় আঁকা হচ্ছে ওটা। প্রতি উরুর সামনের দিকে একটা করে ডানা। মনে করতে পরো ফুলে বসা একটা প্রজাপতি কীভাবে ওর ডানায় হিল্লোল তোলে। একটা নারীর শরীরও ওরকম আন্দোলনের ভেতর…  একটা চলমান ছবি কল্পনা করা যেতে পারে দৃশ্যটার।’

মনে হয় অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি, মুহূর্তের জন্য, বিশাল এক প্রজাপতির পাখার আন্দোলন অনুভব করি নিজের দু’উরুতে। সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দেই ওটা। নিজের প্রতি এক ধরনের ক্লান্তি এসে দ্রুত গ্রাস করে নেয় সব কিছু।
‘অগুনতি মেয়েরা ঠিক ঐ জায়গাটাতেই প্রজাপতি আঁকিয়ে নিতে চায়।’ বলতে থাকে কারমি, ‘অথচ জানো, কাজটা শেষ করার পর ওটার একটা ছবি ওঠাতে দেবে না। এমনকি কটিদেশের নিচের দিকটারও না। এটা মনে করো না যে এমনটা চাই না আমি। ওদের ধারণা, ওখানে ঐ ছবিটা দেখে দেশের সব পুরুষ ওদের চিনে নেবে।’
‘এসব কি কোনোভাবে স্ত্রীদের অনুগত করে?’ লজ্জা মেশানো সুরে জিজ্ঞেস করে টমোলিলো, ‘এটাকে পারিবারিক বিষয় হিসেবে নিলে ক্ষতি কি?’
‘নাহ্’ মাথা ঝাঁকায় কারমি, কষ্টের ছাপ ফুটে ওঠে চোখে। কণ্ঠস্বর ভারি ও আর্দ্র হয়ে ওঠে, ‘নাহ্, লরা একটা সূঁচের শব্দও শুনতে চায় না, ঘৃণার চোখে দেখে সে এসব। জন্মদিনের মতো সাদা ওর শরীর।’

ঐ মুহূর্ত থেকে আমার কল্পনায় ভেসে রইলো লরা। সারা শরীর উল্কিতে সাজানো। বুকের দুদিকে উড্ডীন ভঙ্গিতে একটা করে প্রজাপতি, পেছনদিকটায় ফুটন্ত গোলাপ, পিঠ জুড়ে ড্রাগন, পেটে ছয় রঙে আঁকা তরীসহ সুদর্শন সিন্দবাদ। পুরো শরীরে এজীবনের সকল কল্পনাচিহ্ণ, আমারই বরং এসবকিছু ভালো জানা উচিত।

সিগারেটের ধোঁয়ার ভেতর বসে রয়েছি আমরা চারজন। গোলগাল, পেশীবহুল এক মহিলা প্রবেশ করে কারমির দোকানে। একটা শব্দও বেরোয় না আমাদের কারো মুখ থেকে। ওর পেছনে তেল-চিটচিটে চুলের ভয়াল দর্শন একজন পুরুষও ঢোকে। সোজাসুজি কারমির সামনে এসে থামে মহিলাটি। লোকটাও জায়গা করে নেয় ওখানে। নীরবতার ভেতর কেটে যায় কয়েকটা মুহূর্ত ‘এখানে…’ কাঁপা ও কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করে কারমি, ‘আসার কি কারণ ঘটলো?’

মহিলার দিকে আরেকবার তাকিয়ে আস্তে করে উঠে যাই কারমির পাশ থেকে। লোকটা মনে হয় লরার ভাই, নয়তো বডিগার্ড, নাহয় প্রাইভেট ডিটেক্টিভ। টমোলিলো ও নেড ততক্ষণে দরোজায় পৌঁছে গেছে।

‘আমাদের বোধ হয় দৌড়ানো উচিত’ ফিসফিসিয়ে বলি আমি।
‘ওদেরকে সম্ভাষণ জানাও লরা’ আবেদন জানায় কারমি। ওর জন্য দুঃখ হয় আমার, কিছুটা লজ্জাও। একটা শব্দও উচ্চারণ করে নি লরা। শান্তভাবে অপেক্ষা করে আমাদের চলে যাওয়ার জন্য।

আমার কল্পনায় দুলতে থাকে ওর শরীর। শ্বেতপদ্মের মতো সাদা, ও শূন্য। ঈগলের দাপাদাপি হতে মুক্ত একজন নানের শরীরের মতো, গোলাপের ইচ্ছার মতো নির্ভার।

কল্পনার চোখে দেখি কারমির দোকানের দেয়াল থেকে ছবির প্রাণীগুলো ব্যঙ্গ করছে ওর ভয়াল একাকীত্বে, এবং ঐ অমলিন, স্থুল ও মসৃণ, শরীরটাকে।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত