বুল্টির প্রেম

আজ ১২ নভেম্বর কথাসাহিত্যিক সোমজা দাসের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


লেখাপড়া করতে কোনদিনই তেমন ভালো লাগে না বুল্টির। পনেরো বছর বয়সের মধ্যে অন্তত পনেরোখানা প্রেম তো হয়েইছে তার।বয়স দশ পেরোতে না পেরোতে কেমন মন উঁড়ু উঁড়ু ভাব শুরু হয়ে গেছিল।তার সাথে সিনেমার নেশা।সিনেমা নায়ক নায়িকাদের দেখে মনটা নরম হয়ে আসে তার।নিজেকে নায়িকার জায়গায় বসিয়ে দিনরাত স্বপ্ন দেখে তার নায়কের,যদিও তার সেই স্বপ্নের নায়ক বারবার বদলায়।তা সেটা তো আর বুল্টির দোষ নয়,বুল্টির ভাগ্যের দোষ।নইলে বুল্টি কি একটাও টেকসই প্রেমিক পেতে পারেনা?কিসে কম বুল্টি?বয়স পনেরো হলে কি হবে,গায়ে গতরে কেমন লাউডগার মত বেড়ে উঠেছে।ওই তো সেদিন স্কুলে যাবার পথে ছোকরাগুলো করিনা কাপুর বলে আওয়াজ দিলো।তা এসব আওয়াজ শুনতে নেহাত খারাপ লাগেনা বুল্টির।মনাদা তো বুল্টিকে মাধুরী বলতো।এ হেন বুল্টির প্রেমগুলো সব কেঁচে যাচ্ছে।

যেমন মনাদার কথাই ধরা যাক না।বুল্টির বড়দাদার বন্ধু,বুল্টির থেকে কম করে সাত আট বছরের বড় তো হবেই।সে হোক।সেই নিয়ে বুল্টির মাথা ব্যথা ছিল না।বেশ মাখো মাখো প্রেমপর্বটা চলছিলো মনাদার সাথে।মনাদাদের অবস্থা ভালো,ওর বাবার চালের ব্যবসা।ভালোই চুড়িটা,কাজল, ফিতেটা উপহার জুটে যেত বুল্টির।মনাদা তো কথা দিয়েছিল,পুজোর আগে কলকাতায় গিয়ে হাতিবাগান থেকে একটা জিনের প্যান্ট এনে দেবে বুল্টিকে।বুল্টির বলে কদ্দিনের শখ একটা জিনের প্যান্ট পরে সিনেমার হিরোইনদের মত সেজে ঠাকুর দেখতে বেরোবে।কিন্তু ঐ যে,বুল্টির ফাটা কপাল।নইলে যে দিন জ্যাঠতুতো দিদির দেওর বাঁশবাগানে প্রথমবার একটু হাতটা ধরেছে বুল্টির,সেদিনই মনাদার চোখে পড়তে হল?আর মনাদাও বলিহারি যাই,হাত ধরলেই কি প্রেম হয়ে যায় নাকি।হ্যাঁ এটা ঠিক যে দাদার দেওর ওর দু’হাত ধরে গদগদ প্রেমের কথা বলছিলো,আর বুল্টিও লাজুক হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে সেটা শুনছিল,কিন্তু তাতে হলটা কি?আত্মীয়ের মধ্যে প্রেম বা বিয়ে করার মত বোকা বুল্টি নয়।তার উপর ছেলেটা নিতান্ত চালচুলোহীন। কিন্তু মনাদা সেটা বুঝলে তো।এমন ক্ষেপে গেল আর বলার নয়।যাক গে, গেছে ভালো হয়েছে।এমনিতেও বুল্টি ওকে বিয়ে করতো থোরাই?ওরকম আঁকড়ে ধরা প্রেম বুল্টির মোটেই ভালোলাগেনা।প্রেম করেছে বলে কি কিনে নিয়েছে নাকি বুল্টিকে?

তারপর ধরা যাক, পল্টনদা।সে আবার আরেক জিনিস।সবসময় কেমন শাসন করার স্বভাব।বুল্টি ফ্রক পরবে না,বুল্টি পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে ছেলেদের সাথে হেসে কথা বলবে না আরো কত কি।সেও মানা যেত,কিন্তু লোকটা বলে কিনা সিনেমা দেখা কমাতে।হুঃ,তোমার মত দশটা প্রেমিককে সিনেমার জন্য বলিদান দিতে পারে বুল্টি দাস।

বুল্টি চিরকালই একটু বেশি পাকা।তার উপর এই প্রেমরোগ।দশ বছর বয়সে প্রথম প্রেমপত্র লিখেছিল। সে আরেক গল্প।স্কুলের গেটের সামনে ভাজাভুজি, কুলের আচার এমনি আরো অনেক মুখরোচক খাদ্যসম্ভার নিয়ে বসতো এক বুড়ো।হঠাৎ একদিন দেখা গেলো,বুড়োর জায়গায় এক অল্পবয়সী ছোড়া আসছে ঝুড়ি গলায় ঝুলিয়ে।সংবাদ পাওয়া গেল,ছোড়া ঐ বুড়োর নাতি।বুড়োর পা ভেঙেছে। তাই নাতি আসছে।তাতে ক্ষতি কিছু হয়নি।দাদুর বদলে নাতি এলে তো আর খাবারের স্বাদ বদলে যায়না।কিন্তু বদলালো।বুল্টির যেন সেসব ভাজাপোড়া হঠাৎই অমৃত মনে হতে লাগলো।কুলের ঠোঙা হাতে নেবার সময় হাতে হাত ঠেকে গেলে বুল্টি সারাদিনে আর হাত ধোয়ার নাম করতো না।তখন বুল্টি সবে দশ পেরিয়েছে।ছেলেটাকে বেশ শাহরুক শাহরুক দেখতে।শুধু একটু বেশি রোগা আর গালটা একটু ভেতরে ঢোকানো মতন।তাতে কি যায় আসে।বুল্টি তখন প্রেম সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে।শয়নে জাগরণে শুধু তার শাহরুক।মনে মনে ছেলেটার ঐ নামই দিয়েছে সে।আসল নামটা জানা হয়নি।তারপর একদিন সাহস করে প্রেমপত্র লিখেই ফেললো মনের সব আবেগ একত্রিত করে।

প্রিয়তম শাহরুক,

তুমি আমার কৃষ্ণ আমি তোমার রাধা,
তোমায় ছাড়া জীবন যেন মনে হয় আধা।
তোমার হাতের কুলের আচার
খেতে না পেলে আমি নাচার
পালিয়ে যাব তোমার সাথে মানবো না তো বাধা।

তোমার কাজল(বুল্টি দাস)

স্কুল শেষে কুলের আচারের ঠোঙাটা হাতে নিয়ে টাকার সাথে চিরকূটটা তার শাহরুকের হাতে চালান করেছিল বুল্টি।সারাদিন কী ভীষণ উত্তেজনা।পরদিন ছুটির সময় দেখা গেল আগের সেই বুড়ো খোড়া পায়ে গলায় ঝুড়ি ঝুলিয়ে আগের জায়গায় দন্ডায়মান। খুব আঘাত পেয়েছিল বুল্টি।তখনও কাঁচা বয়স, নরম মন।প্রেমের খেলায় অতটা পেকে ওঠেনি সে তখনও।তারপর থেকে কত যে শাহরুখ,আমীর,সলমান যে এলো আর গেলো,বুল্টির একটাও সেরকম টেকসই প্রেমিক জুটলো না।

আসলে দোষ মোটেও বুল্টির নয়।এমনিতে বুল্টি মেয়ে বেশ ভালোই।সে কথা গ্রামের সবাই এক বাক্যে স্বীকার করবে।জন্ম থেকে এই গ্রামেই তো আছে সে,সবার চোখের সামনে এত বড়টি হয়েছে।কেউ বলুক দেখি বুল্টি কোনদিন কারো সাথে ঝগড়া করেছে।বরং উল্টোটাই বলবে লোকে।হেসে ছাড়া কথা বলে না কারো সাথে।একটু বেশীই হাসে,হেসে গড়িয়ে পড়ে কথায় কথায়।সে তো বয়সের দোষ।তার জন্য তো আর কাউকে মন্দ বলা যায় না।দেখতে শুনতেও বেশ বুল্টি।পনেরো বছরের হলেও দেখতে শুনতে আঠেরোর কম লাগেনা।বুল্টির মত নাকনক্সা গ্রামে আর কটা মেয়ের আছে শুনি?এ হেন বুল্টির প্রেমে যদি গ্রামের ছেলেরা ঘার মুচড়ে পড়ে,তাতে কি বুল্টিকে দোষ দেওয়া যায়?দোষের মধ্যে বুল্টির মনটা একটু বেশী নরম।কাউকে দুঃখ দিতে পারেনা।দুটো মিষ্টি কথা বলতে তো আর টাকা লাগেনা।কারো সাথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দুটো আইসক্রিম খেলে বা কারো সাথে হাত ধরে কিছুটা রাস্তা হাটলেই কি বুল্টি মন্দ হয়ে গেল! ছেলেগুলো যে তার জন্য মরে থাকে,সেই বেলা?ওদের অমন করে মরমে মারলে ঠাকুর পাপ দেবেন না বুল্টিকে?

কিন্তু আজকাল বুল্টি যেন একটু অন্যমনস্ক থাকছে।সেদিন ক্লাসের দুজন বন্ধু ভিডিও হলে সলমানের নতুন সিনেমাটা দেখতে যাবে বললো আর বুল্টি কিনা মানা করে দিল?গত হপ্তায় পাশের গ্রামে জগদ্ধাত্রী পুজোর মেলাতেও গেলো না বুল্টি।দাদারা কত করে বললো,মাও বললো যা ঘুরে আয়,কিন্তু বুল্টির যেতেই ইচ্ছে করলো না।এই বুল্টিই কিনা মেলায় যাওয়ার জন্য মরে যায় একেবারে।বুল্টির হলটা কি?প্রেমে পড়া তো বুল্টির কাছে নতুন কিছু নয়।সে তো ও হরদমই পড়ছে।তা হলে নতুন কি হল?হুঁ।কিছু তো হয়েইছে।আর যেটা হয়েছে সেটা বুল্টির সাথে কোনদিন হয়নি।বুল্টি কারো প্রেমে পড়েছে,আর সে বুল্টিকে পাত্তা দিচ্ছেনা?বুল্টিকে?যে বুল্টির একটু হাসির ঝলক দেখার জন্য গাঁয়ের ছেলেরা জানকবুল করতে পারে,সেই বুল্টিকে কিনা অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করে?এত সাহস?

তাহলে আরেকটু আগের থেকেই বলা যাক।মাস
দুয়েক আগে থেকে ঘটনার সূত্রপাত। মনাদার সাথে প্রেমটা সবে ভেঙেছে। মেজাজটা কদিন ধরে বিগড়ে আছে।এই বুল্টির এক রোগ।যতক্ষণ বুল্টির প্রেম চলছে,তার মেজাজটাও বেশ সরেস থাকে।তখন বুল্টির মত মেয়ে হয়না।বুল্টি কলকল করে হাসে,গুনগুন করে গায়।বুল্টি প্রজাপতির মত পাখা মেলে ওড়ে।কিন্তু প্রেম না থাকলে বুল্টি তখন অন্য মানুষ।তার মেজাজের পারদ তখন হামেশাই চড়ে থাকে।সামান্য কথায় মায়ের সঙ্গে ঝগড়া লেগে যায়।সে যাই হোক,যেটা বলছিলাম,বুল্টির তখন সেইরকম প্রেমরহিত দশা চলছে।ঠিক এরকম সময় পাশের বাড়িতে ভাড়া এল গাঁয়ের প্রাইমারি স্কুলের এক ছোকরা মাস্টার।কলকাতার ছেলে।সবে চাকরি পেয়েই এই ধ্যারধেরে গোবিন্দপুরে পোস্টিং।এত দূর রোজ যাওয়া আসা অসম্ভব।তাই বাধ্য হয়েই এইখানেই তাঁবু ফেলতে হয়েছে।কলকাতার ছেলে,তেমনি নাক উঁচু। না হলে বুল্টির দিকে কি না ফিরেও দেখলো না,এত অহংকার।তা সে এই গ্রামে থাকবে,আর গ্রামের সবচেয়ে দর্শনীয় বস্তুটা নজর করে দেখবে না,তা কেমন করে হয়?আর হতে চাইলেই বা বুল্টি সেটা হতে দেবে কেন?

মাস্টারের নাম বিমান।নামের বাহার আছে,বুল্টি ভাবে।দেখতে শুনতেও মন্দ নয়।ভালোই বলা যায়।বিমান-বুল্টি,বাহ্,নামটাও বেশ লাগছে একসাথে শুনতে।বয়সটা সে বুল্টির থেকে ছয় সাত বছরের বড় হবে ঠিকই,ও ওটা কোন ব্যাপার নয়।যাক এতদিনে বুল্টির যুগ্যি কাউকে পাওয়া গেছে।বুল্টির মনটা আবার ফুরফুরে হয়ে উঠছিলো কদিন ধরে।বিমানের স্কুলে বেরোনোর সময়টিতেই বুল্টি স্কুলে বেরোচ্ছিলো,যাতে মাস্টারের চোখ পড়ে তার উপর।আর বুল্টির উপর চোখ পড়বেনা,তাও কি হয়?কদিন যাওয়া আসার পথে নিত্য দেখা হয়।বিমান যে বুল্টিকে দেখেনা, তা নয়।কিন্তু যেন,পাত্তা দেয় না।বুল্টির আরো জেদ চেপে যায়।তার এই নাতিদীর্ঘ জীবনে সে পুরুষদের চোখে মুগ্ধতা দেখে অভ্যস্ত। কোথাকার এক ভারি তো প্রাইমারি মাস্টার,সে কিনা বুল্টিকে দেখেও দেখে না?এত অবহেলা?না,এর একটা বিহিত দরকার।

বিহিত করতেই গিয়েছিলো বুল্টি সেদিন।পাশের বাড়ির মেয়ে সে।এবাড়ি ও বাড়ি তার অবাধ যাতায়াত।বুকটা একটু যে দুরুদুরু করছিলোনা যে তা নয়।কিন্তু কি আর করা যাবে?কেউ যদি নিজে থেকে না দেখতে পায়,তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয় বৈ কি।তা বুল্টি বিকেলে তাদের ঘরের পুজোর প্রসাদ নিয়ে গিয়েছিলো সেদিন,একটু ইতস্তত করে সোজা ঢুকেছিল বিমানের ঘরে।বিমান বিছানায় শুয়ে খুব মন দিয়ে কোন বই পরছিলো,বুল্টির আগমন টের পায়নি।অগত্যা বুল্টিকেই গলা খাঁকরে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে হল।বিমান বিছানায় উঠে বসলো ধড়মড়িয়ে।একটু অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।’এই তো,কাজ হচ্ছে ওষুধে’,মনে মনে ভাবে বুল্টি।তারপর বলে,’আপনার জন্য প্রসাদ এনেছিলাম।আমরা পাশের বাড়িতে থাকি।’

বিমান ব্যস্তসমস্ত বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।বুল্টির হাত থেকে প্রসাদের থালাটা নেয়।বুল্টি ইচ্ছে করেই একটু আলতো করে ছুঁয়ে দেয় বিমানের আঙুল।বিমান থালাটা পাশে টেবিলের উপর রাখে।তারপর বুল্টিকে বলে,”তুমি পাশের বাড়িতে থাকো?বেশ বেশ।তা তুমি কোন ক্লাসে পড়?”
বুল্টির একটু রাগ হয়।লোকে বলে, বুল্টিকে দেখলে মনেই হয় না স্কুলের ছাত্রী।বিমান কি বুল্টিকে নেহাৎ খুকি ভেবেছে নাকি?ব্যাজার মুখে উত্তর দেয়,
“এইটে।”
“বাহ্ বাহ্,তা মন দিয়ে পড়াশোনা কর তো?ফাঁকি দাওনা তো?”
বুল্টির মনে হয় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।কিন্তু না,সেটা করলে চলবে না।আজ বাড়ি থেকে ঠিক করে বেড়িয়েছে সে,কাজ হাসিল করেই বাড়ি ফিরবে।বুল্টি তার সবচেয়ে ধারালো হাসিটা নিক্ষেপ করে বিমানের দিকে।এই হাসিতে তাবড় তাবড় ভীষ্মেরও প্রতিজ্ঞা টলে,বিশ্বামিত্রেরও ধ্যান ভাঙে,কিন্তু বিমান অচঞ্চল।

বাধ্য হয়ে বুল্টিকে নির্লজ্জ হতে হয়,বেহায়া হতে হয়।তার বিখ্যাত কটাক্ষটা খরচ করতে হয়।অস্ত্রশস্ত্রগুলো সব একে একে খরচ হয়ে যাচ্ছে।লোকটা কি ধাতুতে গড়া?এ হেন অভিজ্ঞতা বুল্টির কোনদিন হয়নি।ওর যেন ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।না কাঁদবে না ও।কিছুতেই কাঁদবে না।এই লোকটার কাছে নিজেকে আর খেলো করবে না।”আসি”, বলে ঘরে ছেড়ে বেড়িয়ে যায় সে।সেই মুহূর্তে পেছনে তাকালে সে দেখতে পেত,বিমান তার নির্গমনপথের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে।

সেই থেকে বুল্টির মন খারাপ।যা কিছু এতদিন পর্যন্ত ওর প্রিয় ছিল,আজকাল সেসব কিছুই আর ভালো লাগছে না।সিনেমা দেখতে ইচ্ছে করছে না,বন্ধুদের সাথে আড্ডাও বিস্বাদ ঠেকছে।গত দু’হপ্তায় বুল্টি একটাও সিনেমা দেখেনি,ভাবা যায়?এইতো গত পরশু পরেশ মোক্তারের ছেলে বিপ্লব দা, বুল্টিকে একটা প্রেমপত্র দিলো রাস্তায় ডেকে।অন্যসময় হলে বুল্টি তো খুশীই হত।পরেশ মোক্তার এই গ্রামের মাথা লোক,বেজায় ধনী।বিপ্লব দাও কলকাতায় কলেজে পড়ে।ছুটিছাটায় বাড়ি আসে।এরকম একটা সরেস প্রেমিক পেলে কিছুদিন আগেও বুল্টি সহজেই রাজি হয়ে যেত।কিন্তু হঠাৎ করেই যেন সব বদলে গিয়েছে।বুল্টির আজকাল আর হাতে ঘাটে মাঠে প্রেম পাচ্ছে না মোটেই।প্রেমের কথা মনে পড়লেই হাড়জ্বালানে বিমান মাস্টারের মুখটা মনে পড়ছে।আজকাল আবার একটা নতুন উপসর্গ শুরু হয়েছে।মাঝে মাঝেই থেকে থেকে খুব কান্না পাচ্ছে বুল্টির।মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে।মনটা অন্যদিকে ঘোরাতে স্কুলের ব্যাগ টেনে বইখাতা নিয়ে বসে বুল্টি।পড়ায় মন দিলে যদি ওই লোকটাকে ভুলে থাকা যায়।মা এসে কপালে হাত দিয়ে দেখে গেছে একবার।শরীর ঠিক আছে তো?বুল্টি নিজে থেকে স্বেচ্ছায় বইখাতা নিয়ে বসেছে,এ যেন অবিশ্বাস্য।

সময়ও থেমে নেই।আমাদের গল্প,মানে বুল্টির গল্প দু’বছর এগিয়ে এসেছে।সবে মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে বুল্টির।গত দু’বছরে বুল্টির একটাও প্রেম হয়নি।রাস্তা ঘাটে যাওয়া আসার পথে বিমানের সাথে মুখোমুখি হয়েছে অনেকবার।বুল্টি প্রতিবার মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে।বয়েই গেছে কথা বলতে।কিসের এত দেমাক?নিজেকে ভাবে টা কি?সে কি আদৌ জানে বুল্টির একটা ইশারায় কতজন তার পায়ে এসে পড়বে?থাকুক নিজের গুমোর নিয়ে।বয়েই গেল বুল্টির।

কিন্তু সত্যি কি বয়ে গেল?তাই যদি হবে,তবে বুল্টির এত কষ্ট হচ্ছে কেন?আজ সকালে পাশের বাড়ির রতনদার কাছে খবর পেয়েছে,বিমান মাস্টার কলকাতার হাইস্কুলে চাকরি পেয়ে কলকাতা ফিরে যাচ্ছে এ গ্রামের পাট চুকিয়ে।বুল্টির বুকের ভেতরটা খালি হয়ে যায়।ইচ্ছে করছে,খুব ইচ্ছে করছে একবার তাকে দেখতে।কিন্তু না।কোন মুখে গিয়ে দাঁড়াবে তার সামনে?কিভাবে বলবে,’শেষবারের জন্য দেখতে এলাম তোমাকে’।না না,থাক।তার চেয়ে এই ভাল।বুল্টি যাবেনা ওর সামনে।কক্ষনও যাবে না।

সকাল থেকে ঘর ছেড়ে বেরোয় নি বুল্টি।চোখের জলে বুক ভেসে যাচ্ছে।বিমান চলে গেছে আজ সকালের ট্রেনে।বুল্টির দাদা গিয়েছিল স্টেশনে,ট্রেনে উঠিয়ে আসতে।এই ক বছরে বুল্টির দাদার সাথে ভারী ভাব হয়েছিল বিমানের।
দরজায় শব্দ শুনে বুল্টি ফিরে তাকালো।পাশের বাড়ির মিষ্টু।আজ আর কারো সাথে কথা বলতে ভালো লাগছেনা তার।তবু জোর করে হাসি টেনে বললো,”আয় মিষ্টু।”
মিষ্টু এগিয়ে এসে এদিক ওদিক তাকিয়ে সন্তপর্ণে একটা ভাঁজ করা কাগজ বার করে বুল্টির হাতে দিল।বললো,”বিমান দা দিয়ে গেছে।তোকে দিতে বলেছে।নে ধর।আমি পালাই।”
মিষ্টু বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে।বুল্টি কাগজটা হাতে নিয়ে বিমূঢ় হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ।তারপর ধীরে ধীরে ভাঁজ খুলে চোখের সামনে মেলে ধরলো চিঠিটা।
“কল্যাণীয়াসু বুল্টি,
আশা করি পরীক্ষা ভালো দিয়েছো।আমার এই গ্রামের পাট চুকলো আপাতত।ফিরে যাচ্ছি।যাবার আগে দেখা হল না।কিছু বলার ছিলো,শোনারও।জানি আমার প্রতি অনেক অভিযোগ জমে আছে তোমার।সব শুনবো।সারা জীবন তো পড়েই আছে।
মন দিয়ে লক্ষ্মী মেয়ের মত লেখাপড়া করবে,কেমন?ঠিকানা দিলাম।চিঠি লিখো।আবার দেখা হবে।রাগ করে থেকো না আমার উপর।
বিমান

বিঃদ্রঃ সেদিন প্রসাদের থালা নিতে গিয়ে পাওয়া ক্ষণিকের ছোঁয়াটুকু সাথে করে নিয়ে গেলাম।”

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত