পাঁচটি কবিতা

আজ ২৭ জুন কবি সৌমেন দত্তের জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার কবিকে জানায় শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।

ইরাবতীর পাঠকদের জন্য রইলো কবি সৌমেন দত্তের পাঁচটি কবিতা।


 বিষ নয় বিশ বাঁচাও 

এ আমরা কোন সময়ের যাত্রী..!
বাতাস জুড়ে বিষের বাস।
বসন্তের কোকিল ঘর ছেড়ে শহর ছেড়ে বিবাগী।
চোখেমুখে,ঠোটে রক্তপ্লাবন।
ভেবে দেখেছো..মৃতদের চোখে কতটা স্ফুলিঙ্গ ওড়ে..?
ভুখা শেয়াল জঙ্গল ছেড়ে রাজপথে,জানালায়।
সংকীর্ণ চক্ষুলজ্জাহীন টায়ারের অন্দরমহলে যত বেশী ব্যাঙাচি,
তার দ্বিগুন অনাহারে স্বাধীনতার তৃপ্তি বুকে নিয়ে দেয় শীতঘুম।
অক্ষমতার হাড়ে শিরদাঁড়া জোড়া।
সহিষ্ণুতা.. তোমার দরজায় খিল কেন…??

আজ চাইছো জাতির বোধ গড়ে তুলতে,
পিঠ,বুক,কোমর ছিঁড়ে জুই,শাবানার।
পৌরুষাঙ্গে রক্ত পলাশের বন্যা।
ছায়া এখনো হাহাকারে হাটে বাজারে হাঁটে,
পারফিউমে তোমার মেটাতে পারে নি..?
পুড়ছে ঘর,পুড়ছে বোবা গাছ,বোবা ছেড়া বন্ধনী ।
সহিষ্ণুতা.. তোমার দরজায় খিল কেন…??

” সিলেট “আজ বুক ঠুকরে কাঁদছে,
তমাল,সেলিমের রক্তে মায়ের আঁচল ভিজে।
ভারি বাতাস জুড়ে গুমোটে কান্না,
ইস্পাতে মন আঁধারে বিলীন।
” আতিয়া মহল ” হয়তো আত্মীয় হতে পারে নি কামাল,কমলের।
অমোঘ মৃত্যুর স্পর্শে তারাদের নিশ্বাসে জমেছে বাষ্প।
শুধু কি রাম গেল,শুধু কি রহিম গেল..!
রক্তের বেশ্যাবৃত্তি নয় কি…?
সহিষ্ণুতা.. তোমার দরজায় খিল কেন…??

সস্তার জান,সস্তার মান,সস্তার হিমোগ্লোবিন,
যৌবন হাঁটে রাস্তায় নিঃশেষ হতে।
আর নয়…সময় এসেছে প্রতিরোধকের,
তোলো আওয়াজ উচ্চস্বরে,
ভেদাভেদে নয়,সমব্যাথীর সুরে…
” বুকে বুক হোক শক্ত,
দূর হোক সব বদরক্ত।
নিপাত যাক সব জাত ধর্মেরঢাক,
অন্ধ ভক্তের হোক অন্ধ বাক।
জেহাদ কিসের,যুদ্ধ কিসের..!
প্রতিরোধক চাই ছোবোল বিষের।”

বৃষ্টি ভেজা শহর এবং…

একটা বৃষ্টির দিন,
সুনসান হাইওয়ে..মধ্যরাত্রি।
নিয়ন আলোয় ভিজে কাক,
খোলা আকাশের সাথে কফি মগে তুমি মিশে আছো।
তোমার পেখমী ওড়না
ঝরা বৃষ্টি নরম খাঁজে জমে।
চোখের পাতায় স্বপ্ন সাজায়,
আমার সস্তা শার্ট ভিজে কাক।
গালে বিদ্যুৎ… নখ ছুঁয়েছে।
তোমাকে দেওয়া আমার প্রথম চুম্বন, যদিও অস্পষ্ট।
ঠোঁটের ব্যাপ্তি ছিল দীর্ঘ, যেন আড়ষ্ট নষ্ট এক যৌবন।
তুমি কুঁকড়িয়ে জাপটে ধরেছ আমায়,
শরীর জুড়ে টারবাইনে পাক।
চোখে মুখে খিল।
চুলের নিচ, কাঁধ হয়ে ধীরে ধীরে যেন কাল কেউটের ফণা।
তোমার বেঁকে ওঠা আমি অনুভব করেছিলাম প্রতিটি স্পর্শে।
নাভির কম্পনে যেন অন্ধ রিখটার।
সাপেরা যেমন ছোবল মারার আগে বেকে ওঠে,
আছড়ে পড়েছিলে আমার শরীরে তেমনি, উন্মত্ত।
যেন ট্রাফিকের সিগন্যালে ভাঙন।
জাপটে ধরেছি, টেনে বুকের সাথে লেপটে ধরে ঠোঁটের ভিতর মুক্তো খুঁজেছি কিছু সময়।
জড়তা কাটিয়ে এবার তুমিও সে খেলায় মেতেছো,
উন্মত্ত করে দিয়েছো তোমার বক্ষ।
শুনলে অবাক হবে..আমি কখনো সমুদ্র দেখিনি।
কিন্তু আজ….!!ভাসছি ভাসছি,
বালির বাড়ি, ভাঁজে ভাঁজে ঢেউ।
ইচ্ছে করছে তেপান্তরী হতে তোমার চোরাবালিতে।

 ফেরারী মন 

অন্ধকার গলিপথ যেন বাঁকা নদীর মতো অন্তহীন,
কাঁচের গ্লাস,অর্ধ চাঁদ যেন শুধুই সময়ানুবর্তী,
তোমার মুখচোরা বালিশে ভিজে সাক্ষ্য।
মেঘ করে কাঁপে বুক ঝলসায় বিদ্যুৎ,
নীড়ের পথে উড়ন্ত চিলের দগ্ধ ডানা।
তুমি যেন ফানুসের মাঝে জ্বলন্ত কপূরের আগুন,
টুকরো হলেও দাবদাহন অপার,
নিয়ে চলে সীমানা পেরিয়ে।
তোমার উপস্থিতি মোহনার মতো,
শত শত অভিমুখ পেরিয়ে
আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে।

পূর্ণিমার গভীর রাতে একলা আকাশ,
চা কাপ,জ্বলন্ত সিগারেট আর
সঙ্গী পিছু তোমার আলেয়া,
একাকিত্বের বোঝা থেকে মুক্তির হাতছানি।
দীর্ঘকাল পর কালের অন্ধকার কাটিয়ে
তোমার নিশ্বাসে মিলিত প্রাণ।
তবে কি ফেনায়িত প্রেমের সুরা
রক্তে প্রবাহমান..!
আধ খাওয়া চাঁদের অস্পষ্ট আলোয়
মন স্তব্ধ,নির্বাক, খোলা আকাশের নীচে
ঠিকানা হারিয়ে ।

অভিমানের গুহায় তালাবন্দী তোমার মন,
একলা ছাতের মধ্যরাত্রি,
মনের মধ্যে গৈরিক জলধারা
নিষ্ঠুর ভাবে আছড়ে ফেলতে লাগলো
পাথরের গায়ে,
চতুর্দিক জুড়ে ঘিরছে শুন্যতা,
শুধু.. রুদ্ধ ঘরে শোনা যাচ্ছে ক্লান্ত নিশ্বাস।

 বহ্নি কৃপান 

ভুবনডাঙার মেঘলা আকাশ
দুয়ারে জাগ্রত দ্বারী।
শিহরিল নিহারি আপন পানে
রুদ্র সমুদ্রের বাহু নিবিড় বনস্পতিতে।
সঘন মেঘে ঝরঝর বরষায় আপ্লুত বিজন গৃহ।
দুঃখবিহীন বক্ষ,ক্রোধ,শিহরণ
কক্ষপথে বিসর্জিত সকল আভরণ।

নিরখি আকাশ পানে
অশ্বমেধের ঘোড়ার মতো দুরন্ত ভ্রুকুটিত দৃষ্টি।
বক্ষে তুলি খসে পড়া আঁচলখানি,
জ্বরাতিসার নিথর বক্ষবন্ধনী, ওষ্ঠ কম্পিত
নগ্ন কোমর জুড়ে পিশাচের ছাপ বহ্নি।
ত্রস্ত হয়ে চতুর্দিকে চেয়ে থাকলো মায়াবিনী,
বিজন গৃহে প্রজ্বলিত রত্নদীপ,
জ্বলছে অনি নিখিলের স্পন্দনবেগ।

কুসুম দোলায়িত কানন তলে শরৎ আসিবে বারংবার
দুয়ার মাগি তব হৃদি স্পন্দন।
হঠাৎ তব চোখে দেখেছি সন্ধ্যালোকে,
সময় আর নাই,গুনছি কৃপণের সম।
ব্যকুল সংকোচ ভরে বর্ষার দিনগুলি,
সকরুণ নম্রতায় পূর্ণ দুই চোখ।

মধ্যরাতের পাগলী

পাগলী হটাৎ আমায় বললো,” এই শোনো..
আমাদের সম্পর্কের একটা নাম কিন্তু তোমায় দিতে হবে..”,
একটু অবাক চোখে তাকিয়ে বললাম, ” নাম..!
কি দিই বলো তো..;
আচ্ছা বেশ তবে নদী নাম থাক তোমার আমার সম্পর্কের “।
পাগলি.. ” নদী..”।
এ কেমন নাম..তা জল কোথায় পেলে…?
আমি তো জল নয়। এ কেন দিলে..?
আমি..হাহাহা ” কে বলে নেই..;.. জল,
সেই তো কেন্দ্রবিন্দু আমাদের।
পাগলি..” বুঝিয়ে বলো তবে আমায়..;
আমি..”বেশ। গঠন আছে একপ্রকার কিন্তু আকার কোথায়..;,
জীবন আছে কিন্তু রং কোথায়..,
স্রোত আছে টান আছে কিন্তু কোনো বাঁধন কোথায়..; “।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত