স্মৃতি উল্টে বৈশম্পায়ন ঘোষাল

Reading Time: 2 minutes

আমার প্রথম কলকাতা ভ্রমণ অনেকগুলো কারণে আমার জীবনে সেরা। এই ভ্রমণের অনেকগুলো মনিমুক্তার একটি বৈশম্পায়ন ঘোষাল। একজন অন্তরালের মানুষ কত বড় আলোকময় হতে পারেন তা বৈশম্পায়ন ঘোষালকে না দেখলে জানাই হতো না। মানুষটি আপাতদৃষ্টিতে গম্ভীর চোখদুটো এত চকচকে গভীর দেখলে অহংকারী মনে হবে একপলকেই। দুধসাদা গায়ের রঙের আভিজাত্যে  দু আঙ্গুলের ফাঁকে ঘন ঘন যে আগুন জ্বলে ওঠে তার ধোঁয়ায় নিজেকে জ্বালানোর যে সুপ্ত প্রচেষ্টা সেখানে একজন গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী হাস্যোজ্জল ধ্যানরত কিন্তু মানুষটির মুখে কঠিন এক যাপনের গম্ভীরতা ঝুলে আছে। কেন জানি মনে হলো এ হেন গম্ভীর মানুষের সাথে কি বলবো? তিনি কি আমার মত যুবককে আদৌ কি পাত্তা দেবেন?

মানুষকে আমি কখনোই ভয় পাইনি। চোখে চোখ রেখে কথা বলতে আমি সাবলীল। পরিচয় পর্বেই খেয়াল করলাম আমি উনার চোখে চোখ রাখতে পারছি না। নিজের কাছেই নিজেকে অজানা লাগছে।

উনার প্রথম শব্দটি আমি অনেকদিন মনে রেখেছিলাম। আমার নামের এত সুন্দর ও গভীর উচ্চারণ আমি এর আগে শুনিনি। উনার কাছেই জেনেছিলাম আমার নামের অর্থ ও আমি যে সৌনক লেখি সেই বানানটি ভুল। তারপরেই আমি শৌনক লেখতে শুরু করি। তবে অবাক করা বিষয় ছিলো এইসময় চমকে দিয়ে উনি বললেন বসুমতিতে উনি আমার লেখা পড়েছেন,সেখানেই তিনি নামের ভুল বানানটি দেখেছেন। বিস্ময় তখনো বাকী ছিলো। নিউকোচবিহার স্টেশনের কাছেই আমি যে আশ্রমে থাকি তার খবরাখবর বলতে লাগলেন বুঝলাম তিনি আমার নাড়িনক্ষত্র জানেন। তখনো জানতাম না তিনি অনুবাদ পত্রিকা করেন। কিন্তু সেইদিন বিস্ময় বা গর্ব হচ্ছিলো কলকাতায় বসে উত্তরবঙ্গের কোন নতুন কবির সন্ধান রাখেন শুধু না তার যাপনের খবরও রাখেন একজন কলকাতাবাসী। কিন্তু অনেকপরে বুঝেছি একজন গুনী সম্পাদকের এমন পঠনপাঠন ও নবীনদের তথ্য রাখাটা তাঁর কাজের শ্রেষ্ঠত্ব।

লোকমুখে একটি কথা ভাসতো বৈশম্পায়ন ঘোষাল যে কারো মুখ দেখে তার সব বলতে পারতেন।তবে আমার মনে হলো তাঁর নিমগ্ন পাঠ ও সম্ভাবনাময়দের খোঁজ রাখা একটা জরুরী কাজ বলেই পালন করতেন। এমনো শোনা যায় তিনি এমন কাউকে কাউকে অনুবাদ চেয়ে চিঠি লিখেছেন যারা আজো বিস্ময়ে ভাবেন কি করে ভিন রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকায় একজন অনুবাদ করে তার খবর কি করে থাকতো বৈশম্পায়ন ঘোষালের কাছে?আমি যতটুকু দেখেছি,কথা বলে যতটুকু বুঝেছি তাতে মনে হয় উনি একজন পাঠক না কেবল একজন সংগ্রাহক।স্কুল ম্যাগাজিন থেকে সব লিটিল ম্যাগ ও দৈনিকগুলোর প্রকাশিত সব লেখার খোঁজ রাখতেন। তারচেয়ে বড় যে গুনটি ছিলো তাঁর তা হলো কবি লেখকদের যথাযথ পথের সন্ধান দেয়া। কথাটা আমার জীবন দিয়েই বুঝেছি দেখা হবার বছর পাঁচেক পরে।যদিও সেইদিন খুব হেসেছিলাম আমি। সেইদিন তিনি বলেছিলেন কবিতার চেয়ে আমায় সাহিত্য মনে রাখবে গদ্য ও অনুবাদের জন্য। তখন আমি কবিতা ছাড়া কিচ্ছু লেখিনা।গদ্যের দীর্ঘ শ্রম ক্লান্ত করে আর অনুবাদ তো তাকিয়েও দেখিনা।হাসি ছাড়া কি উপায় ছিলো। বছর পাঁচেক পরে সেই আমি গদ্য লিখলাম এবং অনুবাদও করলাম একজনের অনুরোধে এবং কি আশ্চর্য সেগুলো সত্যিই খুব প্রশংসা পেয়েছিলো।

আজ বৈশম্পায়ন ঘোষালের জন্মজয়ন্তী। খুব কাছ থেকে দেখা দীর্ঘদিনের ধুলো ঝেড়ে যতটুকু উদ্ধার করা গেলো তাতে গোটা মানুষটি নেই ঠিকই কিন্তু বৈশম্পায়ন ঘোষালের প্রিয় পানীয় চায়ের পিপাসার মতো একটা পিপাসা জেগে ওঠলো। একটা শূন্যতা অনুবাদ করে নিচ্ছে আমায় কেবলই।

     

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>