সত্যজিৎ রায় : এক অনন্য শিল্পীর পাঁচালী

জীবন এমন হওয়া চাই যেন মৃত্যুর মুহূর্তে বলতে পারা যায় যে, না, আমার জীবন বৃথা যায়নি। এ যুগে সত্যজিৎ রায়ের চেয়ে এ কথা কোন বাঙালী বেশি বলতে পারবেন? ছত্রিশটি ধ্রুপদমানের চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্র বিষয়ক তিনটি গ্রন্থ, ছয়টি শঙ্কু ও সতেরোটি ফেলুদা কাহিনী, দশটি শিশুতোষ গ্রন্থ, চারটি গ্রন্থের অনুবাদ, এ ছাড়া “সন্দেশ” পত্রিকা ও অন্যান্য সম্পাদনার কাজ, অসংখ্য বইয়ের প্রচ্ছদশিল্প অঙ্কন, সত্যজিৎ রায়ের কর্মতালিকার কি শেষ আছে?

প্রতিভা মানেই বহুমুখী। বা একটু ঘুরিয়ে বললে, বহুমুখীনতাই প্রতিভার প্রমাণ। কঁকতো ছবি না বানালেও লেখক হিসেবে বরেণ্য হতেন, বার্গমান নাট্য-পরিচালক হিসেবে। আর পাশ্চাত্ত্যসঙ্গীতে বিশেষজ্ঞ, ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, ফেলুদা ও লালমোহন চরিত্র দু’টির সৃষ্টি বা রে-রোমান টাইপের নির্মাণ, সত্যজিতের বহুমুখীনতাও, কতই না – বৈচিত্র্যময়!

প্রতিভার আরেক বড় লক্ষণ- ধারাবাহিকতা। একটি ভাল ছবি কেউ বানিয়ে ফেলতেও পারেন, কিন্তু একটির পর একটি বিশ্বমানের চলচ্চিত্র নির্মাণ করা, সৃজনশীলতার এই নির্ঝরতা- এ পিকাসীয়। তবে ভলতেয়ারের ওই বক্তব্যের সঙ্গে আমিও একমত যে, প্রতিভা বলে কিছু নেই। প্রতিভা মূলত: তিনটি জিনিসের সমষ্টি- পরিশ্রম, পরিশ্রম, আর পরিশ্রম। সত্যজিতের ক্ষেত্রে এই গভীর পরিশ্রমমনস্কতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আরো দু’টি বৈশিষ্ট্য, পশ্চিমের যুক্তিবাদী নিষ্ঠা আর জীবনাচারণে উপনিষদীয় শৃঙ্খলা। এই সব মিলিয়েই সত্যজিৎ রায়।

নদীকে যেমন তার জল থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না, একজন শিল্পীকেও তাঁর শৈলী থেকে আলাদা করা যায় না। শৈলীকে লুকিয়ে রাখাই যে সেরা শৈলী, রায়ের যে কোনো ছবিই তার প্রমাণ। আমরা যারা ছবি নির্মাণের চেষ্টা করছি তারা জানি, দেখতে সহজ হলেও রায়ের প্রতিটি ছবির প্রতিটি দৃশ্যের শট্গুলির পেছনে রয়েছে কী গভীর মেধা ও যন্ত্রের কত জটিল একেকটি সিঁড়িভাঙ্গা অঙ্ক।

বাংলা চলচ্চিত্রের বয়স বেশ কয়েক দশক (‘বিল্বমঙ্গল’ ১৯১৯ ও প্রথম সবাক ছবি ‘জামাইষষ্ঠী’ ১৯৩১) হলেও চলচ্চিত্র তখন ছিল ক্যামেরা-থিয়েটার মাত্র (দুঃখের বিষয়, আজও প্রায় তাই!)। নাটকের মতই শানিয়ে তোলা সংলাপ, বানিয়ে তোলা কাহিনী, চীৎকৃত অভিনয়ের অতিনাটকীয়তা, গান, সেট― পুরোটাই এই কৃত্রিমতার জগৎ। এক সরল বালকের সরল কাহিনী তার সকল সারল্য দিয়ে জমজমাট কৃত্রিম এই জগতটাকে এক দিন উল্টে দিল―‘পথের পাঁচালী’ (১৯৫৫)।

ঋজু, টানটান, মেদহীন চিত্রনাট্য রায়ের। বাঙালী মধ্যবিত্তের সহজাত আবেগী নাটুকেপনা ও সেন্টিমেন্টালিজম থেকে তা’ একেবারেই মুক্ত। সংলাপের গুণেই চরিত্রটা রূপ পেয়ে যায়। পরে ক্যামেরার অবস্থান, ক্যামেরা কোণ, শট্ ডিভিশন, সম্পাদনা ও সর্বশেষে আবহসঙ্গীত— এসবের ভেতর দিয়ে এই ঋদ্ধ চিত্রনাট্য পেয়ে যায় যথার্থ চিত্রভাষা। অভিনেতা-অভিনেত্রীর চাহনি, মুখের ভঙ্গি, কথার উচ্চারণ বা নীরবতাও, এসবের মাঝে শিল্প কোথায় লুকিয়ে আছে, রায়ের ক্যামেরা তা’ জানে- ‘চারুলতা’। ওঁর প্রতিটি ছবির সম্পাদনার বয়ন এমন যে তা কোথাও, প্রচলিত কথায় যাকে আমরা বলি, সেই ‘ঝুলে পড়ে’ না, সংবেদনশীল দর্শকের মনোযোগ এক মুহূর্তের জন্যেও বিক্ষিপ্ত হয় না। এক নৈঃশব্দের কবি যেন রায়। কাহিনীর চমক নয়, সংলাপ নয়, ক্যামেরার সঠিক কোণটি নির্বাচন, অভিনেতাদের অভিব্যক্তি, কম্পোজিশনের নান্দনিক সৌন্দর্য নিয়েই খোলা পালে তরতর এগিয়ে চলে ওঁর ছবি।

আর বিষয়বস্তু ? রায়ের বিষয়বস্তু বৈভবে-বৈচিত্র্যে কতই না বিচিত্রগামী। আজ বার্গম্যানও যেখানে শুধুই ওঁর নানা আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতা শোনাতে ব্যস্ত, কুরোশাওয়া স্থির মধ্যযুগের সামুরাই জাপানে, সেক্ষেত্রে সত্যজিতের বিষয়বস্তু কতই না বিভিন্নমুখী। রয়েছে পিরিয়ড ফিল্ম-‘সতরঞ্জ কে খিলৌড়ী’,  চেম্বার ফিল্ম-‘চারুলতা’, ফ্যান্টাসী ছবি-‘গুপি গাইন’ বা ‘হীরক রাজার দেশে’, শিশুতোষ ছবি- ‘সোনার কেল্লা’।

সেই ১৯২৯ সালে মুরারী ভাদুড়ীকে এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন; “ছায়াচিত্র এখনো পর্যন্ত সাহিত্যের চাটুবৃত্তি করে চলেছে তার কারণ কোন রূপকার আপন প্রতিভার বলে এই দাসত্ব থেকে তাকে উদ্ধার করতে পারেনি।” বন্দী রাজকন্যাকে উদ্ধারের মতো সত্যজিৎ রায় এসে যে সেই উদ্ধারকার্যটি ঘটালেন, তা আজ বাঙালী সংস্কৃতির এক গৌরবময় ঘটনা। তবে চলচ্চিত্র ইমেজ বা চিত্রকল্প (রবীন্দ্রনাথ যাকে বলতে পছন্দ করতেন, ‘রূপের চলৎপ্রবাহ’) সৃষ্টি করবে, গল্প বলা তার কাজ নয়। আর তাঁর এই ন্যারেটিভ গল্প বলার প্রবণতার জন্যে সত্যজিৎ ‘টোটাল সিনেমা’র দাবিদারদের সমালোচনাও পেয়েছেন। কিন্তু টোটাল থিয়েটার, টোটাল সিনেমা, কোথাও কি সফল হয়েছে? মানুষ সব শিল্পের কাছেই গল্প শুনতে চেয়েছে। অন্য যুগের, অন্য মানুষের গল্প। আসলে তার নিজেরই গল্প! সত্যজিৎ তাই দেখি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই তাঁর চলচ্চিত্রগুলিতে গল্প বলেছেন― মানুষের গল্প। অপু-দুর্গা-সর্বজয়া-ইন্দিরা-বিমলা- অনঙ্গবৌয়ের গল্প। বস্তুত সব শিল্পকর্মেই একটা কাহিনী, নিদেনপক্ষে কাহিনীর একটা ইঙ্গিত থাকা চাই, অন্যথায় তো তা’ মানবেতিহাসের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, কোনো পর্যায়েই পড়বে না !

আর তাঁর এই গল্প বলার কারণেই রায়ের ছবিগুলি মূলত সাহিত্যনির্ভর- ‘অপুত্রয়ী’, ‘চারুলতা’, ‘তিনকন্যা’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘জন অরণ্য, ‘জলসাঘর’। তবে সাহিত্য ছাড়াও ছবি করেছেন রায়- ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’।

আর গল্প বলার ক্ষেত্রে রায় প্লটে বিশ্বাস করেছেন। তবে প্লট অর্থে যেখানে অনেক চলচ্চিত্রকারই বোঝেন কাহিনীর জট, রায়ের ছবি কাহিনীর সেই ঘনঘটা থেকে মুক্ত। খুব কিছু কি ঘটে ‘পথের পাঁচালী’-তে ? আসলে চরিত্ররাই মুখ্য। কখনও কখনও মনে হয় টমাস হার্ডি বা জগদীশ গুপ্তের মত এক অনিবার্য্য ঘটনাক্রমে যেন রায়ও বিশ্বাস করছেন, যেমন ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-য় মিস্টার ব্যানার্জীর বিবাহ প্রস্তাব অনিবার্য কারণে বারে বারেই বাধা পড়ায় ঘটনা ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। চরিত্ররাই আসলে ঘটনা সৃষ্টি করে, ঘটনার আবর্তে জড়িয়ে পড়ে, আবার সে আবর্ত থেকে মুক্তও হয়। ঘটনা নয়, নিয়তি নয়, মানুষই মূল। এই যে মানুষকে সব কিছুর কেন্দ্রে রাখা, এই শেক্সপীয়ারীয় বৈশিষ্ট্য, রায়ের ছবিকে অমর করবে।

চলচ্চিত্র সময়কে ভাঙতে, গড়তে, এগোতে, পেছাতে পারে- সবচেয়ে প্লাস্টিক আর্ট। তাই সাহিত্যনির্ভর হলেও অপুত্রয়ী হুবহু বিভূতিভূষণের কাহিনী নয়, ‘চারুলতা’ নয়  ‘নষ্টনীড়’। ছবির প্রয়োজনে কাহিনীর নির্যাসটাই নেন রায়, খোলসটা নয়। আর পরিবর্তনটা যে সব সময় মাধ্যমজনিত কারণে করেছেন তেমনটিও নয়। বিষয়বস্তুগতভাবেও করেছেন। পরশুরামের গল্পের ‘পরশপাথর’-য়ের উকিলকে কেরানী বানিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথের ‘পোস্টমাস্টার’-য়ের শেষ অংশ পাল্টে নিয়েছেন নিজের মত করে। কতখানি আত্নবিশ্বাসী হলে একজন বাঙালী শিল্পী রবীন্দ্রনাথকেও পাল্টাতে পারেন!

একটা অভিযোগ আসে যে, ছবির বিষয়বস্তু বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে রায় যেন কিছুটা অতীতচারিতার পরিচয় দেন। এটা ঠিক যে, ওঁর কলকাতা ট্রিলজী বা শেষ ছবিগুলি- ‘গণশত্রু’, ‘শাখাপ্রশাখা’ বা ‘আগন্তুক’ বাদে, তাৎক্ষণিক বর্তমানের চেয়ে রায় যেন সাম্প্রতিক অতীতের প্রতিই, আগ্রহ বেশী দেখিয়েছেন। আসলে যে কোনো চলচ্চিত্রকারই হয়তো তাঁর ছবির জন্যে সেই যুগটাকেই বেছে নেবেন যার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি গেছেন, কিম্বা অল্প কিছু দিন অতীত হয়েছে যে যুগ। তবে সব সময়েই তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু থেকেছে যে শ্রেণীটিকে তিনি চিনতেন, সেই― বাঙালী মধ্যবিত্ত। এ মধ্যবিত্তকে তিনি নানাভাবেই দেখিয়েছেন। দেখিয়েছেন তার পতনের কদর্যতা— ‘জন অরণ্য’, তার উচ্চাকাঙ্খার সীমাবদ্ধতা- ‘সীমাবদ্ধ’, তার পলায়নের প্রান্তরেখা- ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, তার উত্তরণের সম্ভাবনা- ‘মহানগর’। তবে মধ্যবিত্তের জীবনপ্রবাহের উপরিতলে যে স্বল্পোচ্চার মৃদুতা রয়েছে, বিশেষ করে ব্যক্তি মানবমনের সূক্ষ্ম  nuance-গুলি, তা চিত্রভাষায় রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে রায়ের স্বাচ্ছন্দ্য অনন্য। তবে ভায়োলেন্স, হত্যা, যৌনতা বা সরাসরি সংঘাত, যেগুলোও এই অস্থির সময়ে এক ফিলিস্টাইন সমাজের অংশ বিশেষ, সেসব চিত্রায়ণে রায়ের স্বাচ্ছ্যন্দ হয়তো সমমাপের হয়।

নাগরিক মধ্যবিত্ত ওঁর  milieu হলেও বাংলার গ্রামকে রায়ের চেয়ে বেশি সফলতায় কেই বা পর্দায় তুলে ধরতে পেরেছেন? ঝাঁকা নিয়ে চিনিবাস মিষ্টিওয়ালা, তার পেছনে দুর্গা, তার পেছনে অপু, সবার পেছনে নেড়ী কুত্তাটি, জলে তাদের বিম্বিত ছায়া- চিরক্ষুধার, চিরসুন্দর বাংলার গ্রাম তার সকল রূপ নিয়ে উদ্ভাসিত হওয়ার জন্যে এমন একজন শিল্পীর প্রতীক্ষাতেই যেন ছিল। সত্যজিৎ কখনো গ্রামে বাস করেননি, কিন্তু যথার্থ অর্থেই নাগরিক ছিলেন বলেই গ্রাম-বাংলাকে তার সকল সুষমা ও সীমাবদ্ধতাসহ তুলে ধরতে পেরেছিলেন।

রায়ের বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে আরেকটি যে জিনিষ বিশেষভাবে উল্লেখ্য তা’ হচ্ছে নারী চরিত্র সৃষ্টি ও তার যথার্থ উপস্থাপনা। কথাসাহিত্যে একটা কথা প্রচলিত আছে যে সমাজবাস্তবতা রচনার সাফল্যের কৌশলটা হচ্ছে যথার্থভাবে নারী চরিত্রগুলি আঁকতে পারা। এক্ষেত্রে রায়ের সাফল্য তুলনাহীন। স্মরণ করুন, সর্বজয়া-ইন্দিরা-দুর্গা-অনঙ্গ বৌ-রতন-মৃন্ময়ী রায়ের ছবির সেই সব অসংখ্য নারী চরিত্রের কথা। সংবেদনশীল ও গভীর আত্নানুসন্ধানী কিছু নারীও রায় সৃষ্টি করেছেন— চারু (চারুলতা), বিমলা (ঘরে বাইরে), আরতি (মহানগর)। যে দেশে নারী-আগে-নারী-তারপরে-মানুষ শরৎচন্দ্রের সেই দুর্ভাগা বঙ্গদেশে সত্যজিতের ছবিতে যে নারী-আগে-মানুষ-তারপরে-নারী হিসেবে এসেছে, এ তাঁর আলোকিত মননেরই প্রতিফলন।

প্রচলিত অর্থে সত্যজিৎ রায়কে যে কেউ ইতালীয় নিওরিয়ালিজম আঙ্গিকের একজন পরিচালক বলবেন। হ্যাঁ, নিওরিয়ালিজমের যে সব বৈশিষ্ট্য, প্রামাণ্য বাস্তবতা, ডিটেলস্, আন্ত:মানবিক সম্পর্ক, মানব-পরিবারের চিত্রায়ণ, মানবিক আশাবাদ, এসবই রায়ের ছবিরও বৈশিষ্ট্য। বস্তুত রায়ই নিওরিয়ালিজমকে সবচে’ সুদীর্ঘকাল ধারণ করে এসেছেন। যখন ভিসকন্তি, ডি সিকা মৃত বা এ ধারা থেকে অপসৃত, ফেলিনি অবচেতন যৌনতায় আত্মগত মনোজগতকে খুঁজে ফিরেছেন- ‘এইট অ্যান্ড হাফ’, তখনও রায়, তাঁর শেষ জীবনেও, নিওরিয়ালিজমের সরল গল্প বলার আঙ্গিকে ছবি তৈরি করে গেছেন― ‘শাখাপ্রশাখা’। বস্তুত শেষ মহিকনের মত সত্যজিৎ রায়ই বোধ হয় বিশ্ব চলচ্চিত্রের শেষ নিওরিয়ালিস্ট।

আর শুধু তাই-ই নয়, বে্রঁসর প্রভাবে নিওরিয়ালিজম যখন কখনো ক্রমশ:ই এক নীরস প্রতীকী বাস্তববাদী ধারায় খুঁজে ফিরেছে জীবনের নির্যাস, রায় তখন এই ধারায় যোগ করেছেন এক মানবিক সুষমা ও লালিত্য― ‘চারুলতা’, ‘অপুর সংসার’। আর এক্ষেত্রে বড় সহায় হয়েছে রায়ের ছবির― গীতিময়তা। সত্যজিৎ, যিনি বলতেন; “পাশ্চাত্য মার্গসঙ্গীতের রহস্য সন্ধান করতে করতেই চলচ্চিত্রের সত্য আমার কাছে ধরা পড়ে”, মনে করেন যে, চলচ্চিত্রের কাঠামো সাহিত্যের চেয়ে সঙ্গীতের বেশি কাছাকাছি। যেমন ‘চারুলতা’র কাঠামো সাহিত্যের চেয়ে যেন সঙ্গীতের বেশী নিকটতর। ‘চারুলতা’র কাঠামোটি, ওঁর নিজের ভাষায়― মোজার্টীয়। এই সাঙ্গীতিক কাঠামোবোধের অভাবকেই তিনি চিহ্নিত করেছিলেন প্রাক-‘পথের পাঁচালী’ ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক বড় দুর্বলতা হিসেবে। সাঙ্গীতিক এই ছন্দোময় কাঠামোর গড়ন ছাড়াও রায়ের ছবির আবহসঙ্গীত অংশও সর্বদাই শ্রুতিনন্দন, সৌকর্ষ ও সুষমায় উদাহরণস্থানীয়। ‘জলসাঘর’, ‘গুপী গাইন’, ‘হীরক রাজার দেশে’-র সঙ্গীতময়তা বাঙালীর গর্বের বস্তু, এবং ‘তিনকন্যা’ (১৯৬১) পরবর্তী ছবিগুলির আবহসঙ্গীত, যা রায় নিজেই করেছেন, প্রমাণ করে যে রবিশঙ্কর বা ওস্তাদ বিলায়েৎ খাঁ ছাড়াই রায়ের সঙ্গীতচেতনা কত ঋদ্ধ, এবং চলচ্চিত্রে আবহসঙ্গীতের যথার্থ শৈল্পিক প্রয়োগের প্রশ্নে, রায়ের যে কোনো ছবিই, বিশ্বজুড়েই একটা টেক্সটফিল্ম  হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

পশ্চিমা মাপে রায়ের ছবির গতি শ্লথ, তবে তা’ রায়ের অধিকতর বাস্তববোধেরই পরিচায়ক। কারণ যে সামাজিক আবহ ওঁর জগৎ সেই বাঙালী মধ্যবিত্তের জীবন বা আবহমান গ্রামবাংলার মানুষের জীবনের গতি শ্লথই। সময়ের ধারণা সংস্কৃতি থেকে সংস্কৃতিতে ভিন্নতর হয়। ‘রেইনম্যান’ বা ‘ব্রেথলেস’-য়ে সময়ের যে গতি, ‘পথের পাঁচালী’ বা ‘জলসাঘর’- য়ের সময়ের গতি সেই একই রকম হবে না নিশ্চয়ই। কারণ এদেশে আমাদের সামাজিক জীবনের গতিটাই অনেক ধীরলয়ের।

রায়ের ছবির আরেক বৈশিষ্ট্য— সূক্ষ্মতা। ক্লোজ আপে চারুর চাহনি, দুর্গার মৃত্যুর পর পুকুরঘাটে দাঁত মাজতে মাজতে অপুর থমকে যাওয়া, এইসব অতি সূক্ষ্মকাজ, রে-টাচ্, মানবমনের অন্তঃস্থিত অনুভুতিকে তুলে ধরে শিল্পিত প্রগাঢ়তায়। যে সহজ দক্ষতায় রায় ‘চারুলতা’-র ত্রিভুজ সম্পর্ক বা ‘অপরাজিত’- তে মা ও ছেলের আন্ত:মানবিক সম্পর্ককে এঁকেছেন, তা সূক্ষ্মতায় চেখভীয়ই। তাই এটা আমাদের খুব বিস্মিত করে না যে, পশ্চিমা কোনো কোনো সমালোচক রায়কে, ‘চলচ্চিত্রের চেখভ’ বলতে পছন্দ করেছেন।

জীবনধর্মী ছোটখাটো সংলাপ রায়ের। “ফিরিয়ে-দাও-আমার-হারিয়ে-যাওয়া-বারটি-বছর” জাতীয় নাটকীয় সংলাপের কৃত্রিমতা থেকে রায় বাংলা চলচ্চিত্রকে কতই না বাস্তবনিষ্ঠ করেছেন। চলচ্চিত্রে সংলাপ ভঁহপঃরড়হধষ; কথা মূলত ক্যামেরাই বলবে; সংলাপ সেটুকুই এবং সেভাবেই থাকা উচিত বাস্তব জীবনে আমরা যেভাবে কথা বলি। অপুত্রয়ীতে হয়তো বিভূতিভূষণের সংলাপদক্ষতা তাঁকে সাহায্য করেছে, কিন্তু অন্যত্র ওঁর ছবির সংলাপ উনি নিজেই লিখেছেন, যা বাস্তবনিষ্ঠ ও চরিত্রানুগ।

রায়ের ছবির এক বড় বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিরকালই বিবেচিত হবে ওঁর অসীম ডিটেল্স-অন্বেষা। এ ডিটেল্স হতে পারে ‘পথের পাঁচালী’-র টোল খাওয়া ঘটি, ইন্দিরা ঠাকরুনের ছেঁড়া চাদরের তালি থেকে ‘চারুলতা’ ও ‘ঘরে বাইরে’-র ইঙ্গবঙ্গ-ভিক্টোরীয় আসবাবপত্রের হাজারো অনুষঙ্গ। ডিটেল্সের প্রতি এই গভীর আনুগত্য, এ ভারতীয় ঐতিহ্য। রায় নিজেই ‘মহাভারত’- কে ডিটেলসের এক ‘স্বর্ণখনি বিশেষ’ বলেছেন। মোগল-রাজপুত মিনিয়েচোর আর্ট, নন্দলালের ফ্রেসকো বা অবন ঠাকুরের ছবি – এসবই ডিটেল্সের কাজ। সত্যজিৎ যে বিমূর্ততার পথে না যেয়ে ডিটেল্সের মাধ্যমে মানবপ্রকৃতিকে তুলে ধরতে  চেয়েছেন, এটা ওঁর শৈল্পিক উত্তরাধিকারের মধ্যেই ছিল।

শৃঙ্খলা ছাড়া মহৎ শিল্প সম্ভব কি? রায়ের শৃঙ্খলাবোধ, কী জীবনযাপনে, কী শিল্পসৃষ্টিতে- অনন্য। আর এই শৃঙ্খলাবোধ থেকেই উৎসারিত পরিমিতিবোধ। কতটুকু বলা আর কতটুকু অব্যক্ত রাখা, এর সফল রসায়নের উপরই নির্ভর করে যে কোনো সৃষ্টির শিল্প-সম্ভাবনা। আর এই বলা, ইঙ্গিতে বলা বা অব্যক্ত রাখা, এক্ষেত্রে রায় কখনও ব্যবহার করেছেন  mise-en-scene; ‘পথের পাঁচালী’-র পুঁতির-মালা-চুরির পরের উঠোনের অসামান্য  mise-en-scene– টির কথা স্মরণ করুন! আবার কখনও বা সরাসরি ডকুমেন্টেশন, প্রামাণ্যচিত্রের আঙ্গিকে- ‘অপরাজিত’-র পথদৃশ্যগুলি।

পাঠশালায় পন্ডিতের শ্রুতিলিখনে, চারুর অপেরা গ্লাস দিয়ে পথচারী দেখায়, ‘সমাপ্তি’-তে শহুরে বাবুর গ্রামের কাদাপথে হোঁচট খাওয়ায়, দুর্গাদের বনভোজনের কলহে, অপুর কলেজের ক্লাসরুমে কিম্বা গুপী-বাঘার নানা তেলেসমাতি কান্ডে, শিল্পিত কৌতুকবোধ রায়ের ছবির আরেক সবিশেষ বৈশিষ্ট্য। এছাড়া ভারী একটা সুন্দর স্বাস্থ্যকর কৌতুকদৃষ্টি প্রায়শ:ই ছড়িয়ে থাকে রায়ের চিত্রনাট্যগুলিতে, কখনও সংলাপে, কখনও কোনো চরিত্রের শারীরিক ভাষা বা ভঙ্গীমায়, কখনো বা নাট্য পরিস্থিতিতে।

তবে সত্যজিৎ রায়ের শিল্পসম্ভার সম্পর্কে যে কোনো আলোচনাই অসম্পূর্ণ রবে, যদি ওঁর সৃষ্টিতে একটি উপাদানের কথা অনুল্লেখ রাখি। তা’ হ’চ্ছে— প্রকৃতি। সত্যজিৎ ওই যে শান্তিনিকেতনে আড়াই বছর ছিলেন নন্দলালের ছাত্র হয়ে; প্রকৃতিকে তার নিজস্ব উদ্ভাসে দেখা ও দেখাবার চোখ তিনি তখনই রপ্ত করেছেন। পরবর্তীতে রেনোয়াঁও হয়তো প্রভাবিত করেছেন। রায়ের ছবিতে প্রকৃতি প্রায়শই একটা চরিত্র— ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘অশনি সংকেত’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ এবং ‘পথের পাঁচালী’-তে তো বটেই। তার বুকে অনুষ্ঠিত মানব জীবননাট্যে প্রকৃতিও যেন অংশ নেয়। হরিহরের চিঠি এলে জলপোকারাও নাচে আনন্দে, কাঞ্চনজঙ্ঘা তার অনন্য সৌন্দর্য দেখা থেকে তাকেই বঞ্চিত রাখে, অহং আর ফিলিস্টাইনিজম মানববেদনাকে দেখবার চোখ যার নষ্ট করেছে।

“আমি মানুষের প্রতি কমিটেড। আর আমি মনে করি সেটাই বড় কমিটমেন্ট”- বলেন রায়। বাঙালী মধ্যবিত্তের অতিরিক্ত রাজনীতিমনস্কতা, সহজাত নাটুকেপনা, দলসর্বস্বতা ও জোলো সেন্টিমেন্টালিজমের অনেক ঊর্ধ্বে পরিশীলিত ও যুক্তিবাদী মনন রায়ের। “আমার নিজের অনুভূতি হ’চ্ছে মানুষই ঈশ্বরকে সৃষ্টি করেছে। … অবশ্যই প্রাণের শুরুর ব্যাপারটা নিয়ে রহস্য আছেই … কিন্তু আমার মনে হয় ঈশ্বর তেমন কিছু একটা ব্যাপার নয় যাতে আমি বিশ্বাস করতে পারি”- বলেন রায়। বিভূতিভূষণের কিছুটা মিস্টিক অপু কাহিনীকে সত্যজিৎ যেভাবে সেই বিশেষ সময়ের সমাজবাস্তবতার শক্ত জমিতে দাঁড় করিয়েছেন, তা’ তাঁর আধুনিক মননেরই প্রকাশ। মায়ের শ্রাদ্ধের প্রশ্নে যে আবেগহীনভাবে অপু বলে “সব কালীঘাটে সেরে নেব”, ধর্ম সম্পর্কে এরকম সংস্কারবিহীনতাই যেন সত্যজিতের বিশ্বাসের জগৎ। ধর্মের সমালোচনার ক্ষেত্রে একটা সামাজিক ‘ট্যাবু’ আছে এই উপমহাদেশের শিল্পীদের উপর। সত্যজিৎ তা’ দৃঢ়পায়ে অতিক্রম করেছেন, ‘দেবী’ -তে। সেই ১৯৬০ সালে!

তবে রায় বিশ্বাস করেন “বিদ্রোহই আধুনিকত্বের একমাত্র সংজ্ঞা নয়”। ফলে দেখি পদ্ধতির পরিবর্তনের চেয়ে ব্যক্তিমনের পরিবর্তনের উপরই যেন ভরসা করেছেন বেশি। ‘পথের পাঁচালী’র শেষে দজ্জাল মুখুজ্যে বৌও বিদায়ী পরিবারটির জন্যে কিছু ফল নিয়ে আসে, ‘হীরক রাজার দেশে’-র রাজা নিজেও মূর্তিভাঙ্গাদের দড়ি ধরে-মার-টানের দলে যোগ দেয়।

তবে যে প্রশ্নে সত্যজিৎ ওঁর আবেগকে চাপা রাখেননি, তা’ হ’চ্ছে— স্বদেশপ্রেম। মনসাপোতা স্কুলে ইন্সপেক্টরের সামনে বালক অপু যখন আবৃত্তি করছিল; “কোন্ দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চেয়ে সবুজ / সে আমাদের বাংলাদেশ, আমাদেরই বাংলারে” তখন ওই উদ্দীপ্ত বালকের আবৃত্তির মধ্য দিয়ে তিনি যেন সকল বাঙালীর আবেগটাই তুলে ধরেন।

গ্রাম-বাংলার বর্ষাভেজা মাটির পথ, বৃষ্টির ধারা, বাঁশবনের শ্যামল ছায়া, ডোবা, এতো শুধু বিভূতিভূষণের নিশ্চিন্দিপুর নয়, ‘তিন কন্যা’-সহ রায়ের অন্য সব ছবিতেই বাংলা তার সকল সৌন্দর্য ও স্বরূপ নিয়েই উপস্থিত। আর সেই রূপের গর্বে বলীয়ান হয়েই যেন গুপী-বাঘা ভিন্দেশের মহারাজার দরাবারে গান ধরে; “মহারাজা তোমারে সেলাম/ আমরা বাংলাদেশ থেকে এলাম”। ‘অপুর সংসার’-য়ে লং শটে নৌকায় অপু আর পুলু চলেছে খুলনায়। অপুর হাতে বাঁশী। সেই সময় সাউন্ডট্রাকে যেন অনির্বায্যভাবেই আসে কী সুমধুর “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি!” বাংলা ছেড়ে চলে গিয়েছিল অপু। সর্বজয়াও গিয়েছিল। কিন্তু আবার ফিরে আসতে হয়। কী যেন আছে বাংলার মাটিতে!

সর্বজয়া কাশী থেকে ফিরছে। বিহারের রুক্ষ প্রান্তর পেরিয়ে ট্রেন ঢুকল বাংলার শ্যামলিমায়। সর্বজয়ার মুখে স্মিত হাসির ছোঁয়া। সাউন্ডট্রাকে তখনই এক  leit-motif  হয়ে ফের বেজে ওঠে ‘পথের পাঁচালী’-র সেই অনবদ্য থীম মিউজিকটি, যা বাঙালী মাত্রেরই বুকে জাগিয়ে তুলে শিরশির এক আবেগের অনুভূতি। ‘দুই বিঘা জমি’র উপেনই স্বদেশে ফিরছে যেন; “নমো নমো নমো সুন্দরী মম জননী জম্মভূমি…”। সত্যজিৎ রায় আমাদের স্বদেশপ্রেমও শিখিয়েছেন।

ডোবার পানা চারদিক থেকে এসে ঢেকে দিয়েছিল দিদির চুরির লজ্জা, কিন্তু পুরোটা ঢাকেনি। জীবনের স্মৃতির ভান্ডারে কিছু ফাঁক থাকে যে প্রিজমে শিল্পী স্থাপন করেন তার ক্যামেরা। তবে গরুর গাড়ীর চাকা এগিয়েই চলে। জীবনের নিজস্ব প্রবহমানতায়। সেই উপনিষদীয় চরৈবেতির জীবনদর্শনই যেন রায়েরও। ‘পথের পাঁচালী’তে  পরিবারটি পথে বেরিয়ে পড়ে, ‘অপরাজিত’য় কাশী-রেলগাড়ী-মনসাপোতা-কলকাতা, ‘অপুর সংসার’ শেষই হয়েছে অনিকেত পথযাত্রার অর্থবহ এক অন্তিম শটে। ‘অশনি সংকেত’-য়েও গঙ্গাচরণ-অনঙ্গবৌ বেরিয়ে পড়েছিল সনাতনী আশ্রয় ছেড়ে, হরিহরপুর থেকে বাসুদেবপুর হয়ে ভাতছালা থেকে নতুনগাঁও। পথেই রয়েছে মুক্তি। পথ ও পথিক সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের শুধুমাত্র গানগুলির সংখ্যাই স্মরণ করুন। এগিয়ে চল, এগিয়ে চল- চরৈবেতি ! ভারতীয় জীবনদর্শনের এই প্রবাহমান গতিশীলতারই আরেক সার্থক উত্তরসূরি যেন― সত্যজিৎ রায়।

শিল্প হিসেবে চলচ্চিত্রের একটা দ্বৈততা রয়েছে, বিষয়ে দেশজ, আঙ্গিকে আন্তর্জাতিক। ফলে কোনো দেশীয় সংস্কৃতিকে যথার্থ তুলে ধরতে সেই চলচ্চিত্রকারই সবচে’ বেশি সফল হন, যাঁর পা স্বদেশের মাটিতে দৃঢ়, কিন্তু দৃষ্টি বিশাল বিশ্বে প্রাসরিত। সত্যজিৎ রায়ের মত।

দৃশ্য-শ্রাব্যগত মাধ্যমের এই দিগি¦জয়ী যুগে মাতৃভাষায় রচিত সাহিত্যের প্রচার সীমাবদ্ধতা যত বাড়ছে, ততই আমরা বুঝতে পারছি সত্যজিতের ছবি বাঙালীকে বিশ্বে পরিচিত ও গর্বিত করতে কত বড় ভূমিকা রাখছে। তবে সত্যজিৎ রায়কে পশ্চিমারা যে অঞ্জলিভরে পুরস্কার দিয়েছেন, সেটা ওঁর ছবি  exotic কিছু সে কারণে নয়। কারণ হচ্ছে ওঁর ছবির গভীর মানবিক আবেদন ও মাধ্যমটির উপর ওঁর অসামান্য দখল। মনে রাখতে হবে সত্যজিৎ ওঁর শিল্পনিপুণ ছবিগুলি টালিগঞ্জ স্টুডিওর মান্ধাতা আমলের যন্ত্রপাতি দিয়েই বানিয়েছিলেন। তবে যেটা দুঃখজনক যে বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের স্বভাবজাত জোলো ভক্তিবাদের কারণে সত্যজিতের ছবির একটা নৈর্ব্যক্তিক মূল্যায়ন বাংলা ভাষায় আজো তেমন গড়ে উঠল না (চিদানন্দ দাশগুপ্ত বা অমিতাভ চট্রোপাধ্যায় এরকম দু’একজন ব্যতিক্রম ছাড়া)। এখনও সত্যজিতের ছবির সেরা মূল্যায়নকারী শুধু নয়, সেরা ব্যাখ্যাকারেরাও পশ্চিমা― মারী সিটন, রবিন উড, পলিন কেন বা অ্যান্ড্রু রবিনসন। আসলে যেদেশে চলচ্চিত্র সমালোচকরা এই নব্বইয়ের দশকে এসেও (যে দশকে চলচ্চিত্র শতায়ু হো’ল) চলচ্চিত্রকে ‘বই’ মনে করেন, চলচ্চিত্রের চিত্রভাষা সম্পর্কে জানেন সামান্যই, ছাপানো কাহিনী বা উপন্যাসটির সঙ্গেই শুধু তুলনা করেন চলচ্চিত্রটির, সেরকম মফস্বলী এক সংস্কৃতিতে সত্যজিতের মত এত বড় মাপের একজন চলচ্চিত্রকার সৃষ্টি হো’ল কী ভাবে, তা’ শিল্পের জগতের এক অষ্টম আশ্চর্যই!

আর শুধু চলচ্চিত্র কেন, লেখক রায় ? কিছু ভক্তিবাদী প্রশস্তি ছাড়া রায়ের লেখালেখিরও কি কোনো যথার্থ মূল্যায়ন হয়েছে? কিম্বা গ্রাফিক শিল্পী রায়ের? কমার্শিয়াল আর্টও যে একটা আর্ট, বিজ্ঞাপনের কাজে সেই তরুণ বয়সেই তো তা’ প্রমাণ করেছিলেন। কমার্শিয়াল আর্টে উডকাট, লিনোকাট আর পেপারকাটের কী অসামান্য ব্যবহারই না সত্যজিৎ করেছিলেন ? কিম্বা, প্রচ্ছদ শিল্পী রায়ের? থাক, আমাদের বেদনার বারমাস্যা বাড়িয়ে আর লাভ নেই!

সেরা বাঙালী তাঁরাই হতে পেরেছেন যাঁরা পুর্ব ও পশ্চিমের সেরা দিকগুলি আত্মস্থ করেছেন- রামমোহন, মাইকেল, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, এবং সত্যজিৎ। যথার্থ রেনেসাঁম্যান এঁরা। সত্যজিৎই হয়তো বেঙ্গল রেঁনেসার― শেষ প্রতিভু।

এখন প্রশ্ন সত্যজিতের উত্তরসুরি কারা বা কে ? ঋত্বিকের অনেক সোচ্চার ভক্ত অনুসারী রয়েছেন, কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের ? ক’জন বাঙালী বা ভারতীয় চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ধারায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন? বরং আমরা তো দেখছি নানারকম উচ্ছ্বাসময় প্রশস্তি প্রকাশ করে, সত্যজিৎকে সকাল-বিকাল নমস্কার জানিয়ে, তাঁর ছবি নির্মাণের পদ্ধতিকে দূর থেকেই যেন শ্রদ্ধা নিবেদন করা হচ্ছে। এ ধরনের দেবত্ব আরোপ বা  deitification মঙ্গলজনক কিছু নয়, যে ধরনের উচ্ছ্বাসময় গালগল্পের কারণে ঋত্বিকের ছবিরও যথার্থ নৈর্বক্তিক মূল্যায়ন আজো বাংলায় গড়ে উঠল না তেমন। সত্যজিৎ রায়, যাঁর মানসগঠন পশ্চিমা, সেই আধুনিক রুচিশীল মানুষটির কাছে বাঙালী মধ্যবিত্তের এই ভুলুন্ঠিত ভক্তিবাদ নিশ্চয়ই ছিল খুব বিব্রতকর। বস্তুত সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তাতেই আছি। যে দেশে রাজনীতিবিদ গান্ধী ‘অবতার’ বনে যান, সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ হয়ে পড়েন ‘গুরুদেব’, সেই ভক্তিমার্গের দেশে এই রকম উঁচু লম্বা শরীর, এ রকম ইংরেজি বলিয়ে-লিখিয়ে, এত বিদেশী পুরস্কার, এই পরিশ্রমী ও সংবেদনশীল চলচ্চিত্র-পরিচালকটিকে বাঙালী আবার না কী বানিয়ে ফেলে! বাঙালী মধ্যবিত্তের মাত্রাজ্ঞানের অভাব তো নতুন নয়। হয়তো একদিন বুঝবে ক্যালেন্ডারের ফ্রেমে শুধু ঝুলিয়ে রাখা নয়, নয় তাঁকে নিয়ে হাঁটুভাঙ্গা প্রশস্তির শত শত পাতা লেখা, যা দিয়ে এই প্রতিভাবান চলচ্চিত্র পরিচালকটির জীবন ও কর্মের প্রতি যথার্থ সুবিচার করা যায়, তা’ হ’চ্ছে সত্যজিতের ছবিগুলি দেখা, এবং বারে বারেই দেখা।

তবে আবার তাঁকে নিয়ে দুশ্চিন্তাও নেই। কারণ সর্বপ্রকার রুচির দীনতা ও ফিলিস্টাইনিজমের বিরুদ্ধে আপোসহীন এই মানুষটি তো ছিলেনও একাকী। ওঁর বা ইবসেনের ‘গণশত্রু’- র সেই ডঃ স্টকম্যানের মতই, যে স্টকম্যান বলেন;  “The strongest man in the world is the man who stands most alone”  -ই তো ছিলেন রায়! ওঁর মৃত্যুতে ঘনঘন মূর্ছা যাওয়া মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের জোলো ভক্তিবাদের হৈ-হট্টগোলের ভীড়ে, সকল ধূপের ধোঁয়াকে ছাপিয়েই, তিনি চির উদ্ভাসিত রইবেন। কারণ আমাদের যুগের শ্রেষ্ঠ এই চলচ্চিত্র-পরিচালকটিও ছিলেন তাঁর জীবন ও কর্মে ওই ডাক্তারটির মতই আত্মশক্তিতে বলীয়ান এক একক যোদ্ধা। বাঙালীর আরো কিছু গণশত্রু প্রয়োজন। সত্যজিৎ রায়ের মত!

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত