| 18 জুলাই 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

একজন বিরুদ্ধবাদী যার সাথে আমার প্রায় দেখা হয়

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comইউনিভার্সিটি লাইব্রেররি সামনে দেখা হয়ে গেল ইকতিয়ারের সাথে। কয়েকদিনের শেভহীন মুখ। বিবর্ণ জিনস, পায়ে ছেড়া কেডস। দেয়ালে ঠেস দিয়ে একা দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে।
বললাম, কীরে তুই নাকি পরীক্ষা দিচ্ছিস না?
ইকতিয়ার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল না।
কেন?
প্রিপারেশন নেই।
ইকতিয়ারের কথা বিশ্বেস হলো না। পরীক্ষা দিলে সে খুবই ভাল ফল করবে এ ধারণা সবার। যদিও ক্লাসে অনিয়মিত।
বললাম, ধুশ, এটা একটি কথা হলো? তুই তো পড়াশুনা করেছিস জানি। পরীক্ষা দিবি না কেনো?
ইকতিয়ার রেগে ওঠে, তাতে তোর কী? দ্যাটস নট ইয়র কাপ অফ টি।
আমি অবাক। বললাম, কী হয়েছে রে?
ইকতিয়ার কোন কথা বলে না।

২.

ইকতিয়ার ছিল মেডিকেলের ছাত্র। পরে মেডিকেল কলেজ ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এলো আমাদের সাথে সাহিত্য পড়তে। কেনো, এটা আমার কাছে অনেকদিন দুর্বোধ্য ছিল। ক্লাসে স্যার না এলে পেছনের চুপচাপ বসে থাকত। কথা বলতো না কারো সাথে।

একদিন স্যার ক্লাসে ফস্টাস পড়াচ্ছিলেন। কী একটা প্রশ্ন করলেন একজনকে। সে বলতে পারলো না। শেষে কেউ যখন পারছে না, তখন পেছন থেকে যে উঠে দাঁড়াল, সে ইকতিয়ার। প্রশ্নটা কি ছিল মনে নেই, তবে এটা মনে আছে ক্রিস্টোফার মার্লোর ডক্টার ফস্টাসের সাথে গ্যেটের ফাউস্টের সম্পর্ক, এর পটভূমি আর বাইবেলের উদ্বৃতিসহ ইকতিয়ার যেভাবে উত্তর দিয়েছিল তাতে আমরা যাকে বলে মুগ্ধ হয়ে পড়লাম। পরে আর কখনো ইকতিয়ারকে কেন সাহিত্য নিয়ে পড়তে এলো, এ প্রশ্ন করিনি।

ততদিনে ইকতিয়ার ডিপার্টমেন্টে বেশ বিখ্যাত হয়ে গেছে। জুনিয়র সিনিয়র মহলেও ওকে নিয়ে আলোচনা। তখনই দেখতাম বিভিন্ন জার্নালে পত্রপত্রকিায় ওর নানারকম লেখা প্রকাশ পাচ্ছে। ফলে স্যারদের কাছে ইকতিয়ার খুব অল্প সময়ে ফেভারিট হয়ে গেল।

তবে ইকতিয়ারের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা অন্য কারণে। হলে আমার রুমটা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের উঠতি নেতা, তরুণ কবি ও গঞ্জিকাসেবী আঁতেলদের নিরাপদ আশ্রয়। একদিন দেখি, আমাদের আড্ডায় ইকতিয়ারও আসতে শুরু করেছে। বগলে ড্রাইজিনের বোতল। আমাদের আড্ডা আরো জমজমাট হয়ে উঠল ।

মাঝে মাঝে ইকতিয়ারকে নিয়ে প্রবলেম হয়ে যেত। হ্যাঙ্গওভার কখনো বেশি হয়ে গেলে গালিব এর শের আওড়ানো শুরু করতো। তাও একেবারে চোশ্ত উর্দূতে। ওকে থামানোও তখন মুশকিল হয়ে যেত।

ইকতিয়ার কখনো কখনো পুরো রাত হলে আমার রুমে কাটিয়ে পরদিন কিছু না বলে উধাও হয়ে যেত। উধাও হলো তো হলো দশ পনের দিন আর দেখা নেই ওর। ক্লাস করছে না, টিউটোরিয়ল দিচ্ছে না। আড্ডায়ও লাপাত্তা। বন্ধুরা যখন ওকে খুঁজতে শুরু করেছি তখন হয়তো দেখা গেলো একদিন ও ক্লাসে এসেছে। পেছনের বেঞ্চে আগের মতোই বসে আছে চুপচাপ।

ক্লাসের মেয়েদের নিয়ে ইকতিয়ারের আমাদের মত আদেখলেপনা ছিল না। তাই জানতাম আমরা। আমরা বন্ধুরা যখন নিজেদের বান্ধবীদের নিয়ে আলাপ করতাম, দেখতাম ইকতিয়ার হয় চুপ করে আছে নয়তো এটা ওটা করছে। মাঝে মাঝে আমাদের মনে হতো কোন মেয়ে ওকে দাগা দেয়নি তো। কিন্তু ও সম্পর্কে যা জানতাম তাতে এমন কিছুর আভাস পাইনি।

ইকতিয়ারের কবিতা পড়ে একবার জুনিয়র একটা মেয়ে পছেু নলি ওর। ওকে নানাভাবে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করল কিছুদিন। আমরাও দূর থেকে বেশ হাসি হাসি মুখে বিষয়টা লক্ষ করতে থাকলাম। কিন্তু ইকতিয়ার ছিল বরাবর নির্বিকার। শেষে মেয়েটার যখন খুবই খারাপ অবস্থা, ইকতিয়ার মেয়েটিকে জানাল, সে বিবাহিত। এ ঘটনার পর অন্য কোথাও চলে গিয়েছিল মেয়েটি।

কিন্তু আমরা তখন মেতে গেছি অন্য জিনিস নিয়ে। ইকতিয়ার বিয়ে করল কবে? সবাই মিলে চেপে ধরলাম তাকে, বিয়ে করেছিস, এতদিন জানাসনি কেন?

ইকতিয়ার বলল, এটা জানাবার মত কিছু নাকি?
বললাম, করেছিস কবে?
বেশি দিন হয়নি। কোর্ট ম্যারেজ।

এতদিনে বুঝলাম ইকতিয়ারের বৈরাগ্যের কারণ। বললাম, বউ দেখা।
ইকতিয়ার বলল, কবে দেখতে চাস?
আমরা বললাম, আজই।
ইকতিয়ার মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ঠিক আছে।

ইকতিয়ারের বউকে দেখে আমাদের খটকা লাগে। ওর মতো ছেলে এ কাকে বিয়ে করেছে! তাও লুকিয়ে। কিন্তু ইকতিয়ার কিছু ভাববে মনে করে কিছু বললাম না।
ইকতিয়ার বুঝতে পেরেছিল। অন্য বন্ধুরা সবাই চলে গেলে কিছুক্ষণ ইতসস্ত করে বলল, হঠাৎ হয়ে গেছে। তোকে কথাটা বলছি। কাউকে বলবি না।
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, কী কথা?
ইকতিয়ার মৃদু গলায় বলল, ও আসলে প্রসটিটিউট ছিল।
বলিস কী? আমি হতভম্ব।
হ্যাঁ। তবে এখন তো ও আমার স্ত্রী।
ইকতিয়ার আমার প্রতিক্রিয়া লক্ষ করতে করতে বলল, তবে ওর একটা ঘটনা আছে।
কী ঘটনা!
দূর সম্পর্কের এক চাচাত ভাইয়ের হাত ধরে গ্রাম ছেড়েছিল। পরে বদমাশটা শহরে এসে ওকে তুলে দিয়েছিল এক পিম্পের কাছে।
কোথায় পেলি ওকে?
যেখানে পাওয়ার।
তার মানে ওসব জায়গায় তুই যাস।
ইকতিয়ার নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, আগে যেতাম। এখন আর যাবনা।
ওকে নিয়ে ঘর করতে পারবি?
ইকতিয়ার জবাব দিয়েছিল, হোয়াই নট।

৩.
সেদিন ভীষণ এক অস্বস্থি নিয়ে ফিরে এসেছিলাম। ঐ মেয়েটরি মাঝে কি দেখেছিল ইকতিয়ার? পরিস্থিতির শিকার তো অনেক মেয়েই হয়।

সেদিনের পর ইকতিয়ারের সাথে আমার আর দেখা হয়নি। ও ইউনিভার্সিটিতে আসতো না। পরীক্ষাও দেয়নি। এমন কি আগে ও যে বাসায় থাকতো, সেখান থেকে চলে গিয়েছিল। ইকতিয়ার বন্ধু-বান্ধবদেরও কিছু জানিয়ে যায়নি। আমরাও পাস-টাশ করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলাম। কারো সাথে আর তেমন যোগাযোগ রইল না।

৪.
অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। বিশেষ কাজে কলকাতায় এসেছি। একদিন কলেজ ষ্ট্রীটে হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়লাম কফি হাউসে। কলকাতায় আমার পরিচিত কিছু কবি বন্ধু ছিল। ভাবলাম, হয়তো কফি হাউসেই পেয়ে যাবো ওদের। ঢুকে কাউকে না পেয়ে যখন বেরিয়ে আসছি নজর পড়লো কোণের দিকে যে বসে আছে, সে ইকতিয়ার। মুখোমুখি চেয়ারে এক বেজায় সুন্দরী ভদ্রমহিলা। ওরা কী নিয়ে যেন কথা বলছে। প্রথমে অবশ্য ইকতিয়ারকে চিনতে পারিনি। ইকতিয়ারের চুল ঘাড় অবধি নেমেছে, মুখ ভর্তি দাড়ি। গায়ে বাটিকের পাঞ্জাবি, আঙ্গুলের ফাঁকে যথারীতি সিগারেট জ¦লছে।

ইকতিয়ারের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাকে দেখে উজ্জ্ল হয়ে উঠল ওর চোখ। তবে তেমন উচ্ছাস নেই। মৃদু গলায় বলল, বোস।

চেয়ার টেনে বসলাম। পাশের ভদ্রমহিলার জিজ্ঞাস দৃষ্টি। ইকতিয়ার পরিচয় করিয়ে দিল, ও হচ্ছে সাবের। আমার ঢাকার বন্ধু। তারপর ফিরে বলল, আর এ হল ভাস্বতী। কবিতা লিখেন। পড়িসনি ওর কবিতা?

এতক্ষণে চিনতে পারলাম। ভাস্বতী বন্দোপাধ্যায়। দেশ পত্রিকায় মাঝে মাঝে তার কবিতা দেখি। আদাব বিনিময় হলো।

ইকতিয়ারকে আমার কলকাতা আসবার বৃত্তান্ত জানিয়ে বললাম, তুই শালা এখানে ডুব দিয়ে আছিস, জানাবি তো। কত বছর তোকে দেখি না।

ইকতিয়ার সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে। মৃদু হেসে বলল, কত আর। এই বছর কয়েক হবে।

বছর কয়েক! মাথা নেড়ে বললাম, কমসে কম এগার বছর হবে। প্রসঙ্গ বদলে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে কী করছিস তুই। তোর বউ কোথায়?

আমার প্রশ্নে কিছুটা আনমনা দেখায় ইকতিয়ারকে। টেবিলে দু হাত বিছিয়ে দিল। তারপর স্থির গলায় বলল, ও বেঁচে নেই। সুইসাইড করেছিল।’

আমি বিস্মিত। কেন?
বুঝতেই পারিস, গাঁয়ের মেয়ে। তার ওপর এরকম একটি মানসিক ও শারিরীক ট্রমা। খাপ খাওয়াতে পারেনি। এসব নিয়ে আমি যখন খুব টেনশনে ছিলাম তখন তোর সাথে দেখা হয়ে যায় ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরীতে। পরে ওকে নিয়ে কলকাতায় চলে আসি। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

ভাস্বতী ইকতিয়ারের হাত চেপে ধরে বলল, এখন থাক ওসব কথা। তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, আপনার বন্ধু এখন কোন স্ট্রেস নিতে পারেন না। ডাক্তারের নিষেধ আছে।

ভাস্বতীর উদ্বিগ্নমুখ আমার চোখ এড়াল না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইকতিয়ারকে বললাম, এখন কী করছিস?

ইকতিয়ারে সিগারেট নিভে এসেছে। সেটা আবার ধরিয়ে নিল সে। তারপর ধোঁয়া ছেড়ে বলল, তেমন কিছু না। কবিতা লিখি আর টুকটাক ছবি আঁকি বাস্। এই দ্যাখ কত স্কেচ করেছি। বলে ইকতিয়ার চেয়ারের হাতলে রাখা কাপড়ের ব্যাগ থেকে কাগজপত্র বের করে দেখাতে থাকে। বলল, আগামী মাসে নন্দন-এ আমার স্কেচগুলো নিয়ে সলো এক্সিবিশন হবে।

এক্সিবিশন! আমার মুখ থেকে কথা সরে না।
হ্যাঁ। সেটাইতো ঠিকঠাক করতে আজ বেরুলাম। ভাস্বতীই সব ম্যানেজ করল।’

 

 

 

 

 

One thought on “একজন বিরুদ্ধবাদী যার সাথে আমার প্রায় দেখা হয়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত