সুকুমার রায়ের কবিতা – অনন্য হাস্যরস

আজ ২৭ সেপ্টেম্বর কথাসাহিত্যিক অমিতাভ প্রামাণিকের  জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।

যে কোন বালখিল্যের কাছে ফটোগ্রাফি একটা অত্যন্ত সহজ কাজ। শুধু একটা ক্যামেরা হলেই চলে। সে সেটাকে বাগিয়ে ধরে চোখের সামনে থাকা যে কোন মানুষ, গরু-কুকুর-বাঁদর আদি মনুষ্যেতর প্রাণী বা আকাশ-নদী-ফুল-পাথর জাতীয় প্রকৃতির অংশবিশেষকে তাক করে প্রবল উৎসাহের সঙ্গে বিজ্ঞের মত শাটার টিপে দেয়। ব্যাস, ক্যামেরাটা ডিজিট্যাল হলে – আর আজকাল তো সব ক্যামেরাই ডিজিট্যাল – ছবি উঠে গেল। ক্যামেরার লেন্সটার সামনে ঢাকনা থাকলে সেটা খুলে শাটারটা টিপলে সাধারণতঃ ছবিটা আর একটু ভালো ওঠে। অর্থাৎ যে কেউ ফটো তুলতে পারে, মহাভারত অশুদ্ধ হওয়ার বিশেষ সম্ভাবনা নেই।
হায়, ট্যাঁশগরু গরু নয়, সব কবি কবি নয়, ফটো তুললেই ফটোগ্রাফার হওয়া যায় না।
কিন্তু না, ফটোগ্রাফি সম্বন্ধে জ্ঞান দেওয়ার কোন অভিপ্রায় আমার নেই, আমি নিজেই চার অক্ষরের এই শব্দটার প্রথম ফ’ও জানিনে। তা সত্ত্বেও কোন ছোটবেলায় পড়েছিলাম, ‘আয় তোর মুণ্ডুটা দেখি, আয় দেখি ফুটোস্কোপ দিয়ে’, আর সেটা চোখ-কান দিয়ে মাথার ভেতরে ঢুকে আমার অবচেতন মনের অনেকগুলো ফোকরে একেবারে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে নিয়েছে, তা এক্কেবারে হলফ করে বলতে পারি।
‘আবোল তাবোল’ নামের কবিতার বইতে যখন এই কবিতাটা পড়েছিলাম, বয়সে চুনো হলেও এটুকু বুঝেছিলাম যে ফুটোস্কোপ বলে কিছু নেই, আর মুণ্ডুর ভেতরে সেঁধিয়ে কিছু খুঁটিয়ে দেখার জন্য কবিতার পাশে সাঁটানো ছবিটার মত কোন যন্ত্র নিতান্তই অক্ষম। নির্মল হাস্যরস ঐ বইটার সবকটা কবিতার আসল রেসিপি। বাংলা সাহিত্যে এই ধরণের কবিতার সম্ভবত এই বইটাই প্রথম উদাহরণ। আজ অবধি এর সার্থক কোন উত্তরাধিকারীও আসে নি। ক্ষণজন্মা সুকুমার রায় মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে কালাজ্বরে ভুগে পরলোকগমন করেন। আরও ছত্রিশ বছর কবিতা লিখতে পারলে তাঁর কলম থেকে যে কী চিজ বের হত, তা নিয়ে ভাবনার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।
কবি নিজে এর ধরণকে খেয়াল রস বলেছিলেন, আবোল তাবোল বইয়ের মুখবন্ধে এক কৈফিয়তে তিনি কবিতাগুলো সর্বজনগ্রাহ্য নাও হতে পারে বলে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। এখন একে ‘ননসেন্স’ বলা হয়, বাংলায় কী বলা যায়, আজগুবি? সুযোগ্য পুত্র সত্যজিৎ ‘সুকুমার সমগ্র’ প্রকাশকালে বইটার ভূমিকায় বাবার রচনার অত্যন্ত মনোগ্রাহী আলোচনা ও বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষিতে তার সুন্দর মূল্যায়ণ করেছেন।
মাত্র আট বছর বয়সে শিবনাথ শাস্ত্রী সম্পাদিত মুকুল পত্রিকায় ‘নদী’ নামের একটা কবিতা প্রকাশিত হলেও সত্যজিতের আলোচনা থেকে জানা যায়, সুকুমার ছাত্রাবস্থায় বিশেষ সাহিত্যচর্চা করেন নি। ১৯১৩ সালে বাবা উপেন্দ্রকিশোরের সম্পাদনায় ‘সন্দেশ’ পত্রিকা বের হওয়ার সময় থেকেই ছাব্বিশ বছর বয়সে সুকুমারের মূল সাহিত্যের অঙ্গনে প্রবেশ ও বিকাশ। মাত্র দু’ বছর যেতে না যেতেই উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যু হলে সেই দায়ভার সুকুমার নিজের কাঁধে তুলে নেন। অকালমৃত্যুতে তাঁর সাহিত্যক্রীড়া শেষ হয় মাত্র দশ বছরের পরিসরেই। তার মধ্যে রোগশয্যায় শেষ আড়াই বছর বিশেষভাবে সৃজনশীল। 
কবিতা, ছোটগল্প, সঙ্গীত, নাটিকা, প্রবন্ধ ও শব্দের ধাঁধাঁ নিয়ে তাঁর প্রভূত কারবার। কবিতাগ্রন্থে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘আবোল তাবোল’, কাহিনীসংকলনে ‘পাগলা দাশু’ আর নাটিকায় ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’। ‘খাই খাই’ ও ‘হ-য-ব-র-ল’, ‘শব্দকল্পদ্রুম’, ‘অবাক জলপান’ ইত্যাদিও তাঁর অনবদ্য ও ভীষণ জনপ্রিয় রচনাসংগ্রহ। 
আসা যাক সুকুমারের কবিতায় দমফাটা হাসির উৎস সন্ধানে। এই হাসি পেটে কাতুকুতু দিয়ে হাসানো নয়। আবোল তাবোলের প্রত্যেকটা কবিতাতেই হাস্যরস তৈরীর অসাধারণ সৃজনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। আমি এই সৃজনশীলতাকে চারটে আলাদা আলাদা প্রকারের উপাদানের সমন্বয় বলব। এরা হল –
(ক) আজব যতসব প্রাণীসকলের সৃষ্টি,
(খ) মানুষের উদ্ভট খেয়াল,
(গ) হাস্যকর প্রযুক্তির অসামান্য কল্পনা, আর 
(ঘ) প্রাকৃতিক সাধারণ ঘটনাকে অনন্য অব্যয়ে প্রকাশ। উদাহরণ দেওয়া যাক এক এক করে।
প্রথমে আজব প্রাণী। তার আগে বলে নিই, বাংলা সাহিত্যে অভিনব প্রাণীর ব্যবহার কিছু নতুন নয়। রূপকথা থেকে শুরু করে পুরাণের পাতায় পাতায় অনেক রকম প্রাণীর বর্ণনা আছে, শিশুসাহিত্যে তো বটেই। রাক্ষস-খোক্কস, পক্ষীরাজ ঘোটক, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী পক্ষীদম্পতি, হনুমান নামের বানর ও জাম্বুবান নামের ভল্লুক, সর্পরাজ বাসুকি ও পক্ষীকুলশ্রেষ্ঠ গড়ুর, ময়দানে ডিম্বপ্রসবিনী হাট্টিমাটিমটিম, খুকুর বিয়েতে কনেযাত্রী হিসাবে কটিতটে বন্ধনী নিয়ে প্রস্তুত হুলো মার্জার, সোনামণির বিয়েতে নৃত্যরত হস্তী-অশ্ব সম্প্রদায়, তন্তুবায়ের গৃহে বসবাসকারী খাদ্যে পুষ্ট ও গায়ন-রত কোলা ভেক-এর সন্ততি, কী নেই! কিন্তু সুকুমার এদের সবার চেয়ে আলাদা। ‘খিচুড়ি’-তে দুটো প্রাণীকে স্রেফ শব্দ দিয়ে ব্রীডিং করে – মানে একটার নামের শেষ আর আরেকটার নামের প্রথম অংশ সমান, সেটাকে জুড়ে দিয়ে – উদ্ভট নতুন প্রজাতির সৃষ্টি, তাদের নাম হাঁসজারু, বকচ্ছপ, গিরিগিটিয়া, সিংহরিণ, হাতিমি, বিছাগল, মোরগরু, জিরাফড়িং। রামগড়ুর রাম নামের পক্ষীকুলশ্রেষ্ঠ প্রাণী নয়, বরং মনুষ্যসদৃশ একজন, যার হাসি ব্যান্‌ড্‌। ট্যাঁশগরু গরু-ই না, একটা পাখি, যার দর্শনপ্রাপ্তি সম্ভব হারুদের আপিসে। হুঁকোমুখো হ্যাংলা-র হ্যাংলামির কোনো নিদর্শন নেই, সে তার দুটো পুচ্ছ নিয়ে নাস্তানাবুদ, কোনো দুষ্ট মাছি সেই লেজ দুটোর ঠিক মধ্যিখানে বসলে কোন লেজ দিয়ে মেরে তার জীবনহানি সম্ভব, সেই বিশেষ সমস্যাটা নিয়ে। কুমড়োপটাশ সেই রকম এক বিচিত্র প্রাণী, সে যে কাজটাই করবে তাতেই আমাদের বিপদের আশঙ্কা, তার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিচিত্র বিধান দিয়াছেন কবি। যথা, সে কান্না জুড়লে ছাদে উপবেশন নিষিদ্ধ, লেপ-কম্বল কাঁধে নিয়ে মাচায় উপুড় হয়ে শুয়ে বেহাগ-সুরে রাধাকৃষ্ণের স্তুতি করা সঙ্গত। কিম্ভূত কিমাকার অন্য একটা বিদঘুটে জন্তু, তার আবদারের শেষ নেই, কোকিলের সুর, পক্ষীর ডানা, হস্তীর দন্ত, সিংহের কেশর, ক্যাঙ্গারুর মত লম্ফবান পদ, গোসাপের মত পুচ্ছ, সে ব্যাটার সব চাই। এই বিচিত্র আইডিয়াগুলোই হাসির দমক এনে দেয়।
আজগুবি মনুষ্যেতর প্রাণীসৃষ্টির পাশাপাশি মানুষের আজগুবি খেয়াল তাঁর হাস্যরসের আর একটা অন্যতম উপাদান। ‘সৎপাত্রে’ এমন এক পাত্রের অবতারণা, যার সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে দেওয়ার চেয়ে মেয়েকে কলসী-দড়ি বেঁধে জলে ডুবিয়ে দেওয়াও শ্রেয়, এমনই হাস্যকর সেই পাত্রের ভাইট্যাল ও অন্যান্য স্ট্যাটিস্‌টিক্স। তার গাত্রবর্ণ, ফেস কাটিং, অ্যাকাডেমিক কোয়ালিফিকেশন, পয়সাকড়ি মানে ইকনোমিক স্ট্যাটাস, স্বাস্থ্য, সহোদরদের বৃত্তান্ত জানলে যে কেউ ল্যাজ গুটিয়ে পালাবে, কিন্তু গঙ্গারাম যে উঁচু বংশের ছেলে। আজকের দিনের এম এল এ বা এম পি-দের কোরাপ্ট চ্যাংড়া ছেলেদের ইকুইভ্যালেন্ট! সুতরাং পাত্র হিসাবে বেজায় ‘সৎ’! ‘গোঁফচুরি’তে রহস্যময় ভাবে ঝিমোনো বড়বাবুর মোচ উধাও, নাকি উধাও না! আয়নায় নিজের গোঁফ দেখে বড়বাবুর বিশ্বাস হচ্ছে না যে এটা তার হতে পারে, কেননা – ‘নোংরা ছাঁটা খ্যাংরা ঝাঁটা বিচ্ছিরি আর ময়লা, এমন গোঁফ তো রাখত জানি শ্যামবাবুদের গয়লা’! ‘কাঠবুড়ো’তে বিচিত্র কাষ্ঠতত্ত্ববিদ সৃষ্টি, দাড়িওলা এক বুড়ো, যে কিনা রোদে বসে ভিজে কাঠ সিদ্ধ চেটে খায়! তার থিয়োরীর কাছে কোথায় লাগে নিউটন-আইনস্টাইনের তত্ত্ব – ‘আকাশেতে ঝুল ঝোলে, কাঠে তাই গর্ত’!‘একুশে আইন’-এ বিচিত্র দন্ড, সব কিছু একুশ খানা, সে জরিমানার টাকাই হোক, বা হাঁচির সংখ্যা, সেলাম করানো বা দুপুর রোদে ঘামিয়ে কত হাতা জল গিলতে হবে তার বিধান, কত পাতা হিসেব বা কত ঘন্টা ঝুলে থাকার শাস্তি! ‘কাতুকুতু বুড়ো’ তেমনি আজগুবি গল্প শোনায়, যেগুলো শুনলে নাকি ‘হাসির চেয়ে কান্না আসে বেশি’। ভীষ্মলোচন শর্মার গানের গুঁতোয় লোকের মাথা বনবন ঘুরতে থাকে, কেউ জখম হয়, কেউ মরেও যায়! শুধু মানুষ না, যাবতীয় জীবজন্তুও, সে ডাঙার হোক, বা জলের। একমাত্র শিং-ওয়ালা এক পাগলা ছাগল তাকে ঠান্ডা করতে পারলো। লড়াই ক্ষ্যাপা পাগলা জগাই, ফোঁসফোঁস করে নিশ্বাস ফেলা প্যালারাম বিশ্বাস, বিচিত্র বোম্বাগড়ের রাজা-রানী-মন্ত্রী-ওস্তাদ-পণ্ডিত, আদ্যানাথের মেশোর খোঁজ করা সেই ব্যক্তি যে ‘খুব সহজে’ বুঝিয়ে দেয় আদ্যানাথ কে, ডানপিটে সেই ছেলে যে ‘হামা দিয়ে আলমারি চড়ে, খাট থেকে রাগ করে দুমদাম পড়ে’, এদের কথা যতবার পড়া যায়, ততবার হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়তে হয়। আহ্লাদী-তেও সেই হাসির খোরাক, বিনা চশমাতে পান্তভূতের জ্যান্ত ছানাদের কাজ কারবার পরিদর্শন, হাত দেখিয়ে অমায়িক শান্ত বুড়ো নন্দখুড়োর বেবাক পরিবর্তন, মন্ত্রীর জামার গন্ধ শুঁকতে অনিচ্ছুক তাবৎ লোকের আজব বাহানা, আইডিয়া কিছু ঘুরঘুর করতো সুকুমারের মাথায়! সেই যে নোটবই, যাতে ব্যাখ্যা দেওয়া আছে ‘আঙুলেতে আঠা দিলে কেন লাগে চটচট, কাতুকুতু দিলে গরু কেন করে ছটফট’, অথবা ‘তেজপাতে তেজ কেন, ঝাল কেন লঙ্কায়, নাক কেন ডাকে আর পিলে কেন চমকায়’, সেটা দেখার এক প্রবল ইচ্ছা জাগে না কী? এই যে টিভি জুড়ে ডব্লিউ ডব্লিউ এফের এতো নাচন কোঁদন দেখায় এখন, এরা কেউ কি ষষ্ঠিচরণের নখের যোগ্য, যিনি খেলার ছলে যখন তখন হাতি লোফেন, বা ওপর থেকে দৈববশে যার মাথায় ইঁট এসে পড়তেই – না, তার মুন্ডুটা না – ইঁটটা ধুলোর মত গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে যায়? এ সবের প্রত্যেকটার বর্ণনা যে কোন রামগড়ুরের ছানাদেরও পেট থেকে হাসি টেনে এনে বার করে দেবে। 
স্মরণ রাখা উচিৎ, সুকুমার ছিলেন পদার্থ ও রসায়নশাস্ত্রে ডাবল অনার্স এবং মুদ্রণ প্রযুক্তির বিশারদ। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর রচনায় ঘুরে ফিরে এসেছে বিচিত্র প্রযুক্তির সমাহার। ‘খুড়োর কল’-এ পাঁচ ঘন্টার রাস্তা দেড় ঘন্টায় অতিক্রম করার অদ্ভুত প্রযুক্তি। 
‘বলব কি আর কলের ফিকির, বলতে না পাই ভাষা,
ঘাড়ের সঙ্গে যন্ত্র জুড়ে এক্কেবারে খাসা।
সামনে তাহার খাদ্য ঝোলে যার যে রকম রুচি –
মন্ডা মিঠাই চপ কাটলেট খাজা কিংবা লুচি।
মন বলে তায় ‘খাব খাব’, মুখ চলে তায় খেতে,
মুখের সঙ্গে খাবার ছোটে পাল্লা দিয়ে মেতে’।
আহা, আজকের এই ওবেসিটির যুগে লোকজন জিমে গিয়ে ফালতু ট্রেডমিলে দৌড়ানোর ভান করছে। এ রকম খুড়োর কল পেলে তাদের যে কী পোয়াবারো হত তা বলাই বাহুল্য। 
তারপর ছায়া ধরার ব্যবসাদারের হরেক রকম ছায়াবাজি ব্যবসার ফন্দি।
‘আষাঢ় মাসের বাদ্‌লা দিনে বাঁচতে যদি চাও,
তেঁতুল গাছের তপ্ত ছায়া হপ্তা তিনেক খাও।
মৌয়া গাছের মিষ্টি ছায়া ব্লটিং দিয়ে শুষে
ধুয়ে মুছে সাবধানেতে রাখছি ঘরে পুষে’। 
-এই সব বিচিত্র ছায়ার ছায়াছবি কেমন হবে, বোঝাই যাচ্ছে।
সদাহাস্যবদনী চালভাজা ও মুড়িপ্রেমিকা সেই বুড়ির অদ্ভুত বাড়ি বানানোর টেকনোলজিটা মনে আছে? ‘কাঁটা দিয়ে আঁটা ঘর – আঠা দিয়ে সেঁটে, সুতো দিয়ে বেঁধে রাখে থুতু দিয়ে চেটে’! আর সেই হাতুড়ে ডাক্তার, যার ‘কয়েছেন গুরু মোর, ‘শোন শোন বৎস, কাগজের রুগী কেটে আগে কর মক্‌স’’! অথবা ‘পাঁচখানা কাটলেট, লুচি তিন গন্ডা, গোটা দুই জিবেগজা, গুটি দুই মন্ডা’ চুরি হয়ে যাওয়ার পর চোর ধরার সেই বিচিত্র ব্যবস্থা! বিজ্ঞান শিক্ষায় ফুটোস্কোপ দিয়ে মগজের অন্দরমহলের তত্ত্বতালাশ, আবার এক কিতাবের বর্ণনা, যেখানে চাটনি-পোলাও-সাবান-কালি-দাঁতের মাজন আদি সবকিছুর প্রযুক্তি দেওয়া আছে, কিন্তু কী মুস্কিল! পাগলা ষাঁড়ে তাড়া করলে কেমন করে তাকে ঠেকানো যায়, তার বিধান দেওয়া নেই!
এত যে সায়েন্স ফিকশন আমরা পড়ি, তার কোনোটা কি এ রকম হাসির খোরাক দিতে পারে?
পরিশেষে সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনাকে অসাধারণ হাস্যকর বর্ণনায় উপস্থাপন সুকুমারে আর এক মারকাটারি স্টাইল। শব্দ কল্প দ্রুমের ‘ফুল ফোটে? তাই বল! আমি ভাবি পটকা’ অথবা ‘চাঁদ বুঝি ডুবে গেল? -গব্‌ গব্‌ গবা-স্‌’ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তেমনই ‘ফসকে গেল’-তে ‘ভোজের বাজি ভেল্কি ফাঁকি পড়্‌ পড়্‌ পড়্‌বি পাখি–ধপ্‌’, ‘গল্প বলা’-তে ‘থোও না বাপু ঘ্যাঁচা ঘেঁচি / আচ্ছা বল চুপ্‌ করেছি’, ‘হুলোর গান’-এ ‘চুপ্‌চাপ চারিদিকে ঝোপঝাড়গুলো- / আয় ভাই গান গাই আয় ভাই হুলো’-তে বর্ণনা অনবদ্য। আবার ‘আহ্লাদী’-তে ‘ভাবছি মনে, হাসছি কেন? থাকব হাসি ত্যাগ করে / ভাবতে গিয়ে ফিকিফিকিয়ে ফেল্‌ছি হেসে ফ্যাক্‌ করে’-তে ফ্যাক্‌ করে শব্দবন্ধটা,‘দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম’-এ ‘এই দেখ না চাঁদ্‌নি রাতের গান এনেছি কেড়ে / দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম! দেড়ে দেড়ে দেড়ে’তে শেষ অংশটা বা ‘আসল কথা বুঝছ না যে, করছ না যে চিন্তা / শুনছ না যে গানের মাঝে তবলা বাজে ধিন্‌তা’তে ধিন্‌তা-র ব্যবহারে অনাবিল হাসির উদ্ভব। ‘ভূতুড়ে খেলা’-তে ‘শুনতে পেলাম ভূতের মায়ের মুচ্‌কি হাসি কট্‌কটে / দেখছে নেড়ে ঝুন্টি ধরে বাচ্চা কেমন চট্‌পটে’তে কট্‌কটে হাসি কী রকম হতে পারে, তা ভাবার বিষয়। ‘কাতুকুতু বুড়ো’-তে একই রকম ‘অষ্টপ্রহর গাইত পিসী আওয়াজ করে মিহি / ম্যাও ম্যাও ম্যাও বাকুম্‌ বাকুম্‌ ভৌ ভৌ ভৌ চীঁহি’র বর্ণনা শুনলে অতীব গোমড়ামুখো মানুষও না হেসে পারবে না। ডানপিটে ছেলেদের কাহিনী ভুলে যাওয়া কঠিন, কেননা ‘আরজন ঘরময় নীল কালি গুলে / কপ্‌ কপ্‌ মাছি ধরে মুখে দেয় তুলে’ আর ‘সন্দেহে শুঁকে বুড়ো মুখে নাহি তোলে / রেগে তাই দুই ভাই ফোঁস্‌ ফোঁস্‌ ফোলে’। নারদ নারদ-এর প্রত্যেক লাইনই অসামান্যঃ ‘ক্যান রে ব্যাটা ইস্‌টুপিড / ঠেঙিয়ে তোরে কর্‌ব ঢিট’ বা ‘ডোন্ট পরোয়া অল্‌ রাইট / হাউ ডুয়ুডু গুড্‌ নাইট’। এই ধরণের বর্ণনা অজস্র কবিতায়, এমনকি অনামা একটি পাদপূরক ছড়াতেও,‘ধুপধাপ বাপ্‌ বাপ্‌ ভয়ে ভ্যাবাচ্যাকা / বাবুদের ছেলেটার দাঁত গেছে দেখা’। এটা সুকুমারের এক অনন্য ধরণ। 
রবীন্দ্রনাথ সুকুমার সম্বন্ধে বলেছেন, “সুকুমারের লেখনী থেকে যে অবিমিশ্র হাস্যরসের উৎসধারা বাংলা সাহিত্যকে অভিষিক্ত করেছে তা অতুলনীয়। তাঁর সুনিপুণ ছন্দের বিচিত্র ও স্বচ্ছন্দ গতি, তাঁর ভাবসমাবেশের অভাবনীয় অসংলগ্নতা পদে পদে চমৎকৃতি আনে। তাঁর স্বভাবের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির গাম্ভীর্য ছিল, সেইজন্যেই তিনি তার বৈপরীত্য এমন খেলাচ্ছলে দেখাতে পেরেছিলেন। বঙ্গসাহিত্যে ব্যঙ্গ রসিকতার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত আরো কয়েকটি দেখা গিয়েছে। কিন্তু সুকুমারের অজস্র হাস্যোচ্ছ্বাসের বিশেষত্ব তাঁর প্রতিভার যে স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছে তার ঠিক সমশ্রেণীয় রচনা দেখা যায় না। তাঁর এই বিশুদ্ধ হাসির দানের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর অকাল-মৃত্যুর সকরুণতা পাঠকদের মনে চিরকালের জন্য জড়িত হয়ে রইল”।
প্রশ্ন করা যেতেই পারে, প্রায় এক শতাব্দী হতে চলল, এর পুনর্নিমাণ সে রকম কেন হল না? হাস্যরসের চর্চা যে বন্ধ হয়ে গেছে, তা তো নয়। রম্যরচনা বলে সাহিত্যের এক নতুন ধারা সৃষ্টির প্রয়াস অনেক কালের। ছন্দ নিয়ে অনেকেই গবেষণা করেছেন, এখনও করছেন। কবিতা তো কিছু শব্দসমষ্টি নিয়েই রচনা, বাংলা শব্দভাণ্ডার দিন দিন পুষ্ট হচ্ছে অন্যান্য ভাষা থেকে শব্দ তুলে নিয়ে। তবু নির্ভেজাল সুকুমারী হাস্যরসের পরবর্তী উদাহরণ খুঁজতে গেলে ফুটোস্কোপের কেন প্রয়োজন?
‘শব্দকল্পদ্রুমে’ বৃহস্পতির দশ লাইনের মন্ত্র থেকে প্রথম দুটো আর শেষ দুটো লাইন নিয়ে দ্রিঘাংচু-র মন্ত্র। দ্রিঘাংচু’র চার লাইন সবাই জানে, কিন্তু সমস্ত দশ লাইনই স্মরণ করিয়ে দেওয়া যাকঃ 
হলদে সবুজ ওরাং ওটাং
ইঁট পাটকেল চিৎপটাং
গন্ধগোকুল হিজিবিজি
নো অ্যাডমিশন ভেরি বিজি
নন্দী ভৃঙ্গী সারেগামা
নেই মামা তার কানা মামা
চিনে বাদাম সর্দি কাশি
ব্লটিং পেপার বাঘের মাসি
মুশকিল আসান উড়ে মালি
ধর্মতলা কর্মখালি
এই মন্ত্র প্রসঙ্গে সত্যজিৎ বলেছেনঃ ‘খাঁটি ননসেন্সের এর চেয়ে সার্থক উদাহরণ পাওয়া মুশকিল। কোথায় বা কেন যে এর সার্থকতা, এই অসংলগ্ন অর্থহীন বাক্যসমষ্টির সামান্য অদল বদল করলেই কেন যে এর অঙ্গহানি হতে বাধ্য, তা বলা খুবই কঠিন। এর অনুকরণ চলে না, এর বিশ্লেষণ চলে না এবং জিনিয়াস ছাড়া এর উদ্ভাবন সম্ভব নয়’।
সম্ভবতঃ এই শেষ কথাটাই সুকুমারী হাস্যসাহিত্যের পুনর্নিমাণের পথে এক বড়সড় বাধা। রবীন্দ্র-পরবর্তী সময়ে সত্যজিৎসহ বহু সাহিত্যিক শিশুসাহিত্য রচনা করেছেন, অনেকেই অত্যন্ত গুণী ও সফল। কিন্তু তাঁরা কেউই সম্ভবতঃ সুকুমারের উত্তরসূরী নন।
বালখিল্যের ফটোগ্রাফি দিয়ে শুরু করেছিলাম। বালখিল্যের মতো আমিও ভেবেছিলাম – আরে, এ আর এমন কী, এমন মন্ত্র আমিও রচনা করতে পারি। খাতা পেনও লাগে নি, মুখে মুখে চার লাইন বানিয়ে ফেললাম ফটাফট –
ভিজে গামছা চিটেগুড়
পাটলিপুত্র মধুপুর
বুড়ো হাবড়া সরু থোড়
গা ছমছম গরুচোর 
কিন্তু ফুটোস্কোপ ছাড়াই স্পষ্ট দেখতে পেলাম যে, এটা একেবারে অন্ধ অনুকরণ মাত্র, এরমধ্যে এক ছটাকও নিজস্বতা নেই। আর নিজস্বতা ছাড়া হাওয়াই চটি সেলাই চলতে পারে, সাহিত্য রচনা সম্ভব নয়।
ফটোগ্রাফি সম্বন্ধে একটা প্রাসঙ্গিক তথ্য দিয়ে আজকের আলোচনায় ইতি টানব। সুকুমারের বাবা উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন তৎকালীন ভারতবর্ষে ফটোগ্রাফি ও মুদ্রণ শিল্পের এক উজ্জ্বল তারকা। খ্যাতনামা ব্রিটিশ প্রিন্টিং জার্নাল ‘পেনরোজ অ্যানুয়াল’-এ নিয়মিত প্রকাশিত হত উপেন্দ্রকিশোরের প্রবন্ধ, বিষয়বস্তু রঙীন ছাপার মান উন্নয়ন। ইউ রায় অ্যান্ড সন্সের ছাপাখানা ছিল কারিগরি দক্ষতায় দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠ। রঙীন হাফটোন ব্লক প্রিন্টিংযে তিনি প্রভূত গবেষণা করে ছাপার মান উন্নয়ন করেছিলেন, এবং এই প্রযুক্তিতে তাঁর নিজস্ব পেটেন্ট ছিল। ১৯১১ সালে সুকুমার ফটোগ্রাফিতে উন্নত শিক্ষালাভের জন্য গুরুপ্রসন্ন স্কলারশীপ নিয়ে ইংল্যান্ড যান ও পরের বছর রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সদস্যপদ লাভ করেন। বাবার মত তিনিও পেনরোজ অ্যানুয়ালে ‘Halftone Facts Summarized’ আর ‘Standardizing the Original’ নামে দুটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন।‘পিন হোল থিয়োরি’র উপর সুকুমারের এক অসাধারণ প্রবন্ধ ব্রিটিশ জার্নাল অফ ফটোগ্রাফিতে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৩ সালে, যে বছর সন্দেশ প্রকাশনা শুরু হয়। যদিও সত্যজিৎ লিখেছেন সুকুমার ছবি আঁকা শেখেন নি এবং তাঁর আঁকা ছবিগুলো দেখলে তা বোঝা যায়, আমার ক্ষুদ্র অভিমত হল, ছবিগুলোর জন্যেই ‘খিচুড়ি’র সমস্ত আজগুবি প্রাণীগুলো আমাদের চোখের সামনে ভাসে, হুঁকোমুখো হ্যাংলাকে দেখে আমাদের কষ্ট হয়, কুমড়োপটাশকে দেখে গা ছমছম করে, খুড়োর কলের ছবি দেখে আমরাও আইডিয়া পাই। ছবিগুলো কবিতার চরিত্রকে পরিস্ফুট করে হাসির ফোয়ারা ছোটাতে সাহায্য করেছে, এটাও এক অত্যন্ত বড় নির্মাণ।
একশো বছরের ওপর হয়ে গেল ‘সন্দেশ’-এর বয়স। আর একজন সুকুমার রায়ের জন্যে আমাদের আর কত অপেক্ষা করতে হবে?

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত