উপেক্ষিত অনুবাদক সুকুমার রায়  

আজ ৩০ অক্টোবর কবি সুকুমার রায়ের শুভ জন্মজয়ন্তীতে ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


১৯১২ সালে লন্ডনের ইন্ডিয়া সোসাইটি থেকে প্রকাশ পেল রবীন্দ্রনাথের প্রথম ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ ‘Gitanjali (Song Offerings)’। লন্ডনে তো বটেই আমেরিকাতেও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে হইচই পড়ে গেল এরপর। মুগ্ধতা ঘন হতে লাগল ক্রমশ। এই ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের আগে পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ বিদেশিদের কাছে তো বটেই, এমনকি ভারতবর্ষেও বাংলাভাষী অঞ্চলের বাইরে অনেকাংশে অপরিচিত ছিলেন। সেই বন্ধ দরজাটি হাট করে খুলে গেল। ক্রমে নিজের একাধিক লেখা অনুবাদে হাত দিলেন রবীন্দ্রনাথ। পরের বছরই প্রকাশিত হল চার-চারটি ইংরেজি বই—The Gardener, Sadhana, The Crescent Moon এবং Chitra। পাশ্চাত্য যেন নতুনভাবে আবিষ্কার করল তাঁকে। এবং, সেই আবিষ্কারের মূলে থাকল রবীন্দ্রনাথেরই স্বকৃত অনুবাদ। নোবেল পুরস্কারের কাইটেশনে স্পষ্ট করে বলা হল, রবীন্দ্রনাথের নোবেল-প্রাপ্তির অন্যতম কারণ তাঁর নিজের লেখা অসামান্য ইংরেজি গদ্য।

ইউরোপ যে রবীন্দ্রনাথকে অনুবাদের মধ্যে দিয়েই গ্রহণ করবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। রবীন্দ্রনাথকে অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার একটা ধারাবাহিক চেষ্টা কিন্তু শুরু হয়েছিল ১৯০৯ সাল থেকেই। এর আগেও খাপছাড়াভাবে রবীন্দ্রনাথের কিছু কিছু লেখার অনুবাদ হয়েছে, কিন্তু সেগুলি স্বল্পস্থায়ী চেষ্টা। ১৯০৯-১৯১২ সালের মধ্যে রবীন্দ্রসাহিত্যের একাধিক অনুবাদকের উপস্থিতি দেখতে পাওয়া গেল। রবি দত্ত, অজিতকুমার চক্রবর্তী, আনন্দ কে কুমারস্বামী, ভগিনী নিবেদিতা, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মতো অনেকে রবীন্দ্র-সাহিত্যের অনুবাদে এগিয়ে এলেন। এঁদের অনেকেরই আকাঙ্ক্ষাটি ছিল স্পষ্ট—রবীন্দ্র-সাহিত্যকে বিশ্ববাসীর কাছে যতখানি সম্ভব পৌঁছে দেওয়া। 

এই একই উদ্দেশ্য নিয়েই রবীন্দ্রনাথের কবিতার অনুবাদে হাত লাগিয়েছিলেন আরো একজন যুবক। যিনি পরে বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে উপহার দেবেন ‘আবোলতাবোল’, ‘হযবরল’-র মতো বই। অবশ্য, সেই সমস্ত বই-ই প্রকাশ পাবে তাঁর মৃত্যুর পরে। এবং, রবীন্দ্রসাহিত্যের অনুবাদক হিসবে এই মানুষটিই আজীবন থেকে যাবেন অন্তরালে। এক অজানা রহস্যময় কারণে, রবীন্দ্রনাথের দিক থেকেও এক অর্থে উপেক্ষাই জুটবে তাঁর। মানুষটির নাম যে সুকুমার রায়, তা আন্দাজ করার জন্য কোনো পুরস্কার নেই। 

সেই ১৯১২ সাল। মুদ্রণবিদ্যা শেখার জন্য সুকুমারও তখন লন্ডনে। ‘Gitanjali: Song Offerings’ প্রকাশিত ইতিমধ্যেই। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লন্ডনবাসীর মুগ্ধতা নিজের চোখেই দেখছেন সুকুমার। তাতে আলোড়িতও হচ্ছেন। তাঁর মনে হল, রবীন্দ্রসাহিত্যের সঙ্গে ইংরেজদের আরো নিবিড়ভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। এমনকি প্রয়োজন রবীন্দ্রসাহিত্যের পটভূমির সঙ্গেও বিদেশিদের পরিচয় ঘটানো। শুরু করলেন রবীন্দ্র-সাহিত্যের অনুবাদ। লন্ডনের ‘Quest’ পত্রিকায় একটি রচনাও প্রকাশ করলেন সুকুমার—‘The Spirit of Rabindranath Tagore’. প্রকাশের আগে এই প্রবন্ধটি সুকুমার পাঠ করেছিলেন ‘ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট সোসাইটি’-তে। ১৯১৩ সালের ২১ জুলাই, সেই সভায় শ্রোতাসংখ্যাও কম হয়নি। সুকুমার রায়ের চেষ্টা ছিল, যত বেশি করে সম্ভব রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সম্পর্কে প্রচার করা। 

নিছক প্রবন্ধ নয়, রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি কবিতার অনুবাদও করেছিলেন সুকুমার। ‘সন্ধ্যাসঙ্গীত’ থেকে ‘হৃদয়ের গীতধ্বনি’, ‘প্রভাতসঙ্গীত’ থেকে ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’, ‘উৎসর্গ’ থেকে ‘সুদূর’ আর ‘ধূপ আপনারে মিলাইতে চাহে’। এছাড়াও ছিল একটি কবিতাংশ—‘হৃদয় অরণ্য’।

একই সময়পর্বে লন্ডনে বসেই নিজের দ্বিতীয় অনুবাদ গ্রন্থ ‘The Gardener’-এর প্রস্তুতি সারছেন রবীন্দ্রনাথ। এই বইতেও ঠাঁই পাবে ‘সুদূর’ কবিতার অনুবাদ। এই অনুবাদ অবশ্য রবীন্দ্রনাথের নিজেরই করা। সুকুমার রায়ের অনুবাদটার কথাও কিন্তু জানতেন রবীন্দ্রনাথ। তারপরেও সেটাকে গ্রহণ করেননি তিনি। সুকুমার ‘সুদূর’ কবিতার অনুবাদ করেছিলেন এমনভাবে—“ I am restless,/ I am athirst for the great Beyond./ Sitting at my window,/ I listen for its tread upon the air, as the day wears on./ My life goes out in longing/ For the thrill of its touch./ I am athirst for the great Beyond./ O Beyond! Vast Beyond! How passionate comes thy clarion call…”

এই কবিতাকেই রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করলেন অন্যভাবে। যদিও অনুবাদের শুরুতে মিল আছে সামান্য হলেও—“ I am restless. I am athirst for far-away things./ My soul goes out in a longing to touch the skirt of the dim distance./ O Great Beyond, O the keen call of thy flute!…”

সুকুমার ‘ব্যাকুল বাঁশরির’ অনুবাদে করেছিলেন ‘passionate clarion call’। রবীন্দ্রনাথ তাকে বদলে দিলেন ‘keen flute’-এ। ‘তাহার পরশ পাবার প্রয়াসী’ সুকুমারের অনুবাদে হয়েছিল ‘For the thrill of its touch’। রবীন্দ্রনাথ সেখানে যোগ করলেন নতুন রূপক ‘to touch the skirt of the dim distance.’। রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ নিঃসন্দেহে সুকুমারের অনুবাদের চাইতে মার্জিত, তুলনায় গভীর ইঙ্গিতবাহীও। অবশ্য, The Gardener’-এর সম্পাদনা করেছিলেন ইয়েটস আর স্টার্জ মুর। তাঁদের হাতের ছোঁয়াও নিশ্চয়ই পেয়েছে এই কবিতা।

১৯১২ সালের ১৯ জুন, লন্ডনের উইলিয়াম পিয়ারসনের বাড়িতে, রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতিতেই ‘সুদূর’, ‘পরশপাথর’, ‘সন্ধ্যা’ ইত্যাদি কবিতার অনুবাদ পাঠ করেছিলেন সুকুমার। সেদিনের অন্যতম অতিথি ‘Wisdom of the East’-এর সম্পাদক ক্র্যানমার বিং সুকুমারকে জানিয়েছিলেন, তিনি এই অনুবাদ ছাপবেন। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের আপত্তির কোনো তথ্য আমাদের সামনে নেই। 

এর পরেরদিনই রবীন্দ্রসাহিত্যের অন্যতম অনুবাদক অজিতকুমার চক্রবর্তীকে একটি চিঠি লেখেন রবীন্দ্রনাথ। সেই চিঠিতে কোথাও সুকুমার রায়ের অনূদিত কবিতার উল্লেখ পর্যন্ত নেই। অজিতকুমারের অনুবাদ ইয়েটস পছন্দ করবেন— রথেনস্টাইনের এহেন মন্তব্যের খবর সেই চিঠিতে অজিতকুমারকে দিচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। জানাচ্ছেন, বিং রবীন্দ্রনাথের সাহায্যে নিজেই অনুবাদ করতে চান তাঁর কবিতা। অথচ, বিং যে সুকুমারের অনুবাদও ছাপতে চেয়েছেন—তা একবারও বললেন না তিনি।

এই চিঠি লেখার কিছুদিনের মধ্যেই অবশ্য রবীন্দ্রনাথ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাঁর কবিতার অনুবাদ তিনি নিজেই করবেন। এর অন্যতম কারণ, ইয়েটস-সহ অন্যান্য কবি-সমালোচকদের প্রশংসা। একজন স্রষ্টা এমন সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন। সুকুমারের অনুবাদ হয়তো তাঁর পছন্দ হয়নি। রবীন্দ্রনাথ পরে রথেনস্টাইনকে জানিয়েছিলেন, কবিতার অনুবাদে অন্ত্যমিল তাঁর পছন্দ নয়। তিনি চান অনুবাদ হবে সহজ গদ্যে। সেইকারণে, অজিত চক্রবর্তীর অনুবাদও তাঁর ভালো লাগার কথা নয়। সুকুমারের অনুবাদেও অন্ত্যমিল রয়েছে। হয়তো এটিও এই অনুবাদকে বর্জনের অন্যতম কারণ। কিন্তু, অনুবাদকের প্রাপ্য সামান্য স্বীকৃতিটুকুও কেন পেলেন না সুকুমার, তার কোনো উত্তর মেলে না।

অথচ, রবীন্দ্র-কবিতার অনুবাদের ভিতর দিয়ে কিন্তু নিজের খ্যাতি বাড়িয়ে নিতে চাননি সুকুমার। রবীন্দ্রসাহিত্যের প্রতি তাঁর প্রেম ও আনুগত্য নিঃশর্ত। তা মুগ্ধ পাঠকের সমর্পণ। রবীন্দ্রনাথের অন্যতম জীবনীকার আর্নেস্ট রিজ একজন অপরিচিত বাঙালির কথা উল্লেখ করেছিলেন। লন্ডনের একটি থিয়েটারে একটি ভারতীয় নাটক দেখার সময়ে, সেই অপরিচিত বাঙালি দর্শকটি যেচে আলাপ করেছিলেন রিজের সঙ্গে। তারপর, তাঁর কাছে নিয়ে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথের লেখা একটি বাংলা কাব্যগ্রন্থ, তার ইংরেজি অনুবাদ-সমেত। বলাই বাহুল্য, অনুবাদ করেছিলেন সেই বাঙালি মানুষটিই। তারপর, নিবিড় মুগ্ধতার সঙ্গে তিনি পড়ে শুনিয়েছিলেন সেইসব কবিতা। 

রিজ সেই মানুষটির নাম লিখে যাননি। কিন্তু, যে সময়ের কথা তিনি লিখছেন তখন লন্ডনে উপস্থিত বাঙালিদের মধ্যে একমাত্র সুকুমারই রবীন্দ্রকবিতার অনুবাদ করেছেন। ক্ষিতীশচন্দ্র সেন ‘রাজা’ অনুবাদ করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু কবিতার অনুবাদের কথা শোনা যায় না। অতএব ধরে নিতে খুব অসুবিধে নেই, সেই রবীন্দ্র-মুগ্ধ বাঙালিটি সুকুমার রায়ই।

এহেন রবীন্দ্রমুগ্ধতার পরেও উপেক্ষাই পেয়েছিলেন রবীন্দ্রসাহিত্যের অনুবাদক সুকুমার রায়। তাঁর সাহিত্য নিয়ে পরে উচ্চস্বরে প্রশংসা করেছেন রবীন্দ্রনাথ, কবির স্নেহও পেয়েছেন সুকুমার। কিন্তু এই উপেক্ষাও একইসঙ্গে জড়ো হয়েছে সেই সম্পর্কের ইতিহাসে। সুকুমারের এই নিয়ে অভিমান ছিল কিনা জানা নেই। কিন্তু, রবীন্দ্র-অনুবাদক সুকুমার যে অজ্ঞাতই রইলেন—তা কি পাওনা ছিল তাঁর? 

তথ্য-ঋণ: নিত্যপ্রিয় ঘোষ, শুকনো পাতা মলিন কুসুম, Sisir Kumar Das Ed. The English Writings of Rabindranath Tagore, Vol-I. 

কৃতজ্ঞতা: বঙ্গদর্শন

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত