শিউলি বেলার ছবি

দরজা খুলেই হৈ হৈ করে উঠল বীথিকা।  
—  মা অপুরা এসে গেছে,  দেখুন তো!
লীলাময়ী এক মনে ভেতরের ঘরে বসে সুপুরি কুচি করছিলেন জাঁতিতে, ডাকাডাকিতে মুখ তুলে দেখলেন দরজার দিকে।  মেজ বউমা ঢুকল ঘরে।
— এ কি!  আপনাকে রোগা রোগা লাগছে কেন এত!
— আশি পেরোলুম বউমা! এক রকম কি করে থাকব। 
মনে মনে বললেন এক দিনের জন্যে এসে কি বুঝবে তুমি বাছা! বড় বউমার ঘাড়ে সারা কাজের দায় বেচারি কত জনকে দেখবে! ছোটজন থেকেও বা কি, বারমুখো, দিনরাত বাইরে যাওয়া। পাখি উড়ল বলে অন্য বাসায়–
— রিমা, দইয়ের লস্যি করে রেখেছি তোমরা একটু খাও।  বীথি রান্নাঘর থেকে জোরে বললেন 
— জয়ন্তী কই দিদি!  দেখতে পাচ্ছি না
— আজ ওর খুব ব্যস্ততার দিন। নিজের গানের ক্লাস, বুবলির নাচ আঁকা সব থাকে রে।
— আহা রে! মেয়েটা ছুটির দিন ও একটু বিশ্রাম পায় না। 
এমন করে রিমা বলল না জানি জয়ন্তী সংসারের জন্যে কত খেটে খুটে আসছে।
বীথি অপ্রস্তুত হলেন! এই সব এত কিছু করার কি দরকার সে বোঝেও না। পাপুর সাথে এই নিয়ে খিটিমিটি লেগেই আছে। তারা বুঝতে পারে জয়ন্তী এই পুরোনো বাড়ি, মফস্বল শহর, একসাথে রান্না,  থাকা পছন্দ করে না। পাপু এখন ভালো ব্যবসাকরে।
 — চলে আসবে এক্ষুনি। তুই  ছোটর ঘরেই বস।এসিতে  আরাম পাবি।
— দিদি, মার জন্যে এবার শাড়ি কিনিনি, তোমার দেওর বলছিল কিছুদিন আগেই তো চোখের অপারেশনের জন্য খরচা টরচা হলো আবার আর একটা চোখ ও করতে হবে এই শীতেতে– তাই পুজোতে একটু হাত খরচা দিয়ে যাই বলো! মা আর কোথায়  বা যান! 
উত্তরে -বীথিকা নরম ভাবে হাসলেন। খরচ তার স্বামীও করেছে অপারেশনে। আর  মা আর কিই বা পরেন, বা কি খান তার ইচ্ছা শুধুই  একটু ছেলের নতুন ফ্ল্যাটে যাবেন, গাড়িতে করে  একটু সামান্য এ দিক ওদিক–।
অপূর্ব  মার কৃতি সন্তান। আক্সিস ব্যাঙ্কের সিনিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট  এই বয়েসেই। বড় ভাই স্টেট ইলেক্ট্রিসিটি অফিসের মধ্যম মানের অফিসার আর ছোট ব্যবসা করে।  ছোট রোজগার কি করে বীথিকারা জানে না কিন্তু ছোট বউ ঠাট বাটে থাকতে ভালোবাসে। বড় অমিতেন্দু সংসারের, মার দায় বেশির ভাগই বহন করে। তারপর বীথিকার আর শখ আহলাদ কিছু মেটে না। ছেলেটা  নরেন্দ্রপুরে বারো ক্লাসে পড়ে তার খরচটুকু  তো জোগাড় রাখতে হয়!
রিমা সুযোগ পেল বড় জার মুখের দিকে তাকাতে এবার। কিছুই করেনা তবু রঙ খানা জুঁইফুলের মত, একহারা চেহারা একমাথা কালো চুলের ঢল।   আর তার চর্বির পিপে, রঙ করা চুল, নেহাত মেইন্টেইন করে খুব। রিমা মুখ ঘুরিয়ে নিলো।
–তোমাদের শাড়ি গুলো দেখো বড়দি, তুমি তো তাঁত ছাড়া পরোই না, সেই একই ধরণের, দেখো তো পছন্দ হলো কিনা।
 বীথিকা খুলে দেখলেন সেই পাঁশুটে রঙের গা আর সবজেটে চওড়া পাড়ের শাড়ি। ভেতরে কিছুই নেই, খালি জমিন। মনে মনে ভাবলে, তাঁতের কি রকমফের নেই!  তাঁত মানেই কি অছেদ্দার! মনে পড়ে গেল অপু শাড়ি দিয়েছিল পুজোতে ধনেখালি সাদা লাল কালো ডুরি ডুরি,  সাধারণ অথচ — এই সেই অপুর বউয়ের রুচি।
— খুব সুন্দর হয়েছে রে! একমুখ হাসলেন বীথিকা
— এই সিল্কেরটা জয়ন্তীর। আসলে বাচ্ছা মেয়ে তো, জমকালোই ভালো। 
বীথিকা জানেন জয়ন্তীকে বিশেষ খাতির করে রিমা। জয়ন্তী যে মন ভালো রাখা কথা বলে, এখানকার খবর দেয়। অপু এক আধদিন মাকে  দেখতে এলেও বলে দেয় জয়ন্তী। অশান্তির ভয়ে অপু আর আসে না একা। 
— ওই বেল বাজলো, জয়ন্তীরা এলো, বীথিকা উঠে গেলেন তাড়াতাড়ি।
— আরেব্বাস! কখন এলে মেজদিভাই! আমি ভাবলাম তোমাদের আসতে দেরী হবে। উফফ কি গ্লামারাস লাগছো গো
— কি যে বলিস!  তোর মেজদার এখন যা সব সুন্দর সুন্দর কলিগ!
বলেই আড়চোখে বীথিকে দেখল। সুন্দর না কচু!  দেওর তো একেবারে বউদির রুপেই মুগ্ধ! গাঁইয়া ভুত!
-তোমরা গল্প করো, আমি খাওয়ার জোগাড় করি। বীথিকা উঠে গেলেন  ভেতরে।
খাওয়ার  ঘরে যাবার সময় দেখলেন অপু বসে আছে মায়ের পাশে আর মা কি একটা খুশি খুশি বলেই যাচ্ছেন।
— দাদা কোথায়!  ছোট তো শুনলাম খড়্গপুর গেছে
চমকে গেলেন বীথি! খাবার ঘরে অপু র গলা শুনে
— তোমার দাদার এক বন্ধুর  মার শ্রাদ্ধ পড়েছে আজ। তাকে তো জানোই, যেতেই হবে।
হাসলো অপু  বীথির মুখের দিকে তাকিয়ে। সেই মুখ সেই চুল  সেই  চিবুকের নিখুঁত  ডৌল পাশে লাল তিল, ভাঁজ ভাঙা মস্ত খোঁপা ঘাড়ের কাছে।  নরম আলো খঞ্জনি চোখের মণি। অপু তাকিয়ে থাকল।
— একই রকম থাকলে বউদি, এলোমেলো।
— সবাই কি নিজেকে সাজাতে পারে অপু! কারুর কারুর সাজিয়ে দিতে হয়! কাল পঞ্চমী দেখো কেমন পাটভাঙা শাড়ির মত রোদ!
—অপূর্ব  বউদির হাল্কা তির্যক কথাটি বুঝল। দাদা না থাকলে পড়াশোনা চলতো না, বাবা অতি সামান্য বেতন পেতেন।
— দাদার কি ইনক্রিমেন্ট হলো কিছু?
— খবর রাখি না। সংসার চলে তো যায়! আবার কি!
— ছেলেটা বড় হচ্ছে, 
— তোমরা আছো তো! কিসের চিন্তা
— কিসে আছি! কোথায় আছি বলে মনে হয় তোমার?
ভাগের মা হয়ে গেছে! তাকে একটু নিজের কাছে রাখতেও পারি না। তুমি না থাকলে– আমি ভাবতে পারি না বউদি।
— ওসব বাদ দাও, আজ তোমার জন্য গাটি কচু দিয়ে ইলিশ মাছ করেছি। খেয়ে দেখো তো।
— বউদি,  সামনে এগিয়ে এলো অপু! আমার একটা কথা রাখবে তুমি!
— বলো!
— এই টাকাটা রাখো প্লিজ! নিজের হাতে তো পারি না, একটা লাল সাদা গরদ কিনে  অষ্টমীর দিন  পরবে? আমি শান্তি পাই বড়। মনে আছে তোমাকে প্রথম দেওয়া শাড়ি টার কথা!
—- দূর! তুমি পাগল হলে নাকি! কি হবে এতো দামী শাড়ি নিয়ে। অপু মাকে পারলে এই পুজোতে নিয়ে যেও একদিনের জন্য তোমার কাছে।
এখনো তোমার নতুন ফ্ল্যাট দেখেন নি!  আর কটা দিন বা বাঁচবেন।
বীথি হাসিমুখে টাকা সরিয়ে দিলেন।  চোখের জল লুকোতে লুকোতে মনে মনে বললেন, তুমি পালটে গেছ অপু! অনেক পালটে গেছ! আমার মানুষটা বোকা হলেও বদলায় নি, স্ত্রীকে লুকিয়ে তাকে কাউকে কিছু দিতে হয় না।
তার থেকে তোমার  দেওয়া পুরোনো শাড়ি টাই পরে অঞ্জলি দেব অপু। আমার শিউলি দিনের স্মৃতি।
অপু  কষ্ট পেল ভেতরে কিন্তু বুঝতে দিলো না কিছু।
— ওমা আজ তো দেখছি সব তোমার ফেবারিট রান্না!
ইলিশের মাথার চচ্চড়ি, জ্বালানে ইলিশ  ছোলা দিয়ে কচু!  আমাদের তো এসব চলে না বাবা কচু ঘেচু!
— কচু ঘেচু চালাতে গেলে যে রান্নাটিও জানতে হয়। লীলাময়ী হেসে হেসে মেজবৌকে  ঠেসলেন
— তা যা বলেছেন মা, আপনার  ছেলে তো এইসব মুখেও দেয় না আর! ডায়েট চার্ট ধরে ধরে খায়।
— তুই ভারি হয়ে যাচ্ছিস অপু, অমু আর অণু কিন্তু এখনো ছিপছিপে। 
— হবে না, এক পা হাঁটে নাকি মা! গাড়ি আর গাড়ি। আজ পার্টি কাল পার্টি— খাওয়া দাওয়া লেগেই থাকে।
বীথিকা সব শুনছিলেন, শাশুড়ী বউয়ের বাকযুদ্ধ।শান্ত স্বরে বললেন
— কে বলেছে তোর জন্য কচু ঘেচু  শুধু! দই মাটন করেছি খা।
— এত সব রান্না বান্না এত বাজার দাদার,
অপু বলতে গিয়ে থেমে গেল। মনে হলো বউদি, হয়ত আবার চারদিকে তাকিয়ে দেখল সে,  সেই একই বাবার আমলের ডাইনিং টেবিল সানমাইকা চটা, সিলিং এও পুরোনো রঙ, চিড় খাওয়া বেসিন, নেহাত বউদি পরিশ্রমী নইলে থাকা দায় হত বাড়িতে।  সে নিজে সত্যিই আর কষ্ট করতে পারে না।
— তোমরা পুজোর পরে একদিন  এসো দিদিভাই। জয়ন্তী উচ্ছ্বল কন্ঠে রিমা কে বলল
— হ্যাঁ, অষ্টমীর দিন আসবো, মাকে নিয়ে যাব একটু বউদি। আবার একাদশীর দিন নিয়ে আসব এখানে
রিমা ফোঁস করে উঠল।
— সেকি! আমাদের নিমন্ত্রণ থাকে ক্লাবে, কত রাত হবে ফিরতে! মা একা একা
— তোমরা যাবে, আমি থাকব নয় বাড়িতে
মা আমার নতুন বাড়ি যায়নি, একবার যাবে না!
রিমা চুপ করে থাকল  ভেতরে ভেতরে সে ফোঁস ফোঁস করছিল।
— খুব আদিখ্যেতা মাকে নিয়ে একেবারে।
আমি কি বুড়ির কন্না করবো পুজোর দিন ভোর! তাকে না জানিয়েই এত বড় কথা হাটের মাঝে!
অপু লক্ষ্য করল লীলাময়ীর মুখ খুশিতে ভরে গেছে। এক বার ও না করলো না মা।
 — বউদি, দাদা কে বলো একবার বাড়িটা রঙ করিয়ে নিতে।
— রঙ! ওরে বাবা সেতো অনেক খরচা অপু
— কেন!  আমরা আরো দুই ভাই তো আছি
— এখানে কে কদিন থাকবে, জয়ন্তী ঠোঁট  বেঁকালো একটু
লীলাময়ী তীব্র চোখে তাকালেন জয়ন্তীর দিকে।
কে থাকবে না থাকবে জানিনা, শ্বশুরের ভিটে তো থেকে যাবে ছোট বউমা! চারকাঠা জমির দাম ফেলনা নয়। হাজার হোক নিজের তো!
জয়ন্তীর বাবারা কোয়ার্টারে থাকে। জয়ন্তী বুঝল  কথাটা তাকেই শ্বাশুড়ি  বলল। চুপ করে গেল সে একেবারে।
–মা, আমি একটু বেরোচ্ছি, যাবো আর আসবো। দাদা যদি ফেরে তাহলে দেখা হবে নয়ত ছটায় রওনা হবো। কাল  অফিস আছে তো।
গাড়িতে ওঠার সময় লীলাময়ী প্রায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সামনে এলেন। তার মুখ আজ শরতের আকাশের মতো উজ্জ্বল ঝকঝক করছে। অপু ভাবলো  সামান্য দুদিন তবু মা কতো খুশি আজ।
আর একটা কাজ, অপু ফিরলো
— বউদি,  গাড়ি থেকে ঝুঁকে, একটা প্যাকেট বার করলো অপু
— এটা কি অপু!
— গরদের শাড়ি। তোমার জন্য। সিনিয়র ভিপি হবার পর তোমাকে আর দাদাকে
কিছুই উপহার দেওয়া হয় নি!  প্রমোশনের আনন্দ!
বউয়ের দিকে ফিরলো অপু।
বুঝলে রিমা, আমিতো  ইউনাইটেড ব্যাঙ্কেই থেকে যেতাম যদি না বউদি জোর করে আক্সিস ব্যাংকের পরীক্ষায় বসাতো।
বীথিকা একমুখ হাসলেন। অপু দেখলো
সেখানে অষ্টমীর সকাল এসে গেছে।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত