যে বছর সূর্য ওঠেনি

১৮১৬ সালের গ্রীষ্ম যেন রেকর্ড বই থেকে তুলে আনা একটা অধ্যায়। ইতালির বুকে লাল তুষার, ইউরোপ জুড়ে দাঙ্গা আর ক্যুবেক শহরের  ১২ ইঞ্চি (৩০ সেন্টিমিটার) তুষার, সবকিছুই এক অস্বাভাবিকতায় মোড়ানো ছিলো।

১৯০০ শতকের শুরুর দিকটা এখনকার চেয়ে শীতল ছিলো। তখন সৌর তাপাংক (সূর্যতে তাপের উৎপত্তি কম)-এর সাথে ডাল্টন মিনিমাম (সৌরকলংকের কার্যকলাপের অভাব) এর সম্পর্ক আছে বলে মনে করা হয়েছিলো। আসলে, ১৪ শতক থেকে ১৯ শতকের মধ্য পর্যন্ত, সবখানেই বৈশ্বিক তাপমাত্রা রেকর্ডের চেয়ে নিম্নগামী ছিলো। এই যুগ তাই ‘লিটল আইস এইজ’ নামে পরিচিত।

11127444_861149053946140_8068502791925793218_n

যাই হোক, ১৮১৬ সালের অবস্থা ছিলো সবচেয়ে চরম। এমনকি জুন, জুলাই, আর আগস্ট মাসেও পুরো উত্তর গোলার্ধ জুড়ে বরফ জমছিলো, তুষারপাত হচ্ছিলো। শুধু ঠাণ্ডাটা ব্যাপার না। কাহিনী হচ্ছে, আজ তাপমাত্রা যদি গ্রীষ্মকালের স্বাভাবিক তাপমাত্রার মত (৩৫ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড / ৯৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট পর্যন্ত) হয়, কালকেই আবার এতো ঠাণ্ডা যে পানি জমে বরফ হয়ে যাবে। তাই এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই যে, ওই বছর ফসলের উৎপাদনের হার ব্যাপক পরিমাণে কমে গেলো, খাদ্যের দামও আকাশচুম্বী ভাবে বেড়ে গেলো, আর সেই সাথে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যাও।

প্রশ্নটা হচ্ছে, কেন এই অস্বাভাবিক আবহাওয়া সৃষ্টি হয়েছিলো? যদিও নিন্ম সৌর তাপাংক এই অবস্থার অন্যতম কারণ ছিলো, কিন্তু এই ঘটনার প্রকৃত অপরাধী হচ্ছে ১৮১৫ সালে মাউন্ট তাম্বুরার  অগ্ন্যুৎপাত। অগ্ন্যুৎপাতের সময় এর ছাই এমনভাবে বায়ুমণ্ডলে বিস্তার করেছিলো যে ওই অঞ্চলে সূর্য থেকে তাপ গ্রহণ ক্ষমতা কমে গিয়েছিলো। ঘটনা আরো গুরুতর হয়ে গিয়েছিলো সালফার গ্যাসের নির্গমনের কারণে। এই গ্যাস জলীয়বাষ্পের সাথে মিশ্রিত হয়ে সালফিউরিক এসিডের ছোট ছোট কণায় পরিণত হয়েছিলো। এটি সৌরশক্তি পৃথিবীতে আসার পূর্বেই তাকে প্রতিফলিত করে মহাকাশে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছিলো, এর ফলে তাপমাত্রা আরও হ্রাস পাচ্ছিলো। ১৮১৬ সালের মধ্যে, পুরো উত্তর গোলার্ধে এই অগ্ন্যুৎপাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিলো, যাতে গ্রীষ্মেও ছিলো বরফশীতল তাপমাত্রা, আর পুরো মধ্য ও পূর্ব ইউরোপ জুড়ে অদ্ভুত রঙিন তুষারপাত।

তবে এই খারাপ আবহাওয়ার কিন্তু একটা ভাল দিকও ছিলো। লেখক মেরি শেলি, পার্সি শেলি, লর্ড বায়রন, এবং জন উইলিয়াম পলিডরি একরকম গৃহবন্দী হয়ে আটকে ছিলেন। তাই নিজেদের আমোদে রাখতে তারা গল্প লেখার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়লেন। ‘কে সবচেয়ে ভয়ংকর গল্প লিখতে পারে’ এই চ্যালেঞ্জ নিয়েই পলিডরি লিখে ফেললেন Vampyre আর শেলি’র লেখনীতে গড়ে উঠলো বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বিখ্যাত ভৌতিক চরিত্র Frankenstein।

 

 

 

 

Watson, The Earth Story থেকে অনুবাদ করেছেন– ফারহানা ইসলাম, ফরহাদ হোসেন মাসুম।

Painting Credit: George H. Durrie

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত