সুস্মিতা চক্রবর্তী’র কবিতাগুচ্ছ

Reading Time: 3 minutes

আজ ২১ অক্টোবর কবি, শিক্ষক ও গবেষক সুস্মিতা চক্রবর্তী’র জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় আন্তরিক শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


নীলাভিলাষ

নীলের দরদী আমি তুমি বঁধু নীলের প্রতিমা জগতের সব নীল তোমা মাঝে ফুটিয়াছে গাঢ়।

অনড়-অলস আমি নীল-নাথবতী নীলময় ব্রহ্ম দেখি নীলের তাপসী ও নীল লাগিয়া আমি ডাকাতিয়া বাঁশি!

ও নীল কখনো তুমি নীলাভ্র-আকাশ ও নীল কখনো তুমি তুমুল হুতাশ ও নীল কখনো চাঁদ নীলিম-চন্দ্রিমা ও নীল কখনো রুদ্র প্রলয়-গরিমা ও নীল কখনো নাড়ী আত্মজা-দোসর ও নীল কখনো বন্ধু পরম-নির্ভর ও নীল রূপেতে মন মনের গোঁসাই ও নীল পরশে সুখ অনঙ্গ-আত্মায়।

ও নীল নিরীখে তুমি কল্পনীলেশ্বর ও নীল আধার তুমি মৃগাঙ্গশেখর ও নীল ভুজঙ্গ তুমি উত্থিত-নীলের ও নীল মেঘের দূত বিরহ কৃষ্ণের ও নীল একলা জপি নীলশ্যাম নাম ও নীল বিচ্ছেদ বড় ভালবাসিলাম।

নীলের মধুতে তুমি শ্রীমধুসূদন নীলের যাতনাজ্যোতি কৃষ্ণ-জনার্দন নীলের নিদাঘে তুমি চৈতন্য-চাঁদ নীলের কীর্তনে ভাসে নদীয়ার রাত!

ও নীল কখনো তুমি জাহ্নবী-নিতাই ও নীল কখনো তুমি বৃন্দাবনে ঠাঁই ও নীল নীলের মায়া কবিতার রাত ও নীল নহলী বর্ষা মিলনানুরাগ ও নীল কদম্ব-ঘ্রাণে বরষা-আগুন ও নীল নিরংশু-নীড়ে বিরহ-দ্বিগুণ।

ও নীল নীহার তুমি স্নেহের প্রকাশ ও নীল ভৈরবী তুমি সৃষ্টির প্রয়াস ও  নীল নীলের দর্প বিষামৃতপায়ী ও নীল পরম ধ্যানে নীলানন্দময়ী ও নীল ক্ষেপার দল সাধুর বাজার ও নীল চাঁদের গায় কলঙ্ক হাজার।

ও নীল তেয়াগে তুমি হেম-মূর্তির সীতা ও নীল ভাবের ঘোরে পাগলাই মুর্ছিতা। ও নীল চরন-ঘন-শ্যাম-পীতাম্বর ও নীল নূরের রাগে দম কলন্দর। ও নীল যুগলভজা সহজ সাধন ও নীল শোকের দাহ অতীত-তর্পণ।

ও নীল নিরম্বুকালে সদগুরু সার ও নীল চম্পক তুমি ভক্তি-বাঞ্ছা-হার ও নীল সাঁইজি তুমি নীলের বারাম ও নীল নবনী তুমি নলিনী-কন্যার ও নীল পুরীতে তুমি ঢেউ নীলাচল ও নীল গেরুয়া ছোপে উড়ালে আঁচল ও নীল নির্জিত হাসি অধরা প্রকাশি ও নীল নীদয়ানীলে দারুণ বিলাসী।

নিবিড় নীলের লীলা তুমি আমি বঁধু নীলযোগেশ্বরী মহাতীর্থ পুণ্যঘাটে স্থিত পুণ্যযোগে পুণ্যসিদ্ধালোভী

দুর্লভ-অমেয় জলে নীল অভিলাষী নীলাগুনে পুড়ে শেষে হ- সর্বনাশী ও নীল লাগিয়া তবু গায় বারমাসী!

স্তব্ধতার গান

উদ্ভ্রান্ত দিনের শেষে- লীন হয়ে হাসে মহাকাল। স্তব্ধতার ডানা ভাঙ্গে ধ্যানাচ্ছন্ন হলুদ বিকাল। কলরব থেমে গেলে ক্রমে সন্ধ্যা- গাঢ় অন্ধকার। অন্ধকারে জ্বলে রাত্রি, পিপাসিত শান্তি-বরষার, তোমারও গন্তব্য; আহা প্রবারিত আমার সকাল!

এই শ্রাবণে জলের দিনে

এতোটা জল খলবলিয়ে দু ’চোখ বেয়ে– ঝরলো যেন দিনের শেষে বকেয়া জল; আজ শ্রাবণে জলে মগ্ন ব্যাকুল মনে– চোখের জলে বৃষ্টি জলে হৃদয় তল!

অসুস্থ খুব, শুনছি গান, – একলাটি যে! শেষ শ্রাবণে বর্ষা হলো দুদিন খুব; জলের তলে যাতনাভর শহর-পথ, কাব্য ঘরে নিবিড় তবু জলের ডুব!

ভিজছে জলে শ্রাবণ ঢলে একলা কাক! জানলা খোলা জলজ দিনে পুড়ছে মন– চোখের জলে বিষাদ ধোয়া চশমা-কাঁচ, এই শ্রাবণে রইল কোথায় নিকট জন!

কর্মব্যস্ত দিন পেরিয়ে শ্রাবণ নামে! ঘন আঁধার ভেঙ্গে ভেঙ্গে নিশির ডাকে– পেরিয়ে যায় জমাট কোনো দহন ব্যথা; মেঘের তৃষা অঝোর জলে পাতার ফাঁকে!

ঘন শ্রাবণে জলের গানে মেঘ পড়শী; মেঘ পালকে জলের খামে অচিনপুরে– পাঠালো মেঘ অদৃশ্য কোন্ কারসাজিতে! সজল মেঘে বরষা এলো উজাড় করে।

ভোল অপচয়

কী অপচয় কী যে অপচয় হৃদয়ের! কোন সে ক্ষরণ কার খেসারত হিসেবের। অথচ, জীবন সদা বেগবান– এই ধুলা-মাটি-গাছ মহীয়ান, এই জলরাশি চাঁদ আর আলো সকলের। ভালবাসাবাসি বেঁচে থাকা সব মানুষের।

এই স্বপ্নের নীল চাঁদোয়ার নিচে যে, কত আদরের-প্রণয়ের মনপাখি সে– ডেকে ডেকে আজ ক্লান্ত বৃথাই বেলা যে; অথচ, সময় এত অপচয় কোথা সে!

ভরা মেঘে ডাকে মত্ত আকুল ধারা যে, সূর্যের সাথে আড়ি দেয়া তবুও বাতাসে; কানাকানি কথা গনগনে আঁচে ভাদরে, সামনে শরৎ সাদা মেঘে রথ আকাশে।

কার্তিকে তার কুয়াশার সুর সাধা যে ফিরে পাবে আর আগুনের মত পাখা সে! জানে না সময় শুধু জাগরন জনমের; জানে তার মন কেন অকারণ করে সে!

জানে এই মন বেঁচে থাকা ধন বড় যে, আর জানে তার ডানা ঝাপটানো খাঁচা সে; খোলা খাঁচা বলে জল কেন ঝরে চোখে যে! ভোল অপচয় বিরহবিজন বৃথা সে!

হাওরের জল-হাওয়ায়

সাত সমুদ্দুর ঢেউয়ের বজরায় দিব্যি বসে! ভাটি-জল-হাওয়ার দেশে– পেরিয়ে এসেছি সাময়িক; উজানের ধূর্ততা, একঘেয়েমী জীবিকার কুস্তির সংসার, পেরিয়ে এসেছি দয়িতার অহর্নিশি অবজ্ঞার উপেক্ষার ঝার। জানি এটা চতুরতা শিকারের যুগ! এইখানে প্রেম আর অন্তর্গত বোধ, পরাজিত পদানত হয় বার বার। তবুও এই নির্জন হাওরের বিশুদ্ধ হাওয়া আর জলে, শেকড়ের শেষ সীমা যদি জলে অস্পষ্ট ছায়া আজও ফেলে! আমি তাকে বলে দেব: নাগরিক অসুখের প্রতিবেশ প্রকটতা রূপ। এই জল-হাওয়া আর বন্ধুতার উন্মুক্ত মন, আমায় ভুলিয়ে দিও গো নগরের নগ্নতা আরো কিছুক্ষণ। যেন আমি পুণ্য-জলরাশি আর হাওরের হাওয়ায়; ক্লান্তি ভুলে এই দেহতরী দীপ্ত শলাকায়! পুড়ে পুড়ে পুনরায় দূরে সেই উজানে ভিড়াই।

ওরা গুম হয় ওরা খুন হয়!

কতটা পীড়ন রক্তের মত ঝরে! ওরা গুম হয় ওরা খুন হয়, দেশে দেশে ঘরে ঘরে!

বঞ্চনা-ভরা ওদের বসতি, কেড়ে নেয়া মাঠে ওদেরই অস্থি; সূর্য-শিশিরে ঝরে! ওরা গুম হয় ওরা লাশ হয়, পথে পড়ে থাকে অগোচরে!

মেয়েরা ওদের ধর্ষিত হয়। জঙ্গলে-জিপে লুণ্ঠিত হয়। বিচারের নামে ভাইয়েরা ওদের– হাতকড়া হাতে পাহারা-প্রহারে; রক্তের বমি করে। ওরা খুন হয় ওরা লাশ হয়; মরবার আগে-পরে!

বাঁচার আশার সম্বলটুকু– ক্রমাগত দূরে সরে। ওরা গুম হয় ওরা খুন হয়, দেশে দেশে ঘরে-ঘরে!

এক হয় তারা নিপীড়িত দল, বুকের ভেতরে খাঁ খাঁ করা মন; কিসের যুদ্ধ করে! ওরা গুম হয় ওরা খুন হয়, সামরিক চড়া সুরে।

ভূমি-বন আর জলের কসমে, নিভে যাওয়া মনে বেদনা-জখমে; মৃত্যুর মতো প্রতিরোধ আর প্রতিশোধে ফেটে পড়ে। ওরা খুন হয় ওরা লাশ হয়, জঙ্গলে ঘরে-ঘরে!

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>