স্বপ্ন মেল

(১)

সত্যি সত্যিই জায়গাটার নাম নিশ্চিহ্নপুর। একটা মফ:স্বলী গাঁ বা গেঁয়ো শহরও বলা যায়। পল্লীপ্রকৃতির সারল্য নেই এখানে আবার নেই শহরের ধূলো-ধোঁয়া, তেলকালি ভারি করা বাতাস।ঘিঞ্জি বসতি। বেশীরভাগই দেশভাগের পর এসে খামখেয়ালে বানানো ঘরবাড়ি। কোনও পরিকল্পনা নেই। যে যেমন পেরেছে বসে পড়েছে মনের সুখে। এদেরই বুঝি উদ্বাস্তু বলে। খোলা নর্দমা। কোথাও কাঁচা রাস্তা। কোথাও একটু পাকা। 

এখানে দুটি ছেলে সারাক্ষণ খালি গায়ে, খালি পায়ে বারমুডা পরে ঘুড়ি ওড়ায়। ছেলেদুটোর বড় দিদি সাদামাটা স্কার্ট-ব্লাউজ পরে থাকে। রোজ নিয়ম করে সকাল দশটা নাগাদ দুপাশে দুটো বেণী দুলিয়ে, নীল ছোপ ধরা সাদা স্কুলড্রেস পরে ইস্কুলে যায়। ফেরে সেই বিকেলে। তাদের একফালি বারান্দায়  রাস্তার ল্যাম্পপোষ্টের  চুঁইয়ে পড়া হলদে আলোয়   মেয়েটির লড়াই শুরু হয়। মাধ্যমিকের ভৌতবিজ্ঞান, ত্রিকোণমিতি কিম্বা উপপাদ্যেরা উঁকি মারে তখন।

ছেলেদুটি তখন দিদির পাশে বসে ঢুলতে থাকে সারাদিনের ক্লান্তিতে আর অপেক্ষা করে কখন রান্নাঘর থেকে কখন গন্ধ পাবে গরম ভাতের। সেই অপেক্ষায়।

উল্টোদিকের বাড়ির একফালি রান্নাঘর থেকে সারাদিন ধরে বেজে চলে প্রেসারকুকারের হুইস্‌ল। প্রেসারকুকারের মালকিনের হোমডেলিভারির ব্যাবসা। বাড়ির নীচে একটা বিউটিপার্লার। এ পাড়ার মেয়েরা সব নাকি কাজ করে সেখানে।

বাড়ির মালিক একদম ওপরে থাকে। ছাপোষা গেরস্ত। একতলার বিউটিপার্লার আর দোতলার ছেলেমেয়ে তিনটিরা এনার ভাড়াটে। এই ভাড়ার টাকাতেই তার দিন চলে। ইনি সকালে রোজ লুঙ্গি পরে বাজারে যান আর ব্যাগবন্দী  সজনেডাঁটা, পুঁইশাক, কিম্বা লাউডগা নিয়ে ফেরেন। বিকেলে তাঁর ছাদ-বাগানের কটা শখের ফুলগাছ পরিচর্যা করেন। একটা স্মার্ট ছেলে আছে তাঁর। সে সকালে খবরের কাগজ দেয় পাড়ার বাড়িতে বাড়িতে। বিকেলে টিউশানি করতে যায়। বিএসসি পাশ করেছে গত বছর।

এই জায়গাটিতে ঘরের কাজ করার লোকের অভাব নেই।  কিন্তু সকলে একবেলার ঠিকের কাজ করে। বিকেলে এরা পালা করে করে ঐ বিউটিপার্লারে কাজ করে। এদের মধ্যে কেউ আবার সন্ধ্যের ঢল নামতে না নামতেই  সেজেগুজে মুখে রঙ মেখে সব সফেদাসুন্দরী হয়ে বিদ্দ্যুল্লতার মত বড় রাস্তার ধারে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে ট্রাক ড্রাইভারদের মনোরঞ্জনের জন্য, যেখানে সব পেট্রোলপাম্প, চায়ের ঠেক, ব্রেড-ওমলেট, তড়কা-রুটি, আর আলুপরোটার ধাবা আছে।

একটা জাগ্রত মন্দির আছে এখানে। সকালসন্ধ্যে পুজোর ঘন্টা বাজে। শনিবারে সন্ধ্যায় উপচে পড়ে ভীড় সেখানে। খুব ধর্মভীরু এখানকার মানুষ জনেরা। শ্রাবণে মহাধূম করে তারকনাথে যায় দলবেঁধে। চৈত্রে চড়কের সময় দন্ডী কাটে আর সম্বচ্ছর বারোমাসের তেরোপাব্বনে মাইক চালিয়ে পুজো পালন করে এরা।

ঐ ছহেলেদুটির বড় দিদি এবার মাধ্যমিকে  স্টার পেয়েছে। মেয়েটির নাম আলো। তার ভাইদুটো মানুষ হয়নি তা নয় তবে সারাদিন খেলে বেড়িয়ে যেমন মানুষ হয় তেমন আর কি। একটা ভাই কোনোরকমে উচ্চমাধ্যমিক আর আরেকজন লোকাল পোষ্ট অফিসে চা, জল ইত্যাদি দিয়ে প্রাইভেটে মাধ্যমিক। আলোর বাবা মারা গেছেন  অনেকদিন। মা ক্যানসারে ভুগছিলেন। দারিদ্র্য আর মানসিক চাপে বেশিদিন ভোগেন নি। ভগবান অভাবের সংসারে তাকেও মুক্তি দিয়েছেন।

আলো মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়েই সেই শহুরে গ্রামের ছোটদের বাড়িতে টিউশান দিয়ে সংসার চালিয়ে আসছে। একে একে পেরিয়েছে উচ্চমাধ্যমিকের বিজ্ঞান বিভাগ, জয়েন্ট এন্ট্রান্স দিয়ে ঢুকেছে সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। মুখ্যমন্ত্রীর তরফ থেকে ভাল রেজাল্টের জন্য কিছুটা অনুদান পেয়েছে। তার পাড়ার স্বেচ্ছাসেবী সংঘেরা বাকীটুকুর ব্যবস্থা করেছে এক এনজিওর  কাছ থেকে।  তারপর বিটেক পাশ করেছে কম্পিউটার সায়েন্সে এবং জিআরই টয়ফেল দিয়ে আমেরিকায় চলে গেছে আজ থেকে মাস ছয় আগে। নামকরা ইউনিভার্সিটি থেকে স্কলারশিপ  পেয়েছে। এম.এস, পি.এইচ.ডি করে ফিরবে একেবারে।  আলো দুভাইকে বাড়িভাড়া সমেত তাদের খাইখরচ ডলারে পাঠায় প্রতিমাসে।

                                                         (২)                                                     

এরপর কেটে গেছে বহুবছর। সেই শহুরে গ্রাম বা গ্রাম্য শহরের আর কোনো নতুন উন্নতি হয়নি কয়েকটা পুরোনো বাড়ি ভেঙে নতুন ফ্ল্যাটছাড়া। আর হয়েছে দুএকটা মিষ্টি, শাড়ি আর গয়নার ছোট ছোট দোকান। দ্রুত শহরায়নের ঢেউ যেন আছড়ে পড়ে এ গ্রামের মানুষকে কিছুটা গতিশীল করে তুলেছে। অভাবের তাড়নায় গেরস্ত বাবা মায়েরা এখন ছেলেপুলের লেখাপড়ার দিকে বিশেষ মন দিয়েছে । আমি একে “আলো এফেক্ট’  বলি।

নিদেন পক্ষে ছেলেছোকরারা মাধ্যমিক পেরিয়ে সিকিউরিটির চাকরী করছে। আরো এক ধাপ ওপরের স্মার্ট যুবকযুবতীরা বিপিওর চাকরী করতে যায়। সকাল সাঁঝে গাড়ি এসে বাড়ির দোরগোড়ায় নামিয়ে দিয়ে যায় তাদের।  রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা মারা কালচারটার একটু একটু পরিবর্তন হচ্ছে তখন।    

আলোর চোখে অনেক স্বপ্ন। নিজের মাটির রঙ বদলে দেবার স্বপ্ন। আলো বিদেশে গিয়ে বৈভব দেখে মনে মনে কল্পনার অনেক কুসুম ফুটিয়েছে তার মনে। তার পড়াশুনো আজ শেষের মুখে। শুধু বাকী শেষের কিছু ফর্মালিটি।

পিটসবার্গে আলোর পাশের ঘরের এক রিসার্চ স্কলার অনুভব কুমার বিহারের ছেলে। কিন্তু কলকাতাতেই বড় হয়েছে। বাংলা বলতে ও লিখতে পারে খাসা। আলোর সঙ্গে এই পাঁচ বছরে অনুভবের একটু বেশি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সব ব্যাপারেই দুজনের খুব মতের মিল কেবল একটা ব্যাপার ছাড়া। আলো দেশে ফিরতে চায় আর অনুভব থেকে যেতে চায় এই আমেরিকার বৈভবকে আঁকড়ে ধরে।

সেদেশে বসে তার পুরোণো গ্রাম্য শহরের কথা এখনো ভাবে আলো। কোনো সুখ স্মৃতি নেই সেখানে। নেই কোনো পিছটান। কিন্তু তবুও তার প্রাণ কেঁদে ওঠে বারেবারে। কিছু একটা করতে হবে সেখানে। কিছু একটা গড়তে হবে সেখানে যাতে রাতারাতি বদলে যায় সেই শহুরে গ্রামের খোলনলচে।  আজ যেখান থেকে বড় হয়ে সে এত বড় আকাশটাকে দেখতে পেয়েছে সেই মূলটাকে তো অস্বীকার করার উপায় নেই। কথা বলেছে কয়েকজন এন.আর.আই  বিজনেস ম্যাগনেটের সঙ্গে।  আর সেই থেকেই স্বপ্নের ভেলায় চড়ে ভাসতে থাকা তার।

পিটসবার্গের আকাশে সেদিন শুক্লা একাদশীর চাঁদের জ্যোৎস্না। নিজের এপার্টমেন্টের তলায় সুইমিংপুলের ধারে স্নান সেরে সদ্য উঠে এসেছে পঁচিশ বছরের আলো।  এ ক’বছরে তার রূপে ধরেছে জৌলুস। চেহারায় এসেছে তরতাজা স্মার্টনেস। সদ্য স্নানের পর তন্দ্রা এসেছে আলোর। চাঁদের আলোয় অবগাহন করতে করতে আলো পৌঁছে গেছে ততক্ষণে সেই গ্রামে। ঝাঁ চকচকে ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেস ওয়ে  আর উদ্ধত সব ল্যাম্পপোষ্টে অবনত মুখে দাঁড়িয়ে থাকা হ্যালোজেন আলোর  মাঝে তাদের গ্রাম্য শহরকে চেনা দায়! রাস্তার ধারে শপিংমল, তার সামনে ফোয়ারা। হালকা গানের সুর ভেসে আসছে সেখান থেকে । রাস্তা দিয়ে সব গাড়ির ঢল নেমেছে। এমন কখনো দেখেনি তো সে। বড় বড় রেস্তোরাঁ। আর যে রাস্তায় তারা থাকত সেখানে হয়েছে একটা ছিমছাম টাউনশিপ। বাড়িগুলোর কি চমতকার আর্কিটেকচার! চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে আলোর ।আলো দেখতে পেল সেই তাদের বাড়ির পাশে সেই প্রেসার কুকারের মালকিন মহিলা যিনি হোম ডেলিভারি করতেন তাঁর একটা হোটেল হয়েছে যার নাম “পঞ্চব্যাঞ্জন’  আর সেই যে রূপশ্রী নামের  বিউটিপার্লার সেটি এখন একটা মাল্টিজিম আর স্কিন ক্লিনিকের মর্যাদায় দাঁড়িয়ে রয়েছে স্ব-মহিমায়। নিশ্চিহ্নপুরের সেই জাগ্রত মন্দিরে মার্বেল বসেছে। মন্দিরের পেতলের চূড়ো চকচক করছে চাঁদের আলোয়। কত নতুন স্কুল হয়েছে এখানে। এ যেন এক নতুন নিশ্চিহ্নপুর সে দেখছে। আহা বেচারা ভাইদুটো তার! তাদের জন্য বড় মায়া হল।

স্বপ্নের ঝিমধরা নেশা কেটে গেছে অনেকক্ষণ আগে। আলো ছ’মাস পর দেশে ফিরছে। তার রিসার্চের ফাইনাল ডিসার্টেশন এগিয়ে আসছে। অনুভবের মন খুব খারাপ। তার কাজ এখনো বাকি অনেকটাই। আলো ফিরে এসেছে কোলকাতায় ডাঃ আলো ব্যানার্জি হয়ে । অনুভবকে ছেড়ে আসতে কষ্ট হয়েছে খুব। হোয়াটস্যাপ আর ই-মেল  বাঁচিয়ে রেখেছে।

সল্টলেকে সেক্টর ফাইভে একটি চাকরী নিয়ে এসেছে সে। সেখানেই একটি বাড়িতে পি.জি হয়ে আছে। শুধু স্বপ্ন নিশ্চিহ্নপুরকে আলো দেখানো।  রোজ ই-মেল আদানপ্রদানে নিশ্চিহ্নপুরের একটু একটু করে অগ্রগতি খুঁজতে থাকে আলো।  এন.আর.আই শিল্পপতিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে নিয়মিত। আর মধ্যস্থতা করে অনুভব।  

বড়বড় ইমেইলে, চ্যাটবক্সে আর হোয়াট স্যাপে আলো আর অনুভবের একটাই আলোচনা। প্রজেক্ট “রোশনি’।

সবশুদ্ধ বিরাট একটা প্রজেক্ট। তারপর নিশ্চিহ্নপুরকে আর কেউ চিনতে পারবে না।  আজ অফিসের তিনজনকে নিয়ে সার্ভে করে এসেছে আলো। নিশ্চিহ্নপুরের নতুন প্রোজেক্ট। জমি, ফ্ল্যাট, দোকানপাট রেস্তোরাঁ, স্কুল, হসপিটাল  সব নিয়ে নিশ্চিহ্নপুরের নতুন টাউনশিপের প্ল্যান। বিদেশেই ডা: রায় আর মি: শর্মার সঙ্গে তৈরি হয়েছিল তার ব্লু প্রিন্ট। 

একটা একটা করে তিন তিনটে ফ্লাইওভারের কাজ শুরু হল। তাদের ভাড়াবাড়ির পেছনে যে লো লায়িং বস্তি এরিয়া ছিল তা সব ভাঙা হয়ে গেছে। মানুষ গুলোকে রিহাবিলিটেটও করেছে ইষ্টার্ণ মেট্রোপলিটান বাইপাসের ধারে। তুখোড় ইঞ্জিনিয়ারের আর্কিটেকচারে আলোদের এই মফস্বলে টাউনশিপ গড়ে উঠতে চলেছে। নিশ্চিহ্নপুরের মধ্যে এই টাউনশিপ হবে স্বতন্ত্র তার নাম দেওয়া হয়েছে “রোশনি’।

এদিকে একটা ঝামেলা শুরু হল। জমি নিয়ে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে। কাজ বন্ধ রইল। আলো জানাল অনুভব কে। 

– তুমি পারলে মি: শর্মাকে একটা ফোন কোরো। আমি একদম সময় পাচ্ছিনা। আজ খবরে দেখলাম তাই জানতে পারলাম।  জানিনা কাজটা থেমে গেল নাকি। ভাবছি এই উইকএন্ডে  সময় করে একবার সাইটে যাব। এই এক সমস্যা এখানে। কাজ আর এগুবে কি করে জানিনা।

অনুভবের যেন আড়োআড়ো ছাড়ো ছাড়ো ভাব। আলো লিখল তাকে।

– ব্যাঙ্ক লোনের  কথাটা এগুলো কিছু? মি: শর্মা কিছু জানালেন কিনা জানিও। এখানে আবার কাজ এগুচ্ছে ঠিকমত। আমি আর যেতে পারিনা বহু দিন। নতুন চাকরীতে জয়েন করে এতবার ব্যাঙ্গালোর যেতে হল যে ছুটি পেলেই মনে হয় একটু রেস্ট নি। তুমি এই সময় এখানে থাকলে খুব ভালো হত। বড্ড মিস করি তোমাকে অনুভব! তুমি কি সত্যি পোস্টডক করবে ওখানে?  কিন্তু ফিরে তোমাকে আসতেই হবে এদেশে। কথা দিয়েছিলে তুমি। নতুন বছরে আমাদের কোম্পানির পার্টনাররা আরো অনেককে পার্টনার করবে। তোমার মত ব্রাইট ক্যান্ডিডেটকে লুফে নেবে। কিছু শেয়ার তোমাকে কিনতে হবে। মানে ইনভেস্ট করে পার্টনার হয়ে ঢুকবে তুমি এখানে। আমিও ভাবছি অফারটা নেব। তাহলে আমরা দুজনেই হব কোম্পানির মালিক।

অনুভব যেন ধরই মাছ না ছুঁই পানি। সিরিয়াস নয় এই ব্যাপারে। 

আবার মরিয়া হয়ে মেইল গেল আলোর কাছ থেকে।

-আমাকে এবার ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে ছ’মাস থাকতে হবে, অনুভব।  তুমি কিন্তু ডা: রায় আর মি: শর্মার সঙ্গে লোনের ব্যাপারটা ফয়সালা করে জানিও। যাওয়ার আগে আমি ঘুরে আসব নিশ্চিহ্নপুর থেকে একবার। কাজ খুব দ্রুত এগুচ্ছে  এখন। রাস্তাগুলো তৈরী হয়ে আসছে। এখন সলটলেক থেকে যেতে গেলে নতুন ফ্লাইওভার দিয়ে যাই। খুব সুন্দর ঝকঝকে রাস্তা ।  খুব কম সময় লাগে জানো? 

অনুভব নিরুদ্বিগ্ন, নিরুত্তাপ।

আবারো মেইল আলোর।

– কি হল এত ইরেগুলার হয়ে গেছ কেন? রোজ একটা করে ই-মেল পাঠাতেও তোমার কষ্ট হয় ?  মেলবক্সটা চেক কোরো রোজ। এটা আমার অনুরোধ। আমার আর তর স‌ইছে না অনুভব! কবে তোমার কাজ শেষ  করে তুমি চলে আসবে সল্টলেকে?  জানো? আমার বড়ভাই তো উচ্চমাধ্যমিক আগেই পাশ করেছিল। এবছর সে ওপেন ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ করেছে। সল্টলেকে একটা বিপিওতে ছোট চাকরী করছে। আর ছোট ভাই আমার পাশের অফিসে আউটসোর্স এর কাজ করে। এখন আর আমাকে ওদের টাকা পাঠাতে হয়না।

– অনুভব, আজ আমাদের নিশ্চিহ্নপুরের টাউনশিপ “রোশনি’র লে-আউটের অ্যাডটা দেখ নীচের নিউজপেপারের ওয়েবসাইটে। তুমি তো বি-আর্ক করেছিলে। কাজেই কিছুটা অন্তত: বুঝবে। জানো আমাদের পিটসবার্গের সেই রাস্তার আলোগুলোর মত আলো দিয়েছে নিশ্চিহ্নপুরের রাস্তায়। সেই একটা আলোর নীচে ডাউনটাউন পিটসবার্গে তুমি বলেছিলে তোমার কথা? মনে পড়ে অনুভব? আমার সেদিন বলার মত কিছুই ছিলনা তাই আজ বলছি প্রাণ খুলে তোমাকে। আমার ভালোলাগার সেই গ্রাম্য শহরের কথা। আমার নিশ্চিহ্নপুরের নতুন গল্পের কথা। রোজ সকাল আটটা থেকে রাত আটটা অবধি অফিস করতে ভালই লাগছে এখানে। কিন্তু আরো ভালো লাগত যদি তোমার সান্নিধ্য পেতাম! কাজে ফাঁকি দিও না প্লিজ! যত তাড়াতাড়ি পারো ফিরে এসো প্লিজ।

-অনুভব, আজ আমাদের রাজ্যপাল “রোশনি’  টাউনশিপের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন। ডাঃ রায়কে  ইমেল করলাম আর ধন্যবাদ দিলাম। গতকাল রাতে ফোন করেছিলাম মিস্টার শর্মাকে।যেটুকু লোন স্যাংশান বাকী ছিল সেটুকুও ব্যবস্থা করে  ফেলেছেন বললেন ।”রোশনি’  টাউনশিপের বুকিংও শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যে ফার্স্ট কাম ফার্স্ট সার্ভ বেসিসে। সেই টাকা কিছুটা পেলেই মিষ্টার শর্মার কন্ট্রাকটর ছাদ ঢালাই করবে। তার আগে নয়। প্রত্যেক বাড়ির সামনে থাকবে ম্যানিকিওর্ড ছোট্ট ছোট্ট সবুজ লন। রাস্তাগুলোয় এই বর্ষাতেই লাগিয়ে দিয়েছে এরিকা পাম যাতে বাড়ির পজেশন পেলেই একটা শ্যামলিমার ছোঁয়া পাই আমরা।  আমাদের সেই ম্যাগনোলিয়া গাছটার কথা মনে আছে তোমার? আমাদের বাড়ির সামনে আমি কিন্তু ঐ গাছ একটা লাগাবোই লাগাবো। আজ এই পর্যন্তই থাক।

আবারো লিখল সে।

-দেখতে দেখতে কতদিন কেটে গেল আমি ফিরে এসেছি দেশে । কতটা  সুন্দর হয়ে গেছে নিশ্চিহ্নপুর তা তোমায় বলে বোঝাতে পারবো না অনুভব। আমি ও পাড়ায় গেলে আর চিনতে পারিনা আমার পুরোণো সেই রঙচটা খোলস ছাড়ানো গেঁয়ো শহরটাকে। কনস্ট্রাকশানের আওয়াজে, রঙে, কাঠে, সিমেন্ট-বালিতে নব নির্মিয়মাণ নিশ্চিহ্নপুরকে দেখলে আমার বাবা মায়ের জন্য বড় কষ্ট হয় অনুভব।  আমি ওখানে গেলে এখনো দেখতে পাই আমাদের ভাড়াবাড়ির সেই একফালি বারান্দা যেখানে বসে আমার হাতেখড়ি হত ক্যালকুলাসের সঙ্গে। প্রতিনিয়ত খুনসুটি হত কেমিষ্ট্রির শক্ত শক্ত  ফর্মুলার সঙ্গে! ল্যাম্পপোষ্টের চুঁইয়ে পড়া একফালি আলোর মাঝে  খুঁজে পেতাম  সেই সব কঠিন বিজ্ঞানের সমাধান সূত্র। খিদে পেলে মা এক বাটি মুড়ি নিয়ে আসতেন। শুধু মুড়ি। মা কে বলতাম একটু পাঁপড় ভাজা হবে না মা?  যাক বাবা ভাই দুটোর যে একটা হিল্লে হয়েছে এতেই আমি বড় শান্তি পেয়েছি।

জানো অনুভব?  একটা শপিং মল হবে এখানে। আর একটা সিনেমা হল। শপিং মলে সব থাকবে। ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, ফার্মেসী  থেকে ইন্টিরিয়ার ডেকরেশান অবধি। আমাদের খুব সুবিধে হবে । কি বল? যা ব্যস্ত চাকরী আমাদের! এক জায়গায় সব কিছু পেয়ে যাবার সুবিধে যে কতটা তা আমেরিকায় গিয়ে টের পেয়েছি। একটা চাইনিজ রেস্তোরাঁ হচ্ছে জানো?  আমাদের টাউনশিপের পাশেই।  আমি কিন্তু আমাদের ফ্ল্যাট এর অ্যাপ্লিকেশান আর বুকিং এর টাকা দিয়ে এলাম গতকাল। আমাদের বাড়ির নাম কি হবে জানিও। আমি ভেবেছি কয়েকটা ইন্টারেস্টিং নাম। তারপর অকদিন অনলাইন হয়ে দুজনে বসে ঠিক করব।  সেই মত একটা টেরাকোটার টালির অর্ডার দেব যাতে নামটা খোদাই করা থাকবে।      

                                                              (৩)

এরপর আরও দুটো বছর কেটে গেল। আলো ইমেইল লিখেই চলে আগের মত।

-তুমি তাহলে শেষ পর্যন্ত চাকরীটা নিলেনা এখানে অনুভব। যা ভালো বোঝ তাই কোরো। আমার নিশ্চিহ্নপুর নিয়ে আমি ঠিক ভালো থাকার চেষ্টা করে যাব। জীবনে এত লড়াই করেছি যে কোনো কষ্টকেই আর কষ্ট বলে মনে হয়না । আমার নতুন ফ্ল্যাটের নাম দিয়েছি “আলোক-রেণু’।  আমার মায়ের নাম ছিল রেণু। আমার দিন গুলো কেটে যাচ্ছে। আর তোমার জন্যে মন কেমন করে না। মেলের জন্য অপেক্ষা করাও ফুরিয়ে গেছে। ভাইরাও ফোন করেনা। তাদের নিজেদের সংসার হয়েছে। বোধ হয় তোমার সঙ্গে “আলোক-রেণু’র  স্বপ্ন বাঁধা  হোলো না।  এখনো নিশ্চিহ্নপুরের গাছ-গাছালিরা আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকে, পাখ-পাখালিরা  আমাকে এসে গান শুনিয়ে যায়। আমি স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে আমার অফিসের ঘরটা নিয়ে পড়ে থাকি। আমার সঙ্গী এই ল্যাপটপকে নিয়ে । এই পাঁচ বছরে তোমার আলো ঠিক আগের মতই আছে। সেই নিশ্চিহ্নপুরের আলো হয়ে। আমি দেখতে পাচ্ছি অফুরন্ত আলোর মাঝে জ্বলজ্বল করছে আমার নিশ্চিহ্নপুর। নতুন নিশ্চিহ্নপুরের বুকে দাঁড়িয়ে “রোশনি’  নামের টাউনশিপ। যার মধ্যে আমার-তোমার স্বপ্নের “আলোক-রেণু’।  আমার অফিসের পাশে যে খালটা ছিল সেটা সংস্কার হওয়ার কথা ছিল।  খালটি পুব-পশ্চিমে কোলকাতাকে বয়ে নিয়ে যায় আর মেশে গঙ্গার সঙ্গে। আজ দেখছি সেই আলোর মাঝে, সেই খালপাড়ে দাঁড়িয়ে আমরা কথা বলছি কিছু পরেই নৌকো করে ওপারে যাব আমরা। আমার স্বপ্নগুলো হারিয়ে যেতে যেতে বেঁচে রয়ে গেল তবুও! তবুও বলব আমি ভালো আছি। খুব ভালো আছি অনুভব।  তুমিও ভালো থেকো। 

এটাই ছিল অনুভবকে লেখা আলোর শেষ ইমেইল।

 

এর কয়েক মাস পর…

“মনোময়’  বিকাশ কেন্দ্র থেকে হসপিটাল সুপার ল্যাপটপটি উদ্ধার করলেন ডা: আলো ব্যানার্জির ঘর থেকে। ইয়াহু মেল একসেস করে ইউসার আইডি তে এ টাইপ করতেই চলে এল alo1976আর নিজের ল্যাপটপকে ইয়াহুর পাসওয়ার্ডও মনে করিয়ে রেখেছিল আলো। তাই মেলবক্স খুলে গেল চোখের সামনে।

সেন্ট মেলে অনেক অফিসিয়াল মেল রয়েছে আর সেভড মেলে অনুভবকে পাঠানোর জন্য কম্পোজ করে রাখা রয়েছে এক গুচ্ছ ইলেকট্রনিক মেল। শুধু পাঠানোর অপেক্ষায়!  শেষ পাঁচবছর ধরে যতগুলো মেল সে শুধু লিখে গেছে অনুভবকে। 

ইনবক্সে একটাও মেসেজ নেই অনুভবের কাছ থেকে পাওয়া।  “মনোময়’ বিকাশ কেন্দ্রের সুপার অনুভবের মেল আইডি নিয়ে নিজের আইডি থেকে অনুভবকে মেল করলেন।

“ডা: আলো ব্যানার্জি এখন “মনোময়’  বিকাশ কেন্দ্রে আছেন। সত্বর যোগাযোগ করুন নীচের ঠিকানায়’       

 

 

    

   

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত