Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Sweet Melancholy iraboti

স্মৃতিকথা: বৈশাখী মেলার স্মৃতি । আদনান সৈয়দ

Reading Time: 4 minutes

পয়লা বৈশাখের কথা মনে এলেই ছেলেবেলার সেই লাল নীল স্বপ্নে মোড়ানো হাজার রকমের স্মৃতিগুলো চোখের সামনেই যেন দোল খেতে শুরু করে। সেই স্মৃতিগুলো নিয়ে লিখতে বসলে তখন সত্যি ভিমরি খেতে হয়! কোনটা ছেড়ে কোনটা লিখি? জানি, আপনারাও বলবেন সেই একই কথা। পয়লা বৈশাখ মানেই এক ধরনের নষ্টালজিক স্মৃতির রোমন্থন ছাড়া আর কি? কারণ বর্তমান এই ফেসবুক আর কম্পিউটারের যুগে সেই মিষ্টি স্মৃতিগুলো এখন আত্মার যাদুঘরে বন্দি দুস্প্রাপ্য অমূল্য সম্পদ ছাড়া আর কী? সন্দেহ নেই আমাদের ছেলেবেলায় দেখা পয়লা বৈশাখ আর এই নব্য আধুনিক পয়লা বৈশাখের মধ্যে কতই না ব্যাবধান? তখনকার দিনে নিশ্চয়ই এখনকার মত এতসব টেকনোলজি, বাহারি জীবন যাপন আমাদের ছিল না! তবে আমাদের যা ছিল তা ছিল নির্মল আনন্দ আর ভালোবাসায় মাখামাখি একটা সময়। সে কারনেই পয়লা বৈশাখ মানেই কিছু মিষ্টি স্মৃতি, একটা দীর্ঘশ্বাস, বাবার তর্জনী ধরে দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার এক অনবদ্য গল্প। এই স্মৃতিগুলো নিত্যই আমাদের বুক পকেটে জোনাকি পোকার মত ইতিউতি ঘুড়ে বেড়ায়। বলতে পারেন এই স্মৃতি আছে বলেইতো বেঁচে আছি, এখনো পথ চলি, জীবনকে এত ভালোবাসি! বিখ্যাত তার্কিশ লেখক ওরহান পামুক তাঁর গ্রন্থ ইস্তাম্বুল গ্রন্থে এই নষ্টালজিক দীর্ঘশ্বাসকেই বলেছেন, ”Sweet Melancholy”” বাংলায় করলে হয় ”মিষ্টি বিষাদ”। সেই ধুলো মাখা, যং ধরা, আবছা স্মৃতিগুলোকে আরেক প্রস্থ ঘষামাজা করলে কেমন হয় বলুনতো?

ছেলেবেলায় পয়লা বৈশাখের স্মৃতি মানেই হল বৈশাখী মেলা। বাংলা বর্ষকে উদযাপন করার জন্যে পয়লা বৈশাখকে সামনে রেখে এই বৈশাখি মেলার উৎপত্তি। গোটা বাংলাদেশে বৈশাখী মেলাই সবচেয়ে বড় আনন্দ উৎসবের মেলা। বিভিন্ন আয়োজন আর উৎসবে মুখর হয়ে এই নতুন বছরকে আলিঙ্গন করতে বাঙালি যেন মুখিয়ে থাকে! আমাদের গ্রামের বাড়িতে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে একটা বড় রকমের মেলা হত। স্থানীয় ভাষায় যার নাম ছিল ”বান্নি”। শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে একটা বুড়ো বট গাছকে ঘিরে বৈশাখের প্রথম দিনে বসতো এই বান্নি। বান্নির দু তিন দিন আগে থেকেই আশে পাশের বিভিন্ন গাঁও গেরামের লোকজন চলে আসতো তাদের সওদাপাতি নিয়ে। সে এক উৎসবমুখর পরিবেশ! বান্নির আগের দিন রাতে সবাই কোদাল, শাবল, দা, খুন্তি এসব নিয়ে নিজেদের ছোট ছোট দোকানপাট সাজাতে ব্যাস্ত হয়ে যেত। তখন চারপাশে এই বান্নিকে ঘিরে চলতো এক চাঁপা উত্তেজনা! বান্নি মানেই কত কত রঙিন জিসিপত্র! কত কত খেলনার সমাহার!

সত্যি, ”বান্নি” নামের এই ছোট শব্দটা কানে এলেই চোখে ভেসে উঠে এক হারিয়ে যাওয়া রঙিন উৎসবের স্মৃতি। মেলার এক পাশে আকাশে হাজার রকমের রং বেরং এর ঘুড়ির মেলা, সাদা ধবধবে বিন্নিধানের খই আর সেই সাথে স্বাদের গুড়ের জিলাপি, ছোট ছোট বাচ্চাদের হরেক রকমের খেলনা, গুড়ের সন্দেশ, মাটির তৈরি হাতি, ঘোড়া সহ বিভিন্ন জীব জন্তুর নকশা আঁকা পসরা। মেলার একপাশে বসতো বাইস্কোপ। সেই বাইস্কোপের ছোট ছোট গোল আকৃতির লাল সবুজ জানালার ভেতর মাথা সিধিয়ে আছে গ্রাম্য শিশু কিশোরের দল। আর সেই বাইস্কোপকে ঘিরে আমাদের গ্রামের কানাই লাল চোখ বুজে নেচে নেচে হাতে তাল ঠুকে ঠুকে আপন মনে গান ধরেছেন।

কি চমৎকার দেখা গেল রাজা দেখ হাইট্টা যায় বিয়া হইলো রাজকন্যার লাজুক লাজুক ক্যামনে চায়!”

কি অবাক কান্ড! কানাই লালের গানের সাথে সাথে বাইস্কোপের নানা রং এর ছবিগুলো আমাদের নাকের সামনে দোল খেতে শুরু করে দিত! আহা কি নির্মল আনন্দ! মেলার একপাশে বসতো বাটালি, চাকু, দা, বটি ইত্যাদি গৃহস্থালি জিনিসপত্র। বৈশাখ মাসে নতুন নতুন আমের কুড়ি গাছ থেকে ঝরে পরবে আর সেই আম বৈশাখী মেলা থেকে কেনা চাকু বা ছুরি দিয়ে কেটে খাবো না তাও কি হয়! বৈশাখের ঝড়ে আম কুড়িয়ে বান্নি থেকে সদ্য কেনা চাকু দিয়ে কাঁচা আম খাওয়ার আনন্দ কি আর লেখায় প্রকাশ করা যায়? আমাদের কাপাসিয়া এলাকায় প্রচুর পরিমান কার্পাস তুলার চাষ হতো। হয়তো সে কারনেই তুলার হাটটি ছিল তুলনামুলক ভাবে একটু বড়। দূর থেকে আকাশে সাদা রং এর তুলার উড়াউড়ি দেখেই বলে দেওয়া যেত যে ওটা তুলার হাট। তুলার হাটে গেলে সেই তুলা আকাশে বাতাসে উড়বে, নাসিকায় খোচা মাড়বে, বিভিন্ন রকম হাচির শব্দে বাজার গরম হবে এটাইতো স্বাভাবিক!

এবার আসি আসল কথায়! আসন্ন বান্নি কে সামনে রেখে বছরের প্রথম দিন থেকেই আমরা মাটির ব্যাংকে পয়সা জমানো শুরু করে দিতাম। পয়সা ছাড়া চলবে কেন? বাবা-মার কাছ থেকে কিছু টাকা হাতে পেতাম বটে তবে মাটির ব্যংকে পয়সা জমানোর আনন্দটাই কিন্তু অন্যরকম! চার আনা, আট আনা, পাঁচ পয়সা, দশ পয়সা। কত করমের সিকি? আহা! সেই সিকি, আধুলিগুলো কত কষ্ট করেই না জোগার হত! কখনো বাজার থেকে অতিরিক্ত পয়সাটা ঝেড়ে দিয়ে, কখনো বোনের মাটির ব্যাংক থেকে কায়দা করে সেফটি পিন সহযোগে লুকিয়ে লুকিয়ে পয়সাগুলো বের করে নিয়ে সেটা পাকা চোরের মত নিজের মাটির ব্যাংকটায় সুরুত করে ঢুকিয়ে ফেলা। কিছুদিন পরপরই মাটির ব্যাংকটা কানের কাছে এনে মৃদ ঝাকুনি দিয়ে আন্দাজ করতাম। ”পয়সা কত জমলো?” তারপর অতি উৎসাহে বৈশাখী মেলার আগের রাতে ধপাস করে মাটির ব্যংকটা ভেঙ্গে ফেলা হত। মাটির ব্যাংকটি ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই বুকের ভেতরও একটা ধপাস করে শব্দ শুনতে পেতাম। এই শব্দটি ছিল আনন্দের, উত্তেজনার! তখন শুরু হত পয়সা গোনাগুনি। আমি গুনি, দূরে আমার বোনও গুনছে। কিন্তু বোনটির মন খারাপ। কারণ তার ব্যংকের সিকি আধুলিগুলো কোন এক পাকা চোর যেন আগেই হাত সাফাই করে নিয়ে গেছে! কে এমন কাজটা করলো! এই কথা উপরে উপরে জোর গলায় বলতাম বটে কিন্তু মনে মনে প্রবল অপরাধেবোধ নিয়ে বোনটাকে সান্তনা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করতাম। কারণ এই কাজটির হোতা তো আমি নিজেই।

আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে বান্নি ছিল মিনিট তিরিশেক পায়ে চলার পথ। বৈশাখের সোনালী রোদ গায়ে মেখে আব্বা হাটছেন ফিনফিনে পাঞ্জাবী গায়ে চড়িয়ে আর আমি আমার বোন আমরা দুজনেই লাফাচ্ছি আব্বার দুপাশে চক্কর খেতে খেতে। বান্নিতে আমাদের দু দফা যাওয়া হত। প্রথমবার আব্বার সাথে খুব সকালে যেতাম নতুন গুড়ের জিলাপি আর বিন্নি ধানের খই কিনতে। সেই সাত সকালে মেলা তখনো হয়তো ঠিক মত জমে উঠেনি। তখন গরম গরম জিলাপি আর খই কিনে বাড়িতে এসে সবাই মিলে আনন্দে হৈচৈ করে বৈশাখের নাস্তা পর্ব শেষ হত। দ্বিতীয়বার যাওয়া হত বিকেলের দিকে। তখন দুর থেকেই মেলার লক্ষ জনতার গুম গুম আওয়াজ শুনতে পেতাম। সে এক উদ্ভুত শব্দ। ভুপেন হাজারিকা সেই গানের মত, ”প্রতিধ্বনি শুনি আমি প্রতিধ্বনি শুনি”। বান্নি থেকে কি কিনবো তার মোটামুটি খসড়া আগে থেকেই করা থাকতো। আমার চোখ ছিল ঢাউস ঘুড়ির দিকে। স্থানীয় ভাষায় সেই ঘুড়িকে বলতো ”ডাউস গুড্ডি”। আকাশে সব চেয়ে উঁচুতে যে ঘুড়িটা উড়তো সেই ঘুড়িটাই আব্বাকে কিনে দিতে বলতাম। আব্বা ঘুড়ি ওয়ালাকে বলতো ”এই গুড্ডিডা আসমান থাইকা নামাও তো দেখি”। আর তখন আনন্দ দেখে কে? চোখের সামনেই সাত আসমানের উপরে বসবাস করা ঘুড়িটা আমার হাতের নাগালে চলে আসতো! আর শুধুই কি ঘুড়ি? সুতা কিনতে হবে না? ঘুড়ির দোকানের পাশেই সুতার দোকান। সেখান থেকেই সূতা। যত সুতা কেনা যায় ঘুড়িটা ততই আকাশের উঁচুতে উঠবে। ঘুড়ির পরই কেনা হত মাছের পিঠের মত দেখতে চকচকে ধারালো চাকু। চাকুটা ভাঁজ করে কায়দা করে পেন্টের পকেটে ঢুকিয়ে রাখাটা এক ধরনের ”ব্যাপার” ছিল। তারপর একটা বাঁশের বাঁশি, লাল নীল নকশা কাটা হাত পাখা, বাঘের মুখোশ, সাদা চুলের ঠুনঠুনে বুড়ো এক পুতুল যে সারাক্ষণ মাথা নাড়তো, এইতো…?

আমার ছোট বোন তুলি কিনতো আলতা, ফিতা, সনপাপড়ি, লিপস্টিক, মাটির আর কাঠের রং করা পুুতুল, মাটির ছোট ছোট হাড়ি পাতিল, মাটির গরু-ছাগল, হাস-মুরগী কত কি! দুহাত বোঝাই সাধের সওদা কাঁধে নিয়ে, বাশের বাঁশিটাকে এলোপাথারি জোরে বাঁজাতে বাঁজাতে আমি আর আমার বোন আবার সেই গোধূলির ধুলা মাড়িয়ে বাড়ি মুখো হতাম। দূর থেকেই দেখতে পেতাম আমাদের ছোট্ট ঘরটার জানালার পর্দার আড়ালে আবছা আলোয় মার সেই হাসি মাখা মুখটাকে। মায়ের সেই মুখ দেখে আমাদের আহ্লাতের পরিমান যে আরো দশগুন বেড়ে যেত সে কথা না হয় আর নাইবা বললাম।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>