ফুল, অশ্রু, প্রেম-৩১ নারীর কবিতা (পর্ব-২৫) । মুম রহমান
মূলত কবি হিসাবেই পরিচিত হলেও সিলভিয়া প্লাথ [Sylvia Plath](১৯৩২-১৯৬৩) গল্প, উপন্যাসও লিখেছেন। মার্কিন এই কবি অসম্ভব মেধাবি আর স্বাধীনচেতা ছিলেন। পড়ালেখা করতে তিনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সেখানে তিনি তখনকার বিখ্যাত কবি টেড হিউজকে বিয়ে করেন। দুজনে একত্রে আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে বসবাস করতে থাকেন। তাদের দুটি সন্তানও হয়। ইতোমধ্যেই সিলভিয়া কবিতায় তার স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বরের জন্যে আলোচিত হয়ে ওঠেন। এ্যান সেক্সটনের মতো সিলভিয়া প্লাথও আত্মস্বীকৃতিমূলক কবিতা লিখতে থাকেন এবং বিষাদে ভোগেন। একাধিকবার তার আত্মহত্যা প্রবণতার চিকিৎসা হলেও শেষ রক্ষা হয় না। গ্যাসের চুলা ছেড়ে দিয়ে নিজেকে শ্বাসরুদ্ধ করে মারেন তিনি। মৃত্যুর পর ‘সংগৃহীত কবিতা’ বইয়ের জন্যে পুলিৎজার পুরস্কার পান।
আয়না
আমি রূপালী আর যথার্থ। আমার কোন পূর্ব ধারণা নেই।
যা কিছু আমি দেখি আমি তৎক্ষণাত গিলে ফেলি
ঠিক সেটা যেমন আছে, ভালোবাসা বা অপছন্দের কুজ্ঝটিকা ছাড়াই।
আমি নিষ্ঠুর নই, কেবলই সত্যবাদী-
ছোট্ট দেবতার চোখ, চারকোণা।
অধিকাংশ সময় আমি ধ্যান করি উল্টোদিকের দেয়ালে।
ওটা গোলাপি, ছোট ছোট দাগময়, আমি ওর দিকে এতো চেয়ে থেকেছি
আমার মনে হয় ও আমার অন্তরেরই অংশ। কিন্তু ওতো পরিবর্তনশীল।
মুখগুলি আর অন্ধকারেরা আমাদেরকে বারবার আলাদা করে দেয়।
এখন আমি এক হৃদ। এক নারী আমার উপর ঝুঁকে আসছে,
আমার পরিসরগুলো খুঁজে দেখছে আদতে সে নিজে কি জানার জন্যে।
তারপর সে ওই মিথ্যুকদের দিকে ঘোরে, ওই মোমবাতি কিংবা চাঁদের দিকে।
আমি তার পেছনটা দেখতে পাই, আর বিশ্বস্ততার সাথে ওই প্রতিবিম্ব তুলে ধরি।
সে আমাকে পুরস্কার দেয় কান্না আর তার টালমাটাল হস্তদ্বয়।
আমি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সে আসে আর যায়।
প্রত্যেক সকালে তার মুখই অন্ধকারকে বদলে দেয়।
আমার মাঝে সে ডুবিয়ে দিয়েছে তরুণ বালিকাকে, আর আমার মধ্যেই সে বৃদ্ধা
জেগে ওঠে তার কাছে দিনের পর দিন, যেন এক দূরন্ত মাছ।
প্রেমপত্র
যে বদল তুমি ঘটিয়েছো তা বলা সহজ নয়।
আমি যদি জীবিত থাকতাম এখন, তবে মরেই যেতাম,
যদিও, একটা পাথরের মতো, আমি বিরক্তিহীন,
অভ্যাসবশতই রয়েছি।
তুমি আমাকে টানতে পারোনি এক ইঞ্চিও, না
কিংবা আমাকে ছেড়ে দাওনি আমার ছোট্ট পলকহীন চোখ
আবার আকাশপানে তুলে ধরতে, আশাহীন, নিশ্চিতই,
আশঙ্কাময় নীলে, কিংবা নক্ষত্রদলে।
এমন ছিলো না তা। আমি ঘুমাচ্ছিলাম, বলো : একটা সাপ
কালো পাথরের মাঝে লুকিয়ে আছে একটা কালো পাথর হয়ে
এক শুভ্র উষ্ণ শীতে
আমার প্রতিবেশির মতো, কোন আনন্দ নেয়নি
লক্ষ লক্ষ নিঁখুত খাজ কাটা
গন্ডদেশে প্রতিটি মুহূর্ত গলে যায়
আমার গন্ডদেশে আগ্নেয়শিলার মতোন। তারা কান্নায় রূপান্তরিত হয়,
দেবদূতেরা কাঁদছে শুস্ক প্রকৃতির উপর,
কিন্তু আমাকে সন্তুষ্ট করেনি। সেই সব কান্না জমাট হয়ে গেছে।
প্রতিটি মৃত মাথা বরফের মুখোশ হয়ে গেছে
আর আমি ঘুমিয়েছি যেন ভাঁজ করা আঙুলের উপর।
প্রথমত আমি ছিলাম নিছক বাতাস
আর পতন রুদ্ধ করেছি শিশিরে জাগ্রত
অনাবিল আত্মার মতো। বহু পাথর শায়িত
নিবিড় আর অভিব্যক্তিহীন গোলাকার প্রায়।
আমি জানতাম না এ দিয়ে কী করা যায়।
আমি স্ফুরিত, ইঁদুরের-তুলাদন্ড, আর উদঘাটিত
নিজেকে তরলের মতো ভরে দিতে
পাখিদের পায়ের মধ্যে আর গাছেদের কান্ডে।
আমি নির্বোধ ছিলাম না, আমি তোমাকে চিনেছিলাম মুহূর্তেই।
গাছ আর পাথরেরা ঝিকমিক করে, ছায়াহীন।
আমার আঙুলের দৈর্ঘ্য বাড়ে দীপ্তিমান কাচের মতো।
আমি কুঁড়ির মতো ফুটে উঠি মার্চের ডালপালায়:
একটা বাহু আর একটা পা, আর বাহু, একটা পা।
পাথর থেকে মেঘে, তাই আমি উত্থিত হই।
এখন আমি এক ধরণের দেবতার সাথে মিল খুঁজে পাই
বাতাসে ভাসমান আমার আত্মার বদলে
খাঁটি একদম বরফের স্ফটিকের মতো। এটা একটা উপহার।
আরো পড়ুন: ফুল, অশ্রু, প্রেম-৩১ নারীর কবিতা (পর্ব-২৪)
শিশু
তোমার স্বচ্ছ চোখ হলো এক নিখাদ সুন্দর।
আমি ওকে ভরে দিতে চাই রঙে আর হাওয়ায়
নতুনদের চিড়িয়াখানায়
কার নামে তুমি ধ্যান করবে-
এপ্রিল স্নোড্রপ, ইন্ডিয়ান পাইপ,*
ছোট্ট
ডাটা কোন রকম ভাঁজ ছাড়া,
যে ছবিরা ভেসে আসে
তা হোক যেন বিশাল আর ধ্রুপদী
নয় এই অশান্ত
মোচড়ানো হাত, এই অন্ধকার
ছাদ তারাবিহীন।
* দুটোই সাদা ফুল। তবে ‘এপ্রিল স্নোড্রপ’ বিশুদ্ধতা আর শান্তির প্রতীক। অন্যদিকে ‘ইন্ডিয়ান পাইপ’ বনের গভীর অন্ধকার এলাকায় জন্মায়। কাজেই এটি শুভ প্রতীক নয়। মা ও শিশুর মিলন এবং বিচ্ছেদের প্রতীক হিসাবে হয়তো এ দুটো ছোট্ট সাদাফুল বিপরীত প্রতীক নিয়ে কবিতায় এসেছে। ‘স্বচ্ছ চোখ’, ‘নিখাদ সুন্দর’, ‘রঙ’, ‘অশান্ত’, অন্ধকার’, ‘তারবিহীন ছাদ’ ইত্যাদি বৈপরীত্য ছোট্ট এই কবিতা জুড়েই আছে। উল্লেখ করা দরকার পুত্র নিকোলাসের জন্ম এবং নিজের আত্মহত্যার কিছু আগেই এ কবিতাটি তিনি লিখেছিলেন। সিলভিয়া একদিকে দ্বিতীয় সন্তানের জন্যে নিষ্পাপ, সুন্দর পৃথিবীর কামনা করেছেন তো অন্যদিকে তার নিজের অশান্ত, অন্ধকার জীবনকে প্রত্যাখান করেছেন এ কবিতায়। সিলভিয়া প্লাথের একাধিক কবিতা বিষাদ, মৃত্যুচিন্তা যেমন আছে তেমনি মাতৃত্ব ও সন্তান ধারণের ব্যাপারটিও আছে। এইটুক টীকার প্রয়োজন ছিলো। কারণ আমি একটি অনুবাদে দেখেছি ‘এপ্রিল স্নোড্রপ’-এর বাংলা করেছেন এপ্রিলের তুষারপাত এবং ‘ইন্ডিয়ান পাইপ’-এর বাংলা হয়েছে ‘ভারতীয় পাইপ’। আরেকটি অনুবাদে দেখেছি ‘তুষারের কল্পনা- পেলব, কচি বাঁশের ডগা।’ কবিতার আক্ষরিক অনুবাদ করে পড়তে গেলে এমন বিভ্রান্তি হতেই পারে।

জন্ম ২৭ মার্চ, ময়মনসিংহ। এমফিল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা লেখালেখি।