ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল (পর্ব-৭)

আবার হেমেন্দ্রনাথের মেয়েদের কথায় ফিরে আসা যাক। প্রতিভা ও প্রজ্ঞার আরো ছটি গুণবতী বোন ছিলেন। তাঁদের সেজ বোন অভিজ্ঞাসুন্দরী বেঁচে আছেন সকলের স্মৃতিকথায়। তাকে অনেকেই দেখেননি কিন্তু যারা দেখেছিলেন তারা আর ভোলেননি। সবাইকে অবাক করা এই মেয়েটিই রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে প্রিয় ভাইঝি অভি। তার গলায় নিজের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে যেতেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। শিলাইদহে থাকতে থাকতে অভিজ্ঞার গান শোনবার জন্যে তার মন উঠত হু হু করে। ইন্দিরাকে লেখা চিঠিতেও সেই ব্যাকুলতার আভাস, অভির মিষ্টি গান শোনবার জন্যে আমার এমনি ইচ্ছে করে উঠল যে তখন বুঝতে পারলুম, আমার প্রকৃতির অনেকগুলি ক্রন্দনের মধ্যে এও একটা ক্রন্দন ভিতরে ভিতরে চাপ ছিল।

কি ছিল অভিজ্ঞার কণ্ঠে?

অকালে, নিতান্ত অসময়ে হারিয়ে যাওয়া এই কিশোরীর কণ্ঠে কোন অনির্বচনীয় মাধুরী ধরা পড়ত, কে দেবে উত্তর? যারা দিতে পারতেন তারা সবাই তো পরলোকে। শোনা গেছে, রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের গানগুলি : অভিজ্ঞার কণ্ঠে মূতি লাভ করত। হিন্দী গানও অভিজ্ঞ মর্মস্পর্শী করে গাইতে পারতেন। ছায়ানটের ঠারি রহো মের আঁখন আগে গানটি কিশোরী অভির। কণ্ঠে শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন প্রমথ চৌধুরী। ঠাকুরবাড়িতে তখন সুবর্ণযুগ চলছে। রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টির আপন খেয়ালে তন্ময়। একের পর এক লিখে চলেছেন বাল্মীকিপ্রতিভা, কালমৃগয়া, মায়ার খেলা। আর ক্লান্তিহীন কণ্ঠে তাকে রূপ দিয়ে চলেছেন অভিজ্ঞ।

করুণ গানে অভিজ্ঞার জুড়ি ছিল না। বাল্মীকি প্রতিভার পর কবি লিখলেন কালমৃগয়া! বিদ্বজ্জনসভায় আবার এলেন অতিথিরা। ১৮৮২ সালের ২৩শে ডিসেম্বর, জমাট কুয়াশাভরা শীতার্ত সন্ধ্যা। তাদের সামনে শুরু হল কালমৃগয়া। বাল্মীকিপ্রতিভায় আত্মপ্রকাশ করেছিলেন প্রতিভা, এবার মঞ্চে অবতরণ করলেন অভিজ্ঞ। লীলার ভূমিকায় অভিজ্ঞর অভিনয় দেখে অনেকেই সেদিন চোখের জল রাখতে পারেননি। এই অভিনয়ে রবীন্দ্রনাথ সেজেছিলেন অন্ধমুনি আর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ দশরথ। কিন্তু অভিজ্ঞার অভিনয় সবার মনে যতটা দাগ কেটেছিল তার কাকারাও ততটা পারেননি। ভারতবন্ধু কাগজের সমালোচক লিখেছেন, লীলার গান শুনলে পাষাণ হৃদয়ও বিগলিত হয়।

অভিজ্ঞার পাষাণ-গলানো গনি আর শোনা গেছে বাল্মীকি প্রতিভা অভিনয়ের সময়ে। হাত বাঁধা বালিকা সেজে তিনি যখন গাইলেন, হা কী দশা হল আমার তখন বাঙালী দর্শকরা কেঁদে ভাসিয়ে দিলেন–এ একেবারে অবনীন্দ্রনাথের নিজের চোখে দেখা। আরো কিছু দিন পরে অভিজ্ঞ একটু বড় হয়েছেন। কণ্ঠে মাধুরীর সঙ্গে মিশেছে দরদ। ভালবাসার কুঁড়ি ধরল তাতে রবীন্দ্রনাথ এবার লিখলেন মায়ার খেলা। কথা ও সুরের সত্যিকারের মিলন হল যেন। তাকে আরো সুন্দর করে তুলল অভিজ্ঞার কণ্ঠ। ইন্দিরা ও তার স্বামী প্রমথনাথের সাক্ষ্যে জানা যায়, অভিজ্ঞ এ,সনে বসে বাল্মীকিপ্রতিভা বা মায়ার খেলার সমস্ত গান গাইতে পারতেন। বাল্মীকি প্রতিভার সমস্ত গান অভিজ্ঞার মতো মর্মস্পর্শী করে গাইতে প্রমথনাথ আর কাউকে শোনেননি। অপর দিকে মায়ার খেলার গান শুনে বহু দিন পরে প্রায়-বৃদ্ধ অবন ঠাকুরের স্মৃতি উদ্বেল হয়ে ওঠে, হায়, যে ওসব গান গাইবে সে মরে গেছে। সেই পাখির মতো আমাদের ছোট বোনটি চলে গেছে।…সে সুরে যে গাইত সে পাখি মরে গেছে। অভিজ্ঞা তাই স্মৃতি হয়েও যেন স্মৃতি নন। যে একবার তার গান শুনেছে সে-ই তাকে মনে রেখেছে।

মায়ার খেলায় অভিজ্ঞ নিতেন শান্তার ভূমিকা। শান্তার করুণ-মধুর বিষণ্ণতা অভিজ্ঞার কণ্ঠে জীবন পেত। পরে বির্জিতলায় আরেকবারের অভিনয়ে ইন্দিরা নিয়েছিলেন শান্তার ভূমিকা, কারণ শান্তার ভূমিকাভিনেত্রী তখন আর ইহলোকে নেই। অভিজ্ঞ ছিলেন শান্ত, গম্ভীর, রোদনভরা বিষণ্ণ। দেহ বলে তার কোন জিনিষ ছিল না, মুখের মধ্যে দুটি বড় বড় জীবন্ত চোখ ছিল। আর সে চোখ দুটি মাধুর্যপূর্ণ। নিষ্ঠুর শিকারীর অব্যর্থ লক্ষ্যভে েরিত হয়েছিল। বুঝি পাখির মতো কোমল হৃদয়। কালব্যাধি যে তলে তলে বাসা বেঁধেছে সে কথা কেউ বুঝতেই পারেনি। বিয়ের রাতে ঘটল অঘটন। অনুষ্ঠানের শেষেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। হঠাৎ জ্বর, প্রবল জ্বর। দিনে দিনে অসুখ বেড়ে চলে এবং জানা যায় দুরারোগ্য ক্ষয় রোগ তাকে গ্রাস করে ফেলেছে। চিকিৎসার অসাধ্য। কৃশপাণ্ডুর চাঁদের মতোই একমাসের মধ্যে হারিয়ে গেলেন অভিজ্ঞ। মৃত্যু হল জোড়াসাঁকোর বাড়িতেই। চিকিৎসক স্বামী বধূকে আরোগ্য করবার সুযোগই পেলেন না।

অভিজ্ঞার মৃত্যুতে সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের। সেই প্রথম পরীক্ষা-নিরীক্ষার যুগে অভিজ্ঞার মতো প্রতিভাময়ী গায়িকা বেঁচে থাকলে কবি প্রয়োগের দিক থেকেও রবীন্দ্রসঙ্গীতকে প্রতিষ্ঠা দিতে পারতেন। কিন্তু সে বুঝি হবার নয় তাই অকালে ঝরে পড়ল অস্ফুট কোরটি, অকালে নিভে গেল বাংলা দেশের একটি রত্নপ্রদীপ। অভিজ্ঞার মৃত্যুর পরে কবি চারটি সনেট লিখেছিলেন— নদীযাত্রা, মৃত্যুমধুরী, স্মৃতি ও বিলয়। নতুন করে কবির যেন মনে পড়েছিল মৃত্যুমাধুরীমাখা দুটি আশ্চর্য সুন্দর চোখ আর প্রভাত-পাখির মতো সুমধুর কণ্ঠের অধিকারিণী অভিজ্ঞাকে। এখানে একটা কথা বলে নিই। কবিমানসী গ্রন্থের লেখক জগদীশ ভট্টাচার্যের মতে এই সনেট চারটি কবির নতুন বৌঠানের স্মৃতিসুধায় ভরপুর। কিন্তু একথা মেনে নিতে পারিনি। ক্ষিতিমোহন সেনের ডায়রিতে যে চৈতালি কাব্য আলোচনার অনুলেখন রাখা আছে তাতেও দেখা যাবে কবি এই সনেটগুলো সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, আমার ভাইঝি অভির মৃত্যুর পরে লেখা। অভিজ্ঞার মৃত্যুর পরে আর একজনও তার কথায় উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি আর কেউ নন, প্রমথ চৌধুরী, যিনি কোন রকম ভাবালুতাকে প্রশ্রয় দেওয়া অনাবশ্যক মনে করতেন। তার কাছেও অভিজ্ঞ একটি বিস্ময়! তার মনে হয়েছিল অভিজ্ঞ সেক্সপীয়রের কল্পিত আরিয়েলের সগোত্র। অর্থাৎ অশরীরী সঙ্গীত। বারো তেরো বছর বয়সের এই কিশোরী তার মনে স্থায়ী ছাপ রেখে গিয়েছিলেন, জীবনে কোন কোন লোক প্রথম থেকেই আমাদের মনে বিশেষ ছাপ রেখে যায়, যা কখনো বিলুপ্ত হয় না। অভি ছিল সেই দু-চারটি লোকের ভিতর একজন। প্রমথনাথের মনে হয়েছিল, ইংরেজরা বলে whoin the gods love die young। অভি ছিল সেই দেবানাং প্রিয় একটি বালিকা। কেননা সে কখনো কিশোরী হয়নি।

সময় কারুর জন্যে বসে থাকে না; অভিজ্ঞার ঠিক পরের বোন মনীষাও বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর দিদির রবীন্দ্রসঙ্গীতে এত নাম কিন্তু তিনি বেছে নিলেন বিদেশী যন্ত্রসঙ্গীতকে। বড়দিদি প্রতিভার মতো তিনিও খুব ভাল য়ুরোপীয় গান এবং পিয়ানো বাজাতে পারতেন। পরে পিয়ানোর দিকেই ঝোঁক থাকায় এদেশের শ্রেষ্ঠ পিয়ানিস্টদের একজন হয়ে ওঠেন। তবে ভারতে মনীষা খুব পরিচিত ছিলেন না। কারণ আর কিছুই নয়, বিদেশী সঙ্গীতের চর্চা। অন্যান্য বোনেদের মত তিনিও লরেটোয় পড়তেন, বাড়িতে চলত ক্লান্তিবিহীন সঙ্গীতসাধনা। তবু দেশী গানের সঙ্গে তার অন্তরের যোগ ছিল না বললেই হয়। প্রতিভা গাইতেন বিলিতি গান, পিয়ানোয় বাজাতেন ওস্তাদি বাজনা, পরে তার ঝোঁক পড়ে হিন্দুস্থানী গানের ওপর। কিন্তু মনীষ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পিয়ানো চর্চা করেই কাটিয়েছেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের পদপ্রান্তে রাখে সেবকে ও দু-তিনটি গানে গিয়ানোর সঙ্গত বসিয়েছিলেন কিন্তু সেগুলো তেমন জনপ্রিয় হয়নি। যেমন জনপ্রিয় হয়নি তমীশ্বরাণাং বেদমন্ত্রের পিয়ানো সংগত। এর ফলে মনীষা বাঙালীদের গানের জলসায় প্রায় অপরিচিতাই রয়ে গেছেন। আরো একটা কারণও আছে। এক সময় সাহেবিয়ানার অনুকরণে বাঙালীর ঘরে ঘরে পিয়ানোচর্চা শুরু হয়েছিল ঠিকই কিন্তু পিয়ানো কোনদিনই বাঙালীর ঘরের জিনিষ হয়ে ওঠেনি। এখন বিলিতি বাজনা সর্বস্বতার যুগ, তবু পিয়ানো, তার বিশাল আকার আর বিশাল দাম দিয়ে অভিজাত ড্রইংরুমের বাইরে বড় একটা এসে পৌঁছয়নি—তার স্থান নিয়েছে পিয়ানো-একর্ডিয়ান, গীটার প্রভৃতি ছোট ছোট বাদ্যযন্ত্র। তাই পিয়ানিস্টরাও সাধারণ সমাজে পরিচিত নন। মনীষা তার মোগ্য সম্মান পেয়েছিলেন বিদেশে।

অভিজ্ঞার মৃত্যুর পরে তার স্বামী দেবেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে মনীষার বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের মাত্র একমাস পরেই বিদায় নিলেন অভিজ্ঞা তাঁর বাসরশয্যাই মৃত্যুশয্যায় পরিণত হল। দেবেন্দ্রের সেবা তাকে ফিরিয়ে আনতে পারল না। কিন্তু বোনের মৃত্যুর পর এই উদার উন্নতমনা যুবকটিকে ভালবেসে ফেলেছিলেন অভিজ্ঞার দাদারা। তারা প্রস্তাব করলেন তাঁদের বোন স্নেহবন্ধন ছিঁড়ে চলে গেছেন, কিন্তু দেবেন্দ্র যেন না যান। মনীষার সঙ্গে দেবেন্দ্রর আবার বিয়ে দেওয়া হোক। আপত্তির কারণ ছিল না। শুধু একটু বাধা। মহর্ষি নাতনীদের বিয়েতে তিন হাজার টাকা যৌতুক দিতেন। এবার দেবেন্দ্রকে নতুন করে যৌতুক দিতে তিনি রাজী হলেন না। মনে হয়, নাতজামাইকে পরীক্ষা করবার জন্যেই। বিব্রত হলেন হিতে-ক্ষিতীন্দ্র-ঋতেন্দ্র। তাঁরা দেবেন্দ্রকে অনুরোধ জানালেন এ বিয়েতে রাজী হতে, পরে যেমন করে হোক, তাঁরা এ টাকা জোগাড় করে দেবেন। দেবেন্দ্র এসব দাবি করেনইনি, তাই বিয়ে বন্ধ হল না। সব দেখে সন্তুষ্ট হয়ে, মহর্ষিও সমস্ত টাকা দিয়ে দিলেন। ক্ষিতীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত ডায়রি মহর্ষি পরিবারে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

মনীষা স্বামীর সঙ্গেই বিদেশে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর পিয়ানোয় নিখুঁত ইংলিশ কোটেশন শুনে য়ুরোপীয়রা যেমন মুগ্ধ হয়েছিলেন তেমনি বিস্মিত ইসছিলেন, পিয়ানোয় হিন্দু মার্গসঙ্গীতের ভাব প্রকাশের স্বাচ্ছন্দ্যে। বিদেশে যারা মনীষার পিয়ানো শুনেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন মনীষী ম্যাক্সমুলার। শীষাকে লেখা তার একটি উচ্ছ্বসিত প্রশংসাপূর্ণ চিঠি আজও রবীন্দ্রভারতী মিউজিয়ামে মনীষার নিখুঁত সুরসৃষ্টির নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। তাতে জানা যায় শুধু য়ুরোপীয় সঙ্গীত নয়, ভারতীয় সঙ্গীত বিশেষত হিন্দু মার্গসঙ্গীতের বিশুদ্ধ সুরসৃষ্টি দিয়ে মনীষা সমস্ত পশ্চিমী জগৎকে মুগ্ধ করেছিলেন।

অবশ্য এদেশের সঙ্গীত-সমাজের সঙ্গেও যে মনীষার যোগ ছিল না তা নয়। প্রতিভা ও ইন্দিরা যেমন সঙ্গীত-সংঘের প্রাণকেন্দ্র ছিলেন তেমনি সঙ্গীত সম্মিলনীর প্রাণ ছিলেন প্রমদা চৌধুরী। মনীষা এই সঙ্গীত সম্মিলনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর স্বামীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবেও প্রমদার স্বামী বনোয়ারীলাল চৌধুরী পরিচিত। প্রমদার সঙ্গে ছিল মনীষার গভীর সখ্য। তাঁর স্মৃতিকথা থেকেই জানা যায়, প্রথমদিকে সঙ্গীত সম্মিলনী আনন্দ সভার মতোই একটা ক্লাব ছিল। সেই ক্লাবের সদস্যদের আগ্রহ আর ইচ্ছেতেই গড়ে ওঠে সঙ্গীত সম্মিলনী গানের স্কুল। স্কুলের পরিচালন-ভার গ্রহণ করে প্রমদা। মনীষ ছিলেন উৎসাহী সভ্য। মাঝে মাঝে যোগ দিতেন বিভিন্ন সঙ্গীত ও নৃত্যের অনুষ্ঠানে, বাজাতেন পিয়ানো কিংবা বেহালা। মনীষার লেখার হাতও বেশ ভাল ছিল যদিও তিনি খুব বেশি লেখেননি। তাঁর সাহিত্যচর্চার বিবরণ পাওয়া যাবে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার পুরনো ফাইলে। কয়েকটা প্রবন্ধ ছাড়াও তিনি লিখেছিলেন একটা নাটক। ছোটদের অভিনয় করার জন্যে। কিন্তু লেখার পরে সেটিও আর যত্ন করে তুলে রাখেননি। প্রমদার মৃত্যুর পরে লেখা স্মৃতিকথাটির ভাষাও ঝরঝরে। তিনি লিখেছেন :

তারপর আমি শিলং বাস করাতে ক্ষণিক সম্বন্ধ ত্যাগ করতে হল। মাঝে মাঝে চিঠিতেও পরামর্শ দিতুম। সময় সময় প্রমদা সম্মিলনী ছাড়ি ছাড়ি করতেন। কিন্তু আমরা ছাড়তে দিইনি। সম্মিলনী যেন তার অঙ্গ ছিল।… তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। কিন্তু এই সম্মিলনীর ছেলেমেয়েরা তার সন্তান স্বরূপ ছিল। কেউ বা মিঠাপিসী, কেউ বা জেঠিমা, কেউ বা মিঠাদিদি বলে ডাকত। সকলেই তার আদরের ছিল! বিবাহ সম্বন্ধ পাকাতে তাঁর দ্বিতীয় আর কেউ ছিল না।

মনীষা সাহিত্যচর্চার সঙ্গে সঙ্গে পুণ্য পত্রিকার মাধ্যমে মাঝে মাঝে সেলাইফোড়াইয়ের কাজও শেখাতেন। বিশেষ করে সেকালে বসবার ঘরে পুতির পর্দা ঝোলানো ছিল আভিজাত্যের লক্ষণ। ঠাকুরবাড়িতেও এ প্রথা ছিল। মনীষা সেই পর্দা সেলাইয়ের বা বোনার পদ্ধতি, নকশা প্রভৃতি ছবি এঁকে, ঘর গুণে সেলাই দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করেছেন। হেমেন্দ্রনাথের অন্যান্য মেয়েদের মধ্যেও নানা গুণের সমাবেশ দেখা গেছে। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা দেখিয়েছেন প্রগতির সঙ্গে শাশ্বতীকে বেঁধে রেখে কি করে সমাজকে গড়ে তোলা যায়। শুধু এই কারণেই বাঙালী মেয়েদের ওপর তারা যে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন আর কেউ তা পারেননি। লিলিয়ান পালিত, রমল সিংহ, রাণী নিরুপমা, সুনীতি দেবী, সুচারু দেবী, মৃণালিনী সেন ও আরো অনেকেই সেদিনকার ধনী সমাজে আলোড়ন জাগিয়েছিলেন, এনেছিলেন নতুন উদ্দীপনার জোয়ার কিন্তু তাদের প্রভাব কি পড়েছিল আমাদের সমাজে? না পড়ার কারণ, তারা ছিলেন আরো অনেক দূরবর্তিনী। বরং প্রভাব ফেলেছিলেন সরল৷ রায়, অবলা বসু, কুমুদিনী খাস্তগির, কাদম্বিনী গাঙ্গুলী, চন্দ্রমুখী বস্তু—দলে দলে মেয়েরা এগিয়ে এসেছিলেন তাঁদের মতো লেখাপড়া শিখতে।

হেমেন্দ্রনাথের পঞ্চম কন্যা শোভনাসুন্দরী। তিনি আবার গান-বাজনার চেয়ে লেখাপড়াতেই বেশি উৎসাহী। ঠাকুরবাড়িতে তখন রসের উংসে ভাটা পড়তে শুরু করেছে, একেবারে শুকিয়ে যায়নি, এমনি সময়ে শোভনা বড় হয়ে উঠলেন আপন মনে। দিদিরা ব্যস্ত গান-বাজনা ছবি আঁকা নতুন রকমের খাবারদাবার তৈরি করতে, ছোট বোনেদেরও হয়ত ওদিকেই বেকি কিন্তু শোভনা স্বপ্ন দেখেন পিসীমার মতো বই লেখার। কি সুন্দর গল্প! কেমন অবলীলায় লেখা! কি করে লেখিকা হওয়া যায়? পড়তে পড়তে শোভনা ভাবেন আর তারই ফাঁকে ইংরেজী শেখার ভিত গাঁথা হয়। হঠাৎ বিয়ে হয়ে গেল নগেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে, সুদূর জয়পুরের ইংরেজীর অধ্যাপক। বাড়ি হাওড়ায়। চার ভাইয়ের বড় ভাই রায়বাহাদুর। নগেন্দ্রনাথ মেজ। সেজ ভাই যোগেন্দ্রনাথের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল শোভনার সপ্তম বোন সুষমার। বিয়ের পর শোভনা গেলেন স্বামীর কর্মক্ষেত্রে। এক হিসেবে হয়ত ভালই হল। কলকাতার মেয়েরা তখন। এগিয়ে চলেছেন জোর কদমে। দুর্গামোহন দাসের মেয়েরা উঠে পড়ে লেগেছেন লোককল্যাণের কাজে। সরলা স্থাপন করেছেন গোখেল মেমোরিয়াল, অবলা খুলেছেন ব্রাহ্ম-বালিকা বিদ্যালয়। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা সমাজের মধ্যমণি। প্রতিভা, প্রজ্ঞা, ইন্দিরা তো আছেনই আরো আছেন হিরন্ময়ী ও সরলা। আছেন মহারাণী সুনীতি, মণিকা, সুচারু, এসেছেন হেমলতা, প্রিয়ংবদা আরো কতজন। এঁদের মধ্যে নতুন কিছু করার কথা ভাবতেই পারতেন না শোভনা। তাই অনেক দূরে, নিভৃতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পরিবেশে গিয়ে শোভনা সংগ্রহ করে আনলেন ডালি ভর্তি মরুকুসুম, সেই সঙ্গে তার লেখার হাতটি গেল খুলে। চোখ পড়ল এমন সব জিনিষের ওপর যাদের সবাই দেখেছে অথচ কেউ লেখেনি তাদের ওপর।

পত্নীপ্রেমিক নগেন্দ্রনাথ উৎসাহ দিলেন। তার মধ্যেও একটি কবিমন লুকিয়ে ছিল। মাইকেলের অনুসরণে তিনি লিখেছিলেন যক্ষাঙ্গনা কাব্য। তার আরো অনেক লেখা পাণ্ডুলিপি আকারে রয়েছে—কৃষ্ণা, মেনকানন্দিনী কাব্য, স্বর্গোদ্ধার কাব্য এবং সোনার ঢেউ নামে গল্পগুচ্ছ। কিন্তু সেসব এমন কিছু উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠেনি, তার চেয়ে শোভনার কৃতিত্ব অনেক বেশি। কি লিখবেন তিনি? স্বর্ণকুমারীর মতো গল্প? না না, সে যেন অসম্ভব। তার চেয়ে—তার চেয়ে হারিয়ে যাওয়া-লুকিয়ে থাকা উপকথা-রূপকথাগুলোকে সংগ্রহ করলে কেমন হয়? ঠাকুরবাড়ির মেয়ে, গ্রাম বাংলার সঙ্গে-লোকগাথার সঙ্গে পরিচয় কম। তার চেয়ে বরং জয়পুরের গল্প সংগ্রহ করা যাক। আর এমনি করেই শোভন সত্যিকারের পথ খুঁজে পেলেন। পুণ্য পত্রিকায় ছাপা হল ভিন্ন স্বাদের, ভিন্ন পরিবেশের কয়েকটা গল্প—ফুলাদ ডালিমকুমারী, গঙ্গাদেব, লুব্ধবণিক তেজারাম, দিলীপ ও ভীমরাজ, লক্ষটাকার এক কথা। সবই জয়পুরী গল্পের ছায়ায় লেখা। প্রথমটা মনে হল, স্বর্ণকুমারীর মতোই শোভন টডের রাজস্থান থেকে গল্প সংগ্রহ করেছেন। আসলে কিন্তু তা নয়। শোভনা মন দিয়েছিলেন উপকথা সংগ্রহে। পরে তিনি জয়পুরী প্রবাদ বা কছাবৎও সংগ্রহ করেন। সেই সঙ্গে মন দিলেন শিল্প ও সাহিত্য সম্পর্কেও। লেখার জন্যে লোকসাহিত্য থেকে উপকরণ নির্বাচন যে অত্যন্ত সুষ্ঠু ও মনোজ্ঞ হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। তখনকার তুলনায় তার আগ্রহ বেশ নতুন ধরনের বলা বাহুল্য। কোন মহিলা তখনও লোককথা সংগ্রহ করবার জন্যে বেরিয়ে পড়েননি তবে রূপকথা সংগ্রহের কাজে হাত দিয়েছিলেন মৃণালিনী। সব কাজে অগ্রণী ঠাকুরবাড়ির মেয়ে শোভনাই বা পিছিয়ে থাকবেন কেন? লোককথার সরণি বেয়েই তিনি পৌঁছলেন প্রাচীন ভারতের পৌরাণিক সাহিত্যের জগতে।

জয়পুরী উপকথা সংগ্রহের সঙ্গে সঙ্গে শোভনা সংগ্রহ করেছিলেন কহাবৎ বা জয়পুরী প্রবাদ। ১৯০০/১৯০১ সালে প্রবাদ সংগ্রহের দিকে অনেকেই নজর দিয়েছেন। রেভারেণ্ড লঙ এবং আরো কয়েকজন তখন বাংলা প্রবাদ সংগ্রহ করেছিলেন। তবে ভিন্ন প্রদেশের প্রবাদ সংগ্রহ করে তার অর্থ উদ্ধার, অনুবাদ এবং বাংলায় সমার্থক প্রবাদ অনুসন্ধান করে শেভিনা সত্যিই একটা নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেন। এইসব কহাবং-এ জয়পুর বা রাজস্থানবাসীর বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, ব্যঙ্গপ্রবণতা ও এ অঞ্চলের কিছু কিছু স্থানীয় বৈশিষ্ট্য ধরা পড়েছে। আজকের দিনে অর্থাৎ শোভনার কহাবৎ সংগ্রহের প্রায় আশি বছর পরেও এই ধরনের প্রবাদ সংগ্রাহকের সংখ্যা খুবই কম। এবার কয়েকটা কহাবং শোনা যাক :

মূল : কাল কী জয়োড়ী গধেড়ী, পরসো কী গীত গাবে

অনুবাদ : কাল জন্মেছে গাধা, পরশুর গীত গাচ্ছে।

অর্থ : গর্দভ জন্মগ্রহণ করিয়াই পূর্বজন্মের অভ্যাসবশতঃ অমঙ্গল ডাক ডাকিতে থাকে।

বঙ্গীয় প্রবচন : রাসভবিনিন্দিত স্বর

***

মূল : জয়পুর কী কমাই ভাড়া বলিতা খাই

অনুবাদ : জয়পুরের উপার্জন ভাড়া ও ঘুটেতে ব্যয় হয়

অর্থ : জয়পুরে ঘর ভাড়া ও রন্ধনকাষ্ঠের মূল্য বেশি

***

মূল : সীতলা কুনসা ঘোড়া দে, আপ হী গধা চড়ে

অনুবাদ : শীতলা ঘোড়া কোথা থেকে দেবে, আপনিই গাধ চড়ে

অর্থ : নিজেই পায় না পরকে দেবে।

***

জয়পুরের উপকথা-রূপকথা-প্রবাদ-প্রবচন ছাড়াও শোভনাকে আকৃষ্ট করেছিল জয়পুরী শিল্প-একেবারে ঘরোয়া শিল্প। ছেড়া কাগজ দিয়ে তৈরি ধামা, চুপড়ী, থালা, বাটি, খেলনা, পুতুলকে ওখানে বলা হয় ডোমলা শিল্প। পুণ্যর পাঠিকাদের তিনি ডোমলার কাজও শিখিয়েছিলেন। কিন্তু এগুলি সবই উপক্রমণিকা, এরপর শোভনা নামলেন তার আসল কাজে।

বাংলা ভাষা ছেড়ে তিনি ইংরেজীতে লিখতে শুরু করলেন ভারতের বেদপুরাণ-ইতিহাস-লোককথার গল্প। ব্যাপারটা খুলেই বলা যাক। শোভনা মনে করতেন গল্প লেখার ইচ্ছে থাকলেও তার কল্পনার দৌড় খুব নয়, কাজেই সৃজনশীল রচনার চেয়ে অনুবাদেই তার হাত খুলবে বেশি। তাই প্রথমে তিনি সাহস করে অনুবাদ করে ফেললেন স্বর্ণকুমারীর জনপ্রিয় উপন্যাস কাহাকে। ইংরেজী অনুবাদের নাম টু হুম। খুব যে ভাল হল তা নয়। অনুবাদকের তো কোন স্বাধীনতা নেই। স্বর্ণকুমারী নিজে যখন কাহাকের অনুবাদ করলেন এ্যান অ্যাফিনিস্ট সঙ নামে তখন সে অনুবাদ হয়ে উঠল নতুন বই। যাইহোক, একই সঙ্গে শোভনা অনুবাদ শুরু করেছিলেন পুরনো দিনের গল্পের। এই ধরনের চারটি বই ছাপা হয়েছিল লণ্ডনের ম্যাকমিলান কোম্পানী থেকে।

প্রথম বই ইনডিয়ান্ নেচার মীথস। শোভনা লিখলেন ছোটদের মনের মতো ইংরেজীতে! ছোটদের মানে এই নয় যে রসরর্জিত নীতিসারসংগ্রহ আসলে ইংরেজী ভাষাটা লিখলেন সহজবোধ্য ও সবার উপভোগ্য করে। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, বেদ, উপনিষদ এবং লোককথা থেকে পঞ্চাশটি গল্প সংগ্রহ করে শোভনা লিখেছেন নেচার মীথ্‌স্—অধিকাংশই সৃষ্টিতত্ত্বের দিকে তাকিয়ে লেখা। যেমন, দি অরিজিন অব তুলসী প্ল্যান্ট, দি অরিজিন অব ডেথ, দি অরিজিন অব ভলকানে, দি অরিজিন অব টোবাকো প্ল্যান্ট ইত্যাদি।

ইনডিয়ান ফেবস্ এ্যাও ফোকলোর একই জাতের গ্রন্থ। শোভনা এ বইয়ের গল্প সংগ্রহ করেছেন মহাকাব্য, পুরাণ, কথাসরিৎসাগর, পঞ্চতন্ত্র ও ভক্তমাল থেকে। সবশুদ্ধ গল্প আছে উনত্রিশটা। তার মধ্যে মীরাজ, ব্রাইডগ্রম (ভক্তমাল), এ র‍্যাট স্বয়ম্বর (পঞ্চতন্ত্র, একলব্য এণ্ড দ্রোণ (মহাভারত), কাউ অব প্লেন্টি (রামায়ণ) নিশ্চয় বিদেশী পাঠকদের বিস্মিত করেছিল। প্রায় প্রতিটা গল্পেই শোভনা বিস্ময়ের সঙ্গে আনন্দের খোরাক জুগিয়ে গিয়েছেন।

আর দি ওরিয়েন্ট পার্লস রূপকথা সংকলন। শোভনা জয়পুরী উপকথা সংগ্রহ দিয়ে যে সাহিত্য-জীবন শুরু করেছিলেন এখানেও তারই জের চলেছে। এবং এই চারটি বইয়েই ইতিহাস পুরাণ লোককথা সংগ্রহে অসামান্য প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। তবু সংস্কৃত সাহিত্য থেকে পৌরাণিক গল্প সংগ্রহ আর বাংলাদেশের লোকের মুখে মুখে ছড়ানো রূপকথা সংগ্রহ অন্য জিনিষ। শোভন। এ সব গল্প সংগ্রহ করেন এক অন্ধ ভৃত্যের কাছ থেকে। তিনি এই রূপকথাসংগ্রহ যদি বাংলাতেও লিখতেন তাও অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকত। সেকালে ইংরেজীতে বই লেখার চল্ মেয়েদের মধ্যে ছিল। কনভেন্টে পড়া, বিদেশিনী গভর্নেসের কাছে মানুষ হওয়া মেয়েরা য়ুরোপীয় ভাবাপন্ন হবেন এ আর বেশি কথা কি? তারকনাথ পালিতের মেয়ে লিলিয়ান, লর্ড সিনহার মেয়ে রমলা কিংবা কুচবিহারের তিন রাজকুমারী সুকৃতি, প্রতিভা ও সুধীরার কথাই ধরা যাক না কেন, তাদের চালচলনে সেদিন বিদেশিয়ানাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এঁরা লেখিকা হলে মনের কথা ইংরেজীতেই প্রকাশ করতেন তাতে সন্দেহ নেই। হেমেন্দ্রনাথের আট মেয়ে এবং ইন্দিরাও অভ্যস্ত ছিলেন বিদেশী চালচলনে। সুতরাং শোভনার পক্ষে ইংরেজীতে বই লেখা খুবই স্বাভাবিক। যেমন ইংরেজীতে কবিতা লিখেছিলেন তরু দত্ত কিংবা সরোজিনী নাইডু। সরোজিনী শোভনার সমবয়সী কিন্তু শোভনার চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত, বিশেষ করে রাজনীতিক্ষেত্রে সরোজিনীর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। তার কবিতার বই তিনটি— দি গোল্ডেন থেসোল্ড, দি বার্ড অব টাইম, ও দি ব্রোকেন উইঙ খুব জনপ্রিয়। হয়েছিল। ১৯০৫ থেকে ১৯২০ এই পনেরো বছরে গোল্ডেন থেসোরে পুনর্মুদ্রণ হয়েছিল সাত-আট বার। শোভনা এভাবে খ্যাতির চূড়া স্পর্শ করেননি, হয়ত সে ক্ষমতা তার ছিল না। কিন্তু যেটুকু তিনি দিয়েছেন তারই বা মূল্য কম কী? একেবারে প্রথম থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত যে সব ভারতীয় রূপকথা সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে দি ওরিয়েন্ট পার্ল-এর স্থান বেশ ওপরে। বাঙালী মেয়েদের মধ্যে শোভনাই সবার পূর্ববর্তিনী। আরো আট বছর পরে ১৯২৩ সালে মহারাণী সুনীতি দেবীর ইনডিয়ান্ ফেয়ারি টে লণ্ডন থেকে প্রকাশিত হয়।

শোভনার পূর্ববর্তী রূপকথা সংগ্রাহকের সংখ্যা যে খুব বেশি তা নয়। তাদের নাম—লালবিহারী দে ফোক টেল অব বেঙ্গল (১৮৮৩), রামসত্য মুখোপাধ্যায় ইনডিয়ান ফোকলোর (১৯০৪), কাশীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় পপুলার টেস্ অব বেঙ্গল (১৯০৫), দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার ঠাকুরমার ঝুলি (১৯০৭), উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী টুনটুনির বই (১৯১০), ম্যাক কুলক বেঙ্গলি হাউসহোল্ড টেস্ (১৯১২), ডি. এন. নিয়োগী টেস্ সেক্রেড এ্যাণ্ড সেকুলার (১৯১২ )। এর পরেই প্রকাশিত হয় শোভনার দি ওরিয়েন্ট পার্লস্ (১৯১৫)।

শোভনার বইয়ে রূপকথা আছে আঠাশটি। সব গল্পই শুরু হয়েছে (Once upon a time) বলে রূপকথার আমেজে। যে সব গল্প আছে তার মধ্যে আমাদের পরিচিত ও অপরিচিত উভয় ধরনের রূপকথাই পাওয়া যাবে। দি ওয়াক্স প্রিন্স, দি গোল্ডেন প্যারট, দি হারমিট ক্যাট, এ নোজ ফর নোজ, আঙ্কল টাইগার, দি ব্রাইড অব দি সোর্ড সকলের খুব ভাল লাগবে। তবে এসব রূপকথা যে বিদেশীদের একেবারে অপরিচিত তা হয়ত নয়, কারণ বিভিন্ন দেশের রূপকথার মধ্যে গল্পের অদৃশ্য যোগ চিরকালই ছিল।

আপাতভাবে স্বল্প পরিচিত টেলস্ অব দি গডস্ অব ইনডিয়াতেও নতুনত্ব আছে। এখানে দেবতাদের গল্প নির্বাচন করা হয়েছে ভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। ইদানীংকালে বাংলায় প্রেমকথা নাম দিয়ে কয়েকটি পৌরাণিক প্রেমকাহিনী সিরিজ প্রকাশ করা হয়েছে, যেমন-ভারত প্রেম কথা, রামায়ণী প্রেমকথা, গ্রীক প্রেমকথা, অরণ্য প্রেমকথা, বাইবেল প্রেমকথা ইত্যাদি। এই লেখকদের অনেকেই হয়ত জানেন না তাদের অনেক আগে রামায়ণমহাভারত-বেদ-পুরাণ থেকে যুগল প্রেমের উৎস সন্ধান করেছিলেন শোভন। ভারতের দেবদেবী সংক্রান্ত বইটির জন্যে শোভনা সংগ্রহ করেছেন তিরিশটি গল্প। তিনি কোথা থেকে কোন গল্প নিয়েছেন তার উংস নির্দেশ করতেও ভোলেননি। নাম নির্বাচনও সুন্দর। ঋগ্বেদ থেকে তিনি নিয়েছেন পাচটি গল্প–দ্য ও পৃথিবী, যম ও যমী, ঋভুভ্রাতৃদ্বয় ও উষা, অশ্বিনীকুমারদ্বয় ও সূর্যা এবং বিবস্বান ও সরণু। মহাভারত থেকে সংগ্রহ করেছেন আরো চোদ্দটি গল্প। সে গুলি আমাদের খুবই পরিচিত, যেমন, পুরুরবা ও উর্বশী, সংবরণ ও তপতী, রুরু ও প্রমঘরা, সোম ও তারা, বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতী, ইন্দ্র ও শচী, সাবিত্রী ও সত্যবান, বিষ্ণু ও লক্ষ্মী, শিব ও সতী, মদন ও রতি, অর্জুন ও উলু সী, ভীম ও তার রাক্ষসী বধূ, বলরাম ও রেবতী, দময়ন্তী ও তার দেব পাণিপ্রার্থী। রামায়ণ থেকে নেওয়া হয়েছে রাম ও সীতার গল্প, এবং অগ্নি ও স্বাহার গল্প। শতপথ ব্রাহ্মণ থেকে নেওয়া হয়েছে চ্যবন ও সুকন্যা এবং মিত্র, বরুণ ও অসির আখ্যান! কালিদাসের কাব্য থেকে শোভনা নিয়েছেন কুমারসম্ভব, অভিজ্ঞান শকুন্তলম্ এবং মেঘদূতের গল্প। যম ও বিজয়ার কথা নেওয়া হয়েছে ভবিষ্যপুরাণ থেকে এবং বেহুলা ও লখীন্দরের কাহিনী মনসামঙ্গল থেকে তিনি সংগ্রহ করেন। কোন কোন গল্প দু-তিনটে বইয়ে আছে বলে তিনি তাদেরও উল্লেখ করেছেন, যেমন বিষ্ণু ও লক্ষ্মী আছে মহাভারত ও বিষ্ণুপুরাণে, আবার শিব ও সতী আছে মহাভারত ও ভাগবতপুরাণে। গল্প নির্বাচনে এবং তার উৎস নির্দেশে শোভনার এই সাবধানতা বিস্ময়কর। পরবর্তীকালে এই বইটি যতই দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে এই জাতীয় গল্পের চাহিদাও ততই বেড়েছে।

শুধু ইংরেজী বই লেখা নিয়েই ভুলে থাকেননি শোভন। শেষজীবনে আবার বাংলা রচনায় হাত দিয়েছিলেন য়ুরোপ ভ্রমণ সেরে ফিরে আসার পরে। তাঁর কয়েকটি ভ্রমণবৃত্তান্ত য়ুরোপে মহাসমরের পরে, লগুনে, রণক্ষেত্রে বঙ্গমছিলা ও মহাযুদ্ধের পর প্যারী নগরীতে নামে বিভিন্ন পত্রিকার প্রকাশিত হয়। তাছাড়া তিনি মেতে উঠেছিলেন স্কুল নিয়ে। ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েদের স্কুল খোলার নেশা এক আশ্চর্য নেশা। সেই নেশা ছিল শোভনারও। তার নিঃসন্তান জীবনের অনেকখানি কেটে যেত হাওড়া গার্লস স্কুলের তত্ত্বাবধানে। স্কুলে তিনি পড়াতেন ইংরেজী। এখনও ঐ স্কুলে তার নামাঙ্কিত একটি রৌপ্যপদক স্কুলের সেরা ছাত্রীকে প্রতিবছর দেওয়া হয়। এ ছাড়াও তিনি খুলেছিলেন একটা ছোট্ট গানের স্কুল। বেশ চলছিল। আকস্মিকভাবে সব শেষ হয়ে গেল। সন্ন্যাস বোগে মৃত্যু হল শোভনার। শোকার্ত পত্নীপ্রেমিক নগেন্দ্রনাথের লেখা একটি শোকগাথা প্রেমাঞ্জলি নামে ছাপা হল, রবীন্দ্রনাথ তার ভূমিকায় লিখেছিলেন একটি ছোট্ট কবিতা শোভনা।

শোভনাসুন্দরী ও সুষমাসুন্দরী—দুটি কর্মব্যস্ত বোনের মাঝখানে একটু ক্ষীণ। যতির মতো ছিলেন সুনৃতা। হেমেন্দ্রনাথের মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে অপরিচিত। তাঁর জীবনদীপও নিভেছিল অভিজ্ঞার মতো নিতান্ত অসময়ে। তবে অভিজ্ঞার মতো ভাগ্যবতী নন তিনি! মৃত্যুর পরেও অভিজ্ঞ বেঁচে ছিলেন সবার স্মৃতিতে, সুনৃতাকে তার নিকট আত্মীয়রাও মনে রাখেনি। হয়ত দীর্ঘদিন বেঁচে থাকলে তিনিও কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতিভার পরিচয় দিতে পারতেন। এখন তার সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানা যায় না। তার স্বামী নন্দলাল ঘোষাল ছিলেন বারুইপুরের প্রসিদ্ধ ঘোষাল পরিবারের সন্তান। পরে অবস্থা বিপর্যয়ে তাদের চলে যেতে হয় শ্যামনগরে। সুনৃতার সঙ্গে বাপের বাড়ির যোগ ছিন্ন হয় দারিদ্র্য ও দূরত্বে। তবে সুন্বত এখনও বেঁচে আছেন পুণ্য পত্রিকার পুরনো ফাইলে। আছেন নন্দলালও। তারা দুজনেই সাহিত্যানুরাগী এবং পুণ্যর লেখক-লেখিকা ছিলেন। তাঁদের প্রাকৃবিবাহপর্বে পূর্বরাগ-অনুরাগ ছিল কিনা জানা যায়নি। অবশ্য সুনৃতার মন ছিল প্রজ্ঞার মতো গৃহিনীপণার। তার ইচ্ছে ছিল পুণ্যর মাধ্যমে পাঠিকাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবেন নানারকম মুখরোচক আচার। আমের আচার, কুলের আচার, তেঁতুলের আচার প্রভৃতির প্রস্তুত প্রণালী প্রকাশ করতেন সুনৃতা। সাহিত্য জগতে তার ভীরুকুষ্ঠিত প্রবেশ একটিমাত্র রচনা নিয়ে ব্রহ্মে শূলীনাথ। বর্ষায় শূলীনাথ শিব খুব বেশি পরিচিত নন। তথাগত মন্দিরের প্রাধান্যের মধ্যে শূলীনাথ কোন রকমে নিজের অস্তিত্বটুকু বাঁচিয়ে রেখেছেন। সুন্বত তার খবর পেলেন কি করে? বৌদ্ধ-প্যাগোডার বদলে পুরনো মন্দিরের প্রতি আগ্রহ দেখে মনে হয় তিনি ঝুকেছিলেন মন্দির-শিল্প ও তার বৈশিষ্ট্যের দিকে। কিন্তু একটির বেশি প্রবন্ধ লেখা হয়ে ওঠেনি।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত