Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

বাংলায় সেন বংশের সূচনা

Reading Time: 3 minutes

অনিরুদ্ধ দত্ত

প্রায় চারশো বছরের পালবংশীয় রাজাদের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১১৬২ খ্রীষ্টাব্দে সেন রাজবংশ বাংলায় রাজত্ব কায়েম করে।যদিও পাল রাজবংশের আমলেই ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দেই সেন বংশের রাজা ‘বিজয় সেন’ রাজত্ব কায়েম করতে সক্ষম হয়েছিলেন।কিন্তু তখনও সমগ্র বাংলাদেশের উপর অধিকার পাল রাজাদেরই ছিল।পাল রাজবংশের অন্তিম দশায়,১১৬০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সেন বংশের দ্বিতীয় রাজা ‘বল্লাল সেন’ প্রকৃত অর্থে বাংলার রাজা হয়ে ওঠেন।এই কারণে পাল রাজবংশের পরে সেন রাজাদের শাসনামল ধরা হয়।আর এই বংশের শেষ রাজা ‘লক্ষণ সেন”এর রাজত্বকালে,আনুমানিক ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দে ‘ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজি’ লক্ষণসেনকে পরাজিত করে তাঁর রাজধানী ‘লক্ষণাবতী’ দখল করেন।এরপর ‘লক্ষণ সেন’ পূর্ববঙ্গে পালিয়ে যান। ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করলে তাঁর দুই পুত্র যথাক্রমে ‘বিশ্বরুপ সেন’ এবং ‘কেশব সেন’ কিছুদিন সেখানে রাজত্ব করেন। ১২৩০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে এই রাজবংশের রাজত্ব পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়।’বিশ্বরুপ সেন”এর তাম্রশাসনে ‘সূর্যসেন’ ও ‘কুমারপুরুষোত্তম সেন”এর উল্লেখ রয়েছে।সম্ভবত এঁরা ‘বিশ্বরুপ সেন”এর পুত্র ছিলেন।তবে এঁদের কেও রাজত্ব করেছিলেন কিনা তা জানা যায় না।ঐতিহাসিক ‘মিনহাজ’ যে সময় লক্ষণাবতীতে আসেন(১২৪৪-৪৫ খ্রি:) তখনও লক্ষণসেনের বংশধরগণ পূর্ববাংলায় রাজত্ব করছিলেন।সুতরাং মনে হয় কেশবসেনের পরেও একাধিক সেন রাজা পূর্ববাংলায় রাজত্ব করেছিলেন।তবে তাদের রাজা না বলে জমিদার বলাই বোধহয় সমীচীন হবে।

সেনবংশীয়রা বাঙলার বাইরে থেকে এসেছিলেন।সেনবংশের লিপি থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য লক্ষ্য করা যায়।একটি লিপি থেকে জানা যায় যে, ‘সামন্ত সেন’ বাংলাদেশে বসবাসকারী সেনরাজবংশের প্রথম পুরুষ।আবার অন্য একটি লিপিমালা হতে মনে হয় যে, সামন্তসেনের পূর্বেই সেনবংশ রাঢ় অঞ্চলে নিজেদের বসতি স্থাপন করেছিল।এই সকল তথ্যের সামঞ্জস্য বিধান করে ঐতিহাসিক ‘রমেশচন্দ্র মজুমদার’ বলেছেন, “কর্ণাটের এক সেনবংশ বহুদিন যাবত রাঢ়দেশে বসবাস করছিলেন,কিন্তু তারা কর্ণাটদেশের সাথেও সম্বন্ধ রক্ষা করে আসছিলেন।এই বংশের সামন্তসেন যৌবনে কর্ণাটদেশে বহু যুদ্ধে শৌর্যবীর্যের পরিচয় দিয়ে এই বংশের উন্নতির সূত্রপাত করেন।” এই সূত্রে বলা যায়,সেনবংশীয়রা দাক্ষ্যিণাত্যের কর্ণাটদেশ হইতে আগত।তবে কি কারণে তাঁরা বাংলায় এসেছিলেন তা সুনিশ্চিত নয়।

প্রথমত অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে, সেনরা কর্ণাট হতে বাংলায় এসে পালরাজাদের অধীনে চাকুরি গ্রহণ করেছিলেন।পালরাজা ‘দেবপাল'(৮১০-৮৫০ খ্রি:) থেকে ‘মদনপাল'(১১৪৪-১১৫২ খ্রি:) পর্যন্ত,পাল লেখমালায় উল্লিখিত কর্মচারীর তালিকায় নিয়মিতভাবে ‘গৌড়-মালব-খসহূণ-কলিক-কর্ণাট-লাট-চাট-ভাট’ প্রভৃতি জাতির লোকজন নিয়োজিত হতো বলে উল্লেখ আছে।লিপিসাক্ষ্য থেকে মনে হয়,পালরাজারা গৌড়,মালব,খস প্রভৃতির ন্যায় কর্ণাটগণকেও সৈনিক বা কর্মচারী পদে নিযুক্ত করতেন।ঐতিহাসিকদের মতে, হয়তো কর্ণাটাগত সেনবংশীয় কোনো একজন কর্মচারী শক্তি সঞ্চয় করে পালরাজাদের দুর্বলতার সুযোগে স্বীয় আধিপত্য স্থাপন করেন।এই ধরনের উক্তি নৈহাটি তাম্রলিপিতে প্রদত্ত হয়েছে।এতে বলা হয়েছে যে,চন্দ্রবংশীয় অনেক রাজপুত্র রাঢ় দেশের অলঙ্কারস্বরূপ ছিলেন এবং তাদেরই বংশে ‘সামন্ত সেন’ জন্মগ্রহণ করেন।এতে মনে হয় পাল রাজাদের সময়ে তাঁদের সৈন্যবাহিনীতে কর্ণাটের চন্দ্রবংশীয় রাজপুত্ররা নিয়োজিত ছিলেন এবং যুদ্ধবিশারদ হিসেবে তাঁদের যথেষ্ট সুনাম ছিল।এমনই কোনো পদে নিয়োজিত থেকে ‘সামন্ত সেন’ সামন্তপ্রভু হতে পেরেছিল।

কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেন যে,কর্ণাটাগত সেনরাজাগণের পূর্বপুরুষ দক্ষিণাগত কোনো আক্রমণকারী রাজার সাথে বাংলায় এসেছিলেন।এই সম্পর্কে উত্তর-পূর্ব ভারত আক্রমণকারী চালুক্যরাজ ‘ষষ্ঠ বিক্রমদিত্য’ ও ‘প্রথম সোমেশ্বর’এর নাম উল্লেখযোগ্য।চালুক্যরাজন্যদের এই ধরনের আক্রমণের ফলে উত্তর বিহার ও নেপালে ‘নান্যদেব’ এবং উত্তরভারতে ‘হাহাড়বাল’ বংশ শাসনক্ষমতা লাভ করেছিল।তাঁরা উভয়েই কর্ণাটদেশীয় ছিলেন।

তবে একথা প্রমাণিত যে,’সামন্তসেন’ সেন রাজবংশের প্রথম ঐতিহাসিক ব্যক্তি।ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে,কর্ণাটে বিভিন্ন যুদ্ধবিগ্রহ করে শেষ বয়সে গঙ্গাতীরে বসতি স্থাপন করেন এমনও হতে পারে।হয়তো যুদ্ধ বিগ্রহের পর ধর্মপ্রাণ সেন বংশের পূর্বপুরুষ ‘সামন্তসেন’ গঙ্গাতীরবর্তী বনে শান্তি ও সাধনার যায়গা বেছে নিয়েছিলেন যেখানে তোতাপাখিদেরও বেদের সমস্ত বক্তব্যের সঙ্গে পরিচয় ছিল।দেওপাড়া প্রশস্তিতে এমন ইঙ্গিত দেওয়া আছে।সম্ভবত তিনি ধর্মীয় সাধনার জন্যই এসেছিলেন,কাজেই কোনো রাজ্য প্রতিষ্ঠার কথা শোনা যায় নি।এই কারণেই বোধহয় সেন লিপিমালায় তাঁর কোনো রাজ্য প্রতিষ্ঠা অথবা রাজকীয় উপাধি গ্রহণের ইঙ্গিত নেই।এই কারণেই তাঁর পৌত্র ‘বিজয় সেন”এর অথবা তাঁর বংশধরদের লিপিতে তাঁর নামের সাথে কোনো রাজকীয় উপাধি ব্যবহৃত হয়নি।

“হেমন্ত সেন” : সেনবংশীয় রাজপুরুষ বলতে ‘হেমন্ত সেন”এর নাম প্রথম পাওয়া যায়।তিনি ছিলেন ‘সামন্ত সেন”এর পুত্র।’বিজয় সেন”এর ব্যারাকপুর তাম্রশাসনে ‘হেমন্ত সেন”কে ‘মহারাজাধিরাজ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।এই রাজকীয় উপাধি থেকে ঐতিহাসিকরা ‘হেমন্ত সেন”কে সেন রাজবংশের প্রথম রাজা বলে আখ্যায়িত করেছেন।কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তখনও পালবংশীয়দের রাজত্ব বাংলাতে অটুট ছিল।সম্ভবত তিনি পালবংশীয় শাসনামলে একজন সামন্ত ছিলেন।’বিজয় সেন”এর ব্যারাকপুর তাম্রশাসনে ‘হেমন্ত সেন”কে ‘রাজরক্ষা সুদক্ষ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।এই উক্তি থেকে ‘হেমন্ত সেন’ পালবংশীয় রাজাদের আমলে খুব বিশ্বস্ত সামন্ত ছিলেন বলে মনে করা হয়।এই একই শিলালিপিতে ‘বিজয় সেন”এর মাতা ‘যশোদাদেবী”কে মহারাজ্ঞি উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।

যা হোক না কেনো ‘হেমন্ত সেন”এর পুত্র ‘বিজয় সেন’ ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দে সামন্ত থেকে রাজা হয়ে উঠেছিলেন।

 

তথ্যসূত্র : বাংলাদেশের ইতিহাস-রমেশচন্দ্র মজুমদার। ভারতের ইতিহাস-অতুলচন্দ্র রায়,প্রণবকুমার চট্টপাধ্যায়। উইকিপিডিয়া।

           

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>