| 17 জুলাই 2024
Categories
নক্ষত্রের আলোয়

আধুনিকতার উত্তরাধিকার ও বিনয় মজুমদার । অরুণেশ ঘোষ

আনুমানিক পঠনকাল: 12 মিনিট

কবি কবি চেহারার এক কমবয়স্ক যুবক আমার কাছ থেকে র্যাঁবো নিয়ে যায়। জোর করেই নিয়ে যায়, বলে, দুঘণ্টা পর দিচ্ছি। সত্যি সে দুঘণ্টা পর বই হাতে, দেখি, আমার সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে। বলে, এরকম লেখা আমিও লিখতে পারি, বাজি ধরুন, এই আমি লিখে দিচ্ছি। নির্বোধ এই ছেলেটির প্রাপ্য ছিল একটি চপেটাঘাত এবং পরে একা একা পড়ে উঠি বিনয় মজুমদারের কিছু কবিতা, তাহলে আমিও বলে উঠবআহ্, এ লেখা তো আমিও লিখতে পারতাম। এই লেখা আমি কেন লিখি না?হ্যাঁ, বিনয় মজুমদার একটা সময়ে এই স্তরে উন্নীত হয়েছেন। সমস্ত জটিলতা অতিক্রম করে এক সরলতায়। যে সারল্য সব সৃষ্টিশীল কবি, শিল্পীর এক স্বপ্ন, এক দুর্লক্ষ্য হয়ে থাকে সারাজীবন। র্যাঁবো বলেছিলেন, ‘সারল্য কাঁদাল আমায়’। ঈপ্সিত এই সারল্য কি বিনয়ের সামনে কুয়াশা ও ধোঁয়াশাময় উন্মাদাগারের দরজা খুলে দিল?
বিনয় মজুমদার উন্মাদ হয়ে গেলেন কেন? বিশেষ করে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ ফিরে এসো, চাকা-র প্রকাশের পর?মনে হয় ওই গ্রন্থ লিখে ওঠার পরই তাঁর মধ্যে উন্মাদের লক্ষণ দেখা দেয়। কেন? প্রেমে ব্যর্থ হয়ে? শুধু প্রেমে ব্যর্থ হয়ে একজন আধুনিক মানুষ উন্মাদ হয় না আর আত্মহত্যাও করে না। এটা ঠিক কারণানুসন্ধান নয়, এ হল একজন কবির পেছনের প্রেক্ষাপটের আকাশে-বাতাসে কোনো বর্ণ ও গন্ধ আছে, তারই অনুসন্ধান। নজরুল উন্মাদ হয়েছিলেন রক্ত ও নার্ভঘটিত অসুখে। বিনয়ের উন্মাদ হওয়া সম্পূর্ণ মানসিক ব্যাপার এবং সময়েরও। যে সৃষ্টিশীল আত্মা তাঁর নিজের সময় থেকে শুরু করে, তাঁর বর্তমানকে, তাঁর সমসাময়িক বোধ ও বিশৃঙ্খলাকে লেখায় তুলে নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে চোখ তুলে তাকায় বা পিছন ফিরে অতীতকে দেখে নেয়, তাঁর সংকট আরও বেশি। বিগত শতাব্দীগুলোতে যেসব সফল কবি লেখকদের আমরা জানি, তারা তাঁদের মধ্যে অনেকেই উত্তপ্ত বর্তমানকে কিছুটা জুড়োতে দিয়েছেন, তারপর তাঁদের সৃষ্টিতে সেই সময়কে এনেছেন। জীবনানন্দকেও তাঁর স্ব-সময় ক্ষতবিক্ষত করেছিল, অথচ তিনি শুরুতেই নিজের সময়কে বুঝেছেন, বুঝেছেন ক্ষত সেরে গেলেও ত্বক মসৃণ হয়ে থাকবে, তাতে রোমোদ্গম হবে না। এই যে অজানা, গভীরতর অন্তর্স্রোতকে জেনেও বিনয়ের জিজ্ঞাসা ছিল ভবিষ্যতের অন্ধকারকে বিজ্ঞান কতটা আলোকিত করতে পারবে! সেই জিজ্ঞাসা…
কম বয়সে আমি ভাবতাম, আঁর্তো’র পর আর কোনো কবির উন্মাদ হওয়া চলবে না। কাফ্কা’র পর আর বিষণœতা নয়। নয় দস্টয়েভ্স্কি’র পর আর নির্বাসনও। নয় জীবনানন্দের সেই লাশকাটা ঘরের লোকটির মতো আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া। প্রতিটি স্রষ্টাকে সৃষ্টি করতে হবে, লিখে যেতে হবে, যদি তাঁর লেখা কেউ না ছাপে তবুও। হয় লেখো বা আঁকো, নয় কারখানার ভোঁ বাজলে কারখানায় যাও। অন্য কোনো পথ নেই। এরকম ভাবতাম আমি। কিন্তু পৃথিবী ঘুরে ঘুরে একই জায়গায় আসতে চায়, ঠিক সেই জায়গায় নয়, তবে সেই পুরনো সময়ের মতন নতুন সময়। বিনয় মজুমদারকে আমরা উন্মাদ হয়ে উন্মাদাগারেও যেতে দেখলাম। আর এই উন্মাদ অবস্থার মধ্যেও তাঁকে লিখে যেতে হল জেলখানার অসুস্থ কয়েদির মতন, কাঠকয়লা দিয়ে রংচটা দেয়ালে দেয়ালে।
বিনয় মজুমদারের জিজ্ঞাসা ছিল, বিজ্ঞানের কাছে, কবিতার কাছে আর জীবনের কাছেও। তিনি হতে পারতেন বৈজ্ঞানিক, তিনি হতে পারতেন খ্যাতনামা একজন গণিতজ্ঞ কিন্তু তিনি হলেন হয়ে উঠলেন অবশেষে এমনই একজন কবি, যিনি অসহায় অসুস্থ ও ভারসাম্যহীন। বিনয় যদি বিজ্ঞানের ছাত্র না হয়ে সাহিত্যের ছাত্র হতেন, হয়তো-বা তিনি সুস্থ থাকতেন। কিংবা কবিতার বীজ যদি তাঁর রক্তে প্রবেশ না করত। কবিত্ব তাকে বৈজ্ঞানিক হতে দেয়নি, বিজ্ঞানচেতনা তাঁকে কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশে এক অমোঘ বাধা দিয়েছে। এই দুই টানাপড়েন-এর মধ্যেই তিনি হারিয়েছেন তাঁর মানসিক ভারসাম্য। এর সঙ্গে আরও কিছু জটিলতা থাকবে, তবে এটা একটা বড় দিক, আমার মনে হয়। কবিতা ও বিজ্ঞান একমুখী হয়নি তাঁর ক্ষেত্রে, হয়েছে পরস্পর দুই বিপরীতমুখী তীব্র টান। বাইরের বাধা আত্মপ্রকাশকে দুর্বার করে, ভেতরের বাধা স্রষ্টাকে স্তিমিত ও দুর্বল করে দেয়। আঁতোয়া আঁর্তো কবিতা লিখতে বসে কী দুঃসহভাবে টের পেতেন তাঁর শব্দগুলো কেউ চুরি করে বসে আছে। কী রকম হতে পারে তাঁর সেই না-লেখা রাত্রিগুলো? প্রথম উদগিরণে আগ্নেয়গিরির মুখ খুলে গেছে, তারপর জ্বালামুখের নিচে কঠিন একটা স্তর পড়ে গেছে, ভেতরের জ্বলন্ত লাভা টগ্বগ্ করে ফুটছে কিন্তু তা স্তরটা ফাটিয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারছে না। সে জানে, মুখটা সম্পূর্ণ খোলা, শুধু এটুকু চ‚র্ণ করতে পারলেই মুক্তি। সেটুকুই হয় না। ফিরে এসো, চাকা-র পর কোন পথে? কোন দিকে? প্রকৃতি-পরিত্যক্ত শিশু এখন কী করবে? বিনয় মজুমদারের পেছনে জীবনানন্দের মুখ উজ্জ্বল, এ তিনি অস্বীকার করেননি। জীবনানন্দকে নিয়ে একটি সনেটই তিনি লিখেছেন,
ধূসর জীবনানন্দ, তোমার প্রথম বিস্ফোরণে
কতিপয় চিল শুধু বলেছিল, ‘এই জন্মদিন’
এই কবিতার শেষ দিকটা লক্ষ করার মতন,
… সংশয়ে সন্দেহে দুলে দুলে
তুমি নিজে ঝরে গেছো, হরিতকী ফলের মতন

এই অনুভব শুধু জীবনানন্দ সম্পর্কেই নয়, এ যেন তাঁর নিজের ভবিষ্যৎকে এক বিদ্যুৎঝিলিকের মধ্য দিয়ে এক মুহূর্তের জন্য দেখা। তাকেও ওইভাবে হরিতকি ফলের মতো ঝরে যেতে হবে, সংশয়ে সন্দেহে দুলে দুলে, জীবনের শোভা দেখতে দেখতে। অথচ বিনয় মজুমদার জীবনানন্দের অনুকরণ করেননি। অনুসরণ করেছেন, এরকমও বলা যাবে না। যেমন রবীন্দ্র-অনুসারী কবিরা রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করেছিলেন। তিনি শুধু তাঁর সময়ে টের পেয়েছেন, জেনেছেন তাঁর বোধ ও জ্ঞান দিয়ে, ‘এখনো রয়েছে, চিরকাল রয়ে যাবে’ বুঝেছেন ‘সংগোপনে লিপ্সাময়ী’ ওই চেতনাপ্রবাহ, ওই বোধ। এই যে জানা, তা অন্য কারোর কাছে তেমন কারোর কাছে তেমন স্পষ্ট ছিল না। তাঁর সমসাময়িক কবি যারা, তাদের মধ্যে হয়তো কেউ কেউ জীবনানন্দের দূর প্রসারিত অদৃশ্য থাবার অস্তিত্ব অস্পষ্টভাবে টের পেয়েছিলেন মনে হয়, সঙ্গে সঙ্গে এ-ও ভেবেছেন এড়িয়ে যাওয়া যাবে এই আধুনিকতাকে, এই সময়কে। ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’এ যেন নির্মম সত্য। তাঁর চেয়েও নির্মম সত্য, সকল কবির সময়চেতনা থাকে না ভবিষ্যৎকে দেখার দৃষ্টি অতীতকে মুহূর্তে বুঝে নিয়ে আত্মস্থ হওয়ার। জীবনানন্দের সময়ের পর এটা কোন সময়? বিনয় মজুমদার বুঝেছিলেন, এ সময় নিজের কাছে সরে আসার, আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার সময়। বুঝেছিলেন ফিরে এসো, চাকা লিখতে শুরু করার আগে, কিন্তু তারও পরে রয়ে গেছে দীর্ঘপথ…।
বিনয় মজুমদার, উৎপলকুমার বসু, গদ্যলেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এই তিনজনই উঠে এসেছিলেন জীবনানন্দের জমি থেকে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই তিনজনই সাহিত্যের নতুন রূপ কী হবে এই প্রশ্নে বিভ্রান্ত হয়েছেন। উৎপলকুমার বসু লেখা বন্ধ করেছেন। সন্দীপন সিরিয়াস লেখা ছেড়ে এমন কিছু লিখতে শুরু করেছেন, যা আমাদের কাজে লাগে না। আর বিনয় আধুনিকতাকে বর্জন করে প্রবেশ করতে চাইলেন ক্লাসিক চেতনায়। ফিরে এসো, চাকা-র কবিতা পড়তে পড়তে আমার মনে পড়েছে, অদ্ভুতভাবেই মনে পড়েছে, মধুসূদনকে। তাঁর সেই ভাষার দৃঢ়তা, তাঁর সেই আত্মবিলাপ যেন এই কবিতাগুলোর মধ্য দিয়ে রয়ে গেছে। অর্থাৎ তাঁর রোমান্টিক চেতনার সাথে সাথে এক ক্লাসিক চেতনাও তলায় তলায় প্রবাহিত ছিল শুরু থেকেই। তবু বলা যায় ফিরে এসো, চাকা লেখার সময় তাঁর বিশ্বাসটা ভেসে গেল মনে হয়। সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করলেন ‘মাংসরন্ধনকালীন গন্ধ’কে। ভুলে গেলেন ‘বেদনার্ত মোরগের নিদ্রাহীন জীবন’। তিনি হতে চাইলেন সেই সৌন্দর্যের পূজারি, যা ধ্রæপদী। কিন্তু আধুনিক মানুষ তো তা হতে পারে না। এক-আকাশ ব্যর্থতা যেন তাঁকে গ্রাস করল। আমি ভেবেছি এটা হল কেন? উত্তরটা তৎক্ষণাৎ খুঁজে পাইনি। পরে বুঝেছি, আমাদের কবিতায়, গদ্যে যতটা আধুুনিকতা ছিল ছোট একটা গÐির মধ্যে, ব্যক্তিমানুষের মাধ্যেও। যে মধ্যবিত্ত নি¤œমধ্যবিত্ত সমাজ থেকে কবি-শিল্পীরা উঠে আসেন, সেই সমাজ জীবনানন্দকে গ্রহণ করল ঠিকই; কিন্তু রবীন্দ্রনাথের নাম আগে বসিয়ে তারপর বসাল জীবনানন্দের নাম। তাঁকে এককভাবে গ্রহণ করল না। বরং বলা যায় তারা জীবনানন্দকে সম্মান জানিয়ে রবীন্দ্রনাথের দিকে মুখ ফেরাল, মানসিকভাবে আধুনিক জীবনের প্রতি তাদের আর আকর্ষণ রইল না। ধূর্জটিপ্রসাদ বিষ্ণু দে প্রসঙ্গে একবার দুঃখ করে বলেছিলেন, বাংলায় কোনো ইন্টেলেকচুয়াল ক্লাস গড়ে উঠল না। সেভাবেই বলা যায়, এখানে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে আধুনিকতার শিকড় প্রসারিত করতে পারল না। প্রশ্ন এসে যায়, আধুনিকতাটা কী? আধুনিক জীবন, আধুনিক মানসিক জীবনটা কী? আমরা জীবনানন্দ থেকে যে কবিতার ধারা তাকে আধুনিক বলি। সুধীন দত্ত, বিষ্ণু দে ও সমর সেন সম্পূর্ণ আধুনিক নন। তাঁরা আধুনিকতার সমসাময়িক। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও। ‘বোধ’, ‘আট বছর আগের একদিন’ ও সোমেন পালিতের অনুভ‚তি ও জীবন জিজ্ঞাসা যে চেতনা থেকে উঠে এসেছিল, সেই চেতনা জীবনানন্দের সহযাত্রী অন্য কোনো কবির, মানসিকতায় সম্পূর্ণভাবে ছিল না। আংশিকভাবে ছিল, টুকরো টুকরোভাবে। তাঁরা জীবনানন্দের সমসাময়িক এবং আধুনিক। যা হোক, নতুন একটা চেতনা জন্ম নিল। নতুন চেতনার সঙ্গে সঙ্গে নতুন অনুভ‚তি ক্ষমতা ও উপলব্ধির ক্ষমতাও চলে আসে। এসে গেল। পার্থক্য হয়ে গেল রবীন্দ্রচেতনার সাথে। কিন্তু এই নতুন চেতনা, যার নাম আমরা দিয়েছি, আধুনিকতা, তা আবদ্ধ থাকল একটা ছোট গÐির মধ্যে। ব্যক্তিমানুষের মধ্যে। এটাই নিয়ম, নতুনতর বোধ যখন প্রথম কোনো ব্যক্তিমানুষ নিয়ে আসে, তা প্রথমে ছোট একটি জায়গাতেই থাকে। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে। আমরা দেখলাম, ডবলিউ বি ইয়েট্স-এর কাছ থেকে প্রেরণা পেয়ে জীবনানন্দ প্রবেশ করলেন আবহমান গ্রামবাংলায়। লিখলেন ‘ধূসর পাÐুলিপি’। দেখা গেল, বিস্মিত হয়ে দেখা গেল, আমাদের গ্রাম-বাংলায় আধুনিকতার উৎস বিদেশ হলেও তার কাঁচামাল একেবারে ঘরের পাশের। জীবনানন্দের শৈশব ও কৈশোরের বরিশাল যথেষ্ট। তাঁকে নাগরিক হতে হবে না, তাঁকে কলকাতা শহরে এসে বাস ধরতে হবে না। বরং কলকাতার কবি সমর সেনের কবিতায় দেখা গেল চমক, চাতুর্য ও তারল্য। এক ফিকে আধুনিকতা। জীবনানন্দ আমাদের সামনে একজন আধুনিক মানুষকে এনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। তিনি সোমেন পালিত। ‘জুহু’ কবিতার সোমেন পালিত প্রথম আধুনিক বাঙালি, কী দেখলাম আমরা?
নিজের মনের ভুলে কখন সে কলকে খড়গের চেয়ে
ব্যাপ্ত মনে করে নিয়ে লিখেছে ভ‚মিকা, বই সকলকে
সম্বোধন করে।
কখন সে বাজেট-মিটিং, নারী পলিটিক্স, মাংস
মার্মালেড ছেড়ে,
অবতার বরাহকে শ্রেষ্ঠ মনে করেছিল;
এবং আরও
সান্টাক্রুজে সবচেয়ে পররতিময় আত্মক্রীড়
সে ছাড়া তবে কে আর? যেন তাঁর, দুই গালে নিরুপম
দাঁড়িয়ে ভিতরে
দুটো বৈবাহিক পেঁচা ত্রিভুবন আবিষ্কার ক’রে তবু ঘরে বসে আছে

এই সেই ‘পররতিময় আত্মক্রীড়’ বাঙালি ভদ্রলোক। ‘কলমকে খড়গের চেয়ে ব্যাপ্ত’ মনে হয়েছিল যার। ভুল হয়েছিল। যে বিষণœ বিমর্ষ পায়ে অতিক্রম করেছে, ‘বাজেট মিটিং, নারী, পার্টি-পলিটিক্স, মাংস মার্মালেড’। তারপর? তারপর ‘অবতার বরাহকে শ্রেষ্ঠ মনে করেছিল’। আমরা হতবাক। কিন্তু এই আধুনিক মানুষটির জীবনে, এ তো নির্মম সত্য। তাঁর দুই গালে দুই বৈবাহিক পেঁচা। মার্কস ও ফ্রয়েড। দুই বেয়াইমশাই, কেউ কারোর মুখ দেখেন না। অর্থ ও অনর্থ দুই পুত্রকন্যার সঙ্গে শুভাতীত পরিণয় ঘটিয়ে পৃথিবীর দুই পিঠে, দুই দিকে নিজের ঘরে বসে আছেন। জ্ঞান সম্পূর্ণ, আবিষ্কার শেষ কিন্তু কোথাও তাঁদের আশ্রয় মেলেনি। এই ত্রিকালজ্ঞ পেঁচকদ্বয়কেও বহন করেন সোমেন পালিত। কবিতায় স্পষ্ট করে বলে দেওয়া না থাকলেও আমরা অনুভ‚তি দিয়ে বুঝতে পারি, বাংলার এই যুবকের শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল দূর গ্রামে। তারপর, জীবনের বড় একটা অংশ তারই রাজধানী কলকাতায়। আজ সে, “সান্টাক্রুজ থেকে নেমে অপরাহ্নে জুহুর সমুদ্র পারে গিয়ে/ কিছুটা স্তব্ধতা ভিক্ষা করেছিল সূর্যের নিকটে গিয়ে…/ সমাজ, দর্শন, দর্শন, তত্ত¡, বিজ্ঞান হারিয়ে।”
আধুনিকতার প্রথম শর্ত যে ঈশ্বরে অবিশ্বাস, যে সংশয়, সেখানেই সোমেন পালিত থেমে থাকেননি। হারিয়েছে সমাজ, দর্শন, তত্ত¡ ও বিজ্ঞান। এমনকি ‘প্রেমকেও যৌবনের কামাখ্যার দিকে ফেলে’ আজ সমুদ্র ও সূর্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন সম্পূর্ণ নগ্ন একটি মানুষ। আবার ফিরতে চায় বিশ্বাসে? এই সমুদ্র, সূর্য, ফেনা ও বালি এখানে নতজানু হবে সে? মিশে যাবে ভিড়ে, ফিরে যাবে প্রকৃতির কাছে?না কোনোটাই সম্ভব নয় আর। তাই সে উপস্থিত। উপস্থিত মুন্সি, সভারকর, নিরম্যান এই সব স্ট্যাচুদের দ্বারা। এই তিন স্ট্যাচু, তিন দৃষ্টিকোণ থেকে নেমে এসে কৌতুকের সঙ্গে দেখে গেল তাকে।
সোমেন পালিতের অগ্রজ যে, সেই ‘আটবছর আগের একদিন’-এর অহেতুক-অতৃপ্ত নায়ক, আত্মহননকামী, যে পড়ে আছে লাশকাটা ঘরের নোংরা জড় টেবিলে জড় ও বীভৎস হয়ে, তাকে এখানে টেনে আনিনি। তাকে আমাদের আর কাজে লাগে না, যে আত্মহত্যা করে, পৃথিবী থেকে চলে যায়, শুধু তার বিধ্বংসী চেতনাটুকু আমাদের ঝাপ্টা বাতাসে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। আমাদের কাজে লাগে যে বেঁচে আছে, তাকে। সোমেন পালিত যে সবকিছু হারিয়েছে সে কিন্তু কিছুই হারায়নি। সবকিছু হারিয়ে সে খুঁজে পেয়েছে নিজেকে।
কেন সোমেন পালিতের এই দীর্ঘ অবতারণা? আমি কি পাঠককে বোঝাতে পেরেছি জীবনানন্দ-পরবর্তী আধুনিক জীবন, আধুনিক মানুষ ও লেখা কেমন হবে, কেমন হতে পারে আভাসমাত্র? আমি একটি ধারাবাহিকতা রাখতে চেয়েছি, যেটি স্বাভাবিক ও সত্য। আমাদের পূর্ববর্তী যারা, অর্থাৎ বিনয় মজুমদার, উৎপলকুমার বসু ও গদ্যলেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এই আধুনিকতায় সবসময় বিশ্বাস রাখতে পারেননি। সম্পূর্ণ উপলব্ধি করতে পারেননি, এটা কোন সময়। যে জন্যে এই সংকট। কারোর লেখা থেমে গেছে, কেউ শুধু একরকম স্টাইলকেই লেখা বলে চালাতে চান। আর বিনয় মজুমদার, সারা জীবনের সুস্থতার বিনিময়েও কেন খুঁজে পান না কোনো স্থির বিশ্বাস। তাঁকেই আমরা সংশয়ে সন্দেহে দুলতে দেখি। একবার ভাবেন, আধুনিকতা সত্য, আরেকবার ধ্রæপদী চেতনা। বুঝতে পারেন না কোন দিকে যাবেন।
কিন্তু আমি যখন পড়ি তাঁর লেখা, তা একজন আধুনিক পাঠক হিসেবেই পড়ি। আমার জীবনের বাস্তবতা ও কল্পনার সঙ্গে মিলিয়ে।

দুই
সকল ফুলের কাছে এত মোহময় মনে হবার পরেও মানুষেরা কিন্তু মাংসরন্ধনকালীন ঘ্রাণ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।
আশৈশব আমি নদী, অরণ্য, ফসল, ফসলের মাঠ আর দূর দিগন্তরেখায় নীল পর্বতরেখা নিয়ে যে নিসর্গ তার মধ্যেই বাস করে আসছি। নদীর বুকের পাশে যে ভিজে বালি, তার উপর দিয়ে হেটে গেছি বাঁকের দিকে। মনে হয়েছে বাঁকটা ঘুরলেই আমি আবিষ্কার করব নদীগর্ভ নগ্ননীল পর্বতমালার পাথুরে শিকড়। বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পর বৈশাখের স্বচ্ছ আকাশে কুয়াশা কেটে যাওয়ার পর হেমন্তের আলো ছড়িয়ে পড়া সকালে, এত কাছে মনে হয়েছে সেই পর্বতমালাকে। রাতে, মাঠে ঝোপের পাশে ঘাসের উপর শুয়ে দেখেছি দূর দূরান্তের নক্ষত্র, ছায়াপথ। প্রশ্ন করেছি নিজেকে, ওরা তোমার কে? তোমাকেও দেখছে ওরা? তুমি যেতে পার ওদের কাছে? এসবের মধ্যে বাস করেও ভুলে গেছি আকাশ, নক্ষত্র, নদী ও পর্বতমালাকে। ভুলে গেছি ফল, ফসল ও ফুলকে। আবার হয়তো কোনো এক মুহূর্তে বিদ্যুচ্চমকের মতো মনে পড়েছে এসব, ফিরে যেতে চেয়েছি কাছে। কিন্তু সমস্ত বিস্মৃতি ছাপিয়ে মনে যা উঠে আসে, তা আমার প্রথম যৌন-অভিজ্ঞতার স্মৃতি। যার মধ্যে এই নদী পর্বত প্রান্তরের ও দূর নক্ষত্রাকাশের সৌন্দর্য নেই। যা সৌন্দর্যহীন কিন্তু মাদকতাময়। যে অভিজ্ঞতা চটচটে আঠার মতো কিন্তু তা একমাত্র। আকর্ষণীয় মাংসরন্ধনকালীন গন্ধ।
সে ছিল এক গ্রীষ্মের দুপুর। আমার সেই বয়স, যে বয়সে কিশোর-কিশোরীরা যৌনতাকে ঘৃণা করে। অপবিত্র মনে করে। অন্যসব কিশোরের মতো আমিও ভেবেছি, জীবনে বিবাহ নয়। আমিও নারীদের চোখের দিকে তাকাতে পারি না সোজাসুজি। তাদের থেকে দূরে থাকি। এমনকি কথা বলি না আমার দিদি-স্থানীয়া যুবতীটির সঙ্গেও। যে মায়ের অসুস্থতার জন্য আমাদের রান্না করে খাওয়াচ্ছে, সংসারের কাজকর্ম করছে। আমিও টাইফয়েড থেকে উঠেছি কিছুদিন। আমার চেয়ে বয়সে বড়, নাম ছিল মায়া। আমি কথা না বললে কী হবে, সে আমাকে হাসাতে চায় নানান তুচ্ছ ও রসালো কথাবার্তা বলে। সে আমার পিছু নেয়। সেই দুপুরবেলা আমি যখন বইপত্র ছড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি নিঃসাড়ে, সেই ঘুমের মধ্যে সারা শরীরে এক চাপ অনুভব করি। ঘুমের ভিতর থেকে মনে হয়, একটা ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস ফুলে ফুলে ওঠা তুলোর পাহাড় আমাকে আপাদমস্তক নিচের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তলিয়ে যাচ্ছি আমি। ঘুম ভেঙে যায়, টের পাই ঝড় শুরু হয়ে গেছে, এক নগ্ন শরীরের ঝড়। গরম নিশ্বাস আছড়ে পড়ছে আমার মুখের উপর। মুহূর্তে বুঝে যাই সব। মায়ার নগ্ন শরীর আমার উপর, ঘুমের মধ্যে আমাকেও সে নগ্ন করে দিয়েছে। অস্থির উত্তেজনায় কাঁপছে সে, কানের কাছে মুখ এনে কিছু বলতে চায়, পারে না। আমিও দ্বিধাগ্রস্ত, সংশয়ের মধ্যে ফুলি কিছুক্ষণ। কী করব বুঝতে পারি না। একদিকে শরীর জেগে উঠেছে, অন্যদিকে মন নিঃশব্দে চিৎকার করে ওঠে, না, না, না। কিন্তু সে তো তার উন্মাদনাকে এক জায়গায় থামিয়ে রাখতে পারে না। আমাকে নিশ্চেষ্ট দেখে মায়া নিজেই শুরু করে দিয়েছে। মুহূর্তে আমি সিদ্ধান্ত নেই, প্রচÐ এক ধাক্কায় তাকে সরিয়ে দিই, সে এটা ভাবতেই পারেনি। আমার শরীরের জেগে ওঠা দেখে মনে করেছে, আমার সম্মতি রয়েছে। এক অর্ধসঙ্গমের ভয়াবহ অবস্থা থেকে আমি নিজেকে উদ্ধার করি। উঠে বসি। লাফিয়ে মেঝেতে নামি, দ্রæত পোশাক পরে নিই। ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে যাবার মুখে দেখি, মায়া দলাপাকানো একটি মাংসপিÐ হয়ে, এক কুকুরকুÐলী হয়ে বিছানার কোণে পড়ে আছে। আমি তাকে ধ্বংস করেছি। কয়েকটা দিন দুজনে মুখোমুখি হই না আর, সে আমাকে ভাত বেড়ে দেয়আমি মুখ নিচু করে খাই, তার পায়ের দিকেও দেখি না। তীব্র ঘৃণার পরিবর্তে আমার মধ্যে অনুতাপ জমে ওঠে, আমার মনে হয় আমি তার প্রতি অবিচার করেছি। আমি ঠিক করিনি, ভুল করেছি। আমি নিজেকে, অক্ষম কাপুরুষএইসব বলে গাল দিই। আমার আকাক্সক্ষা প্রবল হয়ে ওঠে। বুঝি এক রহস্যময় জগতের দরজা থেকে আমি নিজেকে ফিরিয়ে এনেছি। আমি প্রায় ভেঙে পড়ি। অবশ্য বাইরে সেটা কাউকে বুঝতে দিই না। মায়া কিন্তু ভেঙে পড়ে না, ভেবেছিলাম, সে চলে যাবে আমাদের বাড়ি ছেড়ে। আমাকে ঘেন্না করে চলে যাবে। আমাকে দেখে মুখ বাঁকিয়ে হাসবে কিংবা ভ্রæ কুঁচকে দুচোখে বিষদৃষ্টি এনে তেরছা তাকাবে। কিন্তু সে থেকে যায় আমাদের এখানেই, আবার আস্তে আস্তে আমার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে নিতে চায়। করে নেয়, যেন ধীর চিকিৎসায় একজন রুগীকে সে সারিয়ে তুলছে, এরকমভাবেই সে আমার ঘনিষ্ঠ হয় আবার। এর পরের এক রাত্রিবেলা সুযোগ পেয়ে যায় সে। আমিও যেন সেই সুযোগের অপেক্ষায়। আর কোনো প্রতিরোধশক্তি নেই আমার। আমাদের মিলন হয় এক ভয়, অন্ধকার, ঘাম ও আঁশটে গন্ধের মধ্যে। দীর্ঘ মিলন। এরপর আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি, মনে পড়েনি একে অন্যকে, কোনো বেদনাবোধ নেই, বিরহ নেই। হয়তো এ দেহই শুধু, শুধুই দেহ। তারপর জীবনের দীর্ঘপথ ধরে হেঁটে এসেছি।
ভালবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে
অবহেলা করে আমি দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে
ঘৃণা করে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে
আমারে সে ভালবাসিয়াছে
আসিয়াছে কাছে
উপেক্ষা সে করেছে আমারে,
ঘৃণা করে চলে গেছেযখন ডেকেছি বারে বারে।

তবু পাহাড়, নদী, প্রান্তর ও প্রেম অতিক্রম করে, ভুলে গিয়ে, আমি সেই স্মৃতির কাছে ফিরে যাই। একমাত্র তাঁর কাছে। যে স্মৃতি আমার শুধুই, ‘মাংসরন্ধনকালীন’ স্মৃতি।
জীবনে ব্যর্থতা থাকে, অসম্পূর্ণ মেঘমালা থাকে
বেদনার্ত মোরগের নিদ্রাহীন জীবন ফুরালো।

‘বেদনার্ত মোরগের নিদ্রাহীন জীবনযাপন’ করছেন কবি নিজেই। এখনো ফুরিয়ে যাননি তিনি। মৃত্যুতে হারিয়ে যাওয়ার আগে তাঁর এই জাগ্রত জীবন। কিন্তু ওই লাইন দুটি পড়ার পর আমার সামনে ভেসে উঠেছিল টুনীবাবুর মুখ। এখনো ভুলতে পারি না তাঁকে। অল্প কয়েকবার দেখা হয়েছিল তাঁর সাথে। প্রথমবার এই মফঃস্বলে শহরের ভাটিখানায়। দুপুরবেলা। ভাটিখানাটি যথারীতি এক দরিদ্র গণিকাপল্লির মধ্যে, যেমন থাকে অন্যান্য ছোট শহরে। টুনীবাবু, আমার নামের সাথে পরিচিত, সেটা জানান। জানান, তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয় না কারণ তিনি দুপুরবেলাতেই মদ খেতে আসেন। তাঁর পোশাকি নাম, মানবকুমার, বলেন তিনি। বলেন, তাঁর দুটো যাত্রা নাটকের বই তাঁর বন্ধু চুরি করে নিয়ে নিজের নামে ছাপিয়েছে। সে দুটো তখনকার বিখ্যাত ও জনপ্রিয় যাত্রাপালা। আমি উপভোগ করছিলাম তাঁর কথাবার্তা। তিনি তখন চ‚ড়ান্ত মাতাল, কিন্তু মাথা খাড়া রেখে নির্ভুল উচ্চারণেই কথা বলছিলেন তিনি। কিছুক্ষণ পরেই একজন গৃহস্থ-রমণীকে দেখা যায় গণিকাপল্লির সীমানায়। সঙ্কোচবশত সে গণিকাপল্লির মধ্যে ঢুকতে পারছেন না। কিন্তু তাঁর মুখে উদ্বেগ ও লজ্জা। দু-একটি যুবককে কিছু বলেন তিনি, তারা ছুটে আসে টুনীবাবুর কাছে। মহিলা, টুনীবাবুর স্ত্রী। টুনীবাবু ৬০ হাজার টাকায় তাঁর দোকান বিক্রি করে এসে, সেই টাকা নিয়ে ভাটিখানায় এসে বসেছেন। তিনি তাঁর টাকার ‘খুতি’ কোমর থেকে খুলে, সেই টাকা ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন নর্দমায়, রাস্তায় ও গলিতে। মাতাল, গণিকা ও বেজন্মা শিশুদের মধ্যে। একটুও মাতাল মনে হয় না তাঁকে।
এ ঘটনার আরও কিছুদিন পর তাঁর সাথে দেখা। সন্ধ্যার অন্ধকারে একটা ভেজা গামছা গায়ে জড়ানো, অন্য একটা ভেজা গামছা পরনে। কোনো ভ‚মিকা না করেই আমাকে বলেন, আসেন। ‘কোথায়’, ‘কেন’ এসব প্রশ্ন আর তাঁকে করি না, নীরবে পিছু নিই। তিনি হাঁটতে থাকেন গণিকাপল্লির বিভিন্ন গলি দিয়ে। মেয়েরা তখন সবেমাত্র সেজেগুজে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। টুনীবাবুকে দেখে মেয়েদের মধ্যে অদ্ভুত এক চঞ্চলতা দেখা দেয়। কেউ ‘কাকু কোথায় যাবেন’, কেউ, ‘ভালো আছেন, দাদা’ কেউ ‘তৃপ্তিকে একবার দেখে যান, ও হয়তো বাঁচবে না’ কমবয়সী অনেকেই এসে নিচু হয়ে প্রণাম করল। টুনীবাবু কারোর কোনো কথার উত্তর দিল না, হাঁটাও থামালেন না। কোনোদিকে তাঁর ভ্রæক্ষেপ নেই, সামনের দিকে তাকিয়ে তিনি হেঁটে চলেছেন। পেছন পেছন প্রায় অস্তিত্বহীন আমি। সব গলি ঘুরে এসে, যেখান থেকে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম, সেখানে এসে দাঁড়াই। টুনীবাবু মাথা সামান্য কাৎ করে, সামান্য হেসে, বিদায় নেন। আমাদের মধ্যে আর কোনো কথা হয় না। এরও পর অনেকদিন পর, তাঁর সাথে দেখা হয় শহরের নতুন গজিয়ে ওঠা এক ব্যাংকের সামনে, হাতে লটারির টিকিট। ছিন্ন পোশাক। ময়লা ন্যাকড়ার মতন ধুতি পরনে, মুখটা টকটকে লাল, ফোলা। তিনি হাঁটতে পারছেন না ঠিক মতন। অনেক কষ্টে নিজের শরীরটাকে আমার কাছে বয়ে এনে তোতলিয়ে তোতলিয়ে বললেন, ‘আমার প্যারালাইসিস, অর্ধেক শরীর পড়ে গেছে… একটা টিকিট নেবেন’।
বেদনার্ত মোরগের নিদ্রাহীন জীবন ফুরালো
এই লাইনটিকে অনেকটা উল্টিয়ে দিয়ে মনে মনে বলে উঠলাম :
অচেতন মোরগের নিদ্রিত নিষ্ফল জীবন ফুরালো

যেন আরও বড় মহাকাশ খুলে গেল আমার সামনে। মহাশূন্যতা। যাকে আমরা কখনো তীব্রভাবে অনুভব করি। কখনো সম্পূর্ণ অচেতন থেকেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিই। মোরগের নিষ্ফলতা এত বেশি যে, প্রকৃতিও তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়নি, তার রাত্রির শেষ ঘোষণার জন্য। কতদূরে আলো তখনো কিন্তু সেই আলো আসছে, আসছে, আসছে। তাঁর গন্ধ পাচ্ছে প্রকৃতি সন্তান যেসে। তাঁর আওয়াজ, মৃদু শব্দ শুনতে পাচ্ছে। এই আনন্দসংবাদ দিতেও সে ব্যর্থ হয়েছে। ভুলে গেছে তার জীবনকে কিংবা রাতের শুরু থেকে সে জেগেছিল, কী ভয়ংকর সেই জেগে থাকা, যদি সে ঘুম থেকে জেগে না ওঠে, যদি সে দূরের আলোর আওয়াজ শুনতে ভুল করে। তার নির্ধারিত নিয়তিকে জানতে ও জানাতে ভুল করে, সেজন্যে সে আর ঘুমেও ঢলে পড়ে না। ঘুমের বিরুদ্ধে, প্রকৃতির বিরুদ্ধে সে। প্রকৃতিকে আর বিশ্বাস করে না সে।
কিন্তু এর চেয়েও বড় বিস্ময় অপেক্ষা করেছিল আমার জন্য বিনয়ের এই ভয়ংকর সৌন্দর্যময় ও জাগ্রত কবিতাবলির দু-একটি পঙ্ক্তিতে। আচ্ছন্ন পাঠক ভাবতে পারে, কবি তার জন্যই এ কবিতা লিখেছেন। আমি সেভাবেই পড়ি।
… তবু হে সমুদ্র, এ অরণ্যে কান পেতে শোনো ঝিঁঝিঁ পোকাদের রব যদিও এখানে মন সকল সময় এ বিষয়ে সচেতন থাকে না, তবুও এই কান্না চিরদিন এইভাবে রয়ে যায়, তরুমর্মরের মধ্যে অথবা আড়ালে।
সমুদ্রকে অরণ্যে ডেকেছেন কবি, অরণ্যে এসে কান পেতে শুনতে বলেছেনঝিঁঝিঁ পোকাদের রব। বই হাতে নিয়ে আমাকে যে কতক্ষণ বসে থাকতে হয় মফঃস্বলের এই ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে। আমি আমার ভেতরের ঝিঁঝিঁ পোকাদের রব যেন কান পেতে শুনছি, তার অর্থ নিগূঢ় অর্থ এই প্রথম বুঝতে পারছি। গভীর অরণ্যে যে যায়নি, কান পেতে শোনেনি সেই সম্মিলিত ঝিঁঝিঁদের একটানা রব, তাকে বোঝানো যাবে না সে কী জিনিস। জীবনে অরণ্যের ঝিল্লিরব যে শোনেনি, তাকেও বোঝানো যাবে না। ‘তবুও এই কান্না চিরদিন এইভাবে রয়ে যায়’ যাবে, যদি বোধহীন চেতনাহীন হয়ে আমাদের মন ঘুমিয়ে থাকে, যদি কেউ জেগে না থাকে, তবুও তার কান্না সে কেঁদে যাবে। গভীর অরণ্যে ঢুকেছে ট্রাক, একটি ট্রাকের সঙ্গে কিছু মানুষ। তারা অরণ্য থেকে কাঠের গুঁড়ি তুলে নিল ট্রাকে। ড্রাইভার জঙ্গলের মধ্যে বসে মদ্যপান করল, সিগারেট টানল আর কুলি-কামিনদের সঙ্গে নানান ঠাট্টা-রসিকতা করে আবার ট্রাক বোঝাই করে নিয়ে ফিরে গেল। কেউ শুনল না ওই অরণ্যক্রন্দন। জীবন-অরণ্য থেকেও এইভাবে ফিরে ফিরে যাই আমরা। কিন্তু এ কোন সমুদ্র?যাকে কান পেতে শুনতে হবে জীবন ট্রাজেডি? এই অন্তহীন ও আগ্রাসী সমুদ্র কি নয় আসলে নিঃশব্দ নিস্তরঙ্গ সময়? সময় ও সমুদ্র এখানে মিলেমিশে গেছে। উন্মাদ কলরোল, আকাশ-উঁচু ঢেউ এর সাথে চিরনিস্তব্ধ, চিরতৃপ্ত সময় ও সমুদ্র নিজেকে নিয়েই মগ্ন, নিজের মধ্যে নিজে সম্পূর্ণ। চিরতৃপ্ত এই সময়কে অরণ্যে ডেকেছেন বিনয় মজুমদার, জীবন-অরণ্যে। তাঁর ক্রন্দন তাঁর অসম্পূর্ণতা যে তাঁর তৃপ্তির চেয়ে অনেক বেশি কিছু সেজন্যেই ডেকেছেন।
আমরা যে আধুনিকতা পেয়েছিলাম সময়ের বিশেষ এক সন্ধিক্ষণ থেকে, সে তো থেমে থাকেনি। এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকেনি। সোমেন পালিত যে আধুনিক মানুষ, তার উত্তরসূরিদের মধ্যে চেতনার আরও কিছু প্রবেশ করেছে। বিনয় মজুমদার আধুনিকতায় সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে পারেননি, ফিরে যেতে চেয়েছেন ক্লাসিক সৌন্দর্যচেতনায়। আবার ফিরে এসেছেন নিজের জায়গায়, আধুনিকতায়, সেখানে তাঁর আশ্রয় মেলেনি। দ্বিধা ও সংশয় তাঁকে উন্মাদ করে তুলেছে। তবু বলব তিনি তাঁর সময়ে আধুনিকতার এক অনন্য উত্তরসূরি। একমাত্র তিনি। আর সবাই সরে গেছে, পিছিয়ে গেছে, পিছিয়ে পড়েছে। বিনয় মজুমদারের পর বাংলা কবিতার আর কোনো পিছুটান থাকল না, ক্লাসিকের প্রতি কোনো আকর্ষণ থাকল না। তার পথ সামনের দিকে।

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত