ঠিকানার কথোপকথন

Reading Time: 2 minutes
 
আমরা কী একই শহরে থাকি? অবাক বিস্ময়ে হাসতে হাসতে প্রশ্নটা করলো কানন।
হ্যাঁ, প্রায় দুুই যুগ পর ওদের কথোপকথন। একটু আগে এক্স করোলা সিলভার কালার গাড়ি থেকে নামলো ঠিকানা। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ছিল কানন। চিনতে একটুও অসুবিধে হয়নি। বেইলি রোডের নাটক পাড়ায় নাটকীয় ভাবে দেখা হয়ে গেল ঠিকানা আর কাননের। পাটের আঁশের মতো দেখতে ঠিকানার কয়েকগোছা চুলে পাক ধরেছে। কাপড়ে মাথা ঢেকে বা কলপ করে সে তার বয়স আড়াল করেনি। এখানেই ও আলাদা। যেন অন্যরকম ব্যক্তিত্ব সিঁথির উপরে ভর করেছে। পরনে জাম রঙের শাড়ি। আগের মতই ভাজগুলো বেশ পরিপাটি। হাতে একটা স্লিম পার্স। বয়সের কোটা পঞ্চাশ পেরিয়েছে, চুল না পাকলে বোঝা যেত না ওর বয়স এখন মধ্য গগনে। কানন স্বভাব সুলভ আগে বাড়িয়ে কথা শুরু করলো। 
– শাড়ি কিনতে এসেছো? 
বেইলি রোডে অনেকেই টাঙ্গাইলের সুতি শাড়ি কেনে। রুচিশীল নারীরাই প্রধানত এখানকার শাড়ির খরিদদার।
– না, না। ছোট মেয়েটা সিদ্ধেশ্বরী কলেজে পড়ে। ওকে পৌঁছে দিলাম। ভাবছি চটপটি খাব। 
ওরা একটু সামনে এগিয়ে ফুটপাতের দোকানের টুলে বসলো। রোদের তাপ মাত্রাতিরিক্ত। এই অল্প সময়ে ঠিকানার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। একটা টিসু পেপার আলতো করে নিজের কপালে ছুঁয়ে নিলো ঠিকানা। আরেকটা টিসু হাত বাড়িয়ে কাননের দিকে দিল। কানন বললো থাক ঝরতে দাও। ওটা তোমার ব্যাগেই রাখো। 
– রিজেক্ট করার অভ্যাসটা এখনো ধরে রেখেছো। 
হা হা করে হাসলো কানন। পঁচিশ বছর আগে কে যে কারে প্রত্যাখান করে ছিল! হাসিটাই যেন অতীত বলে দিলো।
– বলো, তোমার খবর? 
মধ্য বয়সে চাকুরি নেই। এটাই এখন খবর। 
– কতদিন! 
– এই মাস তিনেক। বেসরকারী চাকুরিতে জব সিকিউরিটি নেই। যখন তখন বলে দিতে পারে সে যে বয়সেই হোক! নতুন করে চাকরি খুঁজতে আর ভালো লাগে না। মাঝেমধ্যে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াই। পুরাতন দিনগুলোতে ফিরে যাই। আচ্ছা, তোমার মনে আছে- প্রভা, বিভা, অনিক, অরণ্য, হৃদয় আমরা মিলে যে গাছটা মাটিতে পুঁতে ছিলাম। জান সেটা আর নেই। তুমি যে গাছটার নীচে এসে রোজ দাঁড়াতে সেটাও। কর্পোরেশনের রাস্তা চওড়া করতে গিয়ে কাটা পরেছে। 
– কোন গাছটা? 
– কেন? সেই কৃষ্ণচূড়া। মনে নেই! যেখানে দাঁড়িয়ে ছোট্ট পারুল দৌড়ে দৌড়ে চাপা ফুল বেচতো। আমি এক তোরা ফুল তোমাকে দিতে চেয়েছিলাম তুমি নিতে চাওনি। গত পরশু ওয়ারীতে একটা কাজে গিয়েছিলাম। ওখানে না এখন অন্য একটি পথ শিশু ফুল বিক্রি করে। আমি সে দিন অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম মেয়েটার দিকে। নাম জিজ্ঞেস করিনি। ভেবেছি কি দরকার। বিশ বছর পরে এলেও দেখবো আরেকটি শিশু ফুল বিক্রি করছে হয়ত ওর-ই মেয়ে। বংশ পরম্পরায় ওদের রাস্তাতেই জীবন কাটবে! কে খোঁজ রাখে। আমি-ই বা রাখবো কেন? মেয়েটা দৌড়ে কাছে চলে এলো। ফুল দিতে চাইলো, নেই নি। আমি তো তরুণ নই। তবে মনটা খুব খারাপ হয়েছিল সেই গাছটা নেই, কেমন একটা শূন্যতা। চাকরি চলে যাওয়ার পর আমি খুব পিছনে তাকাই। এবার তোমার খবর বলো?
– আমি আপাদমস্তক গৃহবধূ। দু দুটো মেয়ে আমার। আমি ওদের সর্বক্ষণিক পাহারাদার। এতো দিন স্কুলে নিয়ে গেছি। এখন কলেজে নিয়ে যাই, নিয়ে আসি। ওদের রুটিনের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নেই। এই ধরো বাড়ির পর্দা পুরাতন হলে পাল্টাই। ডালে পাট শাক আর বোম্বাই মরিচ দিলে কেমন স্বাদ হয় ভাবীদের গল্প করে শোনাই ইত্যাদি ইত্যাদি। মাঝেমাঝে আক্ষেপ যে হয় না তা তো নয়, মনে হয় চাকুরি করলে জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো। বড় মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেলে আমিও হয়তো পুরনো দিনে ফিরবো। স্মৃতি হাতড়ে বলবো চাপা ফুল আমার বেশ পছন্দের। চটপটি শেষ করে ঠিকানা ওর ফোন নম্বর বিনিময় করলো। 
একটা উদাস দুপুর। খা খা রোদ। নীল আকাশ আজ আরো নীল। এ নীলে কোন বেদনা নেই। তবুও নীল হয়ে উঠলো কাননের হৃদয়। যাওয়ার সময় যখন ঠিকানা বললো- তোমার দেয়া পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘কথোপকথন’ বই খানা আমি এখনো পড়ি।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>