| 2 মার্চ 2024
Categories
প্রবন্ধ ফিচার্ড পোস্ট

ইরাবতীর ফিচার: আবিষ্কার তুমি কার । পথিক গুহ

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

ওয়ান মিলিয়ন ডলার। ইনামের বরমালাখানি ছিল তেমনই মোটা। স্বাভাবিক। যে সাফল্যের জন্য নির্ধারিত ছিল ওই পুরস্কার, তা যে অধরা ছিল এক শতাব্দী। সেই ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি গণিতজ্ঞ অঁরি পয়েঁকারে বানিয়েছিলেন জ্যামিতির এক বিশেষ ধাঁধা। দুরূহ, জটিল। এতটাই যে, জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকার এক বার বলেছিলেন, ভিন গ্রহের জীব কখনও আবিষ্কৃত হলে, তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমরা কি সমাধান করতে পারবে ওই ধাঁধা? আইকিউ টেস্ট। যদি ওরা পারে ধাঁধাটা সল্ভ করতে, তা হলে প্রমাণ হবে ই টি মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান।

নাহ্, পয়েঁকারে-রচিত ধাঁধা শুধু গণিতের কচকচি নয়। তার তাৎপর্য গভীর। এ প্রশ্নের জবাব পেলে জানা যাবে ব্রহ্মাণ্ডের জ্যামিতিক আকার ঠিক কী রকম। এ হেন গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসার ঠিক জবাবের পুরস্কার মহার্ঘ হলে আশ্চর্যের কী।

২০০২ সালে মিলল ধাঁধার সমাধান। দিলেন ৩৫ বছর বয়সি রুশ গণিতজ্ঞ গ্রিগোরি পেরেলম্যান। চার দিকে ধন্যি ধন্যি। এখন তাঁর কৃতিত্ব গণ্য হয় এ শতাব্দীর প্রথম দশকে বিজ্ঞান গবেষণায় সেরা সাফল্য হিসেবে। নায়কের জন্য ধার্য ‘ফিল্ডস মেডেল’। গণিতে যা নোবেল প্রাইজ। আর হ্যাঁ, ওই এক মিলিয়ন ডলার। সাড়ম্বরে যা হাতে তুলে দেওয়া হবে পেরেলম্যানের।

কিন্তু কী আশ্চর্য! পুরস্কার-প্রদান অনুষ্ঠানে কোথায় তিনি! এলেন না। শত অনুরোধ সত্ত্বেও। প্রত্যাখ্যান করলেন শিরোপা এবং অর্থ। প্রলোভন হিসেবে শিরোপা (যার অর্থমূল্য মাত্র পনেরো হাজার ডলার) যদি তেমন জোরদার না-ও হয়, তবু অন্য পুরস্কার যে দশ লক্ষ ডলার। তাও প্রত্যাখ্যান। অথচ পেরেলম্যান বেকার। অকৃতদার, থাকেন মা-র সঙ্গে। দিন কাটে দারিদ্রে। মায়ের জন্য ধার্য সামান্য সরকারি বার্ধক্য ভাতা। তবু পুরস্কার প্রত্যাখ্যান! কেন? জানতে চায় উদগ্র মিডিয়া। প্রেস কনফারেন্স ইন্টারভিউ দূরের কথা, কোনও রিপোর্টারের সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করলেন না পেরেলম্যান। সতীর্থ গবেষকদের শুধু জানালেন তাঁর মনোভাব। পণ্ডিতরা যে মেনে নিয়েছেন তাঁর কৃতিত্ব, সেটাই তাঁর সেরা প্রাইজ। মেডেল, অর্থ— এ সব তাঁর চাই না। অর্থাৎ, কাম্য শুধু স্বীকৃতি। ব্যস।

নোবেলজয়ী পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান একদা বলেছিলেন, বিজ্ঞানের আবিষ্কার, বিজ্ঞানীর জীবন এক-একটা মহাকাব্য। দুঃখের বিষয়, এ সব ইলিয়াড ওডিসি লেখার জন্য কোনও হোমার নেই।

এপিক লেখা হয়নি বটে, তবে বিজ্ঞানের দুনিয়ায় স্বীকৃতির কিস্সা নিয়ে লেখা হয়েছে অনেক নাটক। যার একটি হল ‘অক্সিজেন’। লেখক দুজন। মহিলাদের গর্ভনিরোধক পিল আবিষ্কার গবেষণার অন্যতম বিজ্ঞানী কার্ল জেরাসি এবং রসায়নে নোবেলজয়ী রোয়াল্ড হফম্যান।

কী গল্প ‘অক্সিজেন’ নাটকের? সাল ২০০১। নোবেল প্রাইজের শতবর্ষ। অভিনব সিদ্ধান্ত নিয়েছে নোবেল কমিটি। দেওয়া হবে ‘রেট্রো-নোবেল’ প্রাইজ। বিজ্ঞানে যুগান্তকারী আবিষ্কার করেও যাঁদের নাম নেই নোবেল তালিকায়, তাঁদের সম্মান জানাতে। আলফ্রেড নোবেল যে পুরস্কার চালু করেছিলেন, তা কেবল জীবিত বিজ্ঞানীদের জন্য। ফলে বঞ্চিত প্রাতঃস্মরণীয় অনেকে। সে কথা মনে রেখে শতবর্ষে এই নতুন উদ্যোগ।

এবং তার অঙ্গ হিসেবে নোবেল কেমিস্ট্রি কমিটির বৈঠক স্টকহল্ম শহরে। রসায়নে কোন সাফল্য পাবে প্রথম রেট্রো-নোবেল? অবশ্যই অক্সিজেন আবিষ্কার। যে সাফল্য বিনে রসায়নশাস্ত্র হত না সাবালক, যার সূত্রে গড়ে উঠেছে ঊনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর কেমিকাল ইন্ডাস্ট্রি, তাকে বাদ দিয়ে রেট্রো-নোবেল ভাবা যায়? ভাল কথা, কিন্তু ও বাবদ কোন বিজ্ঞানী পাবেন প্রাইজ? মানে, কাকে বলা যায় অক্সিজেনের প্রকৃত আবিষ্কর্তা? সুইডেনের রসায়নবিদ কার্ল উইলহেল্ম শিল, যিনি ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে ল্যাবে অক্সিজেন প্রস্তুত করলেও, তাঁর পরীক্ষার ফলাফল জার্নালে ছাপতে পারেননি আগেভাগে? না কি এ ব্যাপারে স্বীকৃতি পাবেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জোসেফ প্রিস্টলি, যিনি শিল-এর পরে ওই গ্যাস শনাক্ত করলেও রিপোর্ট ছেপেছিলেন তাঁর আগে? কিন্তু, শিল বা প্রিস্টলি অক্সিজেন যতই প্রস্তুত করুন, ওঁরা কেউ তো ওই গ্যাসটির গুণাগুণ বুঝতেই পারেননি। বা বুঝেছিলেন ভুল। এ ব্যাপারে কৃতিত্ব যাঁর, তিনি হলেন ফরাসি রসায়নবিদ আতোঁ ল্যাভয়সিয়ে। যিনি শিল কিংবা প্রিস্টলির অনেক পরে অক্সিজেন আবিষ্কার করলেও, তার গুণাগুণ বুঝেছিলেন ঠিক ঠিক। এবং সেই সূত্রে বিপ্লব এনেছিলেন রসায়ন জগতে।

নাহ্, বাস্তবে নোবেল কমিটি রেট্রো-প্রাইজের কথা ভাবেনি। ওই বৈঠকও বানানো গপ্পো। সবটাই ‘অক্সিজেন’ নাটকটিকে জমজমাট করে তুলতে। দুই নাট্যকার তুলতে চান কিছু প্রশ্ন। আবিষ্কার কাকে বলে? গবেষণায় স্বীকৃতির ভূমিকা কতখানি? অক্সিজেন আবিষ্কার এ ক্ষেত্রে একটা চমৎকার উদাহরণ।

সাফল্যের মূলে পিতা-অন্বেষণে অক্সিজেনের মতো আর এক বিতর্ক এখন পদার্থবিদ্যায়। বিতর্কের কেন্দ্রে এ যুগে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় থিয়োরি। বিগ ব্যাং। অতীতে কোনও এক মুহূর্তে প্রকাণ্ড বিস্ফোরণে এই ব্রহ্মাণ্ডের জন্ম। এবং তার পর থেকে ক্রমাগত লুচি বা বেলুনের মতো ফুলতে ফুলতে তার আয়তন বৃদ্ধি। কে এই তত্ত্বের জনক? পিতার নাম হতে পারত আলবার্ট আইনস্টাইন। যদি তিনি হতেন যথেষ্ট বিচক্ষণ। যদি বিশ্বাস ছুড়ে ফেলে আস্থা রাখতেন নিজের আবিষ্কৃত বিজ্ঞানে।

১৯১৫। তিনি আবিষ্কার করলেন জেনারেল থিয়োরি অব রিলেটিভিটি। ১৯১৭। সেই তত্ত্ব প্রয়োগ করলেন ব্রহ্মাণ্ডের চরিত্র বুঝতে। দেখলেন, গণিত বলছে, ব্রহ্মাণ্ড অ-স্থির। পরিবর্তনশীল। আয়তনে বাড়ছে বা কমছে। হায়, আইনস্টাইন যে সে সময়ে চালু ধারণার শরিক। যে ধারণা অনুযায়ী, বিশ্ব বদলায় না, থাকে এক রকম। সে বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে নিজের আবিষ্কৃত ফরমুলার তাৎপর্য না মেনে বরং তাকে জোর করে পালটে ফেললেন। অনেক পরে অবশ্য ওই কম্মটিকে বলেছিলেন ‘দি গ্রেটেস্ট ব্লান্ডার অব মাই লাইফ।’ তা যা-ই বলুন, ভুল ভুল-ই। তা আইনস্টাইন করলেও। ওই ভুল না করলে আইনস্টাইন হতেন বিগ ব্যাং থিয়োরির জনক।

তা হলে সেই পিতা কে? এ ব্যাপারে সবচেয়ে বিখ্যাত এক মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী। এডুইন পাওয়েল হাব্ল। ১৯২০-র দশকে প্যাসডিনা-য় মাউন্ট উইলসন মানমন্দিরে দূরবিনে চোখ রেখে যিনি মেপেছিলেন গ্যালাক্সিদের একে অন্যের থেকে দূরে পালানোর বেগ। যা দেখে বুঝেছিলেন ব্রহ্মাণ্ড আকারে বাড়ছে। কারণ, গ্যালাক্সিরা শূন্যের মধ্যে দিগ্বিদিক ছুটছে না। বরং ওদের ছুটে পালানোর ফলে শূন্যস্থান বা স্পেস গজিয়ে উঠছে। এবং ব্রহ্মাণ্ড ফুলে-ফেঁপে বড় হচ্ছে। আকাশ পর্যবেক্ষণের তথ্য পেশ করে হাব্ল পেপার লেখেন ১৯২৯ সালে। কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে শুধু নোবেল প্রাইজটি পাননি, পেয়েছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রায় সব ক’টি বড় পুরস্কার।

তা পান, তবে বিজ্ঞানের অনেক ঐতিহাসিক কিন্তু হাব্ল-কে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। তাঁদের পছন্দ বেলজিয়াম-এর পাদরি এবং গবেষক জর্জ লেমাইত্রে। কেন? ১৯২৭ সালে ব্রাসেল্স থেকে প্রকাশিত এক জার্নালে ফরাসি ভাষায় এক পেপার লিখেছিলেন তিনি। আর তাতে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন প্রসরণশীল ব্রহ্মাণ্ডের। যেহেতু পেপারটি ফরাসি ভাষায়, তাই তা প্রচার পায়নি গবেষক মহলে। কোনও কোনও ঐতিহাসিক এগিয়ে যান এক ধাপ। অভিযোগ করেন, লেমাইত্রে-র কৃতিত্ব চাপা দেওয়ার কাজটিও নাকি করেছিলেন হাব্ল। কী ভাবে? ১৯২৭-এ প্রকাশিত লেমাইত্রে-র পেপার এত মূল্যবান যে অন্য জার্নালে তার ইংরেজি অনুবাদ ছাপা হয়েছিল ১৯৩১-এ। কিন্তু সেই অনুবাদে মূল প্রবন্ধের কিছু অংশ বাদ। ফলে পেপারের গুরুত্ব কম। ইংরাজি অনুবাদ এবং ওই কাঁচি চালানোর মূলে নাকি হাব্ল।

সত্যি? ২০১১ সালে এ ব্যাপারে গোয়েন্দাগিরিতে নেমেছিলেন আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী মারিয়ো লিভিয়ো। নেমে যা জানতে পারেন, তা অভিনব। নিজের পেপারের ভাষান্তর করেছিলেন লেমাইত্রে স্বয়ং। বাদ-ছাদও তাঁরই কাজ। বাদ কেন? আসলে হাব্ল-রচিত ১৯২৯ সালের প্রবন্ধ পড়ে লেমাইত্রে-র মনে হয়েছিল ওটি ১৯২৭-এ তাঁর নিজের লেখা পেপারের থেকে এগিয়ে। তাই ১৯৩১ সালে আর নিজের ১৯২৭ সালের কাসুন্দি আর ঘাঁটতে চাননি লেমাইত্রে। মোদ্দা কথা, হাব্ল কুচক্রী নন। লেমাইত্রে নিজেকে অগ্রগণ্য প্রতিপন্ন করতে উদ্গ্রীব ছিলেন না মোটেই।

কেস ক্লোজ্ড? না, তা বলা যাচ্ছে না। কেউ কেউ এখন দাবি করছেন বিগ ব্যাং বিশ্বতত্ত্বের জনক রুশ গণিতজ্ঞ আলেকজান্ডার ফ্রিডম্যান। ১৯২২ সালে এক পেপার লিখে যিনি দেখিয়েছিলেন ব্রহ্মাণ্ড প্রসরণশীল। এবং কোনও এক ক্ষণে এর জন্ম হয়েছিল।

সুতরাং, বিতর্ক শেষ নয়। তা বরং জারি। সেটাই স্বাভাবিক। মূল প্রশ্ন যে স্বীকৃতির। আর, বিজ্ঞানে স্বীকৃতিই সব। লক্ষণীয় ব্যাপার, বিগ ব্যাং-এর পিতৃত্বের কাজিয়াতে কিন্তু লিপ্ত নন হাব্ল, লেমাইত্রে কিংবা ফ্রিডম্যান। ওঁরা কবেই প্রয়াত। ওঁদের জন্য কাজিয়ায় লিপ্ত উত্তরসূরিরা। অবশ্য, জীবিত বিজ্ঞানীরা কম যান না। আইজাক নিউটন এ ব্যাপারে স্মরণীয় নাম। গটফ্রিড লিবনিৎজ অভিযোগ করলেন, নিউটন নন, তিনি গণিতের বিশেষ শাখা ক্যালকুলাসের আবিষ্কর্তা। নিউটনের জবাব, না, তিনিই এর আবিষ্কর্তা। লিবনিৎজ ওঁর থেকে আইডিয়া চুরি করেছেন। নিউটনের সশ্লেষ মন্তব্য: ‘সেকেন্ড ইনভেনটরস্ কাউন্ট ফর নাথিং।’

সত্যি, বিজ্ঞানে কোনও সেকেন্ড বয় নেই। এক জন ফার্স্ট বয়, বাকি সবাই লাস্ট।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত