রায়েন্দার ডাকে

 

 

গভীর জঙ্গল। রাস্তা খুঁজে বের করে চলতে হচ্ছিলো। আকাশ ছোঁয়া না হলেও বেশ বড় বড় গাছ ঘিরে ছিল পুরো জঙ্গল। এখানে লতাপাতার জটিল আলিঙ্গনের ভেতর দিয়ে সূর্যালোক মাটিতে নামে না। জায়গাটির নাম মাঝের চর, বাগেরহাট জেলার পিরোজপুর রেঞ্জে এর অবস্থান। বলেশ্বর নদীর পাশে প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্টি হয়েছে মাঝের চর বনটি। শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দা বাজার ট্রলার ঘাট থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তারও আগে সায়দাবাদ থেকে ফাল্গুনি বাসে চেপে রায়েন্দার উদ্দেশ্যে ১৪ জনের মোটামুটি বড় একটা দলই যাত্রা করেছিলাম। এ যাত্রার পুরো কৃতিত্ব রায়েন্দার ছেলে অত্যন্ত স্নেহের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম শাহীনের।  প্রায় এক বছর সে আমাকে ডেকে চলেছিল একবার রায়েন্দা আসেন, দেখে যান আমার শরণখোলা। শেষ পর্যন্ত গেলো নভেম্বরে সময় হয়। রাস মেলাকে উদ্দেশ্য করে চলে আসি শরণখোলার রায়েন্দা। রাত তিনটায় আমরা রায়েন্দা নেমে গভীর রাতে চায়ের দোকানে ধোঁয়া ওঠা গরুর দুধের চা খেয়ে শাহীনের অপেক্ষা করি। সে রাতের বাকীটা কাটে আমাদের আবাসিক হোটেল রূপসী রায়েন্দায় বিশ্রাম নিয়ে। তারপর তো সেই সকাল সাতটায় মাঝের চরের উদ্দেশ্যে যাত্রা, যে গল্প আমার লেখার শুরুতেই আমি করেছি। 
রাায়েন্দা ট্রলার ঘাট থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। যাত্রা শুরুর পর রায়েন্দা নামের ছোট্ট খালের দুপাশের শোভা দেখতে দেখতে এক সময় বিশাল বলেশ্বর নদে পড়ি। সুন্দরবন এলাকার চারটি বিশাল নদীর অন্যতম এই বলেশ্বর নদ। সকাল সাতটায় বলেশ্বর নদের অসাধারণ শোভা ঠিক মন কেড়ে নেয়া। মাছ ধরার নৌকা, ডিঙ্গি নাও আবার মানুষ বোঝাই ট্রলার দেখে দেখে আর ক্যামেরা ক্লিক করে করে আমাদের ছুটে চলা। বিশ মিনিট পর রায়েন্দা জেটিঘাটের দেখা পাই, বাকিটা বলেশ্বরের শোভা।

মাঝের চর পৌঁছতে আমাদের সময় লাগে একঘন্টার একটু বেশী। নদী বক্ষে ভ্রমণ সব সময় উপভোগ্য, বলেশ্বর যাত্রাও ঠিক তাই ছিল। মাঝের চর সে ভালো লাগার মাত্রা বাড়িয়ে তোলে বহুগুন। বলেশ্বর নদের বুকেই গড়ে উঠেছে মাঝের চর। সুন্দর বনের তটরেখা থেকে মাঝের চরের দূরত্ব ঠিক চার কিলোমিটারের মত। এক সময় মাঝের চরে শুধু ধুধু বালি থাকলেও, ৬০-৭০ বছর আগে এখানে গজিয়েছে ছৈলা, কেওড়াসহ বিভিন্ন প্রকারের গাছপালা। সুন্দর বনের মতই এখানে রয়েছে শ্বাসমূলি, গুল্মলতা ও গোলপাতা। মানুষও বসবাস করে মাঝের চর বনে। যার বেশীর ভাগ বলেশ্বর নদের মৎসজীবি। আমরা মাঝের চর বনের প্রায় এক কিলোমিটার ঘুরে মাঝের চর বন কার্য্যালয়ে এসে বনবিভাগের কাউকে না পেয়ে একটু হতাশ হয়ে আমাদের বাহন, ছোট্ট লঞ্চ মায়ের দোয়ায় সওয়ার হই। আমাদের পরবর্তি গন্তব্য ছিল সুন্দরবন শরণখোলা রেঞ্জের বগি ফরেষ্ট স্টেশন। সুন্দরী ও পশুর সহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে বগি ফরেষ্ট স্টেশনে। আমরা বগি স্টেশন এলে এখানে আমাদের সহকারী বন কর্মকর্তা স্বাগত জানান। তারপর ঘুরে দেখি বগি স্টেশনের বন কার্যালয় সহ বিভিন্ন অংশ। বনের অভ্যন্তরের গভীরে আমাদের পদচারণা স্মরনীয় করে রাখতে কি না জানি না। সাবেক বন কর্মকর্তা, আমাদের পথ নির্দেশক আবুল কালাম আজাদ বাঘ নিয়ে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। চাচার বর্ণনা শুনে আমাদের গা ছমছমে ভাব চলে আসার আগেই বগি স্টেশনকে বিদায় জানাই। মাঝের চর বা বগি স্টেশনে ট্যুরিষ্টদের আনাগোনা নেই বললেই চলে। দিনটি ছিল শুক্রবার, ছুটিরদিন। তারপরও স্থানীয় কাউকেও বন বিভাগের এসব স্টেশনে ঘুরতে দেখা গেলো না। অথচ পুরো এলাকা ঘুরে দেখার মত অসম্ভভব সব সৌন্দর্য বিদ্যমান। এখানে নদী ও জঙ্গল মনোরম। বলেশ্বর নদের পরে এদিন আমরা অন্য কোনো নদী না দেখলেও অসম্ভভ সুন্দর তেরাবেকা খাল দেখেছি। তেরাবেকা খাল ও এখানকার রসুলপুর এলাকার ভোলানদের তেরাবেকা অংশ কায়াকিং করার জন্য বেশ উপযুক্ত। কায়াকিং কাপ্তাই লেকে শুরু হবার পর গত কয়েক বছরে জলে ভেসে বেড়ানোর এই খেলাটি সারাদেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কাপ্তাই লেকে শুরু হয়ে পরে মহামায়া লেক হয়ে ধলেশ্বরি নদীতেও কায়াকিং পর্ব শুরু হয়েছে। অথচ এই তেরাবেকা খালের সৌন্দর্য ও সুন্দরবনের পরিবেশ মিলে এখানে কায়াকিং অন্যমাত্রা নিতে বাধ্য। শাহীনের সঙ্গে এখানকার কায়াকিং এর শুভযাত্রা ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা চলার ফাঁকে আমাদের আলোচনায় যোগ দেন হাদিরাতুল জান্নাত। এক সময় দেখি সে আলোচনায় চলে এসেছেন উৎপল সুজন, সুমিত, শুভ্রসুমনসহ অনেকেই। এরই মধ্যে মায়ের দোয়া আমাদের নিয়ে তেরাবেকা খালের গভীরে চলে এসেছে। দুপাশ ও খালের সৌন্দর্য দেখে চোখ ছানাবড়া। দৃষ্টি প্রসারিত করেই মনে হয় পূর্ণিমা রাতে এখানে এমন একটি লঞ্চ বা নৌকায় ভ্রমণ বেশ আনন্দের অভিজ্ঞাতা দেবে। ঘন্টাখানেক আমরা তেরাবেকা খালে ঘুরে বেড়িয়ে, ফেরার পথে সুন্দরবনের পূর্ববন বিভাগ শরণখোলার তেরাবেকা টহলফাড়ি ঘুরে দেখি। তারপর আমরা সরাসরি চলে আসি শরণখোলা। শরণখোলা যেতে যেতে বুঝতে পারি পেটে টান পড়েছে, বেলা গড়িয়ে বিকেল হয়েছে। শরণখোলা বাজারে নেমে হালকা কিছু খাবার খেয়ে আমরা রায়েন্দা ট্রলারঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। শরণখোলা, তেরাবেকা, বগি ও মাঝেরচর মিলে সারাদিনে সুন্দর বনের কাছে আমাদের অসম্ভভব ভালো লাগার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা হলেও, বিদায় নিতে নিতে ভাবি সুন্দর বনের ভেতর প্রতিটি বন বিভাগ কার্যালয়ে একটা করে ছোট্ট মিউজিয়াম নেই কেনো!

প্রয়োজনীয় তথ্যঃ

রায়েন্দার ডাক পাওয়ার উপযুক্ত সময় আসলে সারা বছরই। যাদের রোমাঞ্চ পছন্দ তারা এখানে আসার জন্য বর্ষা ঋতুকেই বেছে নিতে পারেন। তবু অক্টোবর থেকে মার্চ মাসই এখানে বেড়ানোর জন্য উপযুক্ত। এখানে বেড়ানোর জন্য সাধারণ ভ্রমন পিপাসুদের জন্য দুই রাত একদিন হলেই যথেষ্ট। কায়াকিং শুরু হলে বা রসুলপুর সহ শরণখোলার চারটি স্পট ঘুরে দেখার জন্য একটু সময় নিয়ে আসলেই ভালো হবে। মাঝের চর, বগিস্টেশন তেরাবেকা সুভতি স্টেশন বা শরণখোলা ঘুরে দেখবার জন্য একটাদিন কোনো ভাবেই যথেষ্ট না, আসলে মাঝের চরই একদিনে দেখে শেষ করা যায় না!


কীভাবে যাবেনঃ

ঢাকার সায়দাবাদ বাস ষ্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন ভোর ছয়টা ও সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় রায়েন্দার উদ্দেশ্যে সরাসরি বাস ছেঁড়ে যায়, ফেরার বাসও ভোর সাড়ে পাঁচটায় শুরু হয়, সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় শেষ বাস। ভাড়া ৪৫০ টাকা। রায়েন্দা থাকার জন্য হোটেল রূপসী রায়েন্দার ওপর ভরষা করতেই পারেন। ভরষা করতে পারেন এর অন্যতম পরিচালক সাইফুল ইসলাম শাহীনের ওপর। শাহীন নিয়মিত শরণখোলা রায়েন্দায় প্যাকেজ ভ্রমণের ব্যবস্থা করে থাকেন।

সচেতনতাঃ

নদী পথ যেহেতু একটু সাবধান ও সর্তকতার সঙ্গে চলাচল করবেন। সঙ্গে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট রাখবেন। খাবার স্যালাইন পানি ও শুকনা খাবার এবং প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ সঙ্গে রাখবেন। একটা বিষয় খেয়াল রাখবেন আপনার বা আপনার ভ্রমণ সঙ্গীদের দ্বারা পরিবেশ হুমকিতে পড়ে এমন কিছু অবশ্যই করা চলবে না, পলিথিন বা প্লাষ্টিকের বোতলসহ পরিবেশ বিপন্ন হয় তেমন কিছুই বন বা জঙ্গলের ভেতর এবং পানিতে ফেলে আসবেন না।

 

ছবিঃ- লেখক

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত