তুষার গায়েনের কবিতাগুচ্ছ


 

 

 

 

ক্রিস্টাল কন্যার দেশে ক্রিসমাস আসে

জলও যে এত অগলনপ্রিয়, ক্রিস্টালকঠিন হতে পারে তা
এই হিমঋতু, হিমায়নের আগে বুঝি নি কখনো !
এই তো প্রথম নয়, অবধূত দেখেছি তোমাকে সাদারূপে
বহুযুগ নিঃশব্দ প্রপাতে ঝরে যেতে যেতে — আর কোনো রঙ নয়
শুধুই সাদার বিস্ময়ে অন্ধকার রাত প্লাবিত হৃদয়
ভোর হলে পায়ে পায়ে কাদা হয়ে গেছে সাদা আর কালো মিলে মিশে
মানুষের কাজ নয় সৌন্দর্য অক্ষত রেখে দেয়া
তাই দাঁতে দাঁত চেপে এইবার আদি রূপে
জলের স্বচ্ছতা নিয়ে তুষারবৃষ্টির যৌথ ঐক্যতান —
যেভাবে গাছের ডালগুলো জলভারানত সেভাবেই বন্দী হ’ল
হিমাঙ্কের নিচে বরফক্রিস্টালে সারি সারি সুন্দরীর মাথার মুকুট
লাস্যময়ী হাসির ঝঙ্কারে মাথাটা দোলাতে গিয়ে ভেঙে পড়া
মাইল মাইল বিদ্যুতের তারে আর তাতেই অন্যথা যত
নিদ্রাহীন নগরীর অহংকার ধুলায় লুটাল !

এবার ঘুমাও সকলেই ক্রিস্টাল কন্যার দেশে
হি হি কাঁপা হিমরাতে শত শত বর্ষ ধরে যত
শক্তি তরঙ্গ রেখেছ বন্দী করে হাতের মুঠোয়,
ফুৎকারে নিভিয়ে দিয়েছে বরফ মন্ত্রণা যত
ছাদের কিনার থেকে কোটি কোটি নিষ্পলক ছুরির সন্ত্রাস
সাদার অধিক অন্তর্গত স্বচ্ছতার ধার নিমিষেই দিতে পারে
গেঁথে সাবধানী পথিকের ঘাড় !

ক্রিসমাস,ক্রিসমাস …
দ্বি-সহস্র বর্ষ আগে জন্ম নিয়েছিল আর ক্রুশকাঠে বিদ্ধ
হয়েছিল উজ্জ্বল যিসাস ! ঘূর্ণাবর্তে আবারও অন্ধকার …
কারো প্রয়োজন খুব, কেউ কী জন্ম নেবে এই অন্ধকারে আর?

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
রাতের মহল্লা
 
জ্যামিতি কঠিন এই বাস্তবৃক্ষ খোপ খোপ ভরা ঘর শূন্যতার
অনেক উঁচুতে উঠে যাওয়া আকাশের তারা ছুঁতে চাওয়া
অহঙ্কার! নিস্তব্ধ রাতের হু হু হাওয়া ঘুম ঘুম মানুষের অনন্ত প্রহর
অবশ্য ঘুমও নেই বেশি কী যে তাড়না নির্ঘুম … নিঝুম মারিজুয়ানা
বিষাদে নিঃশেষ হ’ল শেষে দ্রুতগামী সড়কের পাশে
মানুষের উল্লম্ব গোত্রের বাঁধা ছক …
 
সব কিছু যদি শান দিয়ে বাঁধা তবে সে কোথায় ফোটে ফুল
সব যদি মানুষের হ’ল পাখিরা বসবে কোন কূলে
তাই কিছু গাছ আর তরুলতা আদেশে বানানো হ’ল
যেন তারা বাতাসে নির্ভুল দোলে আর সঙ্গী কুকুরের ছানা
প্রজননকেন্দ্র থেকে গ্রুম করে আনা, অনুগত অধীর ব্যাকুল
বুদ্ধির বিচ্যুতি নেই মানুষের মত … রাত জাগো রাত জাগো
জাগো রাত নিশাচর, হাঁটো নেশা চুর চুর অলিন্দে হাশিশ
এত যে উচ্ছেদ হ’ল, হুলস্থুল করে কোথা থেকে এল তবু
বসন্ত বাতাস নাচে ঘূর্ণি তুলে, ঝরাপাতা, ফ্রকপরা সহাস্য বালিকা
ওঠে নাই কিশোরের গোঁফরেখা একে বেঁকে সাইকেলে
রাত্রি মাত করে, ঢিল ছুঁড়ে মারে ঝন্‌ঝন্‌ ভাঙে কাঁচের জানালা
অন্ধকারে কী যে সাদা সাদা উরু আর সুগোল বুকের উঁচু
বঙ্কিম রেখার চাপ, তীব্র ফুলগন্ধ, বসন্ত বিলাস
নিতম্ব দুলিয়ে যায় … বাতাস প্রপঞ্চময় তারে কেউ বাঁধে না রে
নাড়িতে যে পারে কেউ, ঘেউ ঘেউ ডাকিল সে কাহার কুকুর
পুরুষের থেকে বিশ্বস্ত সে প্রিয়, ছেড়ে দিয়ে কাছে টানা যায়
অনায়াস গলার চেইন … চেইন স্মোকার এক ক্লিন হেড
দীর্ঘদেহী, তীক্ষ নাক ইলেকট্রিক থামের মত দাঁড়িয়ে থাকে
চুমুকে চুমুকে করে কফি পান আর কী সব নির্দেশ দেয়
সেল ফোনে অদৃশ্য জগত সব মাটির তলায়, দেখে হাসে
পতিতা পাবনী এক জিহ্বায় রূপালী বল মেহন আশ্বাস
সাদা পিঠ জুড়ে উল্কি, গ্রাফিত্তি উল্লাস হাতে পায়ে স্তনের বিভায়
কাছে আয়, কাছে আয়—এত যে প্রযুক্তি যোগ, তবু কেন
দূরে দূরে বিযুক্তি বিস্বাদ, কাছে আয়, ওই দেখ এক জোড়া
ভূত যায় টলমল পায়ে বয়সের ভারে ন্যুব্জ
মরণসঙ্গী এ দুনিয়ায়, ছেলে নেই মেয়ে নেই
নেশা খায় সন্ধ্যা থেকে সোনালী বিয়ার
কাছে আয় কাছে আয় …
রাতের ভিতরে রাত, আরো রাত
নরকের ভিতরে প্রবিষ্ট স্বর্গের আস্বাদ
বাতাস যে বয়ে যায় পাতায় পাতায়
জন্মান্তর ভেদ করে আসা ছায়া ছায়া কত যে অতীত
চুপিসারে কথা বলে মানুষের অগম্য ভাষায় …
 
ধীরে ঘর ছেড়ে নামে সন্ধ্যাবধির তরুণী এক
দেহকোষে কোষে তার পাথরের নীরবতা
হাঁটে এক পা, দু’পা, থামে; পুনরায় হাঁটে জড়বৎ
বাকহীন সাদা পাথরের দেবী, প্রাণপাখি উড়ে গেছে কবে তার
এখন যে দেহখানি আছে, পিঠ থেকে মেরুদণ্ড খুলে নিয়ে গেছে কেউ
হঠাৎ জলপ্রপাত নামে চোখে … কাঁদে একা একা
সুনসান বাতাসের পাতা নাড়া, পাতা নাড়া
জল ডাকে, “আয় অন্তঃসলিলা” … মাটির অতলে নল
বেয়ে আসে সহস্র উচ্ছ্রিত ধারা, উল্লম্ব ও আনুভূমে
ভিজিয়ে ভিজিয়ে দিতে এ গাছপালা, লতাপাতা সব …

 

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

 

ক্যানিবাল কাল

পৃথিবীতে লকলকে নরকগাছ
তার শাখা প্রশাখায় ফুটেছে রক্তফুল
হিংসার সিঞ্চনে পাপসিক্ত মাটি
বীভৎস দৃশ্যের জন্ম দ্রুতগামী—
এক-একটা ক্ষতস্মৃতি মুছে না যেতেই
ভারী হয়ে আসে নিশ্বাস,
কোথাও ফুটেছে বোমা আত্মঘাতী
ছিন্নভিন্ন জোয়ান জনা চল্লিশ
বিচ্ছিন্ন দেহাংশ কাঁদে একাঙ্গ হতে
পরিপার্শ্বে নেই নিস্তব্ধ সমাধি;
গর্জে ওঠে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল
প্রার্থনায় মৌন মানুষ ফুটো হয়ে যায়
জান্তব চিৎকারে! গ্যাসের সিলিন্ডার
ফাটে দাহ্য-কৌতুকে, নেচে নেচে
যোজিত হয় আগুনের অন্তর্জাল
ধ্বংসলীলায়, পথে পথে ঝলসানো
নরমাংস মহাকালের ভোজনসভায়…

 

 

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

 

যে আগুনে রাফীর কণ্ঠনালী পোড়ে

যে আগুনে দগ্ধ হয় তোমার কিশোরী শরীর
পুড়ে যাওয়া ফলের ত্বক ছিঁড়ে নেওয়া দ্রুত
যাতে কিছুটা বাঁচে ভিতরের শ্বাস, কার আস্বাদে
বাঁচাবে তোমাকে এই বরাহ সমাজ?

বড় জ্বালা করে এই দেহ, আগুন সংক্রমিত
হতে থাকে প্রতিদিন, নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে
যদি পারতাম পুড়িয়ে দিতে ক্ষমতার ভণ্ডামি যত
ধর্ম পশুদের বাঁচাতে সব আয়োজন!

সেই অক্ষমতা ক্ষমা কর মেয়ে ততদিন
যতদিন না আগুন এসে আমাদের সবার
কণ্ঠনালী পুড়িয়ে অঙ্গার করে তোমার মতো।

 

 

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

১৪২৬

কোন বর্ষ এসে আমাকে আর নতুন করে নেবে?
আমাদেরকে নতুন করে নেবে কোন নববর্ষ এসে?

সুপ্রচুর পুরোনো বর্ষের পাপ পুঞ্জীভূত হয়ে আছে
জঞ্জাল সরাতে পারেনি নিষ্ক্রিয় আমাদের হাত
আগুন বানিয়েছে যাকে সাদা পরি—
ব্যান্ডেজে মোড়ানো নুসরাত,
রাক্ষসের থাবায় উঠে আসা
তনুর ওপড়ানো চুল
ব্লেডে কাটা পূজার
শিশু যোনি!

পথে পথে মৃত শোকস্তব্ধ ঘাস…
কোন বর্ষ এসে আমাকে নতুন করে নেবে আর?
আমাদেরকে নতুন করে নেবে কোন নববর্ষ এসে?
কীভাবে হাসব আমরা রঙের বাহারী খেলায় মেতে?
যখন কন্যারা আমাদের ঘুমায় গহিন মাটির তলদেশে!

 

 

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত