কবির মুখোমুখি কবি

২০১৬ সনে বাকে প্রকাশিত হয়েছিল পাঁচটি কিস্তিতে এই সাক্ষাৎকারটি। ইরাবতীর পাঠকদের জন্য রঞ্জন মৈত্র’র জন্মদিনে তুষ্টি ভট্টাচার্যের গ্রন্থনায় তা আজ পুনঃপ্রকাশ করা হলো। কৃতজ্ঞতা বাক-এর প্রতি।


তুষ্টি ভট্টাচার্য : ২০১৬র বইমেলায় আপনার নতুন কবিতার বই ‘পা কে বলে দেখি‘ প্রকাশিত হল। এই বইয়ের থেকে রানওয়ের দূরত্ব ঠিক কতটা? ‘পা’ কে কী বলতে চেয়েছেন আসলে? শুনবে কি সে কবির অব্যক্ত?

রঞ্জন মৈত্র : সুবর্ণ রেখা রানওয়ে বইটির প্রকাশকাল ১৯৯৩। তার আগের বই, পরের বই এবং পরবর্তী বইগুলি। প্রত্যেক দু’টির মধ্যেই দূরত্ব থাকে। তাই কতটা দূর আর টের পাই না, চেস্টাও করি না। একলা অভিযাত্রায় সব বলাই তো পা-কে বলা। কখনো উচ্চারিত, কখনো নিরুচ্চার।

তুষ্টি : আমরা চাইছি, ভীষণভাবে চাইছি যে, নিরুচ্চার উচ্চারিত হোক। পা-কে কী বলা গেল শেষপর্যন্ত ?

রঞ্জন : আসলে তুষ্টি , ‘পা-কে বলে দেখি’ বইয়ে ‘রুটম্যাপ’ কবিতার ‘রুমনি’ অংশটি শুরু হচ্ছে ” মেঝে নেই /পা-কে বলে দেখি “– এই ভাবে। সেখান থেকেই বইয়েরনামটি নেয়া। দ্যাখো, “মেঝে নেই” একটা কনফিউজডস্টেট। দাঁড়াবার জায়গাটায় নেই। দাঁড়াবো তো সেই পাদিয়েই। মাথা মগজ মন এবং শারীরবৃত্ত সবই ওই পা-এরকাছে। পা-ই চোখ হয়ে উঠবে আর আবিষ্কার করবেপ্রকৃত দাঁড়াবার নতুন জায়গা, তাকেই বলা তাই। পা-কেআর আর তার ওই খোঁজটিকে আবিষ্কার করতে চাওয়া।চলমানতাই জীবন। সমস্তই সচল। বিপুল বেগেপরিক্রমারত এক গ্রহ আঁকড়ে আমাদের বেঁচে থাকা।আমাদের চাকু ও মাকু, প্রেম ও নুডলস, লক আপ ওকলামন্দির, ট্রেকিং আর ছাদের টবে ফলানো টমেটোরওপর দিনের প্রথম আলো , সবই এর মধ্যে। পা জানে।পা-ই প্রতিভূ। মা জানে, আসলে ফিক্সড ডিপোজিট।ভরসার আমানত। এবং আমাদের বাসগ্রহের ওই বিপুলবেগ আমরা টের পাই না। মাটিতে প্যাডেলে সোলাননালায় বিমলিপত্তনে পা-এর কাছেই থাকা। কবিতার ব্যাখ্যা হয় না তুষ্টি, কিম্বা হয়তো হয় আমি জানি না।তোমাকে তথা পাঠককে স্পর্শ করতে না পারা আমার ব্যর্থতা মানি। পাঠকের পঠনব্যর্থতাও কিছুদূর। তোমরাযদি একটু সময় করে পড়ো এইসব অনুভব-লিপি,নানান চলার পা ও তার ছাপ, কোন এক শূন্যতার সঙ্গেএনকাউন্টারে পা-কেই মনে করা-

‘পা থেকে কি যেন গেছে

মোজার সঙ্গে বুঝি ধোয়া হয়ে গেল

শুয়ে আছ না শোয়ার গানে

আমরা এই ভূতচতুর্দশীর ছেলেপেলে

জঞ্জাল শেষ ক’রে টিলা আনি, ঝাউ-হস্টেল

ক্রমে চারপাই গুঁজেছি আগুনে

চাঁদা দাও , সমস্ত মোজায় তবু মাংস পাওয়া গেছে

রান্না হোক , দাবানলে ঢাবানলে একই পোড়া পা

রাত হোক , কলার পাতার পরে বাকি আছে মোজা খোঁজাখুঁজি’

পিকনিক/ সুবর্ণরেখা রানওয়ে/ ১৯৯৩)

অথবা, নিজের পুরো অস্তিত্বকেই পা-এর সূত্রে স্পর্শ করা, জীবনসূত্র সূর্যকেও এবং সমর্পণের মুক্তি—

‘নানা দিশায় মোহর ফেলে

বাড়ি একটা ব’সে- আঁকোর সূর্য

রাত আর নিতে চায় না পা

কিনার ধরে হাঁটলে আবার গোল

প্রভা ঘুরে গিয়ে রশ্মি বেজে উঠছে

ঘড়িতে । আবার সূর্য , পায়ের অফিস,

আর বাড়ি ফিরবো না ‘

পায়ের অফিস/ সেভেন বেলোর বাড়ি/ ১৯৯৭)

এবং ট্রেকিং-পথে যখন নিজের ধারণাগুলোকে অতিক্রম ক’রে পাহাড়ের সমস্ত অনুসঙ্গগুলোকে নতুন চেনায় নতুন উচ্চারণে ধরার চেষ্টা করছি , তখনও ——-

‘পা নিয়ে কোন শূন্য ছিল না। আজ পাথরের জন্য ,হিমব্রিজের জন্য , অন্য কোন চুম্বক নেই। যা একটুআগের শূন্য, একটু পরেরও, ভারি সংখ্যা হয়ে উঠছে পায়ে পায়ে। মাথা ভরা ফেনকমল , চিরুনি চলছে না ,মাথা জুড়ে বেগুনি পাপড়ি। ভারি হালকা ছিল শূন্যগুলোআমাদের পাড়ায়। এখন তাদের জন্য স্যাক খালি ক’রেদিতে হচ্ছে জামা প্যান্ট চশমাদের, তারাও হাঁটছে। যতহাঁটছে , মাথা জুড়ে ফুটছে ফেনকমল ব্রহ্মকমল’

(ট্রেকিং-৫/ সেভেন বেলোর বাড়ি )

তুষ্টি : ‘পাঠককে স্পর্শ করতে না পারা আমার ব্যর্থতামানি।পাঠকের পঠনব্যর্থতাও কিছুদূর। ‘একজন কবির মুখে এই উচ্চারণ যেন কবির পাঠকের সাথে অঙ্গীভূত হতে না পারার হাহাকার। কবি আর পাঠকের মেলবন্ধন কি হবে না তাহলে? পাঠক পড়তে শিখবে না আর কবি বোঝাতে পারবে না- এই যোগাযোগ ব্যর্থতায় কবিতা হারিয়ে যাবে না তো?

রঞ্জন : আমার বলার ধরনে কোথাও ভুল রয়ে গেল মনে হচ্ছে। না তুষ্টি, আমার এই কথার মধ্যে কোনও হাহাকার নেই। পরিস্থিতির দুটো দিক আমার মত ক’রে উচ্চারন করেছি মাত্র। সব তরঙ্গ সবাইকে স্পর্শ করবে না এটা মেনে নিয়েই তো কবিতা লিখতে বসা। কবিতা জনপ্রিয়তার শিল্প ছিল না কোনোকালেই। কিন্তু স্পর্শ না করার ব্যাপারটা শুধু পাঠকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার আত্মম্ভরিতা কবিকে মানায় না। বরং ব্যর্থতা মেনে নিলে এবং শান্ত থাকলে কোন আপশোষ কুরে খায় না। নিজের রানওয়ে ছেড়ে দেবার ইচ্ছে কিম্বা লেখাকে তরল করার বাসনা জাগে না। অন্যদিকে হঠাৎ-পাঠক অথবা অনেক আগের কালের কবিতাতেই গভীর বিশ্বাসে থাকা পাঠক যদি হাতের সামনের কবিতাটিকে খুঁড়ে দেখার বা নিজের মতো ক’রে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টাটুকুও করতে না চান, তিনি দশ টাকা দিয়ে কয়েকটি কবিতা কিনেছেন অতএব দশ মিনিটের মধ্যে খেয়ে হজম করে ফেলার চাহিদা ও দাবী রাখেন, তবে তাঁর ব্যর্থতার দায় তো তাঁরই। আমাদের ভাষার সবচেয়ে উঁচু-মাথার কবি যখন মধ্যগগনে ছিলেন তখন তাঁর সম্পর্কে প্রচারিত শব্দ দু’টি ছিল দুর্বোধ্য আর অশ্লীল। আমরা তো কীটানুকীট। আর দ্যাখো তুষ্টি, যেমন ধরো, ” অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনে সকল অঙ্গ ভরে”– এ তো আজও জনপ্রিয়তার ভোক্তা কিম্বা ছড়া-পাঁচালির পাঠকের খাদ্য নয়, হতেই পারে না। অথবা, ” আমার চেতনা চৈতন্য ক’রে দে মা চৈতন্যময়ী” — এই পংক্তির দিকে আজও মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি। তুষ্টি, এসব শান্ত মনে মেনে নিয়েই একজন অভিযাত্রী কবি পথে নামেন। অন্য কিছু তাঁকে টানে না যে! এবং যে দু’টি উদ্ধৃতি করলাম তাদেরও তো বয়স হোল বিস্তর। তো , কবিতা হারাবে কেন!

তুষ্টি : ভরসা পেলাম। কবিতা থাকুক মননে আমাদের। এবার ফিরে যাই আপনার পুরনো দিনে। আপনার ছোটবেলা কেমন ছিল? কবিতা টানল কবে থেকে? কবিতা লেখার হাতেখড়ি হল কবে?

রঞ্জন : একটা অতি সাধারন নিম্নবিত্ত বাড়ির ছেলের ছোটোবেলা যেমন হয়ে থাকে তেমনিই ছিল আমার ছোটোবেলা। কিঞ্চিৎ বাঁদর গোছের ছিলাম । অ্যাডভেঞ্চার করতাম নানা রকম । বাবার চাকরিসূত্রে বাঁকুড়া জেলার কয়েকটি জায়গায় কেটেছে। সবচেয়ে বেশি দিন কেটেছে বিষ্ণুপুরে। টিলা পাহাড় জঙ্গল এবং নির্জনে ছড়িয়ে থাকা ছোটো নদী, খুব টানত এসব। টানত বিভিন্ন ধরনের মানুষ । তবে সবচেয়ে দুর্বলতা ছিল পাহাড়। আজও তাই। খাতড়া-তে থাকার সময় তো ( ক্লাস ফাইভ ) বাড়ি থেকে বেশ দূরে বিরাট দুই জোড়া টিলার একটিতে চ’ড়ে তারপর উল্টোদিক দিয়ে নেমে হারিয়েও গিয়েছিলাম । পরনে স্যান্ডো গেঞ্জি, হাফ প্যান্ট এবং খালি পা । লোকে পৌঁছে দেবার পর বাবার সেই অবিস্মরণীয় প্যাঁদানি! এদিকে বাড়িতে আমার থেকে বয়সে সামান্য বড় দাদা ( ১৯৯৫ সালে অকালপ্রয়াত ) খুব ছোটো থেকে অসম্ভব ভালো আবৃত্তি করত । আর প্রাইজ পেত কবিতার বই । তো সেইসব থেকেই কিনা জানি নাক, ক্লাস ফাইভ-সিক্স থেকেই মাথায় কবিতা ঢোকে ব’লে মনে হয় । ক্লাস সেভেনে প্রথম ছাপা হয় স্কুল ম্যাগাজিনে । তখন বিষ্ণুপুরে। খাতা ভর্তি । ছোটো ডায়েরি ভর্তি । প্রকৃতি এবং বড়মানুষ । রবীন্দ্রনাথ থেকে লালবাহাদুর সবার সামনে ‘হে’ বসিয়ে । চতুর্দিকে এত ‘হে’ যে ছোটো ছোটো হাতে সামলাতেও পারতাম না ঠিকঠাক । আর অকালপক্ক হ’লে যা হয় আর কি । একবার গৌড়চন্দ্র সাহা নামে শোভাবাজার(কলকাতা) নিবাসী তৎকালীন এক শিশু-সাহিত্যিক কোন সূত্রে আমাদের বিষ্ণুপুরের বাসায় এসেছিলেন। তিনি আমার ডায়েরির কয়েক পাতা পড়েই বলেছিলেন, অ্যাই, এসব যে লিখেছো, তা তুমি এসব বোঝো! তার বেশ কিছুকাল পর বেশ কাঁচা বয়সে একটি কবিতা লিখলাম যার প্রথম পঙক্তি ” উচিৎ দূরত্ব থেকে রমণীকে নারী মনে হয়’। হাংরি কবি সুবো আচার্য তখন বিষ্ণুপুরে। পড়ে বললেন, তুমি এটা লিখলে কি করে ! ওই বয়সে ওই ‘উচিৎ’ শব্দটি এবং বাক্যটি। অকালপক্কতা আর কি। মোটেই খুব বুঝে কিছু লিখিনি। তবে তখন কিন্তু মাথার মধ্যে আগের ছেলেখেলার বদলে সত্যি সত্যিই কবিতা কামড়াতে শুরু ক’রে দিয়েছে। সেই টানেই লিখে গেছি নানা রকম। ছাপানোর কথার চেয়ে একেবারে নিজের মতো ক’রে লেখার ইচ্ছেও চাড়া দিয়েছে মাথায়। বিষ্ণুপুরে তখন সুবো আচার্য সম্পাদিত ‘ টেরাকোটা ” ছাড়াও আরো দু’ একটি পত্রিকা প্রকাশ পেতো। সেসবই ছিল আমার সঙ্গে কবিতাপৃথিবীর সেতু। এর মধ্যে কোন সূত্রে দেখে ফেললাম , কৌরব। ব্যাস , পুরো বারোটা বেজে গেল আর কি।

তুষ্টি : কৌরব দেখে ফেললেন আর বারোটা বেজে গেল! কীভাবে ঘড়ির দুটো কাঁটা ছুঁয়ে ফেলল একে অপরকে? কৌরবের থেকে আপনি কী এমন পেলেন যে আপনার ‘বারোটা’ বেজে গেল?

রঞ্জন: ‘ বারোটা বেজে গেল ‘ কথাটা যে মজা ক’রে বলা সে তুমি বুঝতে পেরেছ আমি জানি, তুষ্টি ।আসলে আমি তো অন্যরকম কিছু লেখার বাসনা রাখতাম । তো ওই বিষ্ণুপুরে ব’সে আমার সামনে তেমন উৎসাহী ক’রে তোলার মত কিছু পেতাম না । সুবো আচার্য সম্পাদিত ‘ টেরাকোটা’ ছিল আমার চোখের সামনে সবচেয়ে এলিটপত্রিকা । কিন্তু সেটা ছিল পাঁচমিশেলি একটাকাগজ । সেখানে যেমন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কিম্বা অসীম রায়-দের মত প্রণম্য গদ্যকারদের রচনা থাকতো , সুবোদা বা শৈলেশ্বরদা ( ঘোষ )-এর কবিতা বা গদ্য থাকতো ,তেমনি অন্যওথাকতো । বিশেষত কবিতার ক্ষেত্রে ভালোলাগত ভক্তি হোত কিন্তু মগজে একেবারেহুলুস্থুল ঘটিয়ে দেওয়ার মতো কিছু পেতাম না ।আমি , আমার দাদা এবং দু’ একজন বন্ধু ‘মুহূর্ত’নামে একটা পত্রিকাও করা শুরু করেছিলাম ।অন্যদের সূত্রে টুকটাক কবিতার বই দেখে ,কৃত্তিবাস আর গঙ্গোত্রী পত্রিকা দেখে শক্তিচট্টোপাধ্যায় আর রণজিৎ দাশের ফ্যান হয়েগিয়েছিলাম । কিন্তু কৌরবের মলাট উলটেদেখলাম সে একেবারে অন্য জগৎ । সম্পাদকীয়, গদ্য , কবিতা , টুকরো রচনা , ফিলার এমনকিপুটে লেখা এক পঙক্তিও তুলকালাম ঘটিয়েদিলো । মনে জোর এসে গেল , যে যাই বলুক ,আমরা পারব । আমার মিনিটের কাঁটা সাইজেরবোধটোধগুলো কৌরবের ওই ঘণ্টার কাঁটারসাথে জড়িয়ে গেল আর কি । দ্যাখো তুষ্টি , এইযা কিছু লিখলাম সবই এই পরিণত রঞ্জনের একদমই আবছা হয়ে যাওয়া কিছু স্মৃতিরবিশ্লেষণ মাত্র । শেষ কৈশোর আর সদ্য যৌবনেররঞ্জনের তৎকালীন চেতনার ভিতরে ঠিক ঠিককি ঘটেছিলো তা নিয়ে এর বেশি লিখতে গেলেবানিয়ে বানিয়ে গপ্পো বলতে হয় । তা আমিপারব না । এক তো আমার স্মৃতিশক্তি প্রায় শূন্য। তারপর ওই সময়ের পাশাপাশি গিয়ে দাঁড়িয়েতার ভিতরে উঁকি দেওয়া আজ আর বস্তুতইসম্ভব নয় , আমার পক্ষে । যা হবে , তা হোলকলপকরা রঞ্জনের কচিরঞ্জন নির্মাণ ।ভেবেচিন্তে । নাহ , পারব না তুষ্টি ।

তুষ্টি: বেশ এবার নাহয় আবার পরিণত রঞ্জনের দিকে ফেরা যাক। ‘নতুন কবিতা’র বাইরে এখন যে ধরনের কবিতা লেখা হচ্ছে, তার স্পষ্ট দুটো ধারা দেখতে পাচ্ছি। এক হল অত্যন্ত জনপ্রিয় ছন্দে লেখা কিছু অবশ করা কবিতা আর দ্বিতীয় হল একটা নতুন ট্রেন্ড। এর মধ্যে অনেক নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা হচ্ছে। কীভাবে দেখেন আপনি এখনকার কবিতাকে? এর স্থায়িত্ব বা পরিণতি সম্বন্ধে কী ভাবেন?

রঞ্জন: দ্যাখো তুষ্টি , ভাবনার নতুনই কবিতাকে নতুন করে । এখন আমাদের ভাষাটি উচ্চারণগত ভাবেই কিছুটা ছন্দিল । আর যে মহাবিশ্বে আমাদের বাস , যে মহাজীবনধারায় আমাদের বেঁচে থাকা , সেখানে প্রতিটি নড়াচড়ায় , স্থিতি অস্থিতিতে , প্রবাহে প্রভঞ্জনে ,সর্বত্র নিজস্ব ছন্দ বিরাজ করে । কোন প্রত্যক্ষ জ্যামিতিক উপস্থিতি ছাড়াই । তাকে টের পাওয়া, অনুভব করা , কবিতায় তার স্পর্শ পাওয়া খুবই জরুরী । ওই কথা , আগেও হয়তো বলেছি , যে ,ছন্দ ক্লাসে কিম্বা বারান্দায় থাকে না । থাকে কানে , মগজে । এ কোন দোষ বা গুণের ব্যাপার নয় । যার আছে , আছে । যার নেই , নেই । চেষ্টা ক’রে হয় না । লেখালিখির শুরুতে ব্যকরণগত ছন্দের শিক্ষা জরুরী । কারণ তা উচ্চারণের মিতিবোধ শেখায় । তার অনুশীলন , প্রকাশের সংযম শেখায় । কিন্তু একজন কবি নিশ্চয়ই টের পান যে কোথায় এবং কখন মিতির চেয়ে জ্যামিতি বড় হয়ে উঠছে । ভাবনার অভিযান হাত পা নাড়ছে ভাবনার পথে নয় , বাঁধা মাপের নির্দিষ্টতায় । ফলে ব্যকরণমাফিক ছন্দের চর্চা সারাজীবনের বস্তু হতে পারে না ব’লেই আমার মনে হয় । যেখানে কবি , যে সব উচ্চারণ নির্মিত হচ্ছে তাঁর ভাবনায় , কলমকে তা আঁকার স্বাধীনতা দিতে পারেন না , চানও না হয়তো ।নির্দিষ্ট জ্যামিতিক মাপকে রক্ষা করার নেশায় কম্প্রোমাইজ করেন আনন্দে তৃপ্তিতে । এখন ,এসব তো আমি বলছি । এ দাবী তো করতে পারি না যে এটাই হ’ল সবার কথা । আর যিনি যা লিখে আনন্দ পাবেন , তাই লিখবেন , সেটাই স্বাভাবিক । এবং আমি এক সামান্য পাঠক মাত্র। কিন্তু আমার আমার পাঠ-স্বাধীনতাটি আমার কাছে যথেষ্টই মূল্যবান । ফলে আমি কবিতার কাছে জ্যামিতি নয় , ভাবনার নতুন , প্রয়োগের নতুন , দিগন্তে ফুলের আগুন লাগিয়ে দেওয়া নতুনেরই অপেক্ষা করব । ওহ তুষ্টি , দিগন্ত তো বস্তুতই এক অবাস্তব পরীরেখা , মানসমূর্তি মাত্র ,তাতে আগুন লাগছে ! ফুলের আগুন, ভাবো ! যা আমার মধ্যে কল্পনা জাগায় না , কবিতা জাগায় না , সেই টেক্সট নিয়ে আমি কি করব ! আর দীর্ঘকাল যোগ্য কবিদের সঙ্গ করতে করতে আমার মত অশিক্ষিত মানুষেরও চট ক’রে অবাক হওয়ার অভ্যেসটাই চলে যায় । ভাবো ক্রিকেট মাঠের মধ্যে , গ্যালারী ঘেরা বিশাল সবুজের মাঝে , কেউ যদি প্র্যাক্টিশিং নেট বসিয়ে খেলাটা চালিয়ে যেতে চান সে তো তাঁর স্বাধীনতা। কিন্তু আমি তো আমার বাড়ি চলে যাওয়ার স্বাধীনতাটুকু আশা করতে পারি ! তাতে কোনরকম ক্রিয়েটিভ সাম্প্রদায়িকতা আমাকে তাড়া করবে না এই আশাটুকু করতে পারি তো ,না কি ! যারা কবিতায় নিত্যনতুন পরীক্ষা নিরীক্ষায় মেতে রয়েছেন , যা আগে ভাবিনি ,কল্পনায় আসে নি এমন সব অনুভব-নির্মাণের সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন তাঁদের লেখায় ,আমার সকল গান শেষ অব্দি তাঁদেরই লক্ষ্য ক’রে । নাহ তুষ্টি , আলাদা ক’রে কোন নাম উচ্চারণ করব না । অনেকেই অসাধারণ কাজ করছেন । মেনে নিচ্ছি যে পরীক্ষা নিরীক্ষা থাকে, তার ভানও থাকে । বিপ্লব থাকে , তার ভানও থাকে । আমাকে দেখুন আমাকে দেখুন , থাকে ।এবং ভান , আসলের চেয়ে অনেক বেশি রঙচঙে । সদা পরিবর্তনশীল এ জগতে স্থায়িত্ব এক আপেক্ষিক ধারণা , তুষ্টি । তবে যে তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে , সব গাছ ছাড়িয়ে , তাকে তো চোখে পড়বেই , মন তো তাকে খুঁজবেই ,দীর্ঘদিন , ভাবনার আলো অন্ধকারে । কোন চিৎকৃত , মুকুটিত বা ছদ্ম বিপ্লবের বিপুল আলোকসম্পাত ছাড়াই ।

তুষ্টি: জ্যামিতি বলুন আর ভান, চিনব কী করে? কেউ হয়ত জ্যামিতিকেই কবিতা ভাবলেন, আর সেই কবিকেই তালগাছের মত দাঁড় করিয়ে দিয়ে একটা গোষ্ঠী তৈরি করলেন। অন্যজন আরও একটা। এক কবি অন্য কবির অহং-এ কবিতার ইট ছুঁড়তে থাকলেন। পাঠকও বিভক্ত হল। ফুলের আগুন লাগিয়ে দেওয়া দিগন্ত খুঁজতে গিয়ে পাঠক হারিয়ে যেতে থাকল। কবিতার পাঠক এমনিতেই কম, এখন তো কবি তাঁর কাছের মানুষ ছাড়া আর পাঠক খুঁজে পান না। তাহলে কি নিজের জন্যই লেখালেখি পড়ে রইল? ব্যক্তিগত লেখায় ভরে যাবে পৃথিবী?

রঞ্জন: যে কোন সৃষ্টি তো ব্যক্তিগতই হয় তুষ্টি । স্রষ্টা প্রথমত নিজেকে এক অন্য আনন্দে ভরিয়ে তোলার জন্য পরিপার্শ্ব ভুলে, নিত্যদিনের বস্তুগত অন্ধকার ও প্রাপ্তিগুলো ভুলে, নিজের মধ্যে এক অন্য আলো জ্বালাবার জন্যই কলম তুলি ছেনি-বাটালি ধরেন আর একেবারে ডুবে যান। মানে ,প্রকৃত স্রষ্টাদের কথাই বলছি, আমরা তো সামান্য মানুষ। ভাবো তো, বীরভূমের ওই প্রখর রোদে, একজন মানুষ, সামান্য ফতুয়া ( খালি গায়েও ), লুঙ্গি আর বিড়ি সম্বল ক’রে, মূল কাঠামোর গায়ে পাগলের মত সিমেন্ট-বালি-কাঁকড়ের মিশ্রণ ছুঁড়ে ছুঁড়ে লাগাচ্ছেন ‘কলের বাশি’-র ডাক শুনে এক আদিবাসী শ্রমিক পরিবারের কারখানামুখী গতি, শারীরিক প্রতিক্রিয়া আর উজ্জ্বলতাটুকু ধরবেন ব’লে।’সাঁওতাল পরিবার’-এর ভাস্কর্যে ছুঁতে চান মুনিষ-কামিন-তাদের বাচ্চা এবং নিত্যসঙ্গী কুকুরটিকে,নতুন বসতের দিকে তাদের অভিযাত্রার খুশীটুকু মাখিয়ে । কত দীন তারা, কত অভাবী, জাগতিক সুখস্বাচ্ছন্দ্য শূন্য, তবু সামান্যতম পেলবতাহীন ওই চূড়ান্ত রাফ একটা আদিম উপস্থিতিতেও তাদের শরীরে ভাস্করের খুঁজে পাওয়া ওই উজ্জ্বলতা ওই খুশীভাব-এর সামনে আমরা আজও মুগ্ধ বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে থাকি। কখন যেন”গায়ে আমার পুলক লাগে / চোখে ঘনায় ঘোর”।ভাবো তুষ্টি, ওই দিব্যোন্মাদ প্রায় ভাবসমাধির অবস্থায় একজন রামকিংকর তার সম্ভাব্য দর্শক এবং দর্শক হারানোর কথা মাথায় রেখে কাজটি করছেন! মাত্র চপ মুড়ি আর দেশি মদের খোরাকিতেই! ভাবা যায়!! কল্পনা!! তারপর জীবন চলিয়া গেছে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার, তবু আজও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ওই সৃষ্টির সামনে। মাথা আপনিই নুয়ে আসে, এই সেলফি-সংকুল সময়েও! ফলে,দাঁড়াল কি? তালগাছ দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায় না। আমি “তালগাছের মতো”-র কথা বলছি না কিন্তু। তো সব গাছ ছাড়িয়ে একা হয়ে ওঠা একটা স্বতোৎসার ব্যাপার, একদম একলার।এসব গোষ্ঠী আর গোষ্ঠীপতি কিম্বা গোষ্ঠীপত্নী বানিয়ে তোলার কর্মকাণ্ড থেকে অনেক দূরের ব্যাপার। সব সৃষ্টিরই নিজস্ব উপভোক্তা আছে।সার্বজনীন শব্দটা একটু বিভ্রান্তিকর মনে হয় এক্ষেত্রে। তেমনি সব ধরনের স্রষ্টাদেরই একটা বিরাদরি তৈরি হয়। সবার চিন্তাতরঙ্গ সবার সাথে তো মেলে না। যাদের যেমন মেলে তারা তেমনিভাবেই কাছাকাছি এসে পড়েন। ভাব বিনিময়, চর্চা এবং নিজের কাছে নিজে আরও স্বচ্ছ হয়ে ওঠার জন্য। ঋদ্ধির জন্য। এর মধ্যে যিনি ওই সব গাছ ছাড়িয়ে মাথা তোলেন নিজের ভাবনা-কল্পনার অভিনবত্ব, তার প্রয়োগের নবীনতা, অধ্যবসায়, সর্বস্ব নিবেদন করা সৃষ্টিকাজের মধ্যে দিয়ে, সমচিন্তাতরঙ্গের অন্য স্রষ্টারা তাঁর চারপাশে জড়ো হন, সংসার গুছিয়ে ওঠে ক্রমশ। হ্যাঁ, এও এক প্রকার গোষ্ঠীই বলতে পারো। তবে গোষ্ঠী-সংঘর্ষের গোষ্ঠী নিশ্চয়ই নয়।ইট ছুঁড়ে প্রচার পেতে চান যারা, চোখে পড়তে চান খ্যাত হতে চান অহং-এর ঘন্টা বাজিয়ে,তাঁদের নিয়ে আলোচনা ক’রে সময় নষ্ট করা খুব জরুরী কি! আমি জানি না। একইভাবে পাঠক তৈরি হয়। সেও ওই চিন্তাতরঙ্গের মিলমিশের ব্যাপার। সমতরঙ্গের পাঠকরাও নিজেদের মধ্যে প্রাপ্তির আনন্দ বিনিময় করেন। ভেবে দেখো তুষ্টি, সুদূরে-পরিণত সামান্য দূরে বসে জীবনভর কাজ ক’রে, একা একা জাগতিক মরে যাওয়া একজন স্বদেশ সেন-কে আজ কতজন কবিতাপাঠক বারেবারে আবিষ্কার করছেন নানাভাবে। সেই পাঠকদেরও তো কবি না ভেবে আলাদা করে দেবার কথা ভাবতে পারি না আমি। কবিতার পাঠক চিরকালই কম।কোনদিনই তা তেলেভাজা, পিজ্জা বা বিরিয়ানির জনপ্রিয়তা পায় নি। এসব জেনে মেনেই তো কবিতা লিখতে আসা। নিজেই। কেউ কানের গোড়ায় বন্দুক ধরে নি কবিতার লেখক বা পাঠক হওয়ার জন্য। সমাজে কবিতার বস্তুগত প্রয়োজন শূন্য। এসব জেনেই তো।তাহলে, আমি আদৌ কেন লিখব যদি একান্ত নিজের কিছু লিখতে না চাই আমি! আমরা যখন চর্চাধারাটি শুরু করেছিলাম, বাংলায় যাকে বলে টোটাল রিজেকশন তা-ই ছিল প্রাপ্তি। ‘কবিতা ক্যাম্পাস’ পত্রিকা সম্পাদনা করার সময়, ধোপা-নাপিত বন্ধ হয়ে যাওয়া কাকে বলে দেখেছি।নিজেদের পত্রিকা আর কৌরব ছাড়া লেখার জায়গাও ছিল না। পত্রিকা হাতে তুলে দিলে নামী এক অগ্রজ তা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন এতদূরও। লিখিত ভাবে নানারকম বিধ্বংসী সমালোচনা, আক্রমণ এবং আমাদের মত কবিতা-ধংসকারীদের কি কি শাস্তি হওয়া উচিৎ,সেসবও। আমাদের বোধহয় ভূতে ধরেছিল।আমাদের কোন ভ্রূক্ষেপই ছিল না। কোন হতাশা,অবসাদ, খ্যাতি দূরস্থান কোনরকম স্বীকৃতিই না পাওয়ার যন্ত্রণা এসব কিচ্ছু ছিল না, আমাদের ।স্রেফ নতুন অভিযানের আনন্দে, নিজেরা নিজেদের কাজ করে যাওয়ার আনন্দে মশগুল ছিলাম। কুড়ি বছর লেখার পরেও আমাদের মত মহান হস্তি কিম্বা এই পরিমাণ সব বিচিত্রবীর্য তাদের যোগ্য মর্যাদা পেল না কেন বলে কান্নাকাটি করি নি। কোন রঙিন পর্দা কিম্বা বড়দা, কোনটাই ছিল না আমাদের। খুব উপকার করেছিল সেই অভাব। আজ দ্যাখো তুষ্টি,অন্যরকম কবিতা লেখার কত ছেলেমেয়ে, কত পত্রিকা এবং ফেসবুক। আমরা বয়স্ক হয়েছি।কিন্তু আজও আনন্দেই আছি। কোনরকম নেগেটিভ থিঙ্কিং পাত্তা দিই না। কোথায় কোথায় থেকে , কি কি ভাবে পাঠক গড়ে ওঠে উঠেছে উঠছে তা দেখে ভারী কৃতজ্ঞ হয়ে থাকি । ধন্য হই । আর ভাবি , এই পরিস্থিতি পরিবেশ থেকেই,সাত-এর দশক থেকে নীরবে ওই পরিমাণ নিবেদন, পড়াশোনা, অধ্যবসায় আর সৃষ্টিকাজ দিয়ে একজন মানুষ বারীন ঘোষাল হয়ে ওঠেন।জানি যে ওই যাপন ৫০-১০০ বছরে হয়তো এক আধজনই করে থাকেন, করতে পারেন। জানতে পারি যে, তালগাছ কিম্বা বারীন কোনটাই বানিয়ে দেওয়া যায় না। তবে তুষ্টি, গোষ্ঠী এবং তাদের পতি বা পত্নী ও তাদের ইটগুলি ( গোটা, আমা,ঝামা ), এদের কারও প্রতিই আমাদের কোন বিদ্বেষ নেই। সবার মঙ্গল হোক।

তুষ্টি: কবিসঙ্গের কথা যখন বললেনই, এই কবিদের কাহিনী আপনার কাছে জানতে চাইছি। তাঁদের লেখা দিয়ে বা তাঁদের যাপন দিয়ে – কে, কে প্রভাবিত করেছে আপনাকে? আপনার লেখায় সেই প্রভাবের ছাপ পড়েছে কি?

রঞ্জন: সে সব কথা বলতে গেলে তো বিরাট লিস্ট হয়ে যাবে তুষ্টি। তবে একটা কথা বলব যে নিজে যখন লিখতে বসি, বহুকালের অভ্যাসমত চারপাশটা একদম শূন্য হয়ে যায়। কোন কিছুই আমার মাথায় থাকে না । আর আমার বিস্ময়কর বিস্মরণপ্রতিভা এ ব্যাপারে যথেষ্টই সাহায্য করে আমাকে। তবু কোথায় কোথায় আমার লেখার মধ্যে কে কে কি কি ভাবে রয়ে গেলেন, এ ব্যাপারে তোমরা যদি কেউ কখনও কিছু লেখো আমারও উপকার হয়, টের পাওয়া হয় যে এগুলো আমি খেয়ালই করি নি। যে কোন ঋণের সামনে কৃতজ্ঞ হয়ে নত হয়ে দাঁড়াতে আমার ভীষণই আনন্দ হয়। তবু, দু’ এক কথা। প্রভাব যে কি কি ভাবে আসে! সে গতজন্মের কথা প্রায়। বিষ্ণুপুরে দলমাদল কামানের পাশে ছিন্নমস্তা মন্দিরটি তখন নির্মীয়মাণ, সমাপ্তপ্রায়। আমার অকালপ্রয়াত ছবি-আঁকিয়ে বন্ধু প্রদীপ বিশ্বাস আর আমি মাঝে মাঝে ওই মন্দিরের হলটিতে বসে থাকতাম। তো একদিন আমরা গল্প করছি আর একজন অন্ধ মানুষ একতারা বাজিয়ে একা একাই গান গেয়ে চলেছেন। আমাদের অত বকবকমের মধ্যেও হঠাৎ একটা লাইন কান পেরিয়ে একদম সর্বস্বে এসে লাগলো। ” আমার দেহের মধ্যে সুজন যে জন / তার ঘরেতে ঘর করেছি “। কত ক্যালেন্ডার হারিয়ে গেল তুষ্টি, তার পর। কিন্তু এই লাইনটা বিশেষত ” সুজন ” শব্দটি আজও আমায় ছাড়ে নি। খোঁচায় মাঝে সাঝে, ভাবতে বলে। সদ্য কৈশোরে ছিলেন রবীঠাকুর। হ্যাঁ , চোথা মারতাম বৈকি। কিন্তু পেছনটি পেকে ওঠার সময়ে সামনে ছিলেন আনন্দ বাগচী, তখন বাঁকুড়া ক্রিশ্চান কলেজে পড়াতেন। ছিলেন সুবো আচার্য, ঈশ্বর ত্রিপাঠী, রূপাই সামন্ত। অনেক স্নেহ পেয়েছি। যা আমার মূল্যবান স্মৃতি। কিন্তু ওই যে কবিবন্ধু স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা, তৎকালীন স্বনামধন্য ‘ চারণকবি বৈদ্যনাথ ‘, তিনি আমাকে একটু বেশিই ভালবাসতেন, একদিন হঠাৎ বললেন যে, ” তোর লেখার মাথায় যেদিন তোর নাম লেখার প্রয়োজন ফুরোবে, সেদিনই বুঝবি কিছু করলি “। এ আমি আর কখনও ভুলতে পারলাম না। কৌরব-এর সঙ্গে যোগাযোগ-এর পর কমল দা মানে চক্রবর্তীর একটা লেখায় পড়লাম, ” পাটক্ষেতে চাপ চাপ রক্ত পড়ে আছে / সারারাত জমেছে রায়ট ওই সবুজ বিভায় “– রায়ট শব্দের ওই ব্যবহার আমি আগে পরে কখনও দেখি নি। ভুলিও নি। অন্ধের মত ফ্যান ছিলাম শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের। মুখস্ত থাকত কবিতা। আজ উল্লেখে যদি কোন ত্রুটি থেকে যায়, আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। একটি কবিতা শুরু হচ্ছে, ” ছুটে কে তুলিলে শালবন / বাহুবন্ধন চারিধারে “, আর শেষ হচ্ছে, ” কে ছুটে তুলিলে শালবন / ঘনবন্ধন চারিধারে “– ‘ছুটে কে’ থেকে ‘কে ছুটে’ আর ‘বাহুবন্ধন’ থেকে ‘ঘনবন্ধন’ এই জার্নিটা নিজের মত ক’রে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছি কতবার। মনে পড়ছে, গভীর শীতের রাত আড়াইটে। ধলভূমগড়ের বনবাংলোর ঘরে সবাই ঘুমোচ্ছে। আর খোলা বারান্দায় চাদর মুড়ি দিয়ে ব’সে আমি ধীমান আর প্রণবদা (দে) শুনছি বারীনদার “সৎকার” পাঠ। সেই শিহরণ, ” নাম কি / নাম কি বল বাবা / অস্ফুট বরফ ঝরে পড়ে “– শুনতে শুনতে চোখে জল এসে যাওয়া, ভুলি নি। গুরুপ্রতিম প্রয়াত কবি উত্তর বসুর ওই প্যাশনেট উচ্চারণ! বন্ধুরা ধীমান চক্রবর্তী – অলোক বিশ্বাস – প্রণব পাল – রতন দাস প্রত্যেকের কাছেই কিছু না কিছু শিখেছি। ধীমানের কবিতায় সমস্ত উচ্চারণে প্রবহমান একধরনের উদাসীনতা অথচ এ সংসারের পরিচিত মায়া ও রহস্য থেকে অন্য আলো বার করা। আর স্বপন রায়! টোটাল অ্যাডিকশন একখানা। খুব ভয়ে ভয়ে পড়ি আমি। হাত সুলায়। পাগলের মত ইচ্ছে করে নকল করতে। পরবর্তী জনেদের মধ্যে অনেকেরই আমি ভক্ত পাঠক, ওরকম লিখতে পারলে নিজের পিঠ চাপড়াতাম। একদম সাম্প্রতিকে অনুপম মুখোপাধ্যায়, নাহ কোন তাত্ত্বিক তর্ক নয়, অনুপমের উপস্থাপনার অভিনবত্বটি একেবারেই ওর নিজস্ব, দ্বিতীয়-অসম্ভব। তুষ্টি, ঝুঁকি আর ঝাঁকি নিয়েই তো কেটে যায় কবিতাজীবন। ঝুঁকি বলতে মনে পড়ে স্বদেশদাকে। ” নতুনের কোন দুঃখ নেই “। অমর উচ্চারণ। আকাঙ্ক্ষার দুঃখ নিয়ে, আপসোস পিছুটান নিয়ে, যে কোন মূল্যে খ্যাতি চাই / না পেলে বাঁইচব নাই , এ সব নিয়ে তো নতুন করা বা নতুন হওয়া যায় না। আর ঝাঁকি। কত ঝাঁকিই তো চালিয়ে নিয়ে এল এতদূর! কত বছর আগে, এক কবির দু’টি কবিতা বেরোলো এক নামী পত্রিকায়। প্রথমটির শুরুটা এরকম, ” গোলাপ বাগানে ঢুকে / কুপ্রস্তাব করেছিল নগ্ন যুবক / বলো কে বেশি সুন্দর / তুমি, না আমার এই প্রস্ফুটিত শিশ্নমুখ ” — চমকে উঠেছিলাম যৌবনের এই চ্যালেঞ্জিং উদ্ভাসে। কিন্তু ঝাঁকি হয়ে রয়ে গেল অন্য কবিতাটির দু’টি লাইন। ” দুঃখী মানুষেরা ঠিক তত দুঃখী নয় / তাদেরও নৈশ রেডিওতে আছে কিশোরকুমার “– আহা। যারা এই পঙক্তি দু’টি শুধু স্যাটায়ার হিসেবে পড়েন তাঁদেরকে প্রণাম। আমাকে তো ওই ‘কিশোরকুমার শব্দটি’ টানতে টানতে এক বিস্তৃত প্রান্তরে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়। জানি না স্মৃতি বেইমানি করছে কিনা। কবিতা দু’টির লেখক রণজিৎ দাশ। এ প্রসঙ্গে বলি তুষ্টি, ঐহিক পত্রিকার সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে, রণজিৎদাকে জীবনকৃতি সম্মাননা দিতে দেখে, আমার ভিতরে খুব একটা উত্তেজনা হচ্ছিল। এই কথাগুলোই ওখানে বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু লজ্জায় সংকোচে পারি নি।

তুষ্টি ভট্টাচার্যঃ- গত পর্বে বারীনদার কমেন্ট থেকে জানলাম, কোন এক অভিজ্ঞতার কথা বলতে ভুলে গেছেন। সেটা কী?

রঞ্জন মৈত্রঃ- আরে না না, আমার অভিজ্ঞতা কিছু নয়। বারীন দা মজা করেছে। আসলে বেশ কিছু বছর আগে বারীন দা আর স্বপন বিষ্ণুপুরে বেড়াতে গিয়েছিল। সেখানে নানাবিধ ঘোরাঘুরির ফাঁকে ওদের মাথায় নাকি এসেছিল যে বিষ্ণুপুরের এক নাকি একাধিক জায়গায় ফাঁকা বেদীতে আমার মূর্তি বসাবে। এই হোল ব্যাপার।

তুষ্টিঃ- এতদিন ধরে অনেক কথা জানলাম আপনার কাছ থেকে। এবার একটু ভবিষ্যতের দিকে তাকানো যাক। নতুন কিছু পরিকল্পনা আছে আপনার কবিতা নিয়ে বা কবিতার বই নিয়ে? আমরা চাই না এমন দিন আসুক, তবু যদি কোনদিন কবিতা আপনাকে ছেড়ে চলে যায়, কী করবেন? একান্ত নিজের সম্পাদনায় কোন পত্রিকা করার ইচ্ছে আছে?

রঞ্জনঃ- একটা ঝাঁকুনি দরকার তুষ্টি, জোরদার একটা ঝাঁকুনি। যা লিখছি তা পুনরাবৃত্তি মনে হচ্ছে। এমনিতেই খুব কম লিখি। তো আরও কিছু কবিতা নামিয়ে আর একটি বই নামানো। কি হবে তুষ্টি! নিজেকেই যদি খুশী না করতে পারি! কবিতা লেখার সময় গোটা পথটি তুমি যদি আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করো তাহলে সেই আনন্দের ছাপ লেখাটির সারা শরীরে লেগে থাকে। তখন সেই অভিযাত্রার আনন্দ পাঠককেও স্পর্শ করে। সেইরকম নতুন কোন পথের খোঁজ পেতে, আগে মনে মগজে একটা তুলকালাম দরকার। জানি না পাবো কিনা। আশায় আছি।

কবিতার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা মনে হয় কিছুটা সিগারেটের মতই। কতোবার যে ছাড়ার পরিকল্পনা করলাম! আর কমিয়ে ফেলার পরিকল্পনা তো প্রায় রোজই। একদম হিসেব ক’রে ফেলি যে সকাল থেকে কখন কখন খাবো,সারাদিনে তাহলে সংখ্যাটা কতটা কমে দাঁড়াবে। পরের দিনই অবশ্য সেই পরিকল্পনার ষষ্ঠী পুজো করে দিই, নিজেই। দিনের পর দিন এমনকি মাসের পর মাস একটি লাইনও না লিখে কেটে যায়। কোন চাড় নেই, দীর্ঘশ্বাসও না। এবং মাঝে মাঝেই পরিকল্পনা, কি ক’রে পরের দিন থেকেই সর্বস্ব দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব। পরের দিনটিও , ওই,কেটে যায় আর কি। তবু নানা চাপে লিখে ফেলি মাঝে সাঝে। ভালোবাসা সমালোচনা দুই-ই জুটে যায়। তো আমাকে কবিতার পুরোপুরি ছেড়ে যাওয়াটা খুব সন্দেহজনক একটা জায়গায় রয়েছে বলেই মনে হয়। তবু যদি ছেড়ে যায়, কি আর করব, তোমাদের সকলের লেখা পড়ব মাঝে সাঝে।

দ্যখো তুষ্টি, আমাদের ‘নতুন কবিতা’ পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে আমি মারাত্মক স্বাধীনতা পেয়ে এসেছি। আদরে বাঁদর হয়েছি হয়তো কখনও কখনও। কিন্তু স্বপন(রায়)-এর মতো কবিবন্ধু, আর সব্যসাচী হাজরা বা তপোন দাশ-এর মতো কবিভাই ছেড়ে, এইসব ভীষণ মূল্যবান অনুপ্রেরণা ছেড়ে কোথায় যাব একা একা! এরা না থাকলে পত্রিকা করাও ছেড়ে দিতাম কবেই। তবে হ্যাঁ, হাত থেকে লেখা বেরিয়ে গেলেই যে সব বাবুমশাইরা সাঙ্ঘাতিক প্রশ্নময় কেনময় দার্শনিক বিশ্ব-নিন্দুক, কিছুই-হচ্ছে-না সব-গেল চিন্তায় আকুল হয়ে, কতকাল আগে থেকে সাম্প্রতিক পর্যন্ত, এমনকি এককালের অন্যধারার কবি পর্যন্ত, যে ভীষণ মৌলিক প্রশ্নগুলো তুলে স্থান কাল এবং বিশেষত পাত্রটিকে আলোড়িত করতে চান, তেমন অবশ্যই করব না। কারণ অত পড়াশোনা প্রতিভা যোগ্যতা বা খ্যাতি কোনটাই আমার নেই।

তুষ্টিঃ- আপনি নিজে দক্ষিণবঙ্গের মানুষ হয়েও উত্তরবঙ্গের কবি মহলের অন্তর্গত – এ কথা বললে কি ভুল বলা হবে? প্রতিষ্ঠিত কবি মানেই যেন কলকাতার কবি। এঁদের থেকে দূরে থাকেন ইচ্ছে করেই?

রঞ্জনঃ- বাঁকুড়ায় থাকার সময়ে একটা কথা শুনতাম মাঝে মাঝে, ” কাঁদবি না কাঁথা কচালবি!” অর্থাৎ কাঁদবি না কাঁথা কাচবি? তখন কিছুই বুঝতাম না। এখন মনে হয় সদ্য-প্রসবিনী মায়ের উদ্দেশ্যেই এই লোকবাক্যটি। অর্থাৎ নিজের শরীরের ব্যাথাবিষে কান্নাকাটি করবি নাকি বাচ্চার বারবার ভিজিয়ে ফেলা কাঁথা কাচবি। তো তুষ্টি, তোমার এই প্রশ্নটি প’ড়ে আমার সেই অবস্থা হোল। তুষ্টি ম্যাডাম, একমাত্র চাকরিসূত্রে, কিছুকাল আগে এক বছর শিলিগুড়ি আর ২০০২ থেকে দু বছর ডালখোলা,এই আমার উত্তরবঙ্গ বাস। পত্রিকা যা করেছি,সদস্য থাকা বা সম্পাদনা, একটু খানিক বিষ্ণুপুরে (বাঁকুড়া) আর বাকি সব কলকাতার ঠিকানা। লেখালিখিও প্রায় সবই এই ইছাপুরে ব’সে, যার মেগাসিটি পিনকোড কলকাতা -৭০০১২৫। এটা অবশ্য আমি কখনোই ব্যবহার করি না। তবু আমি উত্তরবঙ্গের কবি মহলের অন্তর্গত, এই খবরটা কে দিল? তুষ্টি, আমি একটা রাজ্যে বাস করি যার নাম পশ্চিমবঙ্গ।তো পশ্চিমের কি ক’রে উত্তর দক্ষিণ হয়, আমার কেমন গোলমাল হয়ে যায়। মনে হয়, মোচার ওমলেট। আসলে কবিদের জগতটা এত ছোটো যে তার মধ্যে আবার উত্তর দক্ষিণ কলকাতা দিল্লী গোয়া বা ভীমব্যাঠকার কবি, এসব কি ক’রে হয় আমার মাথায় ঢোকে না।

ফলে, কলকাতার কবি ব’লে কিছু আমি বুঝি না। হ্যাঁ কলকাতা থেকে দূরে থাকি, ট্রেনপথে ২৭ কিমি। অভ্যেস খারাপ হয়ে গিয়েছে তুষ্টি।পত্রিকা সম্পাদনাও যখন যা করেছি, কবিতা নির্বাচনের সময় কবির নিবাস এবং এর আগে তিনি কোথায় কোথায় লিখেছেন এই দুটি বিষয় ঘুণাক্ষরেও মাথায় আসতে দিই নি। ভাবনার নতুন, উপস্থাপনার নতুন, উচ্চারণের নিজস্বতা এবং অভিনবত্ব এই তো খুঁজে বেড়িয়েছি পাগলের মতো। এই করতে গিয়ে দ্বিমুখী ঝাড়ও খেয়েছি কখনও কখনও। সে গল্প থাক। ফলে পশ্চিমবঙ্গবাসী এবং বাংলা ভাষায় কবিতা লেখার চেষ্টা করি, এই পরিচয়েই আমি খুশী।কবিতায় প্রতিষ্ঠিত শব্দটি যে কাকে বোঝায়, এ খুব গোলমেলে বস্তু। ভাবো না, জীবনানন্দ পরবর্তী বাংলা কবিতায় ইউনিক মৌলিক বাঁক কবি স্বদেশ সেন একজন অপ্রতিষ্ঠিত, অনামী।ন্যাকাডেমি পান নি, মরে গেলেন। আর ওঁর সবচেয়ে দুর্বল কবিতারও ধারেপাশে যাওয়ার মতো একটা লাইন না লিখেও কত লোক কি সাঙ্ঘাতিক প্রতিষ্ঠিত! ইচ্ছে করে না, ওই প্রতিষ্ঠিত শব্দটির পিছনটি  মারগো সাবান দিয়ে ভাল ক’রে সাফ ক’রে তারপর ক্যাঁৎ ক্যাঁৎ ক’রে চারটে লাথি মারি, ওই সেলেব পিছনটিতেই!

তুষ্টিঃ- এই সাক্ষাৎকারের একদম শেষ প্রশ্নে আসছি। কবি হিসেবে আপনি নিজেকে কত নম্বর দেবেন? আর মানুষ হিসেবেই বা কত? একজন ভালো কবি না একজন ভালো মানুষ – কোনজনের বেশি প্রয়োজন এই সমাজে?

রঞ্জনঃ- এই রে, আজ অব্দি তো এসব ভাবিই নি কোনদিন। আমি অতি সামান্য একজন কবিতালেখক। তাও একেবারেই স্বল্পপ্রজ। নিজের লেখা সম্পর্কে বাড়তি কোন আহ্লাদ বা আশকারা নেই মনে। আর নিজেকে যতটুকু চিনি, এই নম্বর টম্বর দেওয়ার ব্যাপারটা আমার কম্মো নয়।

সমাজের প্রাথমিক প্রয়োজন একজন ভালো মানুষ। আর ভালো মানুষ না হ’লে, চওড়া অন্তর না হ’লে, মাথার ভিতরটা কূটকচালি ঈর্ষা লোভ আর নানাবিধ কুত্তার গু থেকে মুক্ত না হ’লে,ভাল কবি হওয়া অসম্ভব বলেই মনে করি। কবি তথা অন্যান্য সৃজনশীল মানুষেরা অন্য মানুষের মনের ক্ষুধা মেটান, তার মানবিক ও সুকুমার প্রবৃত্তিগুলি বাঁচিয়ে রাখার কাজে সাধ্যমত পুষ্টির জোগান দেন। নইলে মানুষের ইতিহাস তো উপার্জন খাওন রমন আর পিছন উলটে ঘুমিয়ে পড়নের ইতিহাস হয়েই থেকে যেত।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত