তুইঙ্কল তুইঙ্কল লিতিল এস্তার

– তুইঙ্কল তুইঙ্কল লিতিল এস্তার
যশোহর রোডের ওপর এক্কেবারে রাস্তার ধারে ‘বিদ্যাভারতী গার্লস হাই স্কুল’। বহুদিনের পুরনো স্কুল। বিশাল বিল্ডিং, অনেকখানি জায়গা জুড়ে।দুটো বড় খেলার মাঠ। বিশাল বড় অডিটোরিয়াম, স্কুলের চারধারে বাগান। সম্প্রতি দুটো ল্যাব ও কম্পিউটার রুমও যুক্ত হয়েছে। স্কুলের ঠিক পাশেই একটা নতুন ফ্ল্যাট বাড়ি উঠেছে। দশতলা ফ্ল্যাট। মোমের মা ওখানে কাজ করে। মাথায় পর পর ইট সাজিয়ে দিয়ে আসে রাজ মিস্ত্রির কাছে। আর ছোট্ট মোম নীচে রাস্তায় বালি আর স্টোন চিপসের পাহারটার মাঝখানে বসে খেলা করে বিল্টু, লখন, ছোটু আর গোবলুর সাথে।

– ইদানীং কী হয়েছে কে জানে মোমের। স্কুলের কাছে কাউকে আসতে দেখলেই ছুটে আসে। হাঁ করে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে খানিকক্ষণ । তারপর হঠাৎ করে বলে ওঠে – তুইঙ্কল তুইঙ্কল লিতিল এস্তার
– পাগল নাকি রে মেয়েটা!

কেউ কেউ হেসে ওঠে। কেউ কেউ বিনুনি দুলিয়ে ভেঙায় ওকে! আবার কারো কারো দয়ার শরীর! মোমের ময়লাটে হাতের মধ্যে দু- পাঁচটাকা গুঁজে দেয়। মোম কিন্তু টাকাটা নেয় নয়া। সেটা আবার ফেরত দিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে মুখের দিকে তাকিয়ে বলে
– তুইঙ্কল তুইঙ্কল লিতিল এস্তার
– ধুর ছাই!
– মেয়েটার মুখটা কিন্তু খুব মায়াময় ! চোখ দুটো দেখলে বড় করুণা হয়!
– কিন্তু বুঝি না তো কী যে বলে, পাগল টাগল নাকি!
– দিদিমণিরা আলোচনা করেন। কেউ কেউ হেসে ওর উস্‌খো- খুস্‌খো উকুন ধরা চুলে ঢাকা মাথাটায় একটু হাত বুলিয়ে দেন। মোম সেই আগের মতোই ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে আর বলে – তুইঙ্কল তুইঙ্কল লিতিল এস্তার।

সেদিন তো দৌড়ুতে গিয়ে আর একটু হলে ধাক্কা লেগে সিমেন্টের বস্তাটাই পড়ে যাচ্ছিল। প্রোমটার সাহেব তখন স্বয়ং উপস্থিত! কাণ্ড দেখে তো তাঁর এক্কেবারে মাথা গরম! মোমের মাকে ধমকে দিলেন!
– মেয়েকে দেখে রাখতে পারিস না! কী খালি দৌড়ে বেড়ায়! আর একটু হলে আমার কত টাকা লোকসান করে দিচ্ছিল! কে দেবে টাকা, তোর বাপ?

– শুনে মোমের মার –ও রাগ এক্কেবারে চড় চড় করে বেড়ে গেল! ঐখানেই , ঐ মাটিতে ফেলে মোমের পিঠে দমাদ্দম দু-চারটে কিল দিয়ে দিল। মোম আর কী করে! ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল খানিকক্ষণ। তারপর চোখ মুছতে মুছতে বলল – তুইঙ্কল তুইঙ্কল লিতিল এস্তার।
দিনকে দিন ব্যাপারটা স্কুলের বাচ্চাদের গার্জেনদের কাছে অসহ্য হয়ে যাচ্ছে। বড় মেয়েদের গার্জেনরা বিশেষ আসেন টাসেন না! তারা সব সেলফ ডিপেনডেন্ট। নিজেরাই চলে আসে। কেউ কেউ আবার সাইকেল চালিয়ে আসে। নেহাত যারা দূরে থাকে, তাদের জন্যও স্কুলবাস আছে। কিন্তু ছোট ছোট বাচ্চাদের গার্জেনরা, বিশেষত মায়েরা সঙ্গেই আসেন, মোমকে নিয়ে তারা ব্যাতিব্যস্ত!

– আমার মেয়ে তো ঐ পাগলি মেয়েটার ভয়ে স্কুলে আসতেই চায় না!
– কিছু একটা ব্যবস্থা নেওয়া উচিত! একদিন ওর মা-কে ধরতে হবে!
– ওদের বলে কিছু হবে না। দু একদিন আনবে না। তারপর দেখবেন, আবার এখানে ঘুর ঘুর করছে। যতদিন না এই ফ্ল্যাট কমপ্লিট হচ্ছে, ততদিন কিচ্ছু করার নেই।
– তা যা বলেছেন !
– মোম সবার কথাই শুনতে পায়। কিছুটা বুঝতে পারে, কিছুটা বোঝে না। শুধু সবার দিকেই ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায়, আর বলে – তুইঙ্কল তুইঙ্কল লিতিল এস্তার।
মোম আসলে কাউকেই ঠিক বুঝিয়ে উঠতে পারে না, – “ওগো দিদিমণিরা, ও গো দাদা- দিদিরা আমি পাগল নই গো, টাকাও চাই না। শুধু জানতে চাই এর পরে কী আছে।”

স্কুলের উঁচু পাঁচিল ভেদ করে কী করে কে জানে এটুকু হাওয়া এসে লেগেছে ওর গায়ে! তাতেই বেচারি পাগল হয়ে উঠেছে পরেরটা জানার জন্য।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত