উৎপল দত্ত : যেমন দেখেছি

উৎপল দত্তকে আমি সামনাসামনি প্রথম দেখি ১৯৬৭ সালের প্রথম দিকে। কিন্তু তার আগে তাঁর সঙ্গে পরোক্ষ পরিচয় হয়েছিল। এম এ ক্লাসে ড. সাধন ভট্টাচার্য তাঁর নাটকের কথা বলতেন। একবার রবীন্দ্র ভারতীতে উৎপল দত্তের বক্তৃতার আয়োজনও করেছিলেন তিনি। দুর্ভাগ্যবশত সেদিন আমি হাজির হতে পারি নি। উৎপল দত্তের ‘অঙ্গার’, ‘ফেরারী ফৌজ’, ‘ঘুম নেই’ নাটকগুলি পড়েছিলাম। মিনার্ভা থিয়েটারে তাঁর ‘কল্লোল’ নাটক অভিনীত হচ্ছিল। এই নাটকে নৌবিদ্রোহ দমনের কলঙ্কিত অধ্যায়কে উৎপল তুলে ধরেছিলেন বলে কংগ্রেসীদের খুব রাগ ছিল। পার্টির নির্দেশে ছাত্র-যুবরা মিনার্ভা থিয়েটার পাহারা দেয়। কৌতূহলবশত আমি একদিন এক বন্ধুর সঙ্গে মিনার্ভা গিয়েছিলাম। অনেকক্ষণ ছিলাম। কিন্তু উৎপল দত্তকে দেখতে পাই নি।
আমাদের শিয়ালদা-বিদ্যাসাগর লোকাল কমিটির সম্পাদক সুজিত আচার্য আমাকে একদিন বলেন যে উৎপল দত্তের শ্বশুরবাড়ি হ্যারিসন রোড ও কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে। হ্যারিসন রোড ও বেনেটোলা লেনের মুখে সেঞ্চুরি মেডিকেল নামে ওষুধের দোকানটা উৎপল দত্তের শ্বশুর মশায়ের। আর আমাদের কমরেড শুভেন্দু সেন হলেন তাঁর শ্যালক, শোভা সেনের ভাই।
১৯৬৭ সাল। বিধানসভার নির্বাচন আসন্ন। কংগ্রেসের নেতৃত্বে আছেন অতুল্য ঘোষ আর প্রফুল্ল সেন। খাদ্য আন্দোলনে জেরবার তাঁরা। ভাবমূর্তি কলঙ্কিত নানা কারণে । সিপিএম একটা জোট গড়ে নির্বাচনে লড়ছে। মানুষের মনে একটা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠেছে। উৎপল দত্ত এই পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি করেছেন একটা পথনাটিকা। ‘দিনবদলের পালা’। আমি তখন থাকি সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটের রুবি বোর্ডিং-এ। এই সীতারাম ঘোষ স্ট্রীটের পাশেই নরেন সেন স্কোয়ার। সেখানেই হবে ‘দিনবদলের পালা’র অভিনয়।

আমাদের পাড়াটা ছিল স্বনামধন্য ফাটা কেষ্টর পাড়া। আমাদের রুবি বোর্ডিং-এর ছাদে তিনি বোমার মশলা শুকুতে দিতেন। আমর্হাস্ট স্ট্রিটের ওপার ছিল সোমেন মিত্রের এলাকা। প্রায়ই সোমেন মিত্রদের সঙ্গে ফাটা কেষ্টদের বোমা যুদ্ধ হত। নরেন সেন স্কোয়ারেও মাননীয় ফাটা তাঁর অনেক অনুষ্ঠান করতেন। তাই নরেন সেন স্কোয়ারে উৎপল দত্তের নাটক হবে শুনে ভয় হয়েছিল। কোন গোলমাল হবে না তো! কিন্তু বাটুদা, পল্টনদারা জানিয়ে দিলেন আমাদের প্রচুর কমরেড পাহারায় থাকবেন।
পথনাটিকা সম্বন্ধে আমার কোন ধারনা ছিল না। সেদিন দেখলাম মঞ্চ ছাড়া, মঞ্চমায়া ছাড়া দিব্যি জমতে পারে নাটক। জমতে পারে দিবা-দ্বিপ্রহরে। প্রচারমূলক নাটক, একথা ঠিক। কিন্তু কয়েক হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে দেখছে, তারিয়ে তারিয়ে দেখছে। নাট্যকার তাঁর প্রচারমূলক বক্তব্যকে গুলে মিশিয়ে দিয়েছেন নাটরসের সঙ্গে। শ্লেষ আর কৌতুক ঝিলিক মারছে। হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে মানুষ। কৌতুক শেয হতে না হতেই একটা ভাবনার ধাক্কা।
আমার আর সেদিন রবীন্দ্রভারতী যাওয়া হল না। আড়াইটে নাগাদ শেষ হল পথনাটক। আমার মনের মধ্যে তার রেশ রইল অনেকক্ষণ। তাহলে সাহিত্যও হতে পারে সমাজ বিপ্লবের হাতিয়ার। সে যে কাজ করে যায় গোপনে গোপনে।

দিন কয়েক বাদে মেদিনীপুরের সিপিএম নেতা ডহরেশ্বর সেন এলেন আমার বোর্ডিং-এ। সকালবেলায়। এই মানুষটিকে আমি খুব পছন্দ করতাম। সরল সিধে মানুষ। বাগাড়ম্বর নেই। নেতাসুলভ দেমাক ও গাম্ভীর্য নেই। বললেন, ‘দিলীপ, জানো তো এবার খড়গপুরে নারায়ণ চৌবের বিরুদ্ধে আমরা প্রার্থী দিচ্ছি !’
নারায়ণ চৌবে সিপিআইএর প্রার্থী। তখন সিপিআই সিপিএমের জোটে ছিল না। কিন্তু নারায়ণ চৌবে সে কেন্দ্রে জিতে আসছেন, জনপ্রিয় প্রার্থী। তাঁর বিরুদ্ধে সিপিএমের প্রার্থী কি লড়তে পারবেন! ডহরদা বললেন, ‘ জানি । তবু চেষ্টা করব।’ তাঁর মুখে শুনলাম সিপিএম জনার্দন রাওকে প্রার্থী করেছেন। এ ব্যাপারে কমবয়েসী কমরেডরা খুবই উৎসাহিত। ডহরদা বললেন, ‘আমরা ঠিক করেছি খড়গপুরে একটা জনসভা করব। প্রধান বক্তা জ্যোতি বসু। সেই সভায় উৎপল দত্তের দিনবদলের পালা হবে ।’
বললাম, ‘উৎপল দত্তের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন?’
-‘ আরে না, না। সে দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে।’
লোভ আর ভয় দুটোই হল। লোভ, কেননা উৎপল দত্তের সঙ্গে কথা বলতে পারব মুখোমুখি। ভয়, কেননা এই বিশাল মাপের, ড্যাবা ড্যাবা চোখের ব্যক্তিত্ববান মানুষটির সঙ্গে কি ভাবে আলাপ করব। ডহরদার মতো মানুষকে প্রত্যাখ্যান করা মুশকিল। রাজি হতেই হল।
শুভেন্দুদার কাছে জেনে নিলাম উৎপল দত্ত রাজা বসন্ত রায় রোডে থাকেন। মেদিনীপুরের বার্তা নিয়ে আমি যে যাব, ফোন করে তিনি জানিয়ে দিলেন উৎপল দত্তকে।
বৈঠকখানায় বসে ‘গণশক্তি’ পড়ছিলেন। আমি পার্টির চিঠি দিলাম। সেখানকার পার্টির হাল-হকিকত জেনে নিলেন। যতটুকু জানি বললাম। বললেন, ‘ সেদিন আমাদের কোন প্রোগ্রাম নেই। আমরা যাব। আপনি দুপুরের ট্রেনের টিকিট কাটতে বলবেন।’
নির্দিষ্ট দিনে গিয়ে দেখি লোকজন কেউ নেই। উৎপল দত্ত একা। হয়তো বাইরে আছেন। তাই কটা ট্যাক্সি ডাকব জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, ‘ একটা মুশকিল হয়েছে। জলপাইগুড়িতে শো করতে গিয়ে আটকে পড়েছে আমার টিমের লোকেরা। তাই আমি একাই যাব।’
সর্বনাশ। ডহরদারা নাটক চাইছিলেন। উৎপল দত্ত কি একাই দিনবদলের পালা করবেন! তাঁর মুখের উপর এসব কথা বলা যায় না । আবার ডহরদাকেও জানাতে পারছি না। তখন তো মোবাইল ফোনের চল হয় নি।
ট্যাক্সিতে উৎপল দত্তকে নিয়ে হাওড়া স্টেশনে এলাম। বড় ঘড়ির কাছে সংগোপনে সসংকোচে দাঁড়িয়ে ছিলেন ডহরদা। সংক্ষেপে তাঁকে জানালাম সব। একটা ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কাটতে বললাম উৎপল দত্তের জন্য। আমরা দুজন যাব জেনারেলে।
খড়গপুরের সেই জনসভা আমার জীবনে একটি স্মরণীয় ঘটনা।

চন্দ্রকোণা থেকে জ্যোতি বসুর আসতে দেরি হবে শুনে সংগঠকরা উৎপল দত্তকে প্রলম্বিত ভাষণ দিতে অনুরোধ করলেন। সে তো নিছক বক্তৃতা নয়, সেও একটা নাটক। প্রথমে মাইকের কাছে গিয়ে টোকা মেরে বুঝলেন মাইকটা উপযুক্ত নয়। ঠেলা মেরে সেটা সরিয়ে দিয়ে খালি গলায় বলতে লাগলেন, ‘বন্ধগণ, আমি খালি গলায় দশ হাজার মানুষের কাছে আমার কথা পৌঁছে দিতে পারি। তবে গত এক মাস ধরে নাটক করতে করতে আমার গলার অবস্থা খারাপ। তাই আপনারা কোন শব্দ না করে শুনতে থাকুন।’
তারপর শুরু হল মূল ভাষণ। ভাষণ তো নয়, অমৃতবাণী।
নারায়ণ চৌবে ও সিপিআইএর নামে চলল নির্বিচার গালাগালি। হরেকৃষ্ণ কোনারের বক্তৃতায়ও গালাগালি থাকত, তবে এত উপর্যুপরি কাঁচা নয়। শুনতে শুনতে আমার মনে পড়ছিল উৎপল দত্তের ‘একটি তলোয়ারের কাহিনি’ নাটকের কথা। কে যেন বলেছিল সিপিআইএর মহম্মদ ইলিয়াসের বিচ্যুতি তুলে ধরা হয়েছিল সেই নাটকে। যৎপরোনাস্তি কাঁচা গালাগালিতে বিদ্ধ করা হয়েছিল সংশোধনবাদী সেই নেতা ও তাঁর দলকে।

সেবার নির্বাচনে জনার্দন রাওএর জামানত বাজেয়াপ্ত হয় । তার জন্য উৎপল দত্ত যে একা দায়ী, নিশ্চয় সে কথা বলা যায়ে না। মাস দুয়েক বাদে দেখলাম ‘দেশহিতৈষী’তে ‘কল্লোল’ নাটকের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছ। শুভেন্দুদার কাছে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘ উৎপল পার্টিকে ব্যবহার করে। নিজে পার্টি সদস্য হতে চায় না, ওর গ্রুপের লোকেদেরও সদস্য হতে বাধা দেয়। পয়সার জন্য আজেবাজে হিন্দি সিনেমা করে। আসলে কেরিয়ারিস্ট, অপরচুনিষ্ট ।’ তবে একথা ঠিক যে উৎপল দত্ত পার্টিকে যেমন ব্যবহার করেছেন, তেমনি পার্টিও ব্যবহার করেছে তাঁকে। একসময় তিনি নকশালদের হয়ে কথা বলতে শুরু করেন। পার্টি তখন বিষোদগার শুরু করে। তারপরে আবার কিছুটা মিলমিশ হয়। এভাবে রাগে-অনুরাগে চলতে থাকে। যাত্রায়, নাটকে, সিনেমায় তাঁর অবদান অস্বীকার করার সাহস দুর্দান্ত ও দুর্বিনীত নিন্দুকেরও নেই।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত