ভালোবাসা দিবসের ছোটগল্প: সরোদ জীবন

Reading Time: 8 minutes

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,valentine dayরজত চলে যাচ্ছে। গোলদিঘি ছেড়ে, আমাদের আড্ডা ছেড়ে সব গুটিয়ে নিয়েসে চলে যাচ্ছে। আমার ভীষণ মন খারাপ; কিন্তু রজতের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

সে ম্যাজিক দেখাতে ব্যস্ত। কানের পেছন থেকে কয়েনটা এনে হাতে দিতেই বাচ্চাগুলো হেসে কুটিকুটি হচ্ছে। আমার অভিমান ওকে স্পর্শ করছে না। পত্রিকায় মুখটাকে আড়াল করে রাখলেও আড়চোখে ওকে দেখছি আমি। রজত হাসছে। গজদন্তের ঝকঝকে হাসি। ওর বোধ হয় বয়স বাড়ছে না। আমি ওকে দেখছিলাম আর আমাদের অ্যালবামে রাখা ওর কিশোর বয়সের চেহারাটা মনে পড়ছিল। না, একদম বদলায়নি। অথচ আমি কত দ্রুত বুড়ো হয়ে যাচ্ছি!

লিলিকে সেদিন বললাম- ভাত খাওয়া কমাতে হবে, ভুঁড়ি হচ্ছে আমার।

: খুব ভালো সিদ্ধান্ত। কিন্তু কে দিল ভুঁড়ির খোঁটা? রজত হাজরা

আমি কিছু উত্তর দিতে পারিনি। কিন্তু ওর অনুমান সঠিক। রজতই একদিনকথাচ্ছলে বলেছিল খাওয়া কমাতে।রজতের ব্যায়াম করা ছিপছিপে শরীর। কদিন ধরে ভাবছিলাম আমিও ভোরবেলা ওর সাথে পার্কে দৌড়াব। ঠিক তখুনিই মনে হয় রজত থাকবে না, আমার আর পার্কে গিয়ে কী হবে!

ওর বাড়িটা দূরে নয়। প্রতিদিন রজত আমার ঘরে আসে। একসাথে চা খাই আমরা। তারপর ও বেরিয়ে গেলে আমি অফিসের জন্য তৈরি হই।একা মানুষ, বাড়িতে মন টেকে না রজতের। আমি তো বুঝি। কিন্তু জানিনা কেন লিলি ওকে একেবারেই সহ্য করতে পারে না। লিলির বিরক্তি, কথারঝাঁজ মাঝে মাঝে খুব বিব্রত করে দেয় আমাকে। রজত তখন এ বাড়ির পথ মাড়ায় না। আমিই যাই ওর কাছে। খুব স্বাভাবিক গলায় গল্প হয়। গল্প ফুরালে আমি উশখুশ করি। আমাকে দেখে রজত হাসে। সেই হাসিটা এত অদ্ভুত আর অস্বস্তিকর! আমি চোখ সরিয়ে নিই।

রজত বলে- রাত হয়েছে, এবার বাড়ি যা অভি।

কিন্তু সরোদ না শুনে আমি বাড়ি ফিরি না। এই এক নেশা হয়েছে আমার। টুটু-বিটু, এমনকি পাড়ার ছেলেপুলেরাও ওর ম্যাজিকের ভক্ত। কিন্তু সরোদেরশ্রোতা শুধুমাত্র আমি। আমার আনাড়ি কান তবু বুঝতে পারি ওর বাজানো কত ভালো। প্রতিবার সরোদের সাথে যেন ওর শরীরটাও বেজে ওঠে! ওর তন্ময় মুখটা দেখে আমি ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠি। তারপর ঘোরগ্রস্তের মতো বাড়ি ফিরি।

রজতকে কতবার বলেছি- অমুক জায়গায় দারুণ গানের আসর হচ্ছে,  তুইসরোদটা নিয়ে চল। কিন্তু এসব কথা কানে তোলার মানুষ নয় সে। নিজেকেগুটিয়ে রাখার স্বভাব আর চিরকালের গোঁয়ার গোবিন্দ। বিয়েটা করেনি জেদ করে। কতবার বলেছি আমি। যে লিলি ওকে দু’চোখে দেখতে পারে না আড্ডাবাজ বলে, সেও কম চেষ্টা করেনি। কিন্তু রজত হাজরা চিরকুমার থাকার পণ করে বসে আছে। এদিকে বয়স তো বসে নেই। বিরক্ত হয়ে আমরা হাল ছেড়ে দিয়েছি।

লিলির ধারণা রজত কারও অপেক্ষায় আছে। নইলে একটা মানুষের সংসার করতে এত অনীহা থাকবে কেন! এই প্রশ্নের সদুত্তর আমার জানা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুবার পর প্রায় পাঁচ-ছয় বছর কোনো যোগাযোগ ছিল না আমাদের। এর মাঝে কিছু হয়েছিল কি না সে ব্যাপারে রজত নিশ্চুপ থেকেছে সব সময়। অবশ্য ওর এই সিদ্ধান্তে আমি মনে মনে খুশিই হই। বিয়ে হলে রজতের আলাদা একটা জগৎ হবে। সেটা আমি চাই না।

সত্যি বলতে রজত আমার শুধু পুরনো বন্ধু নয়, ও আমার কাছে একটা প্রিয় অভ্যাসের মতো। দুয়েকদিন দেখা না হলে আমারহাঁসফাঁস লাগে, তবু শ্বাসযন্ত্রের অম্লযানের মতো সারাদিন ওর অস্তিত্বটা টের পাই আমি। যে কোনো সমস্যায় কিংবা মন খারাপে কান পাতলে শুনি কেউ বলছে, আমি সাথে আছি, তুমি এগোও।

সেই রজতের চলে যাওয়াটা আমি মানতে পারছি না। প্রমোশনের খবর শুনে যতটা খুশি হয়েছি তার চেয়ে দ্বিগুণ মন খারাপ লেগেছে ওর বদলির খবরে। এদিকে বাধা দেওয়াটাও ছেলেমানুষির মতো দেখায়। তবু প্রশ্ন করে করে ওকেজেরবার করি।

আমি বলি- রজো, তোর না গেলে হয় না?

রজত নিঃশব্দে হাসে। সেই হাসিটা! আমার বুকের ভেতরটা দুলে ওঠে। সেবলে- এখন এসব বলার সময়?

আমি যুক্তি দেখাই, সে খণ্ডন করে।

: অতদূরে একা থাকবি কী করে?

: একা থাকার অভ্যাস আছে আমার। অনেকদিন হয়ে গেল এখানে, আমি একদম হাঁপিয়ে গেছি।

যাবার আগ মুহূর্তে এমন আবোলতাবোল কথা বলে গেছে সে। শুরুর দিকে খুব মন খারাপ হয়েছে আমার। কিন্তু খুবই আশ্চর্যজনকভাবে মাসখানেকের মধ্যেই রজতকে ছাড়া আড্ডাহীন জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম আমি।লিলি আমাকে নানাভাবে ব্যস্ত রাখে। অফিস থেকে ফিরেই বাচ্চাদের পড়ানো কিংবা ওদের নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাওয়া, নয়তো বাজার করা- এসব করে আমার অবসরটুকু কেটে যায়।

দুই

এ বছর হুট করে শীত পড়ে গেছে। ভোরবেলা চাদর গায়ে না জড়ালে চলে না। গাছের ভেজা ভেজা পাতায় আবছায়া কুয়াশা জমে আছে। আজ টুটু-বিটুর স্কুল ছুটি। টিফিন তৈরির তাড়া নেই। তবু অন্য দিনের মতো খুব ভোরেই আমার ঘুমভেঙে গেছে।

একটু আগে আয়নায় নিজেকে দেখে চমকে গেছি আমি। আগে অল্পতেই চোখ এমন লাল হতো, বিছানা আলাদা হতো। আজকাল আর এসব মানায় না। কিন্তু কাল একটা শুভ দিন ছিল। টুটু-বিটুর সপ্তম জন্মদিন। এই দিনটা এভাবেতেতো হয়ে যাবে ভাবিনি।

‘এত নোংরা মন তোমার, লিলি!’ শুধু এটুকু কথার জন্য নয়। আমি জানি কতগুলো বছর একটা কাঠপোকা আমার ভাবনার কুঠুরিটাকে কুটকুট করে অবিরাম কেটে চলেছে। অসহ্য রাগে আমার মুখের আগল খুলে যায়। অভি চমকে তাকায়, ওর বিস্ময় আর ঘেন্নামাখা দৃষ্টির সামনে আমি জ্বলে-পুড়ে যাই। মনে হয় সত্যিই আমি নর্দমার ময়লা।

টিটু-বিটু আজ বাসায় থাকবে। ওরা বড়ো হচ্ছে, সব টের পায়। ফোলাফোলা চোখ দেখলে বলবে- মা, তোমার কি অসুখ?

আমিও জানি না এটা অসুখ কি না। মাঝে মাঝে অভিকে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু অভি ইদানীং সতর্ক হয়ে গেছে। প্রসঙ্গটা তোলে না। আগে খুব গল্প করত। ওর বন্ধুর গল্প, ক্যাম্পাসের গল্প। রজত হাজরা আর অভি রুমমেট ছিল। কেউ দেখলে বলবে না ওদের বড়োবেলার বন্ধুত্ব। একজন আরেকজনকে বোধ হয় হাতের রেখার মতো চেনে।অভির মুখে শুনেছি দাদা মুখচোরা, গম্ভীর লোক। ভালো লাগা মন্দ লাগা মুখফুটে বলতে পারে না। শুধু অভির সাথে আড্ডাদিতে বসলে তার চেহারায় অদ্ভুতদীপ্তি খেলা করে। রজত হাজরার মুখের রেখার পরিবর্তন, কপালে বিস্ময়ের ভাঁজ কিংবা মৃদু হাসি কিছুই আমার দৃষ্টি এড়ায় না।

অভি আমাকে আড়ালে জিজ্ঞেস করে- ওর দিকে তাকিয়ে কী এত দেখো? তুমি ওর প্রেমে পড়োনি তো, লিলি?

এমন ঠাট্টায় আমার মেজাজ সপ্তমে চড়ে যায়। অভি তাতে মজা পায়। বলে-অমন করছ কেন! রজত কত অন্যরকম, ভালো লাগতেই পারে ওকে…

: এত গুণ যার তার তো পাত্রীর অভাব হবার কথা নয়, ওর বিয়েটা দিয়েদাও না কেন?

আমার কথা শুনে অভি গা কাঁপিয়ে হাসে। এই হাসি দেখে রাগে কান্না পায় আমার। অভি বোঝে না রজত হাজরাকে আমি কেন সহ্য করতে পারি না। সেতো অন্ধ নয়, তাহলে আমি যা দেখি তা ওর চোখে পড়ে না কেন! মাঝে মাঝে আমারই অন্ধ হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। এসব সৃষ্টিছাড়া ব্যাপার তাহলে আরদেখতে হতো না।

আমার মনে আছে দু’বছর আগে টুটুর যেবার নিউমোনিয়া হলো আমি হাসপাতালেই পড়ে ছিলাম ওকে নিয়ে। একদিন ভোরবেলা হুট করে বাড়ি ফিরেদেখি রজতদা অভিকে জড়িয়ে ধরে আমাদের বিছানায় শুয়ে আছে। দাদার কপালে অভির হাত। আমাকে দেখেই অভি বলল- রজোর অনেক জ্বর। একটু আগে এসে শুয়েছে এখানে।

এরপর আমি আর বাড়ি ফিরিনি। হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়ার পর টুটু- বিটুকে নিয়ে মায়ের ওখানে চলে গিয়েছিলাম। অভি কিছুই বোঝেনি, ভেবেছে টুটুর হাওয়াবদল হয়ে বেশ হলো।

সে বছর খুব গরম পড়েছিল। ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে রাতে ছাদে পাটি বিছিয়ে বসতাম আমরা। অভি গান গাইত। আমি সেদিন সন্ধ্যায় মুড়িমাখা নিয়ে ছাদে ফিরে এসে দেখি রজতদা অভির আদুল গায়ে আঙুল বুলিয়ে বারবার কিছু একটা লিখছে, অভি চোখ বুজে সেই লেখাটা বোঝার চেষ্টা করছে! আমি স্থির চোখে দূর থেকে দেখছিলাম। আঙুলগুলো পিঠ থেকে ঘাড়ে উঠে তারপর ওর চুলের গভীরে চলে গেল। আর রজত হাজরার মুখটা ক্রমশ অভির দিকে ঝুঁকে এলো। আমি আর থাকতে পারিনি, টলমল পায়ে নিচে পালিয়ে এলাম, আমার ভীষণ গা গুলাচ্ছিল।

আমাদের বিবাহবার্ষিকীতে অভি সেবার চন্দন রঙের একটা পাঞ্জাবি পরেছিল। অভি এসে রজতদাকে বলল- তুই দিয়েছিস বলে পরলাম, এসবপোশাক আমাকে কী কিম্ভূত দেখায়!

আমি সামনে আছি সেটা হয়তো সেদিন রজত হাজরা লক্ষই করেনি। সেপূর্ণ দৃষ্টি মেলে অভির দিকে তাকাল। তারপর বলল- অভি, তোকে দেখলে এখনো যে কেউ প্রেমে পড়ে যাবে!

অভি খুব হেসেছে কথাটা শুনে। আর রজতদা হঠাৎ আমাকে দেখতে পেয়ে মুখ লুকোতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল।আমি মাঝে মাঝে ভাবি রজত হাজরা ওর প্রতি কতটা অনুরক্ত। এতগুলো বছরে অভি কি সেসবের কিছুই টের পায়নি? নাকি সব বুঝেও না বোঝার ভান করে?

এসব আকাশপাতাল ভেবেও আমি আমার সংসারটাকে বাঁচানোর কোনো পথ বের করতে পারিনি। শুধু অবচেতনে মনে হতো রজত হাজরা কিংবা আমার কিছু একটা হয়ে যাক। মাঝে মাঝে হাজরার চায়ের কাপে বিষ মিশিয়ে দিতেও ইচ্ছে হতো।

এরপর হঠাৎ একদিন ঈশ্বর আমার প্রার্থনা শুনলেন। রজত হাজরার বদলির অর্ডার হলো। অভির অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও হাজরা আর থাকতে চাইল না। মানুষটা যেদিন গোলদিঘি ছেড়ে চলে গেল আমি সেদিন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।

তিন

আজ ভোরে এই গলির ট্রান্সফর্মারটা নষ্ট হয়ে গেছে। সারাদিন জল নেই, বিদ্যুৎনেই। তারপর এই সন্ধ্যা নামার মুখে বাতি জ্বলল চারপাশে। আমার ঘরটা অবশ্য এখনো আঁধার। আঁধারটাই ভালো লাগছে আমার। উঠে বাতি জ্বালাতে ইচ্ছে করছে না। মাঝে মাঝে এমন হয়। মন বলে- রাতভর লোডশেডিং হোক, ঝুমবৃষ্টি এসে ডুবিয়ে দিয়ে যাক ঘরদোর।

‘নিশিদিন এই জীবনের তৃষার ’পরে, ভুখের ’পরে

শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে।’

পাশের বাড়িতে কণিকা গাইছেন। এইসব গান স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দিয়ে যায়। গান শুনতে শুনতে টের পাই বাতাসে ক্রমশ বৃষ্টির ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে। জানালার পাল্লা দুটো বেপরোয়া হাওয়ায় এদিক-ওদিক দুলছে। বৃষ্টির ছাট লেগে আমার গায়ে কাঁটা দেয়। টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে রাইটিং প্যাডটা হাতে নিই আমি।

‘অভি,

তোর মনে আছে তুই জানতে চেয়েছিলি আমি প্রথম কাকে চুমু খেয়েছিলাম? তোকে কতদিন মিথ্যে বলেছি, আসলে আমার প্রথম চুমুর স্মৃতি তোর ঠোঁটে রয়েগেছে, তুই জ্বরের ঘোরে সেদিন টের পাসনি।’

আমি শব্দ করে চিঠিটা পড়ি। অভিকে লেখা এমন অজস্র চিঠি আমি শেষ না করেই ছিঁড়ে ফেলেছি। এই চিঠিটা এমন অবেলায় চোখে পড়বে কে জানত! আমার এখুনিই অভিকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে, ওর গলার স্বর শুনে কান জুড়াতে ইচ্ছে করে।

এসবের পথ আমিই বন্ধ করে রেখেছি। গোলদিঘি ছেড়ে চলে আসার পর আমার ফোন নম্বরটা বদলে ফেলেছিলাম। অভি বেশ কিছুদিন আমার সাথেযোগাযোগ করতে পারেনি। শেষমেশ অফিসের নম্বর জোগাড় করে একদিন ইচ্ছামতো বকাবকি করল।

ওকে সেদিন না করতে পারলাম না। টিটু-বিটুর জন্মদিনে আমাকে গোলদিঘিযেতে হলো। ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছুঁয়ে যেতেই দেখি অভি স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় এগারো মাস পর ওকে দেখলাম! দূর থেকে প্রিয় অবয়বটা চোখে পড়তেই আমার বুকের ভেতর রক্ত ছলকে উঠেছিল। ইচ্ছে করছিল ছুটে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরি।

অভি আমাকে ওদের বাড়িতে নিয়ে গেল। টুটু-বিটু আগের মতোই বায়না করল- ম্যাজিক কাকু,  ম্যাজিক দেখাও। আমার কাছে ওদের এত দ্রুত বড়ো হওয়াটাই ছিল ম্যাজিকের মতো। চোখের পলকে বড়ো হচ্ছে ওরা। এই তোসেদিন লিলির ব্যথা শুরু হলে ছুটে গিয়ে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এলাম আমরা। সদ্য বাবা হওয়ার খবর শুনে আনন্দে আত্মহারা অভি আমাকে বুকে টেনে নিয়েছিল। ঘামে ভেজা শরীরের মিষ্টি গুমোট গন্ধটা আমাকে বিবশ করে দিচ্ছিল। বহু বছর পর সেই স্পর্শের ঘোর আমি কাটাতে পারছিলাম না।

আমার হল জীবনের কথা খুব মনে পড়ছিল। তখন সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা লছে। রাত দু’টোয় দেখি ওর একশ দুই জ্বর। প্রলাপ বকছিল ছেলেটা। পুরো শরীর স্পঞ্জ করে মাথা ধুইয়ে দেবার পর একটু ঘুমাল। আমিও ঘুমিয়েগেলাম। শেষরাতে উঠে অভি আমাকে কখন ডেকেছে টের পাইনি। একটু পরে ধড়মড় করে উঠে দেখি বমি করে বিছানা ভাসিয়ে ফেলেছে। আমি ধীরে ধীরে সব সাফ সুতরো করে ওর কাপড় বদলে দিয়েছিলাম।

অভি আমার গলা জড়িয়ে ধরে বলেছিল- রজো, তুই আমার ভাই!

ওর জ্বরতপ্ত শরীরটা আমাকে ছুঁয়ে যেতেই আমি আপাদমস্তক কেঁপে উঠেছিলাম। নিজেকে থামাতে পারিনি সেদিন। ওর শুকনো পাপড়ির মতোঠোঁটে, নিমীলিত চোখে চুমু এঁকে দিয়ে বারান্দায় গিয়ে লুকিয়েছিলাম আমি।

অভি জানে না, যেমন করেই হোক ওর সাথে আমার একটা গ্রন্থি জুড়ে আছে। ভাই কিংবা বন্ধুর মতো এত সরল নাম হয় না তার।অভি জানেনি, আজও জানেনি তামাটে চাঁদের রাতে আঁধার সাঁতরে আমি একাই ডুবে যাই অতলান্তিক বিষাদে। ওর দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়া আরক্ত মুখটাকেমনে করে আমি বিবশ হয়ে যাই। সরোদের সাথে আমিও কাঁদি, সে কান্না কত পুরনো তা অভি জানে না। একটু স্পর্শের জন্য তেষ্টায় ছটফট করে কতবার আমি মরে গেছি জানে না অভি।সবটুকু জানতে আর বুঝতে আমারই অর্ধেক জীবন ফুরিয়ে গেছে। আমিনিজেকে জানলাম, ভেতরটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল আমার।

ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যাবার পর ইচ্ছে করে বহুদিন যোগাযোগ রাখিনি। কিন্তু অভি কীকরে যেন খুঁজে নেয় আমাকে।সেই গ্রন্থি ধরেই বিয়ের পর অভি লিলি বৌদিকে নিয়ে গোলদিঘিতে এসে সংসার পাতল। অল্প কদিনে আমি আবার ওদের ঘরের মানুষ হয়ে গেলাম। অভিকে ফিরে পাবার আনন্দটা তখন থেকেই আমার বুকের ভেতর গুনগুন করতে শুরু করে।হয়তো এই গান মাঝে মাঝে লিলির কানেও পৌঁছে যেত। বোধ হয় সেইথেকেই লিলি আমাকে চোখেচোখে রাখতে শুরু করল। অভিকে আমার কাছথেকে দূরে সরাতে, আমাকে সংসারে বাঁধতে খুব চেষ্টা করেছে সে। অভির চেয়ে ওর তৎপরতা ছিল দ্বিগুণ।

অভি বলত- লিলি তোকে বিয়ে করিয়েই ছাড়বে!

লিলি একদিন আমায় বলল- কোনো গোপন প্রেম থাকলে বলুন তো দাদা, আমরাও ক্ষান্ত হই তাহলে।

অভি মানতে পারে না এই কথাটা। আমার জীবনে এমন কিছু থাকতে পারে না, থাকলে অভি নিশ্চয়ই জানত।

লিলি কথা বলছিল খুব গম্ভীর গলায়। অভি সরে গেলে লিলি আমায় বলল- প্লিজ আমাকে একটু শান্তি দিন এবার! অভি ওরকম নয়… আপনি এতদিনেও বুঝতে পারছেন না?

সেদিন আমার বুকের ভেতরটা শিরশির করে উঠেছিল। তখুনিই কোথাও পালাতে পারলে বোধ হয় বেঁচে যেতাম। আমি বুঝলাম গোলদিঘি আমাকে ছাড়তেই হবে।

অথচ গোলদিঘিতে আমি নিজের একটা সংসার পেতেছিলাম। সেই সংসারে ছিলাম আমি আর আমার সরোদ। হল জীবন ফুরিয়ে যাবার পর সরোদ আমার জীবনে আসে। নির্ঘুম রাত, অলস নিরেট দুপুরে সরোদ বাজাতে বাজাতে আমি ভাবতাম আমার নামহীন, গোপন প্রেমের কথা। সরোদকে ছুঁয়ে আমি যেন অভিকে ছুঁয়ে থাকতাম। প্রগাঢ় আশ্লেষে আচ্ছন্ন হয়ে রাত কাটত আমাদের।

টুটু-বিটুকে ম্যাজিক দেখাতে দেখাতে কতবার মনে হতো অভিকে যদি ছুমন্তর দিয়ে বশ করে ফেলতে পারতাম! তাহলে আমাদের প্রেম হতো, আমার আর অভির সংসার হতো। ভেবে হাসি পেত খুব, হাসির দমকে চোখে জলওআসত। অসম্ভবের জগৎ থেকে টুপ করে ফিরে আসতাম আমার ধুলো বালির সংসারে।

সেই সংসারটা গুটিয়ে নিয়ে পালাবার সুযোগ এলো গত বছর। প্রমোশন আর বদলি একসাথেই হলো আমার। আমি বিনা বাক্যে সমস্ত কিছু গুছিয়ে চলেগেলাম গোলদিঘি ছেড়ে। বাসার ঠিকানা দিইনি। ফোন নম্বরও বদলে ফেললাম একদিন। এতদিনের অভ্যাসের পর অভির জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া যতটা সহজ দেখাল আসলে ততটা সহজ ছিল না সেটা।

টুটু-বিটুর জন্মদিনে আবার দেখা হয়ে গেল অভির সঙ্গে। স্টেশন থেকেসোজা ওদের বাড়িতে ধরে নিয়ে গেল সে। লিলি শুরু থেকেই মেপে মেপে কথা বলেছে, রাতে খেতে বসেও ওর মুখটা অন্ধকার হয়ে ছিল। আমি অস্বস্তিতে ছটফট করেছি, তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়েছি। অভি ডাকাডাকি করলেও সাড়া দিইনি।

সে রাতে আমি ঘুমোতে পারিনি। অভি আর লিলিও জেগে ছিল। কিছুএকটা নিয়ে খুব তর্ক করছিল ওরা।

ভোরে আমি অভিকে শেষবারের মতো চিঠি লিখলাম।

‘আমাকে খুঁজিস না, খুঁজতে গেলে হারিয়ে ফেলবি।’

চিঠিটা রেখে চুপিচুপি বেরিয়ে এসেছি। আবার ফোন বন্ধ রেখেছি বেশকিছুদিন। তবু অভির সঙ্গে আমার কথা হয়, মনে মনে, তন্দ্রায় কিংবা জাগরণে।

: অভি তুই এত অবুঝ কেন?

: তুই কখনো আমাকে কথাটা বলিসনি কেন, রজো?

অথচ কথাটা আমি কত সহস্রবার বলেছি, ওর চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলেছি, ঘুম ঘুম চোখে চুমু এঁকে বলেছি। আমার সরোদটা জানে কত অযুত- নিযুত বার আমি অভিকে বলেছি- ‘ভালোবাসি।’

এই আঁধার বৃষ্টির রাতে আমার নিজেকে ওই নিশ্চুপ সরোদটার মতোই মনে হয়। আমার ছোঁয়া না পেলে সে বেজে ওঠে না, অভির সান্নিধ্য না পেলে আমিও তেমন মৃতবৎ হয়ে রই।

         

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>