ভালোবাসার দিন

আটটা পাঁচের বনগাঁ লোকালে প্রতিদিনের মতো আজও গান গাইছিল সোহরাব । তবে আজ সে ইচ্ছে করেই রবি ঠাকুরের গান দিয়ে শুরু করেছে … আমারও পরাণও যাহা চায়, তুমি তাই গো… শিয়ালদহ স্টেশান থেকে প্রতিদিনকার মতোই তার সঙ্গী ছোটু বনগাঁ লোকালে উঠেই
বাংকে বক্স দুটো ফিট করে দিয়েছে আর সে কারোকে মিউজিক ট্র্যাকের সঙ্গে গান গেয়ে যাচ্ছে । কতই বা বয়েস হবে সোহরাবের ? এই ফাল্গুনে সে কুড়ি পূর্ণ করবে … এই বয়েসেই কারখানায় অ্যাক্সিডেন্টে দুটো হাতই হারিয়েছে অগত্যা গলাই ভরসা , পেট চালাতে তো একটা কিছু করতে হবে ।ছোটো
থেকেই বোঝা গিয়েছিল তার ঈশ্বরদত্ত একটা গলা আছে , যদিও সে অর্থে গান শেখার তার সুযোগ হয় নি কোনোদিনই , কি ভাবেই বা হবে ? পাঁচ জন ভাইবোন নিয়ে বাবা মার অভাবের সংসার , নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, তাই অল্প বয়েসেই জুতে গিয়েছিল কারখানার কাজে । ছোটোবেলায় কীর্ত্তনের আসরে তার
বাঁধা গান ছিল… “বনমালী গো পরজনমে হয়ো রাধা “… তার মিঠে গলায় এই গানে বিভোর হত ছেলে বুড়ো সব্বাই, মায়ের ঠেলায় না পড়লে হয়তো পালাগানের আসরেই তার জায়গা হত পাকাপাকি ভাবে ।যাক সে কথা ,” যদি আরো কারে ভালবাসো , যদি আরো ফি্রে নাহি আসো/ তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও… গানের এই
কলিটা তার সবচেয়ে ভালো লাগে , এ যেন তার প্রাণের কথা , বুকটা মুচড়ে ওঠে তার , অন্তরের সব আবেগ দিয়ে ওই পংক্তিটা গেয়ে চলে সে । বছর কুড়ি বয়েসের সোহরাব , কালো সুঠাম চেহারা , শুধু দুটো হাত নেই কনুইয়ের তলা থেকে , গলা থেকে ঝুলছে একটা টিনের পাত্র , গান শেষ হতেই তাতে যে যা পারছে দক্ষিণা দিচ্ছে ।
একের পর এক মধুর গানে ভরে উঠছে সকালের ট্রেনের কামরা আর সোহরাবের টিনের পাত্রও ভরে উঠছে ক্রমশঃ। শুধু রবীন্দ্র সংগীতই নয়, কিশোর কুমারের আধুনিক গান থেকে বাজার চলতি হিন্দি সিনেমার গান সবই জীবন্ত হয়ে ওঠে তার গলায়… সবার বাহবা পেলেও শুধু টিয়ারই মন পায় না সে । টিয়া তাদেরই পাড়ার মেয়ে , সোহরাব ভালোবাসে টিয়াকে … অথচ টিয়া…
প্রতিবন্ধী বলে তাকে দয়া করে , তার দিকে তাকায় করুণার চোখে … টিয়ার সেই দয়ার দৃষ্টির সামনে কুঁকড়ে যায় সোহরাব । বুকের ভিতরটা মুচড়ে ওঠে । মুখ ফুটে টিয়াকে বলতেও পারে না “ভালোবাসি”… কিন্তু বুকের ভিতরটা পুড়ে যেতে থাকে ।

সেদিনের মতো গান শেষ হয় । ট্রেনের কামরায় ঘুরে ঘুরে পয়সা নিতে থাকে সোহরাব । হঠাৎ দরজার কাছে কয়েকজন মাস্তান টাইপের ছেলে ছোটুর কলার চেপে ধরে , কিল চড় , থাপ্পড় চলতে থাকে সঙ্গে অশ্রাব্য গালিগালাজ ।” বল কবে থেকে এই লোক ঠকানোর ব্যবসা শুরু করেছিস বল ?” সোহরাব কিছু বুঝে ওঠার আগেই কিল চড় লাথি ছুটে আসে তার দিকেও , একটানে বক্সগুলো ট্রেনের কামরায় আছড়ে ফেলে পা দিয়ে লাথি মারতে থাকে তারা,
রেকর্ডিং করা গানের সঙ্গে ঠোঁট নেড়ে পয়সা রোজগার করা হচ্ছে ? অ্যাঁ ? বেশ তো জোয়ান মদ্দ, হতদুটো গেছে বলে কি লোক ঠকাতে হবে ? অ্যাঁ ? সোহরাব প্রতিবাদ করতে যায় কিন্তু সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই নৈহাটি স্টেশানের কাছে ট্রেনটা একটু স্লো হয় আর ছেলেগুলো এক ধাক্কা দিয়ে প্ল্যাটফর্মের ওপর আছড়ে ফেলে সোহরাবকে । প্ল্যাটফর্মের লোকেরা হই হই করে ওঠে । চলন্ত ট্রেন থেকে ছিটকে পড়ে ঠোঁট চোয়াল ফেটে তখন দরদর করে রক্ত ঝরছে সোহরাবের। কোনরকমে সে ছেঁচড়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে , অপমানে তার চোখ ফেটে জল আসতে চায় , নিজের চেয়েও
তার চিন্তা ছোটুকে নিয়ে , সে তো শুধু তার ভাই নয় , সাগরেদ বন্ধু সব কিছুই … কিন্তু হঠাৎ তার মাথাটা কেমন ঘুরে যায় , চোখের সামনে নিভে যায় সব আলো … সে শুধু অস্ফুটে উচ্চারণ করে ,”ছোটু রে …”

নৈহাটি স্টেশানে এই অফিস টাইমের ভীড়েও প্রচন্ড চিৎকার আর জটলাটা দূর থেকেই চোখে পড়েছিল টিয়ার … রোজকার মতো আজও সে ট্রেন ধরার জন্যই দ্রুত পায়ে স্টেশানে ঢুকছিল ,নটা দশের ট্রেনটা না ধরতে পারলে দেরী হয়ে যাবে তার , কলকাতায় একটা বাড়িতে সে আয়ার ডিউটি করে । চিৎকার চেঁচামেচি শুনে থমকে দাঁড়াল সে ।পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল জটলার দিকে । দেখে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে , সোহরাব । তার সোহরাব … মূহূর্তের মধ্যে ভীড় ঠেলে মাটিতে ব’সে সোহরাবের মাথাটা কোলে তুলে নেয় টিয়া । ব্যাগ খুলে জলের বোতল বের করে চোখে মুখে জলের
ঝাপটা দিতে থাকে , রুমাল দিয়ে মুখের রক্ত মুছিয়ে দেয় … খানিক পরেই চোখ মেলে সোহরাব , দ্যাখে তার মুখের ওপর ঝুঁকে আছে একটা মেয়ের মুখ … সেই তিল , সেই চিবুক , মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম… হঠাৎ সোহরাবের মনে পড়ে আজ ভ্যালেন্টাইস ডে … ভালোবাসার দিন। তার মনের আকাশে হঠাৎ একটা লাল রঙের বেলুন উড়ে যায় উঁচুতে আরো অনেক অনেক উঁচুতে …।

 

 

 

 

.

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত