ভেজা কদম

Reading Time: 3 minutes 

বন্ধু,

কেমন আছিস? অফিস থেকে ফেরার পথে রোজ তোর সাথে দেখা হয়। ভিড়ের ভেতর থমকে যাই। হঠাৎ মনে হয় “বছর চারেক পর” কবিতার মতো অনায়াসে সব কথা বলে দেওয়া যায়। কিন্তু না। ওসব আসলে বলা হয়ে ওঠে না। ভেতরে প্রচন্ড আক্ষেপ নিয়েও মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম। বুকের ভেতর দামামা বেজেছিলো। মনে হচ্ছিলো এই বুঝি তুই পেছন থেকে ডাকবি। এই এক্ষুনি। আর দুটো পা এগোলেই বোধ হয় ডেকে ফেলবি। স্টেশন অব্দি চলে এলাম।ট্রেন থেমে আছে। বাড়ি ফিরতে হবে। পেছন ফিরে একবার দেখবার জন্য সে কি রকম যে প্রচন্ড আকাঙ্ক্ষা আমি যে নিজের মধ্যে দমিয়ে রেখেছিলাম সেটা তুই জানতি। তবুও ডাকিসনি কারন তুই ও একই আকাঙ্ক্ষা বুকে চেপে বাসে উঠেছিলি। তুই ভাবছিলি কেনো আমি কথা বলি না আগে আর আমি ভাবছিলাম কেনো তুই বলিস না!এই রকম পরিস্থিতিতেই ছ’মাস কাটতে চললো।রোজ অফিস থেকে ফেরার সময়টায় আমাদের দেখা হয়। ক’দিন ভেবেছি তুই বুঝি ইচ্ছে করে ওই সময়টাতে দাঁড়িয়ে থাকিস। কে জানে! তুইও হয়তো তাই ভাবতি আমাকে নিয়ে। আমাদের শেষ দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। এতো বড় ভুল কি করে করেছিলাম দু’জনে? জলজ্যান্ত অমন একটা দামী বন্ধুত্ব কেবল দু’পয়সার মেয়ের জন্য ভেঙ্গে গেলো! অতো বড় হয়েও কেমন ছেলেমানুষ ছিলাম।

আচ্ছা হিমাদ্রি, তুই তো অন্তত একবার আমাকে বোঝাতে পারতি! তাহলে এরকম ভাবে আলাদা হয়ে থাকতে হতো না।

নৈঋতা, আপনাকে কখনো ভুলবো না। আপনি নেহাতই এখন অন্য কারো ঘরে পায়ে আলতা, হাতে চুড়ি, কানে ঝুমকো আর বুকের ভেতর অন্য কোন শরীরের গন্ধ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আর এদিকে এক হয়ে থাকা দুটো জীবন কি করে দুমড়ে মুচড়ে ফেলে গেলেন তা দেখার সময় আপনার নেই। এখন চাইলেও দেখা সম্ভব নয়। হিমাদ্রি, কেবল রূপ দেখেই তুই ভালোবেসেছিলি। বলেছিলাম, এরকম হাজারে হাজারে নৈঋতা ঘুরে বেড়ায় কংক্রিটের শহরে। এক চলে গেলে আরেক আসে। থেমে থাকিস না। জানি শুনতে সেদিন ভীষণ খারাপ লেগেছিলো তোর। চিরকাল আমার কাছে তোর ওই গলার স্বর আর বন্ধুত্বটাই যে সবচেয়ে দামী ছিলো তা কি কখনো বুঝিস নি? যেদিন তোকে একগুচ্ছ কদমের মতো দুমড়ে মুচড়ে ভাঙাচোরা করে রাস্তায় ফেলে চলে গেলো পুরোনো ধাঁচের নৈঋতা। সেদিন ঝুম বৃষ্টি। আমি ছিলাম তোর সাথে। প্রচন্ড শীতে কাপঁতে কাঁপতে  ভুলে গিয়ে পুরো শাহবাগ চষে বেড়িয়েছিস সেদিন। কেউ বুঝতে পারে নি, ওই বৃষ্টির জলের সাথে কিছু নোনা জলেও ভিজেছে শাহবাগ। আমি জানি তুই কাদঁছিলি। পাছে আমি দেখি ফেলি তাই দূরত্ব রেখে হাটঁছিলি। কিছু বলি নি সেদিন। এরপর শুরু করলি সুইসাইডাল চিন্তাভাবনা। সেদিন আমার রাগ হয়েছিলো প্রচন্ড। কোথাকার কোন এক বছরের নৈঋতার জন্য এতো বছরের সংসার ত্যাগ করার চিন্তা কি করে আসে তোর মাথায়! কি করে আসে বাবা মা ছোট্ট তিতলি আর আমাকে ফেলে যাওয়ার কথা! প্রচন্ড অভিমানে তোকে সেদিন অনেক কথা বলেছি। গালাগাল কম করি নি। সেসবে কিছু যায় আসে নি তোর আমি সেটা জানি। কিন্তু যখনই নৈঋতার মতো মেয়েদেরকে গাল দিলাম তখনই আমার চোখে প্রথমবার তোকে জানোয়ার বলে মনে হয়েছে। কিরকম হিংস্র হয়েছিলি সেদিন! তুই জানিস না রে হিমাদ্রি, কি রকম ভাবে ফিরেছিলাম সেদিন বাসায়। কিরকম ভাবে বেচেঁ ছিলাম কতোগুলো দিন। আমার কথাগুলোই এতো প্রবল হয়েছিলো সেদিন তোর কাছে? কই কথার ভেতর লুকিয়ে থাকা আমিটাকে তো দেখিস নি? আমি কখনো ফিরিনি তোর কাছে আর তুইও না।

যে আমিকে ছাড়া তোর একটা দিনো চলতো না সে আমিকে ছাড়া কাটিয়েছিস দশটা বছর। আমিও পেরেছি। গেঁড়ে বসা রাগ, ক্ষোভ নিয়ে আমিও পেরেছি। সবাই পারে। জ্বলেছিলো খুব ভেতরটা।কিন্তু কদিন? কদিন জ্বলবে অমন ভাবে? ছাই হয়ে গেলেই ভ্যানিস। এখন তোকে রোজ দেখি। স্টেশনে।ভাঙ্গাচোরা মুখ নিয়ে ক্লান্ত শরীরে কোথাও যাস। রোজ। হয়তো বাড়ি ফিরিস। এখনো কিছু বলতে পারি নি তোকে। এই লেখা গুলো আমার কাছে থেকে যাবে। দীর্ঘদিন এসব বুকে চেপে আমি স্টেশনে তোকে দেখে যাবো। আমি জানি, তুইও আমাকে ওরকম বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়াস।

কি অদ্ভুত! কেউ কখনো বুঝবে না কতোগুলো স্মৃতি নিয়ে রোজ আমাদের দেখা হয়। এই শোন, আমি এখনো তোর বন্ধু। তোর একার। এটা মনে রাখিস।প্রকাশ্যে বন্ধুত্ব না হয় নাই থাকুক, আমাকে ওরকম বুকে জড়িয়ে রাখিস। নৈঋতার পাশে যেটুকু জায়গা আছে ওখানেই আমি গুটিশুটি হয়ে থেকে যাবো। তুই ভালো থাকিস। আমি স্টেশন থেকে রোজ দেখে নেবো।

ইতি বন্ধু          

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>