ভেতর পাতার স্টোরী

Reading Time: 11 minutes

শুভম অনেকক্ষণ ধরে খবরের কাগজের জেলার পাতার ভিতরের একটা খবর বারবার পড়লেন।। খবরের সঙ্গে মেয়েটির দুটো ছবি ছাপা হয়েছে; প্রথমটি তার মুখে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারার আগে, দ্বিতীয়টি অ্যাসিডদগ্ধ হবার পর। একটার সঙ্গে অন্যটির কোনো মিলই নেই, চেনাই যায় না যে একই মেয়ের ছবি। প্রথম ছবিতে এক কিশোরীর সুশ্রী, হাস্যোজ্জ্বল চেহারা, দ্বিতীয় ছবিতে অ্যাসিডদগ্ধ মুখের ভয়াবহ বীভৎস রূপ। এমন ছবি এই প্রথম নয়, আগেও তিনি দেখেছেন, প্রায় একই ঘটনার বিবরণ পড়েছেন, শুধু নাম ছিল ভিন্ন, ঠিকানা আলাদা। পুরনো  অভিজ্ঞতা হলেও তিনি শিউরে ওঠেন আরো একটি সুন্দর মুখের বীভৎস পরিণতি দেখে। যে নিষ্ঠুরতা আর বর্বরতার জন্য এসব ঘটনা ঘটে, ঘটতেই থাকে, তার বিরুদ্ধে তাঁর মন বিষিয়ে ওঠে, ঘৃণায় জ্বলে ওঠে, আরো একবার। পড়তে পড়তে তাঁর মুখের পেশি টানটান হয়ে আসে উত্তেজনায়, যেন ছিঁড়ে পড়তে চায়। তাঁর হাতের মুঠি শক্ত হয় কারো গলা চেপে ধরার জন্য। প্রতিবারই, যখন এ-ধরনের খবর পড়েন, তাঁর একই প্রতিক্রিয়া হয়, তিনি ফুঁসতে থাকেন আক্রান্ত সিংহের মতো। 

তাঁর সত্তর বছরের  দেহ এখন নানা অসুখের ঘাঁটি। তিনি তাদের ভারে ক্লান্ত, প্রায় শক্তিহীন। তবু সিংহের মতোই গর্জে উঠতে ইচ্ছা হয় তাঁর। থাবার আঘাতে ধরাশায়ী করতে চান দুর্বৃত্ত অপরাধীকে। সব জঘন্য অপরাধই তাঁর মধ্যে অবধারিতভাবে এই প্রতিক্রিয়া নিয়ে আসে। তবে অ্যাসিডদগ্ধ মুখ দেখে এটা হয় সুতীব্র । টেবিলে, সকালের দ্বিতীয় চায়ের পেয়ালা পাশের টেবিলে রেখে গিয়েছে পরিচারিকা। সেখানে ধোঁয়া উড়তে উড়তে এখন শীতল স্তব্ধতা। 

এমন সময় একটা ফোন আসে। নিঃস্তব্ধ ঘরের সবকিছু ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার ঝঙ্কারে।  তিনি বেশ কিছুক্ষণ ল্যান্ডফোনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ফোন বাজতেই থেকে। এবার তিনি প্রায় অনিচ্ছায় রিসিভার তুলে ধরেন, যে-হাতে সেটি যেন তার নয়। এই মুহূর্তে তাঁর মন এত ক্ষিপ্ত,  উত্তপ্ত যে কারো সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা হয় না। তিনি খুব নির্জীব, নিস্পৃহ হয়ে ফোন তুলে বললেন, হ্যালো। স্যার ,আপনি ভালো আছেন?ওপাশ থেকে অভিজিৎ নামের সাংবাদিক ছেলেটি জিজ্ঞাসা করে। হ্যাঁ। তিনি উত্তর দেন। আজকে আপনার গলার স্বরটা একটু অন্যরকম মনে হচ্ছে , তাই বললাম। অভিজিৎ-এর স্বরে কৈফিয়ত। হ্যাঁ। তাঁর কণ্ঠস্বর এখন অন্যরকমই হওয়ার কথা। তিনি স্বাভাবিক নেই। এইসব ঘটনার খবর যখন তিনি পড়েন, বিধ্বস্ত হয়ে যায় তাঁর মন, নষ্ট হয় স্থৈর্য। দারুণ এক অস্থিরতা তাঁকে পেয়ে বসে। অভিজিৎ বলে, আপনার লেখার পরবর্তীঅংশ পাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। কবে আসবো? তিনি কিছুক্ষণ ভাবেন। তারপর বলেন, কী হয় এইসব লিখে?কতই তো লিখলাম। সামাজিক সমস্যা। অর্থনেতিক সংকট। রাজনৈতিক অস্থিরতা। কেউ পড়ে?মনোযোগ দেয়?কোনো পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যায়?শুধু শুধু সময় নষ্ট। তোমাদের কাগজের স্পেস অযথা দখল করা। অভিজিৎ বলে, কিন্তু এসব লেখা ছাড়া যে পত্রিকা বার করা যায় না। এডিটরিয়ালে, পোস্ট-এডিটরিয়ালে নানা বিষয়ে লেখা থাকতেই হয়। তারপর সে একটু থেমে নিয়ে বলে, পাঠকরা নিশ্চয়ই পড়ে। না হলে চিঠি দিতো। বলতো, এসব ছাপেন কেন?কেউ তা লেখে না। আমি সাধারণ পাঠকের কথা বলছি না।যারা বুদ্ধিজীবী ,যারা সমাজের নীতি নির্ধারন করেন , সেই শ্রেণির মানুষরা পড়েন?গুরুত্ব দেন? সবাই না হলেও তাদের অনেকেই নিশ্চয়ই পড়েন। অভিজিৎ বলে। যদি পড়ে, তাহলে হত্যা, ছিনতাই, তোলাবাজি,বাজার দখল, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, অ্যাসিড ছুঁড়ে মারা, ধর্ষণ এইসব ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না কেন? আচ্ছা বেশ ধরে নিলাম পুরো বন্ধ হবেনা ।কিন্তু কমছে না কেন? সাংবাদিক ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, তারপর বলে, আপনাদের মতো বুদ্ধিজীবীদের লেখায় জনমত সৃষ্টি হলে নিশ্চয়ই পরিবর্তন আসবে। ধীরে হলেও আসবে। অভিজিৎ যেন তাঁকে আশ্বাস দিতে চায়। জনমত?তিনি হেসে ওঠেন। সেই শব্দে বিদ্রূপ মেশা। তারপর শ্লেষের সঙ্গে বলেন, জনমতকে গুরুত্ব দেয় কেউ এদেশে?শোন,ছোকরা, ক্ষমতার জোরে, টাকা দিয়ে জনমত কেনা যায়।জনগণ আসলে সবেতেই চুপ থাকতে ভালবাসে। অভিজিৎ বলে, আপনি আজ একটু বেশি উত্তেজিত। কোনো কারনে ডিস্ট্রাবড । কারণ জানতে চাই না। ধৃষ্টতা হবে। লেখার জন্য পরে ফোন করবো। তিনি শ্বাস ফেলে বলেন, হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছো। আমি বেশ উত্তেজিত। তোমাদেরই কাগজে জেলার পাতায় একটি মেয়ের অ্যাসিডদগ্ধ হওয়ার খবর পড়ে উত্তেজিত হয়ে পড়েছি। সব সময়ই হই। এইসব ঘটনা আমার সহ্য হয় না। বলে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন, আচ্ছা একটা কথা বলো তো। বলুন। কী কথা। ছেলেটি অপেক্ষা করে। তিনি বলেন, তোমরা এইসব খবর এখন আগের মতো প্রথম, কী শেষ পৃষ্ঠায় আর ছাপো না কেন? ছেলেটি কিছুক্ষণ নিরুত্তর থাকে। তারপর বলে, মনে হয় এডিটরিয়াল পলিসি। এরকম অনেক ঘটনা ঘটছে, ছাপতে হয়েছে তার খবর। তাই মনে হয় নিউজ ভ্যালু কমে গিয়েছে। কী বললে?তিনি প্রায় ফেটে পড়েন রাগে। মানুষের জীবনের মূল্য থাকবে না?তাদের নিরাপত্তার জন্য চিন্তা করবে না কেউ?তোমরা না সাংবাদিক?জাতির বিবেক। বিবেককে ঘুম পাড়িয়ে রাখছো কেন?নিউজ ভ্যালু! হুঁ। মানুষের জীবনের নিউজ ভ্যালু নেই? ছেলেটি আমতা-আমতা করে। তার অস্ফুট কণ্ঠস্বর শোনা যায়। বোঝা যায় কী বলবে তা ঠিক করে উঠতে পারছে না। তিনি গম্ভীর হয়ে বলেন, আমি আর এসব নিয়ে লিখবো না। কোনো কিছু নিয়েই লিখবো না। সময় নষ্ট। তামাশা অযথা। তিনি ফোন রেখে দেন। 

সামনের টেবিলে আজকের ইংরেজি আর অন্য বাংলা কাগজগুলোর দিকে তাকান। তারপর যে-কাগজগুলো পড়া হয়নি সেসব একটা একটা করে হাতে তুলে নেন। প্রথম পৃষ্ঠায় প্রায় সব কাগজে একই খবর। সম্পাদকীয় লেখাতেও মিল রয়েছে যথেষ্ট। কিন্তু অ্যাসিডদগ্ধ হওয়া মেয়েটির খবর আর কোনো কাগজে ছাপেনি। তিনি বেশ অবাক হলেন, সেইসঙ্গে ক্ষুব্ধও। যে-কাগজে ছাপা হয়েছে, যা তিনি কিছুক্ষণ আগে পড়েছেন, সেটি আবার তুলে নিয়ে খবরটা পড়েন। সাংবাদিক ছেলেটির সঙ্গে কথা বলার পর তাঁর উত্তেজনা কিছুটা কমেছে। তিনি ধীরেসুস্থে খবরটা আবার পড়েন। ঘটনার বিবরণে অতীতের পুনরাবৃত্তি রয়েছে। মনে হয় যেন সিনেমার পর্দায় একই ছবি দেখছেন। বড়লোকের এক ছেলে। অবশ্যই বখাটে এবং চরিত্রহীন। গরিব পরিবারের সুশ্রী মেধাবী মেয়ে পায়ে হেঁটে একটু দূরের স্কুলে যায়। পেছনে, কখনো পাশ থেকে, বখাটে ছেলেটি তার সঙ্গীদের নিয়ে মেয়েটিকে উত্ত্যক্ত করে। অশ্লীল কথা বলে। কুপ্রস্তাব দেয়। দিনের পর দিন। মেয়েটি কিছু বলে না। চুপ করে সহ্য করে, মাথা নিচু করে হেঁটে যায় স্কুলে, ফিরে আসে একইভাবে। তার নীরবতা আর সহ্যগুণ বখাটে ছেলেটিকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। একটি গরিব পরিবারের মেয়ে হয়ে যে এমন ঔদ্ধত্য দেখায়, তাকে শিক্ষা দিতে হবে।তোষামোদকারী  সঙ্গীরা সঙ্গে সঙ্গে সমর্থন করে। অবশ্যই সমুচিত শিক্ষা দিতে হবে। ধর্ষণ করলে হয় না?শুনে বখাটে ছেলে বলে, তার চেয়েও ভয়ংকর কিছু করতে হবে, যা সারাজীবন মনে রাখবে। সবাই দেখবে।

পরদিন স্কুল যাচ্ছিল মেয়েটি ।হঠাৎ তার আর্তচিৎকার ছুটে আসে আশেপাশের লোকজন ।খবর দেয় বাড়িতে।কাঁধে নিয়েই এক মাইল দূরে জেলা হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল বিহ্বল, অশ্রুসিক্ত মেয়েটির বাবা, তার সঙ্গে কয়েকজন প্রতিবেশী। হাসপাতালে ডাক্তার ছিল না, তখন তাদের ডিউটি থাকে না। কর্তব্যরত নার্সই করেছিল যা যা করার। মেয়েটি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। কারো অজানা ছিল না, কে বা কারা ছিল সেই জঘন্য অপরাধের পেছনে। কাদের হিংস্র বর্বরতার শিকার হয়েছে গরিব পরিবারের মেধাবী মেয়েটি। কিন্তু মেয়েটির বাবা ছাড়া আর কেউ মুখ খোলেনি ভয়ে। থানা-পুলিশ করা হয়েছিল। কেস নেওয়া হয়নি। কেবল জিডি হয়েছে। স্থানীয় এমপির কাছে যাওয়ার পর তিনি মেয়েটির বাবাকে বলেছেন দেখবেন। বখাটে ছেলেটির বাবার কাছে গেলে সব শুনে তিনি বলেছেন, খুবই দুঃখের বিষয়। কিন্তু আমার ছেলে এর সঙ্গে জড়িত হতেই পারে না। কোনো প্রমাণ আছে?যতসব বাজে অভিযোগ। টাকা আদায়ের ফন্দি। তারপর মেয়ের চিকিৎসার নামে কিছু টাকা বাপের হাতে ধরিয়ে তিনি তার লোকদের দিয়ে সতর্ক করে দেন মেয়েটির পরিবারকে। বাড়াবাড়ি করলে ভালো হবে না। ইজ্জতওলা পরিবারের দুর্নাম করা হলে তার জন্য কঠিন শাস্তি পেতে হবে। বখাটে ছেলেটি হাসপাতালে মেয়েটিকে দেখতে গিয়েছিল। হা হুতাশ করে বলেছিল, আহা, কোন পাষণ্ড এমন চাঁদের মত সুন্দর মুখটাকে নষ্ট করে দিলো ? এখন এ মেয়ের কি হবে ? কে একে বিয়ে করবে ? তারপর সাপের মত হিস হিস স্বরে বলেছিল , তার থেকে তখন যদি আমার কথা শুনতে তবে… মেয়েটি তখনো যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। খবর পাওয়া পর্যন্ত সে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিল।

ছেলেটি আগের মতোই স্কুলের ছাত্রীদের প্রতিদিন উত্ত্যক্ত করছে। চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছে। হিন্দি সিনেমার চটুল গান গাইছে। তারা ফুর্তিতেই আছে। মেয়েটির বাবা থানায় যাওয়ার পর  পুলিশ জানিয়েছে, তারা অনুসন্ধান করছে। ব্যস্ত হবার কিছু নেই।যথাসময়ে সব জানা যাবে।

পড়তে পড়তে তাঁর মুখের চোয়াল আবার শক্ত হয়ে আসে। হাতের আঙুল জড়িয়ে গুটিয়ে এনে কঠিন মুষ্ঠি তৈরি হয়। তিনি চাপা ক্রোধে কাঁপতে থাকেন। আহত, বৃদ্ধ সিংহের মতো। টেলিফোন তুলে তিনি  সাংবাদিক ছেলেটিকে ফোন করেন ছেলেটি ফোন ধরার পর বলেন, সময় আছে?এসো তাহলে। নিউজ স্কুপ করতে পারবে। অভিজিৎ আসার আগেই গাড়ি বের করতে বলেন ড্রাইভারকে।শহরের কাছেই জায়গাটা,সকালে গিয়ে বিকেলে ফেরা যাবে, বড়জোর সন্ধ্যা হবে। তিনি সঙ্গে নিলেন একটা ব্যাগে দু প্যাকেট বিস্কুট,দুটো মিনারেল ওয়াটারের বোতল। আর  পলিথিন ব্যাগে ভারী একটা কিছু, যার জন্যে ব্যাগটা ঝুলে থাকলো যতক্ষণ গাড়ির সিটে তা গুছিয়ে না রাখলেন। তাকে বেশ তৃপ্ত দেখাচ্ছে। যদিও আপাত ভাবে কিছুটা চঞ্চল আর অস্থির। অভিজিৎ বললো, আমরা কোথায় যাচ্ছিবললেন না তো? তিনি হাতের কাগজটা দেখিয়ে বললেন, যেখানে এটা ঘটেছে সেখানে। সেখানেকেন?ছেলেটি তাকায় তাঁর দিকে। সরেজমিনে দেখতে। সবকিছু শুনতে। কাগজে ঘটনার বিবরণ পড়া এক ধরনের অভিজ্ঞতা। অকুস্থলে গিয়ে নিজ চোখে দেখা, নিজ কানে শোনা ভিন্ন অভিজ্ঞতা এনে দেয়। তোমরা ঘনঘন যাও না কেন এইসব ঘটনার প্রতিবেদন লেখার জন্য বাইরে? অভিজিৎ বলে, অফিসে জনবল কম। তাছাড়া জেলার রিপোর্টার রয়েছে এইসব ঘটনার খবর লিখে পাঠাবার জন্য। আমাদের যেতে হয় না। তিনি ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললেন, আজ না হয় ব্যতিক্রম হলো। নিজের চোখে দেখবে, নিজের কানে শুনবে। ওখানকার রিপোর্টার ভয়ে কি সব কিছু লিখতে পারে?তারপর বললেন, একটা দিনই তো। সন্ধ্যায় ফিরে অফিসে গিয়ে রিপোর্ট দিতে পারবে। খবরের কাগজের কাজ তো বেশিরভাগ সন্ধ্যার পরই শুরু হয়। সাংবাদিক গাড়ির সিটের পেছনে হেলান দিয়ে বলল, হ্যাঁ। কিন্তু  সব দেখে সন্ধ্যার আগে ফেরা যাবে কি-না সন্দেহ। এডিটার কে ফোন করে জানিয়ে দিতে হবে। আপনার কথা বলতে হবে। আপনিও কথা বলবেন। আপনিই তো নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি ট্রাফিক আইল্যান্ডের লালবাতি দেখে বললেন, বেশ। জানাও তাঁকে।  বাইরের দিকে তাকিয়ে তারপর বললেন ,দেখ ট্রাফিক বাতির রং রক্তের মতো লাল দেখাচ্ছে। তার মুখের পেশি শক্ত হয়ে আসে, তিনি জোরে জোরে শ্বাস ফেলেন। যেন নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। অভিজিৎ তাঁর দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন স্বরে বলে,স্যারআপনি সুস্থ তো? হ্যাঁ। পুরোপুরি সুস্থ। সে আবার  বলে, আজ আপনাকে একটু উত্তেজিত আর অস্থির মনে হচ্ছে। মানে অন্যদিনের তুলনায়। উত্তেজিত? হ্যাঁ, তা বলতে পারো। খবরটা পড়ার পর এমন হয়েছে। সব সময় তাই হয়। তুমি তো সব সময় আমার কাছে থাকো না। কথা বলো না। আজ আছো, কথা বলছো, তাই জানতে পারলে। তারপর একটু থেমে বললেন, আজকাল আমি বড় বেশি ইমোশনাল হয়ে যাই। বরাবরই ছিলাম একটু-আধটু। এখন বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটাও বাড়ছে। ছেলেটি উদ্বিগ্ন হয়ে বললো, না না। সাবধান হবেন। এমন হলে ব্লাডপ্রেসার বেড়ে যেতে পারে। তিনি বললেন, আমার ব্লাডপ্রেসার অনেকদিন থেকেই হাই। নতুন করে আর কী হবে? অভিজিৎ  বললো, স্ট্রোক হতে পারে। হুঁ। তা হতে পারে। ডাক্তারও বলেছে। কিন্তু সব সময়ই কি হিসেব করে চলা যায়? মাঝে মাঝে নিয়মের ব্যতিক্রম তো হবেই। মানুষ তো মেশিন না। রক্ত-মাংসের শরীর তার। নিজের নিয়মে চলে। তুমি তো ইয়াংম্যান। তোমার মন কি সব সময় নিয়ম মেনে চলে? অভিজিৎ কিছু বলে না।চুপ করে থাকে। গাড়ি মেন রোড  থেকে বের হতে সময় নিচ্ছে। প্রতি রাস্তাতেই ট্রাফিক জ্যাম। গাড়িতে এসি চললেও ঘামছেন তিনি। ঘনঘন রুমাল দিয়ে মুখ মুছছেন। তাঁর ভেতরের চঞ্চলতা বাড়ছে। 

সাংবাদিক  পরের সিগন্যালে একজন ভিখিরিকে পাঁচ টাকা দিয়ে বললো, ভিখিরি উচ্ছেদ করার কথা।অথচ এখন দেখছি এদের সংখ্যা বাড়ছে।কোথা থেকে যে আসছে এরা ?

তিনি বললেন, তার মানে গরিবের সংখ্যা বাড়ছে। আমি রাস্তায় গাড়ি থেমে গেলে যারা এসে কিছু না কিছু বিক্রি করে যেমন, বই, ম্যাগাজিন, ম্যাপ, তোয়ালে, ফুল, তাদের কাছ থেকে কিনি। ভিখিরিদের চেয়ে তারা ভালো, খেটে খাচ্ছে। আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে আছে। অভিজিৎ বললো, কতদিন রাখতে পারবে আত্মসম্মান? শুনে তিনি তার দিকে তাকিয়ে বললেন, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে আমাদের। প্রয়োজন না পড়লেও কিনতে হবে তাদের থেকে একটা কিছু। ক’টাকাই বা খরচ হয় তাতে। আমরা অকাজে অনেক টাকা খরচ করে থাকি। সাংবাদিক ছেলেটি পাশের গাড়ির দিকে তাকালো। নাদুস-নুদুস ছেলের হাতে আইসক্রিম। তার মায়ের হাতেও একটা । বেশ পরিতৃপ্ত দেখাচ্ছে তাদের। যেন বিজ্ঞাপনের ছবি।

 গাড়ি আবার  চলতে শুরু করলো।হাই ওয়েতে স্পিড তুলে গাড়ি ঠিক সময়ই গন্তব্যস্থলের কাছাকাছি পৌঁছল।এই রাস্তা দিয়ে যাবার সময় দু’দিকে তাকালে মনে হয় কি উন্নত এই দেশ!কোনো সমস্যানেই জীবনে।শুধু গতি আর ছুটে চলা।

জায়গাটার নাম বলতে বড় রাস্তা থেকেই দেখিয়ে দিলো লোকজন। একজন চোখ ছোটো করে সন্দেহের দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যাবেন?কার বাড়ি?তিনি কিছু বললেন না। তাঁর মুখ গম্ভীর হয়ে এসেছে। তিনি ভেতর ভেতর অস্থির হয়ে পড়েছেন। তাঁর হাতের আঙুল মুষ্ঠিবদ্ধ হচ্ছে। 

ছেলেটি তাঁকে দেখলো কয়েকবার। তারপর বললো, কাউকে বলেছেন না যে, আমরা কোথায় যাচ্ছি?

তিনি উত্তর না দিয়ে গাড়ির জানলার বাইরের দিকে তাকালেন।

 ছেলেটি বললো, এভাবে হুট করে গিয়ে স্থানীয় কাউকে সঙ্গে না পেলে কি সাহায্য পাওয়া যাবে? তিনি এবার বিরক্তির সুরে বললেন, আমার সাহায্যের প্রয়োজন নেই। যা করতে এসেছি তা একাই পারবো।

 

আরো খানিকটা গিয়ে জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে হলো পথের হদিশ, বাড়ির ঠিকানা। দুদিকে শস্যের ক্ষেত। ফসল কাটা হয়ে গিয়েছে। জমি থেকে ধানের গোড়া তুলে নতুন ধান লাগাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে কৃষক। দুপুরের রোদে তাদের শরীরে ঘাম চকচক করছে। আকাশ হালকা নীল।ভালুকের মত মেঘ ভাসছে অলস ভঙ্গিতে। ঈষাণ কোণে এক ছোপ কালো রং। বৃষ্টি হবে, বর্ষা আসতে বেশি দেরি নেই। আজ আষাঢ় মাস শুরু।তিনি নিজের মনেই বললেন ।

অভিজিৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে  বললো,এবারে বৃষ্টি হবে না তেমন বোধহয়। আবহাওয়া বদলে গিয়েছে। তিনি বললেন, হুঁ।

 

আশেপাশের টিনের আর মাটির তৈরি বাড়িগুলোর পাশে ইঁট আর সিমেন্টের তৈরি তিন তলা বাড়িটা দূর থেকেই চোখে পড়ে। নতুন,দেখে মনে হচ্ছে মাত্রকয়েক বছর আগেই তৈরি হয়েছে। টকটকে লাল রং বাইরের দেয়ালে। পাশে আম-কাঁঠাল, নারকেলের বাগান। বাড়ির সামনে লোহার গেট। এখন খোলাই আছে। গাড়ি থেকে নেমে তিনি অভিজিৎ-কে নিয়ে ঢুকলেন। সে তার নোটবই আর কলম বের করে নিল। কী কী প্রশ্ন করবে, সেসব মনে মনে আরেকবার  ঠিক করে নিল। একজন ষণ্ডামার্কা লোক বারান্দায় দাঁড়িয়ে। বললো, কাকে চান?

তিনি নাম বললেন। 

লোকটি বললো, কোত্থেকে আসছেন?তিনি তার দিকে তাকালেন। তারপর একটু ক্ষেপে গিয়ে বললেন, তাকেই বলবো। তুমি বলো গিয়ে শহর থেকে দুজন এসেছেন। জরুরি  কথা আছে। তাঁর কথায় নির্দেশ দেওয়ার ভঙ্গি, কিছুটা ধমকও। 

লোকটা ইতঃস্তত করে। তার সাদা-পাকা চুলের দিকে দেখে কয়েকবার। হাতের ব্যাগের দিকে তাকায়। 

অভিজিৎ বলে, ইনি নামকরা লোক। তোমার সাহেবকে নাম বললে চিনবেন। যাও বলো গিয়ে। দেখতেই পাচ্ছআমরা ভদ্রলোক। লোকটা চলে গেল ভেতরে।

 তিনি ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমরা ভদ্রলোক, একথা না বললেই পারতে। কেন?দোষের কিছু কিংবা ভুল বলা হলো? তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন, ভদ্রলোকরাই বিপজ্জনক। ভণ্ড আর অসভ্য। এখন ভদ্রলোকের আগের সংজ্ঞা আর নেই। তোমার জানা উচিত। ভদ্রলোক এখন একটা গালি। 

ছেলেটি হেসে বললো, আপনি বেশ জটিল হয়ে গেছেন। জটিল! তিনি মুখ ঘুরিয়ে তাকালেন ছেলেটির দিকে। তারপর আবার বললেন, তার অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে, জটিল!

 

তাঁরা বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। একটা লোক ঝুড়িভর্তি আম নিয়ে এসেছে।

 কিছু পর ভেতর থেকে লোকটা বেরিয়ে এসে বললো, বসুন ঘরে। স্যার ভাত খাচ্ছেন। বসতে বললেন। তারা ভেতরের ঘরে ঢুকলো। লাল টকটকে রঙের ব্রোকেড কাপড়ে মোড়া দশাসই আকারের দুটি সোফাসেট। একটা কাঠের আলমারি। ভেতরে তামা আর পিতলের তৈরি নানা সাইজের উপহার সামগ্রী। জাপানি পুতুল, শূন্য ফুলদানি। দেয়ালে বড় একটা পোর্ট্রেট। পাঞ্জাবির ওপর চাদর জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন মধ্যবয়সী লোক। তার চোখ-মুখে গাম্ভীর্য এবং চাপা অহংকার। ঠোঁটে ঈষৎ বিদ্রূপের আভাস। মনে হয় যেন তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। পোর্ট্রেটের প্রৌঢ়ই ঘরে ঢুকলো খানিক বাদে। তার চোখে জিজ্ঞাসা। সামনের সোফায় বসে পাশে দাঁড়ানো লোকটাকে সে বললো, অতিথিদের সরবত-টরবত কিছু খাওয়া। তিনি বললেন, না, কিছু লাগবে না। আমরা বেশিক্ষণ থাকবো না। 

পোর্ট্রেটের লোকটি,এবাড়ির মালিক জনার্দন মাইতি বললো, আপনাদের এখানে আসার উদ্দেশ্য?বলে সে স ন্দেহের ভঙ্গীতে এক দৃষ্টে তাকায় তাদের দিকে। তাকে কিছুটা গম্ভীর দেখায়। তিনি বললেন, আপনার ছেলে গ্রামের একটি মেয়ের শরীরে অ্যাসিড ছুঁড়ে মেরেছে। সে এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। শুনে গৃহস্বামী ক্রুদ্ধ চোখে তাকালেন। তারপর গর্জে উঠে বললেন,কে বলেছে এই মিথ্যা কথা? তিনি হাতের খবরের কাগজ খুলে দেখিয়ে বললেন, এখানে সব লেখা আছে। নাম-ধাম। সব। গৃহস্বামী পাশের লোকটার দিকে তাকালো। সে যেন প্রস্তুত হয়েই আছে এমন ভঙ্গিতে সামনে এসে দাঁড়ালো। দুজনের দিকে তাকিয়ে গৃহস্বামী বললো, কাগজে মিথ্যা কথা লেখে। যে এইসব খবর পাঠাইছে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হইবো। আমার উকিল মানহানীর মামলা করছে কাগজের বিরুদ্ধে। তিনি বললেন, আপনি ভেবেছেন টাকার জোরে, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ছেলের অপরাধকে ঢেকে দেবেন। তা হবে না। তাকে শাস্তি পেতেই হবে। কী করতে চান আপনি?মুখ সামলে কথা বলুন। না বলে আমার বাড়িতে ঢুকে আমাকেই ভয় দেখাচ্ছেন। খুব সাহস দেখি।জনার্দন উত্তেজিত। তিনি দৃঢ়স্বরে বললেন, আপনাদের মোকাবিলা করার জন্য এভাবেই আসতে হয়। অতর্কিতে। না বলে-কয়ে। বলে এলে কি আপনি বাড়িতে থাকতেন?থাকলেও বের হতেন?এখন দেখি , ডাকুন আপনার বদমাশ ছেলেকে। তার জন্যই আমাদের আসা। চুপ্‌। একেবারে চুপ্‌। আমার বাড়িতে বসে আমার  ছেলেকেই বদমাশ বলছেন!জানেন আমি কে!মুখ সামলে এখনি বেরেন। নইলে… বলে পাশে দাঁড়ানো লোকটাকে ইঙ্গিত দেয়। সে  তাদের দিকে আরো এগিয়ে আসে। 

অভিজিৎ বলে, আমাদের ভুল বুঝবেন না। সবকিছু জেনে প্রতিবেদন লেখা হবে। আপনার দিকেও কিছু বলার থাকতে পারে। তাই এসেছি। এতে রাগার কিছু নেই। আমাদের উদ্দেশ্য ভালো। তিনি সাংবাদিক ছেলেটিকে বললেন, না প্রতিবেদন তৈরি করার জন্য এই লোকটার মুখ থেকে কিছু শুনতে আসিনি। আমাদের সব জানাই আছে। এখন শুধু বিচার আর শাস্তি বাকি। কী! এতবড় সাহস?আমার বিচার করতে চাও তুমি?কিসের বিচার?তোমাদের বেয়াদবির সীমা নেই দেখছি।অনেকক্ষণভদ্রতাদেখিয়েছি।এবার,বলে তিনি পাশের লোকটাকে বলেন, এখনো দাঁড়িয়ে আছিস?ঘাড় ধরে বের করে দে। বলার মুহূর্তেই এবার তিনি ব্যাগ থেকে পিস্তল বার করে বললেন, কেউ নড়বে না। দেখছো, হাতে কী?এখন ডাকো বদমাশ ছেলেটাকে। বেশি সময় নেই আমাদের। পিস্তল দেখে তার পাশে দাঁড়ানো লোকটা ইতস্তত করে। তার চোখে-মুখে আতঙ্ক। তিনি বলেন, ডাকো এখান থেকেই বদমাশ ছেলেটাকে। ছেলের বাবা ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে বলে,সে নেই । বাইরে গেছে। তিনি বলেন, বেশ আমরা থাকবো যতক্ষণ সে না আসে। তোমরাও চুপ করে থাকো। যে যেখানে আছো। নড়াচড়া করবে না একটুও। তাঁর হাতের পিস্তল তাক করা থাকে। ঘটনার আকস্মিকতায় সাংবাদিক ছেলেটি হতবাক হয়ে যায়।সে অবাকহয়ে তাঁকে দেখে। তারপর ফিসফিস করে বলে, আপনি এ কী করছেন। পাগলামি হচ্ছে। এমন কিছু করবেন বলেননি তো !। এমন হবে জানলে আমি কখনই আসতাম না। তিনি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, হ্যাঁ। সেই জন্যেই বলিনি আগে। জানলে তুমি সঙ্গে আসতে?হয়তো বিশ্বাসই করতে না। বিশ্বাস করলেও সঙ্গে আসতে না।তাহলে এই চমৎকার প্রতিবেদনটা কে লিখতো? এখন চুপ করে বসে অপেক্ষা করো। বদমাশটা এসে যাবে। তার দুপুরের খাওয়ার সময় এখন। তাই না?বলে তিনি জনার্দন মাইতির দিকে তাকান। জনার্দন মাইতি ঘামছে। তার ঠোঁট দুটো শুকিয়ে এসেছে। ছেলেটি ভেতরে ঢুকে তাদের দেখে চমকে ওঠে। এভাবে তার বাবাকে সামনে রেখে পিস্তল হাতে কেউ বসে থাকবে সে কখনো কল্পনা করেনি। জনার্দনবাবু  অসহায় দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকাল। ছেলেটি চিৎকার করে এক লাফে বাইরে চলে যেতে গেল। সেই চিৎকার ঢেকে দিয়ে গর্জে উঠলো তাঁর হাতের পিস্তল। পরপর দুবার। দরজার সামনে লুটিয়ে পড়লো ছেলেটি। রক্তে তার জামা ভিজে গিয়েছে। তার হাতে-পায়ে খিঁচুনি দিচ্ছে। মুখে তীক্ষ্ণ যন্ত্রণার ছাপ। রক্তের রং টকটকে লাল। অভিজিৎ ভয়ার্ত স্বরে বললো, এ আপনি কী করলেন?এ যে খুন। মার্ডার।এখন আমি কি করি ? ও মাই গড। তিনি খুব ঠান্ডা স্বরে বললেন, শাস্তি দিলাম। এরা তো শাস্তি পায় না। তুমি লিখবে সব। তোমার শাস্তি হবে না। আমারই হবে। তোমাকে আমি নিয়ে এসেছি কিছু না বলে।

শুভমের  স্ত্রী বাজার করে এসে দেখলেন তিনি কাগজ হাতে বসে আছেন। পাশের টেবিলে চায়ের কাপে চা ঠান্ডা হয়ে পড়ে আছে। স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, এখনো কাগজ পড়ছো?চা দেখি কাপেই পড়ে আছে। খাওনি। ভুলে গেছ মনে হয়। আর এক কাপ দিতে বলবো? তিনি সম্বিত ফিরে পেয়ে বললেন, হ্যাঁ। বলো। তারপর ঈষৎ হেসে বললেন, তোমার বাজার কেমন হলো? আঁতকে উঠে তাঁর স্ত্রী বললেন, কাঁচাবাজারে ঢোকাই যায় না। সবকিছুতে আগুন লেগেছে। মাছের বাজারে আরো বেশি। এক কেজি মাছের দাম চারশো টাকা। ভাবতে পারো!কারা কেনে ?কারা খায়? তিনি অল্প হেসে বললেন, নিশ্চয়ই কেউ আছে। নইলে এত দাম চাইবে কেন?তাঁর স্ত্রী কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়ে ,কে জানে !বলে ভেতরে চলে গেলেন। সামনের সোনার কারখানার চিমনি দিয়ে  বেরনো কালো ধোঁয়ায় আশপাশটা ঢেকে গেছে।নাক জ্বালা করছে । তিনি উঠে জানালার পর্দা টেনে দেন। ঘরটা অন্ধকার দেখায়। তার এখন আবছা অন্ধকারই ভালো লাগে। পরিচারিকা ঘরে ঢুকে চায়ের কাপ রাখে টেবিলে। তিনি সেদিকে তাকিয়ে ফোন তোলেন এক হাতে, অন্য হাতে ডায়াল করেন নম্বর। ওপাশে সাংবাদিক অভিজিৎ-এর  স্বর শোনা যায়। কিছুটা অবাক হয়েছে সে ফোন পেয়ে। কিছুক্ষণ আগেই কথা হয়েছে তাঁর সঙ্গে। তিনি শান্ত স্বরে বললেন, আগামীকাল এসো। তোমার লেখাটা নিয়ে যেও। লিখে রাখবো। ফোনে কথা শেষ করে তিনি চেয়ারে এসে বসেন। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে এঁকেবেঁকে। তিনি একদৃষ্টিতে চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কাপের ধোঁয়া ক্রমে নিস্তেজ হয়ে আসে।একসময় ধোঁয়ার রেখা হারিয়ে ঠান্ডা চা পড়ে থাকে কাপে । 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>