বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের গোড়ার কথা


      
।।ড. মোহাম্মদ আলী খান।।

বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের গোড়ার কথা
বাংলাসাহিত্যের প্রথম উপন্যাস প্যারীচাঁদ মিত্রের (টেকচাঁদ ঠাকুর) ‘আলালের ঘরের দুলাল’, প্রকাশকাল ১৮৫৭ খ্রি.। আর প্রথম সার্থক উপন্যাস বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দুর্গেশনন্দিনী’, প্রকাশকাল ১৮৬৫ খ্রি.। প্রথম সার্থক বাংলা নাটক মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘শর্মিষ্ঠা’, প্রকাশকাল ১৮৫৯ খ্রি.। তবে ভ্রমণ কাহিনী কোনটি প্রথম, সেটি নিয়ে আলোচনা হয় না। অথচ ভ্রমণ কাহিনীর তালিকা যেমন দীঘর্, তেমনি গুণে-মানে বাংলা ভ্রমণসাহিত্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ভ্রমণ কাহিনীর অন্যতম পুরোধা শ্রী অন্নদা শংকর রায় চমৎকার বলেছেন, ‘সম্প্রতি প্রবন্ধ লেখকদের এক সম্মেলনে ভ্রমণ কাহিনীকারদেরও আসন দেওয়া হয়েছিল। তখন এই প্রশ্নটা আমার মনে ওঠে, ভ্রমণ কাহিনী কি প্রবন্ধের ঘরের পিসি, না কথাসাহিত্যের ঘরের মাসি? না একাধারে দুই?’ সময়ের বাতিঘর সাক্ষ্য দেয় যে, উপন্যাস, গল্প বা নাটকের সার্থক আত্মপ্রকাশের আগেই বাংলা ভ্রমণ কাহিনী পাঠককুলকে স্পর্শ করেছে।



ভ্রমণসাহিত্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত বহিরাঙ্গণ সাহিত্য (outdoor literature), প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলির রূপায়ণ, ভ্রমণবিষয়ক স্মৃতিকথা এবং একটি বড় অংশ জুড়ে আছে ভ্রমণ গাইড। মানবসভ্যতার বহমান পথ পরিক্রমায় ভ্রমণসাহিত্য প্রাচীনত্বের দাবি করতেই পারে। দ্বিতীয় শতাব্দীর গ্রিক ভূগোলবিদ Pausanias-এর কথা স্মরণ করা যায় যিনি লিখেছেন ভ্রমণবিষয়ক স্মৃতিকথা Description of Greece’। আধুনিককালে যাঁর বই বহুল আলোচিত, তা হলো- James Baswell-এর ‘Journal of a Tour in the Hebrides ‘, প্রকাশকাল ১৭৮৬ খ্রি.। কিন্তু তারও আগের অনেক ভ্রমণ কাহিনী সময়কে জয় করে আজও কথা বলে, যেমন- ওয়েলসের গেরাল্ড (Gerald)-এর বই Journey Through Wales’ (প্রকাশকাল ১১৯১ খ্রি.), Description of Wales’ (প্রকাশকাল ১১৯৪ খ্রি.) কিংবা ইবনে জুবায়ের (১১৪৫-১২১৭ খ্রি.) এবং ইবনে বতুতার (১৩০৪-১৩৬৯ খ্রি.) অসাধারণ ভ্রমণ কাহিনী Rihla’ (The Travels)। ইবনে বতুতার সফরনামা আরবিতে লেখা হলেও বাংলা অনুবাদ অত্যন্ত জনপ্রিয়। ভ্রমণ গাইডও (Travel Guide) বহু আগে থেকেই ভ্রমণপিপাসুদের তৃষ্ণা মিটিয়ে চলেছে, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য থমাস ওয়েস্টের বই ‘Lake District’, প্রকাশকাল ১৭৭৮ খ্রি.। ভ্রমণ গাইডের পাশাপাশি ভ্রমণ বিষয়ক জার্নাল (Travel Journal)-এর বহু উদাহরণ রয়েছে, যা সর্বজন প্রশংসিত।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী শতবর্ষের সীমানা পেরিয়ে একগুচ্ছ বাংলা ভ্রমণ কাহিনীর উদাহরণ পাওয়া যায়, সে সব বই আমাদের বিস্মিত করে, একই সঙ্গে করে আপ্লুত, মাতৃভাষা যাঁদের বাংলা, তাঁরা এ জন্য গর্ব করতে পারেন অনায়াসে। এক্ষেত্রে প্রথম নাম আসে বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়ের (১৮৮৭-১৯৪৯ খ্রি.)। তিনি ছিলেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পিতামহ। বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় ৫৩ বছর বয়সে রচনা করেন অসাধারণ ভ্রমণ কাহিনী ‘কালনা থেকে রংপুর’, ভ্রমণকাল ১৫ কার্তিক ১২৪৭ থেকে ১৪ অগ্রহায়ণ ১২৪৭ বঙ্গাব্দ (১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ)। আজ থেকে অর্থাৎ ১৪২৫-১২৪৭ বঙ্গাব্দ = ১৭৮ বছর আগে এই ভ্রমণ সম্পাদিত হয় এবং মোট সাতাশ দিনে নৌপথে নৌকাযোগে তিনি কালনা থেকে রংপুর গিয়েছিলেন। তিনি ভ্রমণকাহিনীটির নামকরণ করেননি, রোজনামচার ধাঁচে লেখা। তখন বাংলা গদ্যভাষা অর্থাৎ সাহিত্যিক গদ্যভাষা নির্মিত হয়নি, বরং তা ছিল প্রাকৃত ঘেঁষা, ছেদ ও যতির ব্যবহার নেই। গদ্যে বিরামচিহ্ন প্রয়োগের রীতিও সে সময় শুরু হয়নি। বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় তাঁর ভ্রমণ কাহিনীর শুরুর দিকে লিখেছেন-

‘…১২৪৭ সাল তারিখ ১৫ কার্ত্তিক মোং কালনার গঞ্জ হইতে শ্রীতিলকচন্দ্র কুণ্ডুর তহবিলের শ্রীবেঙ্গু মাজির নৌকায় আরোহণ হইয়া ঐ দিবষ আন্দাজ দিবা এক প্রহরের সময় নৌকা খুলিয়া রাত্র আন্দাজ ছয় দণ্ডের সময় মোং শ্রীপাট নবদ্বিপের পূর্ব আন্দাজ দুই ক্রোষ পথ দূরে নৌকা লাগান হইল- তথায় পাক করিয়া আহারাদি করিয়া রাত্রে থাকা গেল ইতি…।’

এই ভ্রমণবৃত্তান্ত সম্পর্কে ড. দীনেশ চন্দ্র সেন লিখেেেছন,

‘এই ভ্রমণ-বৃত্তান্ত ১৮৪০ খ্রীষ্টাব্দে, অর্থাৎ রাজা রামমোহন রায়ের মৃত্যুর মাত্র ৭ বৎসর পরে লিখিত হয়। উক্ত রাজার বহু শতাব্দী পূর্ব হইতে সাধারণের মধ্যে বাংলা গদ্যের যে ধারা প্রচলিত ছিল, মৃত্যুঞ্জয় প্রভৃতি সংস্কৃত পণ্ডিত ও রাজা রামমোহন রায় প্রমুখ ইংরেজির পক্ষপাতী শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ সেই প্রাচীন ধারাটি গ্রাহ্য করেন নাই। ‘

বাংলা ভ্রমণসাহিত্যে ধ্রুপদী সংযোজন সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৪০-১৮৮৯) বিখ্যাত ভ্রমণ কাহিনী ‘পালামৌ’। ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় মোট ছয় কিস্তিতে এটি প্রকাশিত হয় ১২৮৭, ১২৮৮ ও ১২৮৯ বঙ্গাব্দে। প্রকাশকালে লেখক প্রাঃ নাঃ বঃ ছদ্মনাম ব্যবহার করেন। সুকুমার সেন লিখেছেন, ‘ছোটনাগপুরের আদিম গিরি-দরী-অরণ্যানী এবং আরণ্যক পশু-মানব লেখকের সমবেদনা রসধারার অভিষেকে পালামৌ প্রবন্ধগুলিতে অভিনব মাধুর্যমণ্ডিত হইয়া জীবন লাভ করিয়াছে।’ বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ যেমন বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত, তেমনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বড় ভাই সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পালামৌ’কে বাংলা গদ্যসাহিত্যে প্রথম সার্থক ভ্রমণ কাহিনী হিসেবে গণ্য করা যায়।

বর্তমানে ভ্রমণসাহিত্য মানেই গদ্যে রচিত, কিন্তু পদ্যে বা কাব্যে রচিত ভ্রমণ কাহিনীর উদাহরণ বাংলাসাহিত্যে প্রচুর ও সর্বজন প্রশংসিত। সাত সমুদ্র তেরো নদী নিয়ে বাংলার অনবদ্য রূপকথা ভ্রমণ কাহিনীর স্বাদ এনে দিলেও তা কিন্তু ভ্রমণের কল্পলোক। অন্নদা শংকর রায় লিখেছেন, ‘ভ্রমণ কাহিনী থেকে কোনো কোনো প্রসঙ্গ বাদ যেতে পারে। কিন্তু তার মধ্যে কাল্পনিক উপাখ্যান মিশিয়ে দেওয়া উচিত নয়।’ এ প্রসঙ্গে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্নেষণ (১৯ অক্টোবর ১৮৯৪ খ্রি. বোলপুর) উল্লেখ করা যায়, ‘…ভ্রমণবৃত্তান্তের একটা মস্ত সুবিধা এই যে, তার মধ্যে অবিশ্রাম গতি আছে অথচ প্লটের বন্ধন নেই- মনের একটি অবারিত স্বাধীনতা পাওয়া যায়।…’

কাব্যে রচিত ভ্রমণ কাহিনী হিসেবে বিজয়রাম সেন রচিত ‘তীর্থমঙ্গল’ সর্বাধিক আলোচিত, তবে ভ্রমণ কাহিনী নামকরণে বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। ‘তীর্থমঙ্গল’ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত হয় ১৩২২ বঙ্গাব্দে। তার বহু আগে বাংলাসাহিত্যের গৌরবময় অধ্যায় ‘মনসামঙ্গল’-এ চাঁদ সওদাগরের নৌযাত্রার উদাহরণ আছে। নরহরি চক্রবর্তীর ‘নবদ্বীপ পরিক্রমা’ বা ‘ব্রজ পরিক্রমা’, মুকুন্দ চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমণ্ডল’ ভ্রমণসাহিত্যের নিবিড় আলোচনায় স্থান পেয়েছে। এক্ষেত্রে আরও উল্লেখ্য, ১৭৯৬-৯৭ খ্রি. রচিত জয়নারায়ণ ঘোষালের ‘কাশী পরিক্রমা’।

এ ছাড়া চৈতন্যচরিত কাব্যসমূহের ভেতর উল্লেখযোগ্য বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্যভাগবত’, লোচন দাসের ‘চৈতন্যমঙ্গল’, কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘শ্রীচৈতন্যচিরতামৃত’ প্রভৃতি। এসব গ্রন্থে ভ্রমণের রস আস্বাদন করা গেলেও তা প্রকৃতপক্ষে ভ্রমণ কাহিনী নয়, যদিও ভ্রমণের নানা বিবরণ তাতে লিপিবদ্ধ হয়েছে। কাব্যে রচিত ভ্রমণ কাহিনী বর্তমান সময়ে আর জোরালো দৃষ্টি আকর্ষণ করে না; কারণ, ভ্রমণসাহিত্য মূলত গদ্যে রচিত, তাকে কথাসাহিত্য বা নিবন্ধের ঘরে সংজ্ঞায়িত না করলেও বাংলাসাহিত্যে, ভ্রমণসাহিত্য স্থায়ীভাবে নিজের আসন তৈরি করে নিয়েছে।

উনিশ শতকে বহুবিধ ভ্রমণ কাহিনীতে স্থান পেয়েছে তীর্থভ্রমণ। এসব গ্রন্থকে বিশুদ্ধ ভ্রমণসাহিত্য হিসেবে গণ্য করার বিষয়ে সমালোচকদের অনীহা থাকলেও, বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের বিকাশে তার অবদান অনস্বীকার্য। তীর্থভ্রমণ প্রধান গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- যদুনাথ সর্বাধিকারীর বই ‘তীর্থভ্রমণ বা তীর্থভ্রমণের রোজনামচা’, বইটির রচনাকাল ১২৫৯-১২৬৪ বঙ্গাব্দ (১৮৫২-১৮৫৭ খ্রি.) আর বইটি প্রকাশিত হয় ১৯১৫ খ্রি.। বিদ্যাবিনোদ লিখেছেন ‘উত্তরখণ্ড পরিক্রমা’ যার প্রকাশকাল ১৯১২ খ্রি.। এ ধরনের তীর্থভ্রমণ কাহিনীর মধ্যে আরও রয়েছে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যয়ের ‘শ্রীশ্রীগয়াতীর্থ বিস্তার’, ঈশ্বরচন্দ্র বাগচীর ‘তীর্থমুকুর’, দীনবন্ধু মিত্রের ‘সুরধুনী কাব্য’ (১৮৭১ খ্রি.) ইত্যাদি। উল্লিখিত তীর্থভ্রমণ কাহিনী ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবই ভারতকেন্দ্রিক। মুসলমানদের কাছে সেরা তীর্থভ্রমণ মক্কা বা মদিনা অর্থাৎ ওমরাহ ও হজ পালন। এই হজ ভ্রমণের কাহিনী বাংলায় প্রথম কে লিখেছেন সে তথ্য সহজলভ্য নয়। বাংলাদেশের স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ খানবাহাদুর আহ্‌ছানউল্লাহ ১৯২০ খ্রি. হজ শেষে ১৯২১ খ্রি. প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণ কাহিনী ‘হেজাজ ভ্রমণ’।

চট্টগ্রাম নিবাসী শরচ্চন্দ্র দাশ (১৮৪৯-১৯১৭ খ্রি.) এমন একজন ভ্রমণ কাহিনী রচয়িতা যিনি বাঙালি ভ্রমণ কাহিনী লেখকদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তাঁর ভ্রমণবিষয়ক দুটি বইয়ের উদাহরণ পাওয়া যায়, যার শিরোনাম Narrative of a Journey to Tashi-Ihunpo’, প্রকাশকাল ১৮৭৯ খ্রি.। তাঁর অন্য বইটির বহুল আলোচিত শিরোনাম ‘A Journey to Lhasa and Central Tibet’, প্রকাশকাল ১৮৮১ খ্রি.। যদিও এই দুটি বই একজন বাঙালি প্রণীত শতাব্দী প্রাচীন বই, তথাপি তা বাংলায় রচিত হয়নি; অবশ্য দ্বিতীয় গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদ ‘তিব্বত ভ্রমণবৃত্তান্ত’ প্রকাশিত হয়েছে। সেই হিসেবে শরচ্চন্দ্র দাশের বইটিকে বাংলাসাহিত্যের প্রথম দিককার ভ্রমণ কাহিনী হিসেবে গণ্য করা যায় না।

কী তীর্থযাত্রী, কী ভ্রমণপিপাসুকে, হিমালয় টেনেছে যুগ যুগ ধরে। সেই হিমালয়কে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে বিখ্যাত সব ভ্রমণ কাহিনী। এক্ষেত্রে যাঁর নাম অগ্রগণ্য, তিনি হলেন জলধর সেন। শোকসন্তপ্ত মনকে শান্তির পরশ দেওয়ার মানসে হিমালয় পরিভ্রমণ করলেও জলধর সেন ভ্রমণকালে টুকরো স্মৃতিসমূহ ডায়েরিতে টুকে রাখতেন। আর তার প্রথম উপস্থাপনা ‘ভারতী ও বালক’ পত্রিকায় প্রকাশিত ভ্রমণবিষয়ক লেখা ‘টপকেশ্বর ও গুচ্ছপাণি’, প্রকাশকাল মাঘ, ১২৯৯ বঙ্গাব্দ। ভ্রমণ কাহিনী হিসেবে তাঁর বইয়ের প্রথম প্রকাশ ১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯ খ্রি.) যার শিরোনাম ‘প্রবাসচিত্র’। জলধর সেনের ভ্রমণ বিষয়ক বইয়ের সংখ্যা মোট ৯টি। ‘প্রবাসচিত্র’ ছাড়াও তাঁর শতাব্দীপ্রাচীন গ্রন্থগুলো হলো ‘হিমালয়’ (১৩০৭ বঙ্গাব্দ), ‘পথিক’ (১৩০৮ বঙ্গাব্দ), ‘হিমাচল বক্ষে’ (১৩১১ বঙ্গাব্দ), ‘হিমাদ্রি’ (১৩১৮ বঙ্গাব্দ), ‘দশদিন’ (১৩২৩ বঙ্গাব্দ/১৯১৬ খ্রি.)। এ ছাড়া ১৯১৫ খ্রি. (১৩২১ বঙ্গাব্দ) জলধর সেন প্রকাশ করেন একটি অনূদিত গ্রন্থ ‘আমার য়ুরোপ ভ্রমণ’ যাঁর প্রণেতা ছিলেন বর্ধমানের মহারাজা মহতাবচাঁদ বাহাদুর, ‘Impressions’ সে বইয়ের নাম। জলধর সেনের লেখায় অনুপ্রাণিত হয়ে শ্রী শুদ্ধানন্দ ব্রহ্মচারী ১৩১৯ বঙ্গাব্দে প্রকাশ করেন ‘হিমালয় ভ্রমণ’। ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় ৭ পৌষ ১২৬১ বঙ্গাব্দ হতে ধারাবাহিকভাবে ‘ভ্রমণকারী বন্ধু হইতে প্রাপ্ত’ শিরোনামে ভ্রমণবৃত্তান্ত প্রকাশ করেন উক্ত পত্রিকার সম্পাদক ও কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। পুরোটাই পূর্ববঙ্গের, বাংলা ভ্রমণ সাহিত্যের এক বর্ণিল সংযোজন।

ভ্রমণ কাহিনীর অনুবাদের ভুবনে আর একটি বই ইতিহাসের পাতায় গৌরবময় স্থান করে নিয়েছে। বইয়ের লেখক মির্জা শেখ ইতিসামুদ্দিন আর তা বাংলা অনুবাদ করেছেন আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ। ফারসি ভাষায় প্রথম রচিত ১৭৭৯ খ্রি., বইয়ের নাম ‘শিগার্ফ-নামা-এ-বিলায়েত’ (বিলাতের আশ্চর্য দৃশ্যাবলি)। নদীয়ার পাঁচনুরে জন্মগ্রহণকারী ইতিসামুদ্দিনই প্রথম বাঙালি যিনি প্রথম বিলেত ভ্রমণ কাহিনী লিপিবদ্ধ করেন, চমৎকার সেই ভ্রমণ কাহিনী। অবশ্য, তিনি বাঙালি ছিলেন কি-না, এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

‘কাশ্মীর কুসুম’ একটি অসাধারণ ভ্রমণবৃত্তান্ত, লিখেছেন রাজেন্দ্র মোহন বসু, প্রকাশকাল ১৮৭৫ খ্রি.। ১৯০৩ খ্রি. দুর্গাচরণ রক্ষিতের বই ‘সচিত্র ভারত প্রদক্ষিণ’ ব্যতিক্রমধর্মী, সেখানে যেমন রয়েছে ভ্রমণরস, তেমনি পাশাপাশি ছিল ১৮টি ছবি যা সে সময়ের জন্য দুর্লভ সংযোজন। শিবনাথ শাস্ত্রীর ‘ইংলন্ডের ডায়েরি’ পুরোপুরি ভ্রমণসাহিত্য গুণসম্পন্ন না হলেও ভ্রমণের রস-আস্বাদন করা যায় সহজেই তাঁর ডায়েরির পাতা থেকে। ১৫ এপ্রিল ১৮৮৮ খ্রি. কলকাতা থেকে তাঁর বিলাত যাত্রা এবং ছয় মাস পর ফিরে আসেন স্বদেশে, এ সময়ে লিখেছেন দিনলিপি। স্বামী বিবেকানন্দের (নরেন্দ্রনাথ) ‘পরিব্রাজক’ ও তাঁর অনুজ মহেন্দ্রনাথের ‘বদ্রীনারায়ণের পথে’ বাংলা ভ্রমণসাহিত্যে স্মরণীয় সংযোজন। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রমণবৃত্তান্ত ছিল অসাধারণ যা ১৮৯৮ খ্রি. ‘আত্মজীবনী’তে অন্তর্ভুক্ত হয়।

পুরুষশাসিত বাঙালি সমাজে নারীদের ‘ঘর হতে দুই পা ফেলিয়া’ ভ্রমণ করা সহজসাধ্য ছিল না। কিন্তু সেই স্রোতের উল্টোপথে সাঁতরিয়ে কয়েকজন স্বনামধন্য নারী বিদেশ সফর করেছেন এবং ভ্রমণ কাহিনী লিখে বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের পাতায় স্মরণীয় হয়ে আছেন। শতবর্ষের ব্যবধানে মৃত ছাপার অক্ষরের ভিড়ে তাঁরা চাপা পড়ে যাননি। এই যাত্রায় যাঁর নাম প্রথমে আসে, তিনি হলেন কৃষ্ণভাবিনী দাস। তিনি ইংল্যান্ডে যান ১৮৮২ খ্রি. এবং আট বছর সেখানে ছিলেন। সেই সময়ের কাহিনী নিয়ে লেখেন ‘ইংলন্ডে বঙ্গমহিলা’। বইটি জেএন ব্যানার্জি অ্যান্ড সন্স, ব্যানার্জি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় ১৮৮৫ খ্রি.। তথাপি এই তথ্য আকর্ষণীয় যে, বইয়ের কোথাও লেখিকার নাম ছিল না। যাই হোক এটা সত্য যে, এটি বাংলাসাহিত্যে মহিলা লিখিত প্রথম ভ্রমণ কাহিনী। এই সঙ্গে আর একটি নাম ইতিহাসের গৌরবময় পাতায় স্থান করে নিয়েছে, তিনি হলেন প্রসন্নময়ী দেবী। তাঁর ভ্রমণ কাহিনীর নাম ‘আর্য্যাবর্ত্তে বঙ্গমহিলা’, প্রকাশকাল ১৮৮৮ খ্রি.। উল্লেখ্য, কৃষ্ণভাবিনী দাসের বই যেখানে ছিল বিদেশ ভ্রমণ কাহিনী, সেখানে প্রসন্নময়ীর বইটি ছিল ভারত ভ্রমণ কাহিনী।

বিলাত ও ভারতের বাইরেও যে কোনো বঙ্গনারীর পদচারণা হতে পারে এবং তার ভিত্তিতে যে ভ্রমণ কাহিনী রচিত হতে পারে, তার প্রমাণ হরিপ্রভা তাকেদার বিখ্যাত বই ‘বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা’। গ্রন্থটির প্রথম প্রকাশ ১৯১৫ খ্রি.। ১৯০৭ খ্রি. জাপানি যুবক তাকেদার সাথে হরিপ্রভার বিয়ে হয় ঢাকায় এবং তিনি স্বামীর সাথে জাপান যান ১৯১২ খ্রি.। সেই জাপানে বসবাসের অভিজ্ঞতা সংবলিত অনবদ্য গ্রন্থ ‘বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা’। সেই সঙ্গে আর একটি নাম না করলেই নয়, তিনি হলেন জগৎমোহনী চৌধুরী, যিনি কোনো পুরষসঙ্গী ছাড়াই একাকী ১৮৯৪ খ্রি. লন্ডনে গিয়েছিলেন, তাঁর ভ্রমণ কাহিনীর নাম ‘ইংলন্ডে সাত মাস’, প্রকাশকাল ১৯০২ খ্রি.। আর একটি ভ্রমণ কাহিনী, ১৯১৫ খ্রি. প্রকাশিত, শ্রীমতী বিমলা দাশগুপ্তার ‘নরওয়ে ভ্রমণ’ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভ্রমণ-সাহিত্য হিসেবে স্বীকৃত। ১৯১৬ খ্রি. প্রকাশিত হয় শরৎরেণু দেবীর ‘পারস্যে বঙ্গ রমণী’। একই বছরে অবলা বসুর ‘জাপান ভ্রমণ’ ‘মুকুল’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, ১৩০২-১৩৩২ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত তিনি ‘মুকুল’ ও ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় অনেক ভ্রমণ কাহিনী লেখেন। এ সবই ভ্রমণসাহিত্যে বঙ্গনারীদের স্মরণীয় অবদান।

সরকারি কাজে বা সফরে ব্রিটেন যাওয়া এখন হরহামেশা হলেও ঊনবিংশ শতাব্দীতে তা ছিল ব্যতিক্রম। ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যয় ১৮৮৮ খ্রি. বিলেত গিয়েছিলেন সরকারি কাজে। বিলেত ভ্রমণ নিয়ে তিনি একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন ১৮৮৯ খ্রি.। তবে তা ছিল ইংরেজিতে, শিরোনাম ‘A Visit to Europe। পরবর্তী সময়ে (১৯৮২ খ্রি.)) পরিমল গোস্বামী এই বইয়ের বঙ্গানুবাদ করে নাম দেন ‘আমার ইউরোপ ভ্রমণ’। দেশভ্রমণের প্রচণ্ড নেশায় চন্দ্রশেখর সেন বেরিয়েছিলেন দেশভ্রমণে ১৮৮৯ খ্রি., নানা দেশ ঘুরে ‘ভূ-প্রদক্ষিণ’ নামে একটি বই প্রকাশ করেছেন। আর একজন বিখ্যাত পর্যটক ইন্দুমাধম মল্লিক বিলেত গিয়েছিলেন ১৯০৪ খ্রি., বিলেত ভ্রমণ নিয়ে দুই খণ্ডের ভ্রমণ কাহিনী রচনা করেন, যার প্রথম খণ্ডটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১০ খ্রি.।

১৯১৩ খ্রি. প্রকাশিত হয় ‘তুরস্ক ভ্রমণ’ (১ম খণ্ড), এই অসাধারণ ভ্রমণ কাহিনী লিখেছেন ইসমাইল হোসেন সিরাজী। তাঁর ‘তুরস্ক ভ্রমণ’ (২য় খণ্ড) তৈরি হলেও আর প্রকাশিত হয়নি। পৃথিবীর সব মহাদেশে ভূ-পর্যটক হিসেবে যিনি ভ্রমণ করেছেন দুই চাকার বাইসাইকেলে করে, তিনি হলেন প্রথম ভারতীয় ও বাঙালি ভূ-পর্যটক বিমল মুখার্জি। তিনি ১৯২৬ থেকে ১৯৩৭ খ্রি. পর্যন্ত ভ্রমণ করেন, তাঁর ভ্রমণ কাহিনী ‘দু চাকায় দুনিয়া’ অবশ্য তাঁর ভ্রমণ শেষ করার ৫০ বছর পর প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ খ্রি.।

বাংলায় লেখা ভ্রমণ কাহিনী বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়েছে যা আর পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়নি। যেমন- ভাই গিরিশচন্দ্র সেন ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে পরলোকগমনের আগে পর্যন্ত ‘মহিলা’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তিনি ঐ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ভ্রমণবৃত্তান্ত প্রকাশ করেছেন, কিন্তু তা বই আকারে পাঠকের কাছে পৌঁছায়নি, শতাব্দীপ্রাচীন এ রকম ভ্রমণ কাহিনী সংগৃহীত হলে তা বাংলা ভ্রমণ সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতো।

বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের গোড়ার কথার এই সংক্ষিপ্ত আলোচনার রাশ টানা যায় বাংলাসাহিত্যের সব অঙ্গনে যাঁর উপস্থিতি উজ্জ্বলতম সেই কবিগুরল্ফম্ন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্মরণ করে। বাংলা ভ্রমণসাহিত্যকেও তিনি সমৃদ্ধ করেছেন তাঁর লেখনি দিয়ে। যে কয়টি গ্রন্থ রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণসাহিত্য হিসেবে চিহ্নিত, সেগুলো হলো : য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র, য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়রি, জাপানযাত্রী, পশ্চিমযাত্রীর ডায়রি ও জাভা-যাত্রীর পত্র, রাশিয়ার চিঠি, পারস্যে ও পথের সঞ্চয়। আর ‘ছিন্নপত্রাবলী’ তো কবিগুরুর ভ্রমণপিপাসা নিবারণের দিকদিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। ‘ছিন্নপত্রে’র প্রথম থেকে অষ্টম পর্যন্ত আটটি পত্র কবিবন্ধু শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে লেখা; অবশিষ্ট ১৪৫টি পত্র শ্রীমতী ইন্দিরা দেবীকে লিখিত। ১৮৮৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮৯৫’র ডিসেম্বরের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে যে চিঠিগুলো লেখেন, তারই কতকগুলো ১৩১৯ বঙ্গাব্দে ‘ছিন্নপত্র’ গ্রন্থে অংশত সংকলিত হয়। শতাব্দীপ্রাচীন এসব পত্রে ভারতবর্ষের নানা পরিচিত স্থানের বর্ণনা এমনভাবে প্রস্টম্ফুটিত হয়েছে যা বাংলা ভ্রমণসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। কবিগুরুর ‘য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র’ প্রথম গ্রন্থকারে প্রকাশিত হয়েছিল ১২৮৮ বঙ্গাব্দে। আর ‘য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি’ দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল ১২৯৮ ও ১৩০০ বঙ্গাব্দে।

ঘরকুনো বাঙালি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে পৃথিবীর সবক’টি মহাদেশে, সে প্রতিনিয়ত পাড়ি দিচ্ছে কত দেশ-মহাদেশ-অরণ্য-পর্বত-সাগর-মহাসাগর-নদী-উপত্যকা। লেখা হচ্ছে একের পর এক ভ্রমণ কাহিনী ও তা প্রকাশিত হচ্ছে, বাংলা ভ্রমণ সাহিত্য হচ্ছে সমৃদ্ধ ও সমাদৃত; আর এই প্রাণন্ত, গীতিময় ও মনোলোভা আয়োজনের প্রাতঃস্মরণীয় হলো বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের গোড়ার কথা।
কৃতজ্ঞতাঃ সমকাল

 


   



 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত