বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১৯ঃ যা কিছু নতুন

প্রথম বিশ্বকাপ ক্রিকেট হয়েছিল ১৯৭৫ সালে। আজ ৩০ মে,বৃহস্পতিবার ইংল্যান্ড এন্ড ওয়েলসে যে আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ শুরু হতে যাচ্ছে – তার সাথে সেই প্রথম বিশ্বকাপের অনেক তফাৎ, অবশ্য একটি ক্ষেত্র ছাড়া – এই ইংল্যান্ডের মাটিতেই বসেছিল প্রথম বিশ্বকাপের আসর।

প্রথম সেই বিশ্বকাপ খেলা হয়েছিল লাল বলে, খেলোয়াড়রা পরতেন সাদা পোশাক, আর তখনকার দিনে ব্যাটসম্যানরা হেলমেট পরার কথা চিন্তাই করেন নি। প্রতিটি দল ব্যাটিং করেছিল ৬০ ওভার।

টিভি নিয়ে বসা থার্ড আম্পায়ার, রিপ্লে, হক-আই, স্নিকোমিটার, স্টাম্প ক্যামেরা, ডিআরএস – এসব কিছুই ছিল না তখন।

এ যুগে ক্রিকেট খেলায় অভাবনীয় সব পরিবর্তন হয়েছে। ক্রিকেট খেলার আইন-কানুনও আগের তুলনায় অনেক বদলে গেছে, এখনও বদলাচ্ছে।

একেকটা বিশ্বকাপ আসে, আর তখন যেন অনুভব করা যায় যে ক্রিকেট খেলাটা গত চার বছরে বেশ খানিকটা বদলে গেছে। এখানে সেরকমই কিছু পরিবর্তনের কথা, যার অনেকগুলো গত কয়েক বছর ধরে হয়েছে – কিন্তু বিশ্বকাপে এসব পরিবর্তন প্রয়োগ হতে দেখা যাবে এই প্রথম।

কোন সহযোগী সদস্য দেশ নেই এবারের বিশ্বকাপে

এর আগের বিশ্বকাপগুলোর নানা আসরে বিভিন্ন সময় আইসিসির সহযোগী সদস্য দেশ খেলেছিল। ইংল্যান্ডে ১৯৭৫-এর প্রথম বিশ্বকাপে আমন্ত্রিত দেশ হিসেবে ছিল পূর্ব আফ্রিকা। ইংল্যান্ডেই দ্বিতীয় বিশ্বকাপ হয় ১৯৭৯ সালে, তাতে আইসিসি ট্রফির চ্যাম্পিয়ন আর রানার্স আপ হিসেবে সুযোগ পেয়েছিল তখনকার সহযোগী সদস্য দেশ শ্রীলংকা আর কানাডা। এরপর ১৯৮৩, ১৯৮৭ এবং ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে যায় জিম্বাবুয়ে। উপমহাদেশে ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে কেনিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং নেদারল্যান্ডস।

ইংল্যান্ডে ১৯৯৯ সালে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপে খেলেছিল বাংলাদেশ, তার দু’বছর আগে আইসিসি ট্রফি জেতার সুবাদে। প্রথমবারই বাংলাদেশ হারিয়েছিল স্কটল্যান্ড আর পাকিস্তানকে। সহযোগী সদস্য হিসেবে আরো ছিল কেনিয়া ও স্কটল্যান্ড।

দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০০৩ সালে কেনিয়া, নামিবিয়া, কানাডা আর নেদারল্যান্ডস ছিল সহযোগী সদস্য দেশ হিসেবে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজে ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে মোট ছয়টি সহযোগী সদস্য দেশ খেলেছিল : বারমুডা, আয়ারল্যান্ড, কেনিয়া, কানাডা, স্কটল্যান্ড আর নেদারল্যান্ডস। ভারত-শ্রীলংকা-বাংলাদেশে ২০১১ সালের বিশ্বকাপে কানাডা, আয়ারল্যান্ড, কেনিয়া, আর নেদারল্যান্ডস। সবশেষ অস্ট্রেলিয়ায় ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে খেলে আয়ারল্যান্ড, আফগানিস্তান, স্কটল্যান্ড আর সংযুক্ত আরব আমিরাত।

কিন্তু এটিই হচ্ছে প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপ – যেখানে কোন সহযোগী সদস্য দেশই খেলার সুযোগ পাচ্ছে না।

‘স্টেট অব দি আর্ট’ টিভি কভারেজ

আইসিসি বলছে, প্রযুক্তি ও ক্যামেরা ব্যবহারের দিক থেকে এবারের বিশ্বকাপের কাভারেজ হবে অভূতপূর্ব, ‘স্টেট-অব-দি-আর্ট’। ক্রিকেট পন্ডিতরা উচ্ছসিত। তারা বলছেন, এবারের বিশ্বকাপ হতে পারে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে চমকপ্রদ, উপভোগ্য, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ টুর্নামেন্ট।

আইসিসি বলছে, এই প্রথমবারের মতো ম্যাচের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহুর্তগুলোর রি-প্লে ও সেই সাথে বিশ্লেষণ এমনভাবে এবার টিভি দর্শকরা দেখবেন যে অভিজ্ঞতা আগে তাদের কখনো হয়নি। এই ‘৩৬০ ডিগ্রি’ রিপ্লেতে কয়েকটি ক্যামেরার ফুটেজ যোগ করা হবে।

প্রতিটি ম্যাচে মাঠে কমপক্ষে ৩২টি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে যেগুলোর আটটি থাকবে ‘আলট্রা-মোশন’ ‘হক-আই’ ক্যামেরা। স্ট্যাম্পের সামনে ও পেছনে দুদিকেই ক্যামেরা থাকবে। সেইসাথে মাঠের ওপর টাঙানো দড়িতে থাকবে চলমান ‘স্পাইডার ক্যামেরা’। আকাশে থাকবে ড্রোন চালিত ক্যামেরা যা দিয়ে ওপর থেকে পুরো স্টেডিয়াম এবং আশাপাশের ছবি দেখবেন দর্শকরা।

দেড় মাস ধরে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ১১টি মাঠে এই টুর্নামেন্ট হবে। তবে বিশ্বের প্রায় ১০০ কোটি মানুষ ৪৬ দিন ধরে বিশ্বকাপের ৪৮টি ম্যাচ দেখবে টিভিতে।

সবচেয়ে বেশি প্রাইজ মানি

বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি প্রাইজ মানি দেয়া হচ্ছে এবার – চ্যাম্পিয়ন দল পাবে চার মিলিয়ন বা ৪০ লক্ষ ডলার, আর রানার্স আপ পাবে দুই মিলিয়ন বা ২০ লাখ ডলার। হেরে যাওয়া সেমিফাইনালিস্টরা পাবে ৮ লক্ষ ডলার করে। গত বিশ্বকাপের তুলনায় এবার প্রাইজমানি বেড়েছে ৪০ শতাংশ।

২০০৩ সাল থেকে প্রায় প্রতি বারই ক্রিকেট বিশ্বকাপের প্রাইজমানি বেড়েছে। ২০০৩ সালে শিরোপাজয়ী দল পেয়েছিল ২০ লাখ ডলার। আর ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে সর্বমোট প্রাইজমানি দেয়া হচ্ছে ১৪ মিলিয়ন বা ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

এর সাথে তুলনা করুন ১৯৭৫ সালের প্রথম বিশ্বকাপের। তাতে সর্বমোট প্রাইজ মানিই দেয়া হয়েছিল মাত্র ৯ হাজার ডলার।

এবার বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা কমে গেছে
গত দুটি বিশ্বকাপে অর্থাৎ ২০১১ এবং ২০১৫ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে দলের সংথ্যা ছিল ১৪টি। এবার মাত্র ১০টি। প্রতিটি দলই একবার করে একে অপরের বিরুদ্ধে খেলবে। এর পর সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট পাওয়া চারটি দল খেলবে নকআউট পর্বে।

এটিই হচ্ছে প্রথম বিশ্বকাপ যেখানে টেস্ট মর্যাদার অধিকারী হয়েও দুটো দেশ খেলতে পারছে না – এরা হলো আয়ারল্যান্ড এবং জিম্বাবুয়ে।
১৯৮৩ সালের পর এই প্রথম জিম্বাবুয়ে কোন বিশ্বকাপ ক্রিকেটে অনুপস্থিত।

ব্যাটের আকার নিয়ে নতুন নিয়ম

ক্রিকেট খেলার ব্যাটের আকৃতিতে গত চার দশকের মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে । আজকালকার ক্রিকেটে যে ব্যাট ব্যবহৃত হয় তা আকারে আগের চাইতে অনেক মোটা – যা দিয়ে বলকে অনেক জোরে আঘাত করা যায়।

উনিশশ’ সত্তর বা আশি’র দশকেও ব্যাটের কিনারা মাত্র ১৫-১৬ মিলিমিটার চওড়া হতো; কিন্তু এ যুগে ডেভিড ওয়ার্নারের মত কোনো কোনো ক্রিকেটার তো এমন ব্যাট ব্যবহার করছিলেন – যার কিনারা মাঝ বরাবর ৫০-৫৫ মিলিমিটার পর্যন্ত চওড়া ছিল।

একে ব্যাট না বলে গদা বললেও খুব ভুল হতো না। এসব আধুনিক ব্যাটের ওজন অবশ্য পুরোনো ব্যাটের প্রায় সমান; কিন্তু নির্মাণ কৌশলের কারণে তা বলকে অনেক বেশি শক্তি দিয়ে আঘাত করতে পারে এবং চার-ছক্কা মারা অনেক সহজ হয়ে যায়।
সাবেক দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটসম্যান ব্যারি রিচার্ডস বলেছেন, আজকাল যেভাবে ব্যাটিংএর নতুন নতুন রেকর্ড হচ্ছে তার একটা কারণ এই বড় ব্যাট। অবশ্য সব ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ তার সাথে একমত নন।

এমসিসির ক্রিকেট কমিটি বলছে, ‘আধুনিক’ ব্যাটের কিনারা ৩ গুণ বা প্রায় ২২ মিলিমিটার পর্যন্ত বেশি চওড়া হচ্ছিল। ব্যাটের মাঝখানের ‘সুইট স্পট’ ও ছিল আগের চাইতে আড়াই গুণ বড়। তবে এসব ব্যাট আকারে বড় হলেও ওজন প্রায় একই, কারণ ব্যাটের পেছন দিকটা অনেক বেশি উঁচু হলেও দু’পাশ থেকে অনেকখানি কাঠ চেঁছে ফেলে খাঁজ বানিয়ে দেয়া হচ্ছে।

এখন ২০১৭ সালের অক্টোবরে নতুন নিয়মে ব্যাটের আকৃতি কী হবে – তার একটা সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। এখন ব্যাটের কিনারা সর্বোচ্চ ৪০ মিলিমিটার হতে পারবে। চওড়া হবে সর্বোচ্চ ১০৮ মিলিমিটার আর গভীরতা হবে ৬৭ মিলিমিটার।

এই নিয়ম কার্যকর হবার পর এটাই প্রথম বিশ্বকাপ। এবার ডেভিড ওয়ার্নারের মতো চওড়া-ব্যাটধারীদের নতুন নিয়মমাফিক ব্যাট নিয়েই মাঠে নামতে হবে।

রান আউটের নতুন নিয়ম

রান-আউটের ক্ষেত্রে ২০১৭-র অক্টোবর থেকে চালু হয়েছে নতুন নিয়ম। আগের নিয়ম ছিল, ব্যাটসম্যান রান পুরো করার জন্য পপিং ক্রিজের ভেতরে ব্যাট ছোঁয়ানো সত্বেও বলের আঘাতে উইকেট ভাঙার মুহুর্তে যদি ব্যাট মাটিতে লেগে না থাকে – তাহলে তিনি আউট বলে গণ্য হবেন।

কিন্তু নতুন নিয়মে বলা হচ্ছে: বলের আঘাতে উইকেট ভাঙার আগেই ব্যাটসম্যান যদি পপিং ক্রিজের ভেতরের মাটিতে ব্যাট ছোঁয়াতে পারেন তাহলে – এর পরে ব্যাট হাওয়ায় উঠে গেলেও – তিনি আর রান আউট হবেন না। এবারে এই প্রথমবারের মতো ক্রিকেট বিশ্বকাপে এই নতুন রান আউটের নিয়ম প্রযুক্ত হবে।

ক্রিকেট খেলাতেও ফুটবলের মত ‘লাল কার্ড’
মাঠে ক্রিকেটারদের খারাপ ব্যবহার ঠেকানোর জন্য ‘লাল কার্ড’ অর্থাৎ খেলোয়াড়কে মাঠ থেকে বের করে দেয়া এবং বিপক্ষকে পাঁচ রান বোনাস দেয়ার আইন হবার পর এবারই প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপ হচ্ছে।

ক্রিকেটারের সম্ভাব্য অসদাচরণকে চার স্তরে ভাগ করা করা হয়েছে।

লেভেল ওয়ান: অতিরিক্ত আপিল করা বা আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত না-মানার ভাব দেখানো। শাস্তি হচ্ছে সতর্কবাণী, আর দ্বিতীয়বার একই কাজ করলে শাস্তি হিসেবে বিপক্ষকে পাঁচ রান দেয়া হবে।

লেভেল টু: কোন খেলোয়াড়ের দিকে বল ছোঁড়া বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে গায়ে গা লাগানো। শাস্তি: বিপক্ষের জন্য পাঁচটি পেনাল্টি রান।

লেভেল থ্রি: আম্পায়ারকে ভীতি প্রদর্শন, অন্য কোন খেলোয়াড় কর্মকর্তা বা দর্শককে আক্রমণের হুমকি দেয়া। শাস্তি: বিপক্ষকে পাঁচটি পেনাল্টি রান, এবং দোষী খেলোয়াড়কে নির্দিষ্ট সংখ্যক ওভারের জন্য মাঠ থেকে বের করে দেয়া।

লেভেল ফোর: আম্পায়ারকে হুমকি বা মাঠে কোন ধরণের সহিংস আচরণ। শাস্তি: বিপক্ষকে পাঁচটি পেনাল্টি রান এবং দোষী ক্রিকেটারকে ম্যাচের বাকি সময়টুকুর জন্য মাঠ থেকে বের করে দেয়া।

ক্যাচ: হেলমেট থেকে ছিটকে যাওয়া ক্যাচ ধরলেও আউট। আগে নিয়ম ছিল, ব্যাটসম্যান বল মারার পর যদি তা উইকেটকিপার বা ফিল্ডারের হেলমেটে লাগে এবং তার পর ক্যাচ ধরা হয় – তা হলে ব্যাটসম্যান আউট হতেন না; কিন্তু গত বিশ্বকাপ আর এবারের বিশ্বকাপের মাঝখানে এ নিয়ম বদলে গেছে। তাই এখন ফিল্ডার এমন কোন ক্যাচ ধরলে ব্যাটসম্যান আউট বলে বিবেচিত হবেন।

শুধু তাই নয় – ফিল্ডিং সাইডের কারো হেলমেটে বল লাগার পর সেই বল ধরে নিয়ে যদি ব্যাটসম্যানকে স্টাম্পড বা রানআউট করা হয় – তাহলে তা-ও আউট বলে বিবেচিত হবে।

ইদানীং ক্রিকেটের নতুন যে আইনগুলো প্রণীত হচ্ছে – তা এমন এক ভাষায় লেখা হচ্ছে যাতে তা দিয়ে পুরুষ ও নারী ক্রিকেটার উভয়কেই বোঝানো যায়।

ক্রিকেটের আইনের ইংরেজি ভাষ্যে ‘হি’ বা ‘হিজ’ এর মত পুরুষবাচক সর্বনাম আর থাকছে না – তার পরিবর্তে লেখা হচ্ছে ‘ফিল্ডার’, ‘বোলার’ ‘ব্যাটসম্যান’ বা ‘প্লেয়ার’। তাছাড়া এবারের বিশ্বকাপকে আইসিসির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে বর্ণনা করা হচ্ছে আইসিসি মেন’স ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ বলে। এটাও একটা বড় পরিবর্তন বৈকি।

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত