| 27 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

বাস্তু

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট

ত নি মা হা জ রা

করিডোরে সুটকেস নামিয়ে দেখলাম গ্রীলের গায়ে ঝুল ঝুলে আছে। তালার গায়ে ধূলো। চাবিটা লাগিয়ে চাপ দিতে হল একটু জোরেই। এতদিন বন্ধ থাকায় জং লেগেছে। দরজা খোলার পরে গোটা পাঁচের মাকড়সা রাগী চোখে জিজ্ঞাসা করলো, এ্যাই তুই কে রে? খুব বিনীত গলায় বল্লাম, আজ্ঞে স্যার, মানে আমি এককালে এখানে থাকতাম। এটা তো আমার বাড়ি মানে বাড়ির রেজিষ্ট্রেশন, মিউটেশন সব কিছুতেই আমার নাম লেখা আছে। যাচাই করে দেখতে পারেন। মিথ্যে বলছি না।

সবচেয়ে বড় চোদ্দপেয়েটা বল্লো, রাখ তোর মিউটেশন। দেখছিস না আমরা এখন এখানে থাকি। যখন খুশি তালা মেরে বিদেশে পালাবি আবার ইচ্ছে হলে এসে হাজির হবি তালা খুলে। গাছেরও খাবি, তলারও কুড়োবি। ইয়ার্কি নাকি?

তা তোর নামটা কি রে? আমতা আমতা করে নিজের নাম বলি।
অনেকক্ষণ পরে চিন্তা ভাবনা করে তিনি বলেন, অ, আমার তেতাল্লিশ পুরুষ আগের প্রপ্রপ্রপ্র…….পিতামহ একটা ডায়েরির পাতায় তোর নাম লিখেছে বটে। কিন্তু তুই ই যে সেই তুই সেটা প্রমাণ করবি কি করে বল তো।। তুই তো দেশ থেকে উচ্ছেদ হয়ে কবেই চলে গেছিস। সরকারী খাতায় তুই তো এখন উদ্বাস্তু রে।
উপায় না দেখে এগিয়ে গিয়ে করুণ মুখে দেওয়ালে ঝুলন্ত গৃহকর্তার ছবির দিকে চাইলাম। ঝুল আর ধুলো মেখে তাকেও স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে না। তিনি বল্লেন, আমিও এখন এই মাকড়সা সাম্রাজ্যের একজন। এরা আমার দেখাশোনা করে তাই আমি এখন এদেরই বেশি কাছের। তুমি বা তোমরা তো আমাকে ফেলে রেখে গেছ এখানেই।

মাকড়সার জাল সরিয়ে এগোতে থাকি। আমার ঘর, আমার খাট বিছানা, আমার আসবাব, সব বিবর্ণ, ধূসরিত।
ভিটে মানে কি? দেশ মানে কি?
নিত্যকার বসবাসের স্থান। তাই তো?
কিন্তু পেটের টানে, আত্মজ সম্পর্কের টানে যদি বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়ে যেতে হয় তাহলে কি পায়ের তলার মাটি এভাবে হারিয়ে যাবে, আর যেখানে আছি তাও কি আমার দেশ নয়?
আবার যদি পুরোনো আশ্রয়ে ফিরে আসি, সে কি আমাকে বিদেশি ভাববে?
এভাবে গন্ডী দিয়ে কি মানুষকে খাঁচায় পোরা যায়?
আমার চারপাশের মাকড়সার জাল গুলোকে আমার সীমান্তের কাঁটাতার মনে হলো। আর তার মাঝে বসে থাকা মাকড়সার দলকে ধূর্ত পাহারাদার। খুব অচেনা লাগতে লাগলো আমার রান্নাঘরের সারি সারি কৌটো, বাসনপত্র আর সামগ্রীদের। বেডরুমের খাট আলমারি, র‍্যাক, দেওয়ালের পেন্টিং সব যেন আমার কাছে প্রমাণ পত্র চাইছে।
আমার গমন আগমনের, বাসজনিত সিদ্ধান্তের ওপরে এমন পাহারাদারি কি আমার ব্যাক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী নয়? 

আয়নায় আমার ঠোঁটের পাশের কালো তিলটা বলে উঠলো, মিলে যাচ্ছে কিছু কিছু, তবে যে তুই গিয়েছিলি সেই ফিরে এলি তো?
আমি আয়রণ চেষ্ট খুঁজে আঁতিপাঁতি করে নিজের পরিচয় পত্র গুলো খুঁজে বার করার চেষ্টা করছি।। দেওয়ালের ছবিগুলো নির্বাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ আমার পক্ষে চাইলেও একটি রা ও কাড়ছে না।
এই জীবিত আমিটার ভূমিহীন হওয়া রুখতে এই মৃত মানুষগুলোর ঠিকুজি কুলুজি সাক্ষ্য জরুরী কিন্তু ওরা কথা বলবে কি করে?
এই আমি কি ওদের ভুলে গেছিলাম, ওদের ফেলে রেখে পেটের টানে, প্রয়োজনের টানে মাটি ছেড়ে চলে গেছিলাম, কিন্তু আমি তো এই কয়েকবছরে কদাচিৎ এমন দিন যায়নি যে ওদের কথা মনে ভাবিনি, ছেড়ে গেলেই কি ছেড়ে যাওয়া হয়?

সেই আমাকেই এখন নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত রাখতে নিজেরই মাটি খুঁড়ে শিকড় বার করে আমার বৃক্ষগোত্র প্রমাণ করে দেখাতে হবে।

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত