| 22 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত কবিতা

বিশ্ব কবিতা দিবসে বিশ কবির অনুবাদ কবিতা

আনুমানিক পঠনকাল: 11 মিনিট

আজ ‘বিশ্ব কবিতা দিবস’। বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কবি ও কবিতা পাঠকদের দিন আজ। ১৯৯৯ সালে ২১ মার্চকে ইউনেস্কো বিশ্ব কবিতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।

দিবস পালনের উদ্দেশ্য হল বিশ্বব্যাপী কবিতা পাঠ, রচনা, প্রকাশনা ও শিক্ষাকে উৎসাহিত করা।

ইউনেস্কোর অধিবেশনে এই দিবস ঘোষণা করার সময় বলা হয়েছিল, ‘এই দিবস বিভিন্ন জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কবিতা আন্দোলনগুলোকে নতুন করে স্বীকৃতি ও গতি দান করবে।’

আগে অক্টোবর মাসে বিশ্ব কবিতা দিবস পালন করা হতো। প্রথম দিকে কখনও কখনও ৫ অক্টোবর এই উৎসব পালিত হলেও বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে রোমান মহাকাব্য রচয়িতা ও সম্রাট অগস্টাসের রাজকবি ভার্জিলের জন্মদিন স্মরণে ১৫ অক্টোবর এই দিবস পালনের প্রথা শুরু হয়।

এখনও অনেক দেশে অক্টোবর মাসে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কবিতা দিবস পালন করা হয়। এই দিবসের বিকল্প হিসেবে অক্টোবর অথবা নভেম্বর মাসের কোনো এক দিন কবিতা দিবস পালনেরও প্রথা আছে।  ইরাবতীর পাঠকদের জন্য থাকছে বিশজন কবির বিশটি অনুবাদ কবিতা।


 

মধুর অনুযোগের সনেট

ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা

অনুবাদ নাজনীন খলিল

 

আমাকে কখনো হারাতে দিওনা এই বিস্ময়
তোমার স্ট্যাচুর মতো চোখের, অথবা এই স্বরসঙ্ঘাত
তোমার নিঃশাসের স্বতন্ত্র গোলাপ
যা রাত্রে স্থাপিত হয় আমার কপোলে।

আমি তটস্থ থাকি, এই সৈকতে
এই শাখাহীন গুঁড়ি, যা আমার তীব্র অনুতাপ
পুষ্পহীনতা, শাঁস অথবা মৃত্তিকা
আমার উদ্যমহীনতার জীবাণুর জন্য।

তুমি যদি হও আমার গুপ্তধন
তুমি যদি হও আমার দুর্দশা, আমার বিষণ্ন যন্ত্রণা
যদি আমি হই সারমেয়, তুমি একাকী আমার প্রভু।

কখনো হারাতে দিওনা যা পেয়েছি আমি ,
এবং সাজিয়ে দেবো তোমার নদীর শাখা
আমার বিচ্ছিন্ন শরতের পত্র-পল্লবে।

 

 

 

মেঘাচ্ছন্ন আকাশ
উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ
অনুবাদ। ইন্দ্রানী সরকার

নিবিড় ঘন মেঘে ঢাকা তমসাবৃত
আকাশ শুভ্র চাঁদের আলোয় ভরা।
অস্পষ্ট সঙ্কুচিত গোলাকার চাঁদ মৃদু
আলো ছড়ায় যা পাথর, গাছপালা আর
মিনারের নকশা মাটিতে এঁকে দেয়।

সুদূরে চিন্তারত একাকী পথিক সুমধুর
চাঁদের আলোয় সচকিত হয়ে অবনত
মুখ তুলে উপরে তাকিয়ে দেখে মেঘ
সরে গেছে আর মেঘের ফাঁক দিয়ে
ফুটে ওঠে সুষ্পষ্ট চাঁদ আর স্বর্গের দীপ্তি।

নীলাভ আঁধারে বাঁকা চাঁদ ভেসে যায়,
কত শত ক্ষুদ্র অথচ স্পষ্ট অগুন্তি নক্ষত্র
সুগভীর নীহারিকায় চাঁদের পথসঙ্গী হয়,
কত দ্রুত তারা বৃত্তাকারে ঘুরে যায় কিন্তু
অদৃশ্য হয় না, গাছে গাছে ঝরো বাতাস
বয়ে যায় কিন্তু তারা পথভ্রষ্ট না হয়ে বহু
যোজন দূরে থেকেও; মেঘেদের সারি সারি
তোরণ অপরিমিত গভীরতায় গাড় হতে থাকে।

দূরে মন আর দৃষ্টি ক্রমশঃ শান্ত হতে থাকে,
চারিদিকের সুন্দর আর পবিত্র পরিবেশে মন
হয়ে যায় অচঞ্চল, ধ্যানমগ্ন।

 

 

মৃত্যু তোমাকে
মূল কবিতা : আনা আখমাতোভা
অনুবাদ : রিয়া চক্রবর্তী

একসময় না একসময় তুমি
গ্রহণ করবে আমায় –
এখনি নয় কেন?

তোমারই প্রতিক্ষায় আছি –
সহ্যের সব বাঁধ ভেঙেছে,
অন্ধকারে, দরজা খুলে রেখেছি।
সাথে এনো যন্ত্রণা উপশমের
আশ্চর্য কোনো যাদুকরী মলম।
যদি কোন মন ভোলানো ছদ্মবেশ ধরতে হয়,
তবে ছদ্মবেশেই এসো।
দস্যুর মতো বুকে বিঁধে দিতে চাও বিষাক্ত তীর,
যদি মারণব্যাধির জীবাণু রূপ নিতে চাও,
সে ভাবেই এসো।

না হয় এসো একটা বিভৎস গল্পের মতো
যার সমাপ্তি সবার জানা।
নীল টুপি পরা পুলিশের মাঝখানে
গৃহস্বামীর বিবর্ণ মুখ।
এইসব আমার সহ্যের মধ্যে।
ফুলে ওঠে এস্নেই নদীর জল,
আকাশে প্রজ্জ্বলিত ধ্রুবতারা,
প্রিয়জনের নীল চোখের আলোয়
মুছে দেয় আতঙ্ক আর ভয়।

 

 

মিলো, আমি বলি

ম্যানোলিস অ্যানাগ্নোসটাকিস

অনুবাদ-গৌরাঙ্গ হালদার

 

আমি খালি পায়ে হাঁটা মা’দের কথা বলি
যে আগুনে গিলে খাওয়া শহরের
ধ্বংসস্তুপের মাঝে থেমে থেমে চলছে,
রাস্তায় রাস্তায় মৃতদেহের স্তুপ আর
কূটনামি করা কবিদের কথা বলি
যারা রাতের বেলায়
তাদের দোরগোড়ায় বসে ভয়ে কাঁপে।

আমি শেষহীন রাতগুলোর কথা বলি
যখন আলো নিভে গেল
এলো দিন
অতিবোঝাই ট্রাকগুলো এবং
ভেজা পথে পা ফেলা’র কথা বলি।

আমি জেলখানার আঙ্গিনার কথা বলি
কথা বলি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের অশ্রুর
আর সর্বোপরি বলি
জেলেদের কথা
যারা তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে
তাদের জাল পরিত্যাগ করেছে
এবং যখন সে কাপুরুষ প্রমাণিত হলো
তারা ক্ষান্ত হলো না
সে যখন তাদের সাথে বেঈমানি করলো
তারা কখনোই ঘোষণা করলো না
আর সে যখন মহিমান্বিত হয়েছিল
তারা তাদের চোখ সরিয়ে নিয়েছে অন্যদিকে
তারা থুতু ছিটালো তাদের মুখে
তারা তাদেরকে ক্রুশে চড়ালো
কিন্তু তারা সবসময় ছিল শান্ত
অবগুণ্ঠিত হয়ে বা নুয়ে পড়ে
শিরদাঁড়া সোজা রেখে ও একা হয়ে
জনতার ভয়াবহ নিঃসঙ্গতার মাঝে
কোনো দূরদৃষ্টি ছাড়াই
তারা একটি শেষহীন রাস্তা নিলো।

 

 

 

ছবি

সাজ্জাদ জহীর

অনুবাদ: সফিকুন্নবী সামাদী

 

এক রঙে বাস করে হাজারো রঙ
হালকা, গাঢ়, মধ্যম, স্বচ্ছ
আলোকোজ্জ্বল, চকমকে, ঝলমলে
সুরমাই রেশমী নেকাব-ঢাকা
মিশেল দেয়া
রৌদ্রছায়ার কানামাছি খেলা
অনন্য চিত্র হয়ে ওঠে উড়তে থাকা
অথবা এতটা গম্ভীর
যেন কোনো জাহাজের নোঙর
যার ওপর দিয়ে ঢেউ বয়ে যায়
বেদনায় অশান্ত ঝড়ের মত
আর তারপরও
যার ওপর ছেয়ে থাকে
শান্তির ছায়া
কিন্তু তার তলদেশে
পাহাড়ী ঝর্ণার গতি, চঞ্চলতা
অনুসন্ধানের জ্বলন্ত শিখা
আকাঙ্ক্ষার উন্মত্ত সুগন্ধ
থাকে লুকিয়ে
আর যখন অনেক রঙ
তাদের অগণন তরঙ্গ
নানান রকম ছোট বড়
প্রকাশ্য গোপন তরঙ্গ
মুখোমুখি হয়, ধাক্কা খায় একে অপরের সাথে
তখন নতুন বিস্ময়কর ছায়াকৃতি
অসমাপ্ত, পূর্ণ উথলানো বৃত্ত
কল্পিত রেখা
লা-জবাব চেহারা
আর এমন শরীর যা অন্য কোনো কিছুর মত নয়
কিন্তু যে স্বয়ং নিজের স্বতন্ত্র অনুপম অস্তিত্বে
নববধূর মত
নবজাতক শিশুর মত
ভালো লাগে
ঢুকে যায় অস্তিত্বে
টিমটিমে ছোপের এই শিখা
মানবীয় আঙুল,মনন ও আত্মার এই কারিশমা
ভাষার এই অলঙ্কৃত বিস্ফোরণ
জীবনের গায়ে লাগিয়ে দেয় পাখনা
তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায় এমন উঁচুতে
যেখান থেকে এই পৃথিবী
আর তার বাসিন্দাদের
আমরা এমনভাবে দেখি
যেমন করে দেখেছিল তাকে মার্শাল টিটো
আর তার সমস্ত গুণ
সকল সৌন্দর্য
তার সব সুগন্ধ
আনন্দিত অলঙ্করণের প্রতিবিম্ব
পতিত হয় আমাদের আত্মার ওপরও
আমরা বদলে যাই
এমনই এক চিত্র
তুমি জানো না
কোন কোন আসমানী রঙে আঁকা
না জানি অপ্সরাদের কেমন ঐন্দ্রজালিক মুদ্রায় পূর্ণ
স্বর্গের কোন মধুর রাগে বাঁধা
আর চুপি চুপি
মনের উষ্ণ তপ্ত আঙিনায় দেয় রেখে
সহসা জেগে ওঠে হাজারো বসন্ত
বর্ষিত হতে থাকে গোলাপি পাপড়ি
সুগন্ধিত হওয়া থেকে
গড়িয়ে পড়ে মৃদু মৃদু শীতল কোমলতা
আর জীবনের শূন্য সিঁথি
ভরে ওঠে সিঁদুরে!

 

 

অবশেষে

সর্বেশ্বরদয়াল সাক্সেনা

অনুবাদ : স্বপন নাগ

 

কিছু আর বলতে চাই না,
যদি কোথাও থাকে
একটি সত্য সুন্দর শব্দ
আমি তা-ই শুনতে চাই।

নতুবা
এর আগে
আমার বলা যত কথা
যত মন্থন
যত অভিব্যক্তি
শূন্য হতে আবার ফিরে আসুক,
সেই অনন্ত স্তব্ধতায় আমি ডুবে যেতে চাই
যা কেবলই মৃত্যু।

‘মৃত্যুর আগে সে
কিছু বলতে চেয়েছিল
যা কেউই শোনেনি’
তা বলার চেয়েও
অনেক বেশি গৌরবের
‘কিছু না বলেই সে চলে গেল।’

 

 

 

একটি কালো শিশুর পরিচয়

মাইকেল উইন

ভাষান্তর: মনজুরুল ইসলাম

 

আমি অনন্য,
উপহাস আমায় তাড়িত করতে পারে না।
আমি শক্তিমান,
প্রতিবন্ধকতা আমায় রুদ্ধ করতে পারে না।

আমার মস্তক আমি ঊর্ধ্বে তুলে ধরি,
অতীব গর্বভরে দাবী করি আমি আমার স্বকীয়তা।

আমি ধারণ করি আমার উতুঙ্গ গতিকে,
প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এগিয়ে যাই সামনের দিকে।

উত্তরাধীকারীদের নিয়ে গর্বিত আমি,
আর এতটাই বিশ্বস্ত যে,
আমি অর্জন করতে সক্ষম হবো আমার প্রতিটি লক্ষ্যকে।

যা করবার সামর্থ্য আমার মাঝে অন্তরিত,
তার সবটাই করতে সক্ষম হবো আমি।

আমি কালো রঙের একটি শিশু,
সৃষ্টিকর্তার মহান এক সৃষ্টি।

 

 

মন্তর

এডিথ স্যোডেরগ্রান

ভাষান্তর: সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

 

কীভাবে গভীরতম হৃদয়ের থেকে আমি বলব তোমাদের?
দেবতারা কী করে তাদের শব্দগুলিকে সাজায়, তাল্কা, আর তবু অপ্রতিহত?
কী প্রকারে বললে পরে মানবিক দুর্বলতা করবে না মাজুল শব্দদের?
এবং আমার ইচ্ছা তোমাদের পাকড়ে ধরে যেন সাঁড়াশিতে
ব্যথা, ভীতি, বা প্রেমের মতো ….
আমার ইচ্ছার কাছে তোমাদের হীনবল ক’রে ফেলতে চাই।
আমি চাই ছিঁড়ে-ছিঁড়ে ছুঁড়ে ফ্যালো তোমাদের হৃৎপিণ্ডগুলিকে,
শয়তানের অধিষ্ঠান হোক তোমাদের হাতে-পায়ে
বুনো ও অমানুষিক, আজীবন বিস্ফোরণময়।
পিশাচেরা,
কী – যে চাই তোমাদের চোখে রাখতে চোখ,
আমার চানুনিতে চাই আমার পুরেপাটা ভ’রে দিতে।
পিশাচেরা, আকাক্সিক্ষত: আমার ক্ষমতাবলে আমি বশ করব তোমাদের?
সেনালি চুলের টোপ তোমাদের সামনে ছুঁড়ে মারি দয়াহীন,
ফিনকি দিয়ে ছুটে যায় আমার রক্তের মোটা ধারা।
তোমরা কি আমার কাছে আসবে, ওগো পাতালের রক্তচোষারা?

 

 

 

বীণা এবং মৃদঙ্গ

অক্তাবিও পাস
অনুবাদ: শুক্তি রায়

(কারমেন ফিগেরোয়া দে মেইয়ের-এর উদ্দেশ্যে)

বৃষ্টি পড়েছিল।
সময় যেন এক প্রকাণ্ড চোখ।
তার মধ্যে আমরা আসা যাওয়া করি প্রতিবিম্বের মতো
সঙ্গীতের নদী বয়ে যায় আমার রক্তের মধ্যে।
আমি যদি বলি ‘শরীর’ সে উত্তর দেয় ‘হাওয়া’
আমি যদি বলি ‘পৃথিবী’ সে উত্তর দেয় ‘কোথায়?’

ধরিত্রীর জোড়া ফুল উন্মীলিত হয়
এখানে আসার দুঃখ
আর এখানে থাকার আনন্দ।

নিজের কেন্দ্রবিন্দুর মধ্যেই হারিয়ে গিয়ে পথ চলতে থাকি আমি।

 

 

 

খেয়াল

লুইস গ্লুক

অনুবাদ: বিপাশা বিনতে হক 

 

একটা কথা বলি: প্রতিদিন
মানুষ মারা যাচ্ছে। আর সেটা সবে শুরু।
প্রতিদিন, সন্তাপগৃহে, নতুন বিধবার জন্ম হচ্ছে,
নতুন অনাথের সাথে। ওরা হাত ভাঁজ করে বসে থাকে,
নতুন জীবনটাকে বুঝে নেবার চেষ্টা করে।

তারপর ওরা গোরস্তানে যায়, সেখানে অনেকের
ওটা প্রথমবারের মতো যাওয়া। ওরা কাঁদতে ভয় পায়,
কখনোবা না কাঁদাতে। কেউ একজন ঝুঁকে পড়ে
ওদের বলে দেয় এরপর কি কর্তব্য। হতে পারে সেটা
একটা সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেয়া, ক্ষেত্র বিশেষে খোলা কবরে একমুঠো মাটি ছুঁড়ে দেয়া।

তারপর ওরা সন্তাপগৃহে ফিরে যায়।
হঠাৎ করে দর্শনার্থীতে ফুলে ফেঁপে ওঠে ঘর।
বিধবা ভদ্রমহিলা সোফায় আসন গ্রহণ করেন; একদম রাজকীয় কায়দায়,
আর দর্শনার্থীরা সারিবদ্ধভাবে তার দিকে এগোতে থাকে,
কেউ তার হাত স্পর্শ করে, কেউ তাকে আলিঙ্গন করে,
সকলের জন্য তার কিছু না কিছু বলার থাকে;
তিনি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন, তাকে দেখতে আসার জন্য শুকরিয়া আদায় করেন।

মনে মনে তিনি চান সবাই চলে যাক।
তিনি ফিরে যেতে চান কবরস্থানে;
ফিরে যেতে চান হাসপাতালে, যে ঘরে তার সেবা শুশ্রুষা হতো, সে ঘরে।
তিনি ভালোই জানেন, এসব সম্ভব না। কিন্তু এটাই যে তার একমাত্র আশা,
আশা এই যে আবার যদি পুরোনো সময়ে ফিরে যাওয়া যায়। খুব বেশি পিছনে না,
বিবাহ পর্যন্ত দূরে না, প্রথম চুম্বনের মতো দূরেও না।

 


আরো পড়ুন: স্প্যানিশ কবিতা


 

দোতলার ঝুলবারান্দায়

আত্মানাম

অনুবাদ: জ্যোতির্ময় নন্দী

 

দোতলার ঝুলবারান্দায়
একমাত্র জানলাটার পাশে
আমি নিজের সঙ্গে বসে খাচ্ছিলাম…
এমন সময় ডেকে উঠলো
কাছের নিমগাছের ডালে বসা একটা কাক।

ওটা আমার
পূর্বপুরুষ নাকি দেবতা–
ভাবতে ভাবতে আমি ছুঁড়ে দিলাম
একমুঠো ভাত…

ভাত ভাতই থেকে গেলো
আর কাকটা গেলো উড়ে পালিয়ে।

কার পূর্বপুরুষ ছিলো ওটা
সেটা আমার আর জানা হলো না।

 

 

অবৈধতায় আটক ছায়া

সর হুয়ানা ইনেস দে লা ক্রুস

অনুবাদ: জয়া চৌধুরী

 

অবৈধতায় আটক, আমার দারুণ অসরল ছায়াটি,
মোহিনীরূপের ভাবছায়া যাকে আমি বড্ড ভালবাসি,
এক রমণীয় ভ্রম যার জন্য আমি সুখে মরে যাই,
মধুর সংঘর্ষ তার জন্য তুচ্ছ এ জীবন বাঁচি।

যদি তোমার করুণার আকর্ষণীয়, চুম্বক টান,
আমার ইস্পাতের মত বাধ্য বুক তোমারই সেবায় নিরত থাকে,
কিসের জন্য তুমি ভালবাসো চাটুকার
পরে যদি উপহাসই করতে হয় আমায় হে দ্রুত অপসৃয়মান?

আরো গুণকীর্তন করতে তুমি পারো না, আমি তৃপ্ত,
তোমার স্বৈরাচার থেকে আমি জয়ী হয়ে যাই বলে-
যদিও তোমার চওড়া ফাঁস কে উপহাস করা এখনো রহিত রেখেছ তুমি

যে তোমার সুন্দর গড়নকে লেপটে জড়িয়ে রাখে,
আমার ফ্যান্টাসি যদি তোমার মধ্যে গরাদ খোদাই করে দেয়
হাতদুটো কিংবা বুককে নিয়ে রসিকতা করলে কিঞ্চিৎই যায় আসে।

 

 

 

হে প্রভু দয়াময়
কাদিয়া মলদাওস্কি

অনুবাদ:মহসিন রাহুল

 

হে প্রভু দয়াময়,
বেছে নাও অন্য লোকদের,
অন্যদের করো নির্বাচন,
আমরা মৃত্যুতে আর মুমূর্ষুতায় ক্লান্ত।
আমাদের আর কোনো প্রার্থনা নাই।
বেছে নাও অন্য জনতাকে,
অন্যদের করো নির্বাচন।
আমাদের উৎসর্গ করবার মত রক্ত আর বাকি নাই।
আমাদের বাড়িঘর মরুভূমি হয়ে গেছে।
জমিন আর বাকি নাই যেখানে কবর দেয়া যায়।
কোনো অবশিষ্ট মাতম,
কোনো মর্সিয়া-গীতি
আমাদের জন্য আর নাই ধর্মগ্রন্থে।

প্রভু দয়াময়,
আশীর্বাদ করো অন্য কোন দেশকে,
অন্য পাহাড়কে।
আমরা আমাদের সব মাঠকে, প্রতিটা পাথরকে
ঢেকেছি ভষ্ম দিয়ে, পবিত্র ভষ্মে। ঢেকে দিয়েছি বৃদ্ধদের, তরুণদের,
আর নাবালকদের মরদেহ দিয়ে।
তোমার দশ মহাবিধানের প্রতিটা অক্ষরের
মূল্য আমাদের চুকাতে হয়েছে।

প্রভু দয়াময়,
তোমার অগ্নিচোখের ভ্রুখানি উঁচাও,
দেখো সারা দুনিয়ার কত মানুষ, —-
তাদেরকে দিয়ে দাও তোমার দৈববাণীগুলি, প্রার্থনা ও পাপমুক্তির সব দিবস।
সব জাতির ভাষায়ই তোমার নামের জপ, —-
তাদেরকে বলো অলৌকিক মাজেজার কথা,
পাপের প্রলোভনের কথা।

হে প্রভু দয়াময়,
আমাদেরকে দাও সরল পোষাক, যা পরে
মেষপালকেরা সাথে নিয়ে মেষপাল,
হাতুড়ি হাতে কামারেরা,
ধোপারা , বা চামার,
বা হীন তারও চেয়ে।
এবং করো আরেকটা দয়া :

ওগো রাহমান ,
অলৌকিক প্রতিভার ভার তুমি না করিও দান।

 

 

 

আমার ফটোগ্রাফ

মার্গারেট এটউড

ভাষান্তর: মাজুল হাসান

 

কিছুক্ষণ আগে তোলা হয়েছে এটা
দেখে, প্রথমেই মনে হবে
কোনো তৈলচিত্র:
কলঙ্কের মতো অস্পষ্ট রেখা. আর ধূসর ডোরা কাটা দাগ
যেন লেপটে গেছে কাগজে।
এরপর যখন তুমি রেকি করবে
বা-দিকের কোণায়
গাছের ডালের মতো দেখতে পাবে
(সুগন্ধি গুল্ম অথবা পাইনের) বাড়ন্ত শাখা,
ডান দিকে, আধাআধি উচ্চতায়
একটা হালকা ঢাল, আর দেখবে
একটি ছোট্ট বাড়ির কঙ্কাল।
ব্যাকগ্রাউন্ডে একখানা লেক
তারও ওপারে নিচু টিলা কতক।
(আমি তলিয়ে যাবার এক দিন আগে
তোলা হয়েছিল ছবিটা
ছবির মধ্যভাগের লেক, আমি থাকি
জল-পৃষ্ঠদেশের গভীরে
কিন্তু জলপৃষ্ঠে সূর্য কিরণ আছড়ে পড়ায়
জলের ঠিক কোন জায়গাটায় আমার বাস
অথবা আমি কতটুকু বড় অথবা ছোট
তা বলা বেশ শক্ত
তারপরও দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকলে
অবশেষে
আমাকেই দেখতে পাবে তুমি। 

 

 

 

কবি

হানা ফ্রান্সিসকা

অনুবাদ:মাজহার জীবন

এক কবি কবিতা লিখতে চাইল পাহাড় নিয়ে
কিন্তু পাহাড়ে সুন্দর কিছু নেই
এরপর সে বৃষ্টির দিকে চোখ ফেরালো
কিন্তু বৃষ্টিকে সহজেই ভূলে যাওয়া যায়
তাই সে ভবিষ্যতের কবিতায়
এসব বিষয় বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
পলকা বুদ্ধির স্পন্দিত প্রগাঢ় আবেগে
স্মরণ করলো কাব্য দেবতাকে:
“বিশ্বজগত, আকাশ ও সমুদ্র থেকে
শব্দমালা আর কবিতা পাঠাও, হে কাব্য দেবতা।”
কিন্তু এসব দিয়ে কবিতা লেখা অতি সহজ।
তাই সে এবার গেল এক কফিসপে।
পার্টির মার্কা দেখল
প্রেসিডেন্টের ছবি দেখল
আর প্রথম পাতায় দেখল-
পুলিশ নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে।
“ভাইসব, দয়া করে আপনারা এখানে কবিতা আওড়াবেন না।
এ কারণে অন্তত আমার পাঁচজন খরিদ্দার আসেনি আজ। ”
কফিশপ মালিকের এ আচরণ তাকে অস্বস্থিতে ফেলে।
আজ দোকানীকে বন্ধুবাৎসল মনে হচ্ছে,
আজাইরা কবির নাম দ্বিতীয় পাতায় প্রকাশিত হয়নি।
আকাশ শান্ত। ব্রম্মাণ্ডকে বিশাল দেখাচ্ছে,
আর সর্বত্র দৃশ্যমান আকাশ।
পঞ্চম পাতার কোণায়:
দুর্যোগ, দু’জন দরিদ্র মানুষের ছবি,
আজাইরা মন্ত্রীগণ
ধর্মীয় কলাম,
জাতীয় বীরের বিধবা স্ত্রীকে ধর্ষণের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের খবর।
তার নজরে আসে-
৮০০ সাংসদের হাসোজ্জ্বল ছবি
যারা প্লেনের সামনে দাঁড়িয়ে পোজ দিচ্ছে
তারা ইউরোপ সফরে যাবে।
এসব দেখে সে অসহায় বোধ করে;
ভাবলো – এবার তবে ভালবাসার কবিতা লিখি।
সুখী কবি এখন এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর কথা ভাবে
যে অনেক দুরে এক শহরে থাকে।
তাকে এক বার্তা লেখে:
“তুমি যদি আজও আমার প্রতি বিশ্বস্থ থাকো
বৃষ্টি নামলে পর পাহাড়ে যেও ।
প্রেমের কবিতা লেখার এ এক মোক্ষম উপায়”।
সে এক বোতল বিয়ার নিতে ভোলে না।
কফিসপ থেকে বের হয়, বিদায় জানায়
এভাবে জীবন চলতে চলতে
সে জড়িয়ে পড়ে আকণ্ঠ ঋণে ।
সকালে নেশাগ্রস্থ হওয়া কবির জন্য দোষের কিছু নয়।
কবি জানালা খোলে, সিটি নিউজ পড়ে।
আর তার কাজের মাঝে কবিতা এসে হাজির হয়-
রাস্তা থেকে
দারিদ্র থেকে
দুষিত বায়ু থেকে।

 

 

 

সমুদ্র

হোর্হে লুইস বোর্হেস

অনুবাদ: মুম রহমান

 

আমাদের মনুষ্য স্বপ্নেরও আগে (অথবা শঙ্কায়) উদ্ভাবিত হয়েছিলো
পুরাণ, সৃষ্টিতত্ত্ব আর প্রেমের,
সময় তার সবকিছুকে দিনের হিসাবে আনার আগেই,
সমুদ্র, সদাই সমুদ্র, অস্তিত্তময়: ছিলো।
সমুদ্র কে? কে সেই প্রচ- প্রাণ,
প্রচ- আর প্রাচীন, যে চিবিয়ে খেয়েছে ভিত্তি
এই মাটি পৃথিবীর? সে একই সঙ্গে এক এবং অনেক সাগর;
সে পাতাল আর দ্যুতি, দৈব আর হাওয়া।

যে তাকায় সমুদ্রের দিকে, দেখে প্রথমবার,
প্রতিবার, পরিশোধিত বিস্ময় নিয়ে
অবিমিশ্র বস্তু থেকে- সুন্দর
সন্ধ্যা থেকে, চাঁদ, বহ্নুৎসবের উড়াল।
সমুদ্র কে আর আমিই বা কে? যে দিন
অনুসরণ করতে থাকে আমার মর্মবেদনা সে হয়তো বলবে।

 

 

 

মোকাবেলা

ইউসেফ কমুনিয়াকা

অনুকাদ: বিপাশা চক্রবর্তী

 

আমার কালো মুখ ঝাপসা হয়ে আসে
কালো গ্রানাইট পাথরের ভেতর লুকায়
আমি বলেছিলাম,না আমি লুকাব না
আরে শালা! আর কান্না নয়
আমি শিলাখন্ড, আমি মাংস পিন্ড
আমার মেঘে ঢাকা প্রতিবিম্ব শিকারী পাখির মতো আমাকে দেখছে ।
রাত্রির মুখ যেন হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছে সকালের শরীরে।
আমি ঘুরে দাঁড়াই এদিকে-
শিলাখন্ড আমাকে যেতে দেয়
আমি ঘুরে দাঁড়াই ওদিকে
আমি আবার ভেতরে এসে পড়ি
ভিয়েতনাম ভেটরেন মেমোরিয়ালে
আলোতে ভর করে ভিন্নতা সৃষ্টিতে
আটান্ন হাজার বাইশটা নাম পার হয়ে যাই
কিছুটা ভেবে খুঁজি
ধোঁয়ার অক্ষরে আমার নিজের নাম
আমি স্পর্শ করে দেখি নামটি এন্ড্রু জনসন
আমি দেখি যুদ্ধের বোকা ফাঁদ, শাদা আলোর ঝলকানি
নামগুলো কাঁপে এক নারীর ঢিলা বহির্বাসে
কিন্তু সেই নারী যখন হেঁটে চলে যায়
নামগুলো থেকে যায় দেয়ালে ।
তুলির আঁচড় চলে। লাল পাখির ডানা আমার জলন্ত দৃষ্টি ঘোলা করে দেয়।
আকাশ। আকাশে এক বিমান।
যুদ্ধফেরত এক শ্বেতাঙ্গের মুখ ভেসে যায়
ভেসে আসে আমার খুব কাছে ,
তারপর তার ম্লান চোখ
আমার চোখ দিয়ে দেখে।
আমি এক জানালা।
সে হারিয়েছে তার ডান হাত
পাথরের ভেতর। কালো আয়নায় এক নারী
মুছে দিতে চাইছে নাম
না, সে এক বালকের চুল আঁচড়ে চলছে।

 

 

শরীর, মনে রেখো

কনস্তানতিন কাভাফি

অনুবাদ: কুমার চক্রবর্তী

 

শরীর, কতটা প্রণয় পেলে তা নয় শুধু, কোন সে শয্যায়
হলো শোয়া তা-ও শুধু নয়,
মনে রেখো, তোমারই জন্য সেই কামনাসাগর যা চিকচিক করেছিল চোখে,
আর কেঁপেছিল কিছু-একটা এই কণ্ঠস্বরে–
আর কিছু দৈব বাধা জেগে ওঠে ভেস্তে দিল তাকে।
এখন সবই অতীত
অনেকটাই মনে হয়, যেনবা কামনা তুমি দিয়েছিলে নিজেকেই,
তবু–মনে রেখো চিকচিক ঔজ্জ্বল্যে ভেসে ওঠা সেই চোখ
যা চেয়েছিল তোমারই দিকে,
কীভাবে যে কেঁপেছিল কণ্ঠ, তোমারই জন্যে, তা যদি জানতে;
মনে রেখো, শরীর।

 

 

 

শ্রেণীকক্ষে অন্ত্যেষ্টির গান

অ্যানি সেক্সটন

অনুবাদ: সোনালী চক্রবর্তী

 

জনবিরল ক্লাসঘরে যেখানে তোমার অভিজাত মুখ আর তার উচ্চারণেরাই শেষ ও একমাত্র শব্দ,
তোমার সেই এলাকাতেই আমি এই ফুটন্ত প্রাণীটাকে খুঁজে পেলাম ।

তোমায় অবিন্যস্ত পেয়ে সে গোবরাটে জবরদখল চালাচ্ছিল,
অকাট্যভাবে বাসাও বেঁধে ফেলেছিলো,
যেন রাক্ষুসে এক ব্যাঙের বিরাট বড়ো পিণ্ড ।
তোমার পশমী পায়ের ব-দ্বীপের মধ্যে দিয়ে
আমাদের নিবিষ্টভাবে পরীক্ষা করছিলো ।

তা সত্বেও,তোমার চাতুরিকে আমার তারিফ করতেই হবে ।
তুমি অত্যন্ত শৃঙ্ক্ষলাপূর্ণভাবে মানসিক বিকারগ্রস্ত ।
আমরা আমাদের সাধারণ চেয়ারগুলোতে বসে থেকেই উসখুস করে উঠি ।
আর আমাদের প্রকৃত অবস্থাকে ফর্দে ফেলার ভান করি
তোমার বলিষ্ঠ ইন্দ্রজালের প্রভাবে ।
অথবা তোমার স্থূল,অন্ধ চোখেদের উপেক্ষা করি
বা সেই কুমারকে,
যাকে তুমি উদরস্থ করেছো বিগত দিনে,
যে ছিলো পন্ডিত,প্রবীণ,প্রাজ্ঞ ।

 

 

 

পিতাশ্রী

সিলভিয়া প্লাথ

অনুবাদ: শৌনক দত্ত

 

তুমি আর সেই কালো জুতা পরবেনা। যার মধ্যে আমার বসবাস
তোমার পায়ের মতোন-রিক্ত, ম্লান হয়ে ত্রিশ বছর
সাহস হয়নি বাঁচার বা নিশ্বাস ফেলার।
বাবা, তোমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছি।
কিন্তু তুমি আমার সময়ের অনেকটা আগেই ফিরে গেছো।

এক বস্তা ঈশ্বর, মার্বেলের মত ভারী!
পাথুরে মূর্তি বিরাট ধুসর এক পা নিয়ে
এক বিশাল মায়া খেয়ালী অতলান্তিকের দিকে
যেখানে নীলের উপর সীমের মত সবুজ বর্ষিত হয়
সুন্দর বালিয়াড়ি সৈকতের জলে।
মুক্তির জন্যে আমি প্রার্থনা করতাম,
হ্যাঁ, তোমার থেকে।

পোলিশ শহর যাকে
দুরমুজ দিয়ে সমান করে দেয়া হয়েছিল
কারন যুদ্ধ, যুদ্ধ আর যুদ্ধ।
সেই শহরের নামটি আমার খুব পরিচিত।
আমার এক পোলিশ বন্ধু
বলেছে এরকম আছে কয়েক ডজন।
তাই আমি বলতে পারব না কখনই
কোথায় তুমি পা মাড়িয়ে গেছ,
কোথায় তোমার শিকড়।

তোমার সাথে কথা বলতে পারিনি কখন
জিভ আটকে গেছে চোয়ালে বারবার
আটকে গেছি কাঁটা তারের ফাঁদে।
আমি, আমি এবং আমি।আমি তখন
কথা বলতে পারতাম না।
আমার মনে হত প্রতিটি জার্মানই তুমি
এবং অশ্রাব্য তোমার ভাষা,
একটি ইঞ্জিন যেন
আমাকে বিরক্ত করছে ইহুদীদের মত
আমি কথা বলা শুরু করলাম ইহুদীদের ভাষায়
আমার মনে হতে থাকে আমি হয়ত ইহুদী কেউ।
টিরল অঞ্চলের তুষারপাত,
ভিয়েনার স্বচ্ছ বিয়ার
সত্যি নয়, খাঁটি নয়, বনেদী নয়
তোমার কাছে,
আমার যাযাবর পূর্বপুরুষ এবং আমার
অদ্ভুত ভাগ্য
আমার নীল ব্যাগ, আমার সাধারণ ব্যাগ
আমি হয়ত কিঞ্চিত পরিমাণে ইহুদী।
আমি তোমাকে সবসময় ভয় পেতাম
তোমার যুদ্ধবিমান, তোমার গোয়েবলীয় প্রচার
তোমার পরিপাটি গোঁফ
তোমার আর্য চোখ, উজ্জ্বল নীল
উদ্যত মানুষ সে তুমি।
ঈশ্বর নয়, কিন্তু
একটি সস্ত্বিকা চিহ্ন
নিকষ কালো, কোন আলো তা ভেদ করতে পারে না।
প্রতিটি নারী একজন ফ্যাসিস্ট ও
মুখ মাড়ানো জুতাই পুজা করে, সেই নিষ্ঠুর
হৃদয় তোমার মত এক পশু।
তোমার ব্লাকবোর্ডের সামনে দাড়াঁনো
যে ছবিটি আমার কাছে আছে সেখানে
তোমার থুতনিতে একটি খাঁজ আছে যেখানে
তোমার জুতা থাকার কথা ছিল।
কিন্তু তাতেও কম অমানুষ মনে হচ্ছে না তোমায়
না, সেই কৃষ্ণাঙ্গের চেয়েও কম না যে
আমার সুন্দর হৃদয় দুটুকরো করে দিয়েছিল।
আমার বয়স ছিল দশ যখন ওরা তোমাকে কবর দিল।
বিশ বছর বয়সে আমি মরতে চেয়েছিলাম
ফিরতে চেয়েছিলাম তোমার কাছে।
আমার মনে হয়েছিল তোমার হাড় দিয়েও হবে।
কিন্তু তারা আমাকে থলে থেকে বের করে
আঁঠা দিয়ে জুড়ে দেয়।
তখন আমি জানি আমার কি করতে হবে,
আমি তোমার একটি মূর্তি বানাই।
একটি কৃষ্ণাঙ্গ মুর্তি মাইন কাম্ফের মত যার চেহারা।
নিপীড়নের প্রতি ভালোবাসা জন্মালো
আমি বলেছি, আমি রাজী আমি রাজী।
বাবা, আমার অবশেষে মুক্তি হয়েছে
সেই কালো টেলিফোনটির তার উপড়ে ফেলা হয়েছে,
সেই কন্ঠ আর আমাকে বিরক্ত করবে না।
আমি যদি একজনকে খুন করে থাকি
তবে দুজনকেই শেষ করে দিয়েছি।
সেই রক্তচোষা যে তোমার প্রতিমূর্তি হয়ে এসেছিল
আমার রক্ত চুষেছিল সাত বছর ধরে, তুমি জানতে চাও!
বাবা, তুমি এখন শুতে পার
তোমার কালো হৃদয়ে এখন একটি লম্বা পেরেক
গ্রামের লোকজন কখনই দেখতে পারত না তোমাকে
তারা এখন খুশীতে নাচছে আর তোমাকে লাথি মারছে

তারা সবসময়ই জানত তুমিই…।
বাবা, বাবা, আমার অত্যাচারী বাবা
আমি মুক্তি পেয়েছি আজ!

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত