Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,কৃষ্ণ

রাধাকৃষ্ণ প্রেমপদাবলি । দিলীপ মজুমদার

Reading Time: 6 minutes

মানবমনের কিছু স্থায়ী ভাব আছে। যেমন ,— রতি, হাস, শোক, ক্রোধ, উৎসাহ, ভয়, জুগুপ্সা, বিস্ময়।  কাব্যে এই সব স্থায়ী ভাব রসপরিণতি লাভ করে বিভাব, অনুভাব  ও ব্যভিচারী ভাবের সংযোগে। স্থায়ী ভাব অনুযায়ী রসের সংখ্যা আটটি: শৃঙ্গার, হাস্য, করুণ, রৌদ্র, বীর, ভয়ানক, বীভৎস, অদ্ভুত।

প্রিয় বস্তুর প্রতি মানবমনের স্বাভাবিক অনুরাগ হল রতি। কৃষ্ণের প্রতি ভক্তজনের  অনুরাগ বা রতি পরিণতি লাভ করে পাঁচটি রসে: শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর। শান্তরসের সাধনা হল বিষয়বাসনা বর্জন করে কৃষ্ণ মন সমর্পণ করা। দাস্য রসের সাধনায় ভগবান প্রভু আর ভক্ত দাস। সখ্য রসের সাধনায় ভগবান সখা বা বন্ধু। বাৎসল্য রসের সাধনায় ভগবান পুত্র। মধুর রসের সাধনায় ভগবান কান্ত বা প্রেমিক। বৈষ্ণবরা মধুর রসের সাধনাকে শ্রেষ্ঠ সাধনা বলেন। গোদাবরী তীরে রায় রামানন্দের সঙ্গে আলোচনায় চৈতন্যদেব বলেছিলেন, ‘কান্তাপ্রেম সর্বসাধ্যসার।’

মানবিক প্রেমের আধারে রাধাকৃষ্ণ প্রেম পরিবেশিত হলেও গৌড়ীয় বৈষ্ণব দার্শনিকরা  তাকে তত্ত্বমণ্ডিত করেছেন,কৃষ্ণদাস কবিরাজের ভাষায়:

সচ্চিৎ-আনন্দময় কৃষ্ণের স্বরূপ।

অতএব স্বরূপশক্তি হয় তিনরূপ।।

আনন্দাংশে হ্লাদিনী সদংশে সন্ধিনী।

চিদংশে সংবিৎ যারে জ্ঞান করি মানি।।

হ্লাদিনীর সার অংশ হল প্রেম, প্রেমের পরম সার হল মহাভাব,আর রাধা হলেন ‘মহাভাবরূপা’।

চৈতন্যপরবর্তী বৈষ্ণব কবিরা তত্ত্বের আলোকে রাধাকৃষ্ণ প্রেমকে দর্শন করলেও মানবিক প্রেমের আধারটি বর্জন করতে পারেননি। করা সম্ভবও ছিল না। তাই বৈষ্ণব পদাবলি শেষ পর্যন্ত প্রেমেরই কাব্য।

প্রেমের প্রথম ধাপ পূর্বরাগ।  প্রত্যক্ষ পরিচয়ের পূর্বাবস্থা। দ্বিজ চণ্ডীদাস বলছেন, ‘সই কেবা শুনাইল শ্যাম নাম’। রাধা বলছেন তাঁর সখীকে। শ্যামনাম শুনে তাঁর প্রতিক্রিয়ার কথা। সে নাম তাঁর কানের ভিতর দিয়ে প্রবেশ করছে অন্তরের গভীরে। সে নাম ‘আকুল করিল মোর প্রাণ’। সে নাম জপ করছেন রাধা। নাম জপ করতে করতে তাঁর অঙ্গ অবশ হয়ে যাচ্ছে। শ্যামের সঙ্গলাভের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠছেন তিনি।  তিনি ভাবছেন শুধুমাত্র যাঁর নাম শুনে তাঁর এ রকম প্রতিক্রিয়া হচ্ছে , তাঁর অঙ্গ স্পর্শ করলে কি তবে হবে!কুলবতী তিনি। পরস্ত্রী। তাই  পরপুরুষ কৃষ্ণের কথা বিস্মৃত হবার চেষ্টা করছেন প্রাণপণ। কিন্তু পারছেন না বিস্মৃত হতে।

গোবিন্দদাসের রাধা  দেখেছেন কৃষ্ণকে। তাঁর ‘ঢল ঢল কাঁচা অঙ্গের লাবণি অবনী বহিয়া যায়’। মন উচাটন হয় তাঁর  ঈষৎ হাসিতে। তাঁকে দেখার পর থেকেই রাধার  হৃদয় ব্যাকুল। কৃষ্ণের কণ্ঠে মালতী ফুলের মালা, কপালে চন্দনের ফোঁটা, নয়নে কটাক্ষ। কেন রাধার শরীর এমন অস্থির হয়ে উঠেছে। ‘না জানি কি ব্যাধি মরমে বাধল’। মনের এই অসুখের কথা লোকলজ্জার ভয়ে প্রকাশ করতে পারেন না তিনি। আপশোশ করে বলেন, ‘এমন কঠিন নারীর পরাণ বাহির নাহিক হয়’।

ঘর ও বাহির করছেন চণ্ডীদাসের রাধা। তাঁর ‘মন উচাটন নিশ্বাস সঘন’। বার বার তিনি কদম্ব কাননের দিকে দৃষ্টিপাত করছেন। ঘরে গুরুজন। রাধা আর তাঁদের ভয় করেন না। বসে থাকতে থাকতে বার বার চমকে ওঠেন। স্খলিত হয় বসন। রাজার কুমারী তিনি, তিনি কুলবধূ, কৃষ্ণের ছলাকলার স্বরূপ তিনি বুঝতে পারেন না। এ এক বিচিত্র ‘কালিয়া ফাঁদ’। রাধা পড়েছেন সেই ফাঁদে।

বেদনাবিদ্ধা, বৈরাগিনী রাধার ছবি এঁকেছেন চণ্ডীদাস। তিনি বসে আছেন নির্জনে। অন্য কারোর কথা শুনছেন না তিনি, কথাও বলছেন না কারোর সঙ্গে। ‘সদাই ধেয়ানে চাহে মেঘপানে’। মেঘের দিকে তাকিয়ে আছেন একদৃষ্টিতে, কারণ মেঘের রঙের সঙ্গে কৃষ্ণের গাত্রবর্ণের মিল আছে। আহারে তাঁর রুচি নেই। তাঁর পরনে গৈরিক বস্ত্র। যেন ঠিক যোগিনী। আপনমনে কথা বলে যাচ্ছেন মেঘের সঙ্গে। কৃষ্ণের সঙ্গে কথা বলছেন যেন। নিরীক্ষণ করছেন ময়ূর-ময়ূরীর কণ্ঠ। কালিয়া বঁধুর সঙ্গে নব পরিচয় তাঁকে এমন উন্মনা করে দিয়েছে।

বসু রামানন্দের রাধা বেলা অবসানে একাকিনী যমুনায় গিয়েছিলেন স্নান করতে।   যমুনার জলে  নামতেই দেখতে পেলেন শ্যামকে। তাঁর মাথায় ফুলের চূড়া, হাতে মোহন মুরলী। যমুনাতে ঢেউ দিতে বিম্ব ওঠে আচম্বিতে, আর ‘বিম্বের মাঝারে শ্যাম রায়’। ত্রিভঙ্গমুরারী তিনি। তাঁর সে রূপ দেখে কুল রাখা দায়। জলে ঢেউ দিতে সবই অদৃশ্য, জল আবার স্থির হতে দেখা গেল কানুকে। তাঁকে ধরার চেষ্টা করছেন রাধা, অনুরাগে  ডুব দিয়েছেন জলে, পান নি শ্যামের নাগাল। অভাগিনী রাধা তাই কাঁদতে কাঁদতে ফিরেছেন ঘরে।

এমন প্রেম কখনও দেখেন নি চণ্ডীদাস। এ যে ‘পরাণে পরাণে বান্ধা আপনা আপনি’। এমন প্রেম যে তিলমাত্র বিচ্ছেদ সহ্য করতে পারে না। এমন কি ‘দুঁহু কোরে দুঁহু কান্দে বিচ্ছেদ ভাবিয়া’। মানুষের সুখের অবসর তো স্বল্পায়ু, সে কথা ভেবেই মিলনের মধ্যে আসে বিরহের ভাবনা। এমন প্রগাঢ় প্রেম সুদুর্লভ। ‘মানুষে এমন প্রেম কোথা না শুনিয়ে’।

জ্ঞানদাসের পূর্বরাগের পদে বেজে ওঠে আধুনিক গীতিকবিতার সুর। সেখানে  যৌবনের বনে মন হারিয়ে যায় রাধার, রূপের পাথারে ডুবে থাকে নয়ন, ঘরে যাবার পথ হয় অফুরান। ‘রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর, প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর’। এ তো কাম নয়, নয় আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা, এ হল কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা। আর কবিরাজ গোস্বামী বলেছেন, ‘কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম’। হৃদয়ের স্পর্শের জন্য হৃদয় কাঁদে এবং ‘পরাণ পিরীতি লাগি থির নাহি বান্ধে’।

কবিবল্লভের রাধা বলেন কানুর প্রতি তাঁর অনুরাগ নব নব রূপে প্রতিভাত হয়। ‘তিলে তিলে নূতন হোয়’। কানুর রূপ তিনি প্রতিনিয়ত দেখছেন,তবু তাঁর দেখার তৃষ্ণা মিটল না; কানুর বচন বার বার শুনেও ইচ্ছে করে আবার শুনতে।দুর্নিবার এই তৃষ্ণায় রাধা আকুল পাগলপারা।

পূর্বরাগ ও অনুরাগের পরে অভিসার। কৃষ্ণের সঙ্গে মিলিত হতে যাচ্ছেন রাধা। সে অভিসারের পথে পদে পদে বাধা। বাইরের বাধা, ঘরের বাথা। অভিসারের পদে রাজাধিরাজ গোবিন্দদাস। তিনি  ফুটিয়ে তুলেছেন দুর্যোগময়ী রাত্রির ছবি। রাধা জানেন এই দুর্যোগ অতিক্রম করতে হবে তাঁকে তাই আগে থেকে অভ্যেস করে চলেছেন। প্রেমের  কঠিন পরীক্ষা দিচ্ছেন রাধা। জল  ঢেলে  পথ পিচ্ছিল করে  তার উপর দিয়ে চলার অভ্যেস করছেন, পথে কাঁটা বিছিয়ে তার উপর কমলসম পদতল স্থাপন করছেন,  বিনিদ্র রাত্রি অতিবাহিত করছেন, চক্ষু মুদ্রিত করে পথ অতিক্রম করছেন, হাতের কঙ্কণ পণ করে ভুজঙ্গগুরুর কাছে ‘ফণিমুখ বন্ধন’ শিক্ষা করছেন, কত কথা বলছেন গুরুজনেরা কিন্তু রাধা বধির হবার ভান করছেন।

গোবিন্দদাসের অভিসারের আর একটি অসামান্য পদ ‘মন্দির বাহির কঠিন কপাট’। দ্বাররুদ্ধ ঘর। পিচ্ছিল, কর্দমাক্ত পথ। তার উপর আছে ঘনঘোর বাদল। রাধার নীল শাড়ি সে বাদলকে রোধ করতে পারবে না। ‘বারি কি বারই নীল নিচোল’? প্রচণ্ড বজ্রনির্ঘোষে কান পাতা দায়। ছুরির ফলার মতো বিদ্যুতের ঝিলিক। কিছুরই পরোয়া নেই রাধার। প্রেমের শক্তিতে তিনি বলীয়ান, প্রেমের জন্য আত্মবলিদানে অকুন্ঠ তিনি। গোবিন্দদাস বলেন, ‘ছুটল বাণ কিয়ে যতনে নিবার’। ধনুক থেকে একবার বাণ নির্গত হলে তাকে ফেরানো যায় না। তেমনি হৃদয় প্রেমোন্মত্ত হলে কোন বাধা তাকে নিরস্ত করতে পারে না।

শশিশেখরের অভিসারিকা রাধা সঙ্কেতকুঞ্জে কৃষ্ণের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য কিছু সাজসজ্জা করেছেন। ‘সাজলি ধনি শ্যামবিহার’। পরেছেন নীল বসন, তাঁর কণ্ঠে নীলোৎপল হার, কবরীভার তাঁর শিথিল, চন্দ্রভ্রমে চকোর বিভোর হয়ে ধাবিত হচ্ছে তাঁর দিকে, পথে বিপদ দেখে নীল বসনে তিনি মুখ আবৃত করছেন। অবশেষে রাধা এলেন সঙ্কেতকুঞ্জে, আদরে আগুসার হয়ে কৃষ্ণ অভ্যর্থনা করলেন দয়িতাকে। রাই আগমন নিরীক্ষণ করে তাঁর ‘শীতল ভেল তপত প্রাণ’। তপ্ত প্রাণ হল শীতল।

গোবিন্দদাসের রাধা তাঁর দয়িতকে তাঁর ‘পথ-আগমন কথা’র বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন,’মাধব কি কহব দৈব বিপাক’। ঘর থেকে পথে নেমে তিনি দেখছেন ঘোর অন্ধকার, ‘নিশি হেরি কম্পিত অঙ্গ’। একে তিনি কুলকামিনী, তার উপর তামসী রাত্রি, তার উপর জলধর ‘বরিখয়ে ঝর ঝর’। পঙ্কবিভূষিত, কণ্টকবিদ্ধ  রাধার কোমল পদযুগল তবু তিনি অদম্য। কৃষ্ণের বংশিধ্বনি কর্ণকুহরে প্রবেশমাত্র গৃহসুখের আশা বর্জন করেছেন তিনি। তাঁর কাছে জগৎ সংসার মিছে সব,মিছে এ জীবনের কলরব। ‘তুয়া দরশন আশে কছু নাহি জানলু’। কৃষ্ণ দর্শন করার জন্য আর কোন কিছু গ্রাহ্য করেন নি তিনি।

‘পিয়া-মুখ-চন্দা’ দর্শন করে রাধার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিদ্যাপতি। সে মুখ দর্শন করে তাঁর জীবন-যৌবন সফল হয়েছে। নিজ গৃ্হকে গৃ্হ এবং স্বীয় দেহকে দেহ বলে মনে হচ্ছে।  সব সন্দেহের অবসান ঘটেছে আজ। যে  প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আগে দুঃসহ বলে মনে হয়েছিল, আজ আবার তা তাঁকে পুলকিত করছে। সেই কোকিল এখন লক্ষবার ডাকুক, উদিত হোক লক্ষ চন্দ্রমা, পঞ্চশর এখন লক্ষ শর হোক, মন্দ মন্দ প্রবাহিত হোক মলয় পবন। এই নবীন প্রেমকে ধন্য ধন্য করছেন বিদ্যাপতি, ‘ধনি ধনি তুয়া নব লেহা’। ধন্য তোমার নবীন প্রেম। রাধা সখীকে বলছেন তাঁর আনন্দের অবধি নেই আজ , ‘কি কহব রে সখি আনন্দ ওর’।


আরো পড়ুন: রাধাকৃষ্ণপ্রেমের দ্বিতীয় কাব্য  শ্রীকৃষ্ণকীর্তন (পর্ব-১) । দিলীপ মজুমদার


অভিসার ও মিলনের পরে মান ও কলহান্তরিতা। মান হয়েছে রাধার। কৃষ্ণ যে অন্য নারীর সঙ্গে রাত্রি যাপন করে এসেছেন। রাত্রি যাপনের চিহ্ন তাঁর অঙ্গে। তারপরে কৃষ্ণ এসেছেন রাধিকার মানভঞ্জন করতে। রাধা বলছেন ,যে কৃষ্ণের  হৃদয়-অধিদেবী , কৃষ্ণ তার চরণসেবা করুন। যে নারীর চরণের অলক্তক রাগচিহ্ন কৃষ্ণের অঙ্গে শোভিত, কৃষ্ণ যেন তার সঙ্গে পুনর্বার প্রেমলীলায় মত্ত হন। ‘সোই পুরব তুয় কাম, কি ফল মুণ্ডধিনী ঠাম’। রাধার মতো সরলা নারীর কাছে এসে কোন ফল নেই, কুটিল কৃষ্ণের যোগ্য সেই কুটিলা নারী।

জ্ঞানদাসের কৃষ্ণ অনুনয়-বিনয় করছেন অভিমানিনী রাধাকে। বলছেন,রাধার অভিলাষের জন্য তিনি পীতবন্ধন পরিধান করেছেন,রাধার দীর্ঘশ্বাসে চমকে ওঠে তাঁর প্রাণ,  সাধের মুরলী তিনি রাধাকে দান করতে চান,রাধার চরণের ধুলি তিনি স্পর্শ করতে চান, জগৎ সংসার জানে যে তিনি রাধার আরাধনা করেন। রাধাকে  তাঁর প্রতি বিমুখ না হতে কাতর অনুরোধ করেন কৃষ্ণ।

এরপরে প্রেমবৈচিত্ত্য ও আক্ষেপানুরাগ।  আক্ষেপানুরাগ রাধার। কত চেষ্টা করেন রাধা কৃষ্ণচিন্তা থেকে বিরত থাকার, কিন্তু বিরত থাকতে পারেন না তিনি। তাঁর অন্য পথ নেই, সব পথই  কৃষ্ণাভিমুখী হয়ে যায়। কৃষ্ণের নাম উচ্চারণ করতে চান না তিনি, কিন্তু তাঁর মুখে এসে পড়ে কৃষ্ণনাম। নাসিকা বন্ধ করে রাখেন তিনি, তথাপি সে নাসিকায় ভেসে আসে কৃষ্ণগন্ধ। আসলে এ হল সচেতন আর অচেতনের দ্বন্দ্ব। তাঁর সচেতন মন কৃষ্ণকে পরিহার করতে চায় আর অচেতন মন বন্দি হয়ে যায় কৃষ্ণের অমোঘ আকর্ষণে। চণ্ডীদাসের রাধার ‘সদা সে কালিয়া কানু হয় অনুভব’। মনে মনে কৃষ্ণকে তিনি বলেন যে স্বল্প বয়সে প্রেমের আকর্ষণে গৃহহারা তিনি, বেদনাদগ্ধা। কৃষ্ণকে এই শাস্তি দিতে চান তিনি। ‘মরিয়া হইব শ্রীনন্দের নন্দন তোমারে করিব রাধা’। তখন কৃষ্ণ বুঝবেন প্রেমের জ্বালা। রাধা যখন কৃষ্ণ হয়ে ছেড়ে যাবেন দয়িতাকে, তখবই কৃষ্ণ অনুভব করতে পারবেন তাঁর বেদনা।

আক্ষেপ করে জ্ঞানদাসের রাধা বলেন,‘সখি কি মোর করমে লেখি’। সুখের নিমিত্ত তিনি ঘর বেঁধেছিলেন, সে ঘর  অগ্নিদগ্ধ হয়ে নষ্টনীড় হয়ে গেল। বারংবার তিনি আশাহতা হন। এ হল অভাগীর কর্মদোষ। জ্ঞানদাস বলে দেন ‘কানুর পিরীতি মরণ অধিক শেল’।

কি মোহিনী যে জানেন কৃষ্ণ। দ্বিজ চণ্ডীদাসের রাধা কৃষ্ণের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘অবলার প্রাণ নিতে নাহি তোমা হেন’। রাধা ঘরকে বাহির করেছেন, বাহিরকে ঘর করেছেন; পরকে আপন করেছেন, আপনকে পর করেছেন; রাত্রিকে দিবস করেছেন, দিবসকে রাত্রি করেছেন, তবু ‘বুঝিতে নারিনু বন্ধু তোমার পিরীতি’। স্রোতে ভেসে যাওয়া শ্যাওলার মতো রাধা অসহায়। মন-প্রাণ তিনি সমর্পণ করেছেন কৃষ্ণকে, সেই কৃষ্ণ যদি নির্মম হন তাহলে ‘মরিব তোমার আগে দাঁড়াইয়া রও’।

এর পরে আসে মাথুর বা বিরহ। মধুপুরে চলে গেলেন কৃষ্ণ। ফেলে রেখে গেলেন রাধাকে। তাই রাধার ‘শুন ভেল মন্দির’, ঘর শূন্য হয়ে গেল, শূন্য হয়ে গেল জগৎ সংসার। বিদ্যাপতির মাথুরের পদে ফুটে উঠেছে সৃষ্টির আগুনজ্বালা বিরহ। ‘এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর’। আমার দুঃখের সীমা নেই। ভাদ্রমাসের এই ভরা বাদলে ঘর তাঁর শূন্য। গর্জন  ও বর্ষণ করছে মেঘ, শত শত কুলিশপাতে ময়ূর আনন্দে নৃত্য করছে, বেদনায় বুক ফেটে যাচ্ছে রাধার। রাতের অন্ধকার আকাশে ছুটে যাচ্ছে অস্থির বিদ্যুৎ, হরি ছাড়া কেমন করে অতিবাহিত হবে রাত্রি! ‘হরি হরি কো  ইহ দৈব দুরাশা’। এ কি দৈব দুরাশা রাধার! এই নব যৌবন যদি বিরহে অতিবাহিত হয়, তাহলে ‘কি করব সো পিয়া লেহে’, তাহলে কি হবে কৃষ্ণের পরবর্তী ভালোবাসায়?

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>