Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,মণিকা চক্রবর্তী

ভাসাবো দোঁহারে: তুমি, অন্তহীন । মণিকা চক্রবর্তী

Reading Time: 3 minutes

মুনলাইট সোনাটা শুনতে শুনতে মাথার মধ্যে প্রচ্ছন্ন প্রেম ও সুন্দরের চেতনা মিলেমিশে এক অপার্থিব বিষ্ময় তৈরি হয়। ভাবি, এই বিপুল বিশ্বে মানুষের গন্তব্য কী ! জন্ম থেকে মৃত্যু এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া আর তার মধ্যে রয়েছে কিছু রুদ্ধতা, কিছু আবিষ্কার আর বিস্ময়। প্রতিদিনের উপলব্ধির জগতে এক আর্শ্চয ‘তুমির’ জন্য চিরদিন অপেক্ষা করে থাকি আমরা। আর বেঁচে থাকা তখনই তাৎপর্যময় হয়, যখন হৃদয়ের গভীরে থাকে এক অনন্ত তুমি আর অবিরাম বিস্ময়ের অনুভব। সেই ‘তুমি’র বারতায় হানাহানি, কানাকানি আর গ্নানিতে ভরা এই জীবনের অন্তঃসার থেকে ভাললাগার জগতের দিকে খুলে যায় অস্তিত্বের স্তর। একেই কী আমরা ‘প্রেম’ বলবো! আমাদের অপজীবনের ভিতর কত আশ্চর্যভাবে কখনও কখনও আসে পাগল করা মুহূর্ত। তারপর কী ঘটতে যাচ্ছে আমরা কেউ জানি না। কেবলই ভেসে যেতে থাকি প্রবল টানে। সেই টানের অনুভব রয়ে যায় বাকী জীবন জুড়ে।

প্রেমের সত্যকে হৃদয়ে ধারন করার পরই সমস্ত জগৎকে মনে হয় সুন্দর, স্নিগ্ধ আর ভালোবাসাময়। প্রেম যখন খুলে দেয় অস্তিত্বের স্তর তখন তার মাঝে শরীর ও আত্মার এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। আঁদ্রে জিদের ‘শীর্ণ তোরণ’ উপন্যাসিকাটি এরকম একটি বিষয়কে উপস্থাপনা করেছে। যেখানে আত্মা ও শরীর পরষ্পর দুই শত্রু হিসাবে উপস্থিত থাকে। আলিসার ধর্মীয় নৈতিকতার প্রগাঢ় বোধ তার প্রেমিক জেরোমকে দূরে সরিয়ে দেয়। সেই অনুভুতির প্রকাশ থাকে তার জার্নালে-‘সব নিভে গেল! হায়! একটা ছায়ার মতো সে আমার হাত ছাড়িয়ে পালিয়েছে। এসেছিল! সে এসেছিল! আমি এখনও তাকে অনুভব করতে পারছি। তাকে ডাকছি। আমার হাত, আমার ঠোঁট অন্ধকারের মধ্যে তাকে খুঁজছে, বৃথা…

কী হয়েছে তবে! আমি ওকে কী বলেছি? আমি কী করেছি! কেন আমি ওর কাছে বারবার আমার নৈতিকতা নিয়ে অতিশয়োক্তি করি? সেই পূণ্যে র কী মূল্য আছে যাকে সমস্ত হৃদয় অস্বীকার করে?’ নৈতিক বোধের কাছে বারবার প্রশ্ন হয়ে এসেছে আলিসার প্রেম।


আরো পড়ুন: এক ঘাইহরিণীর ডাক শুনি । মণিকা চক্রবর্তী


প্রেমের আকাক্সক্ষা আমাদের শুদ্ধ চৈতন্যের চালিকাশক্তি। বিশুদ্ধ প্রেম বা প্লেটোনিক লাভ গড়ে ওঠে মানবধর্মের সৌন্দয্য চেতনার ভিত্তিতে। এক্ষেত্রে যৌন আগ্রহ অর্ন্তভুক্ত নয়। পরম সৌন্দর্য্য ও শুদ্ধতার মাহাত্ম্য নিয়ে দান্তের বিয়াত্রিচে এক আভাময়ী, অপার্থিব দেবী। বিখ্যাত জার্মান সাহিত্যিক গ্যোটের উপন্যাস ‘দ্যা সরোস অব ইয়াং ওয়ার্দার’ ইয়োরোপীয়ান সমাজ জীবনে বিপুল প্রভাব ফেলেছিল। অসাধারণ এই প্রেমের উপন্যাসটি সৌন্দর্য্য, বিস্ময়, বর্ণনা আর বিষাদের তীব্রতায ইয়োরোপীয়ান তরুণসমাজকে আক্রান্ত করে। আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়ার কারণে, বইটিকে নিষিদ্ধ করা হয়।

প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যার উদাহরণ কম নয়। টলস্টয়ের ‘আনা কারেনিনা’ ও গুস্তাভ ফ্লুবেরের ‘মাদাম বোভারী’ রোমান্টিক অবশেসনের ঘোরে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়। পাশাপাশি প্রতিহিংসার উদাহরণও অনেক আছে। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পটিতে অন্ত্যজ জীবনের প্রেম ও আদিম কামনাকে প্রকাশ করা হয়েছে অপরিসীম লেখার শক্তিতে। প্রেম কীভাবে পরিণত হয় হিংসার স্রোতে, সেই নিষ্ঠুরতার চিত্র তীব্রতর হয় ভিখুর ঘাতক চরিত্রে।

চর্যাপদের শবর-শবরীর প্রেম আমাদের মাতাল করে। পরকীয়া প্রেমের চিরন্তন তাড়নার বিষয়টিও চর্যাপদে আছে। ‘দিনের বেলায় যে গৃহবধু কাকের ভয়ে ভীত থাকে,সেই বধূই রাতের বেলায় অভিসারে চলে যায়‘।মানিক বন্দোপাধ্যয়ের পদ্মানদীর মাঝির ‘কুবের ও কপিলার প্রেম’ একটি আকুতিভরা বিশেষ সংলাপের মধ্যে দিয়ে (আমারে নিবা মাঝি লগে) পরকীয়া প্রেমকেই প্রতিষ্ঠা করে। ডি এইচ লরেন্সের ‘ল্যাডি চার্টালিজ লাভার’ এবং বুদ্ধদেব বসুর ‘রাত ভর বৃষ্টি’ প্রেমকে অন্য এক পরিনতির ভিতর দিয়ে নিয়ে যায়।

কাম-গন্ধহীন প্রেম যেমন আছে চন্ডীদাস-রজকিনীতে, দান্তে-বিয়াত্রিচে, তেমনি সমাজের চোখে অনৈতিক পরকীয়া প্রেমেরও একটি অপ্রতিরোধ্য তত্ত্ব রয়েছে। কবি ,সাহিত্যিক ও শিল্পীদের জীবনে প্রেম ও পরকীয়ার বিষয়টি অতি স্বাভাবিক। এ বিষয়ে কবি আল মাহমুদ লিখেছেন, ‘হাওয়ার কাছে আদি পুরুষের যে দাবি, তা মূলত নিজের ভুলে যাওয়া রক্তমাংসের কাছেই দাবি। কবির দাবিও নারীর কাছে তেমনি। এক এক নারীর কাছে কবি দেখে তার হারানো পাঁজরেরই খন্ড খন্ড যোজনা। শুধু একজনের দেহে তা পাওয়া যায় না বলেই কবির কাছে কামের চেয়ে প্রেম এত বড়’।

প্রেম একক অনুভুতি নয়, অনেক অনুভবের সমন্বয়ের এক বোধ। রবীন্দ্রনাথের‘ রক্তকরবীর ‘নন্দিনী’ সেই বোধের ভিতর দিয়ে গড়া এক অসাধারণ চরিত্র। এক অধরা মাধুরি। যাকে বারবার জানতে গেলেও যেন অজানাই থেকে যায়। অফুরন্ত সেই অজানার বোধের নামই ‘ভালবাসা’। এই বোধ ছাপিয়ে যায় প্রণয়সম্পর্ক, মানবসম্পর্ক এবং সমগ্র বিশ্বলোকের সঙ্গে সম্পর্ককে।

           

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>