| 18 এপ্রিল 2024
Categories
উপন্যাস ধারাবাহিক সাহিত্য

ধারাবাহিক উপন্যাস: খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি (পর্ব-১৪)

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

দিন গড়িয়ে যাচ্ছে তরতরিয়ে।

নানাবাড়িতে সবার স্নেহ আর ভালোবাসায় লুকিয়ে রাখা ক্ষতটাও শুকিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। আমার দুইমামা সত্যিই বড় ভালোমানুষ। জগতের মিথ্যা মোহ আর আভিজাত্যের মরীচিকা তাদের পিছু ধাওয়া করাতে পারেনি। সংসারের ছোটখাট প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি যোগ বিয়োগ সুখ অসুখকে একত্র করে তারা মায়ার জগতে দিব্যি নিজেদের পুরে নিয়েছে।

বেশ আছে আমার মামারা। তাদের দেখে মনের মধ্যে অদ্ভুত এক শান্তি জাগে। আবার কীসের একটা ছাইচাপা আগুনও যেন নিজের অজান্তেই বুকের মধ্যে ধিকধিকিয়ে ওঠে। আমার মা-বাবার এত কীসের অতৃপ্তি ছিল? কোনোভাবেই কি সবকিছুকে একপাশে সরিয়ে রেখে তারা যেটুকু আছে সেটুকু নিয়েই সুখি হতে পারতো না?

ছোটমামা এমনিতে সিরিয়াস হয় না কখনো। তবু সেদিন কী একটা বলতে গিয়ে বেশ ভাবুক হয়ে গেল।

অন্যরকম চোখে তাকিয়ে থেকে বললো, ‘বুঝলিরে নীরা…বড়ভাই খুব বোঝাতো পড়ালেখা করার জন্য। আমার ভালো লাগতো না পড়তে। মনে হতো, পড়াশুনা করে তো আমি সুখি হতে পারবো না। আমার সুখ যেখানে…তা থেকে কেন নিজেকে বঞ্চিত করবো? দ্যাখ… তার ফল এখন ঠিকমতোই ভোগ করছি! যে চাকরি করছি, তাতে নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যাওয়ার জোগাড়। হাহ হা…তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, ফু্রাচ্ছে ফুরাক! যার যা আছে তাই নিয়েই সুখি হতে হয়। আরেকজনের দিকে তাকালে মনে তো অতৃপ্ত আসবেই…তাই না?

এই যেমন ধর, আমাদের মামার কথা। ওহ্‌ তুই তো মনে হয় দেখিসনি উনাকে। তোর জন্মের আগেই মারা গেছে মামা। আমাদের মামা দেখতে শুনতে খুব সুন্দর ছিল। লম্বা চওড়া পালোয়ানের মতো সুঠাম শরীর। চেহারার কাটিংও খুব ভালো ছিল। মামার আয় রোজগার ভালো ছিল…মানে পুরুষ মানুষের যা যা থাকলে তাকে সবদিকে সেরা বলা যায়, মামা ছিল সেইরকম। কিন্তু মজার বিষয় কী ছিল জানিস? আমাদের মামী দেখতে তেমন সুন্দর ছিল না। বেঁটে খাটো মোটা মহিলা। সামনের সারির দাঁতগুলো উঁচু। আমাদের নানা তার বন্ধুর মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে ঠিক করেছিল। মামা অবাধ্য হয়নি তার বাবার। আমাদের মামী মানুষটা ছিল খুব ভালো। পরোপকারী…দিলদরিয়া যাকে বলে। স্বভাবটাও ছিল খুব সুন্দর।

আমাদের মামার মতো ওমন সুন্দর একজন মানুষ তার সারাটাজীবন ঐ বেঁটে মোটা দাঁত উচু মহিলাকে নিয়েই হাসিমুখে পার করে দিলো।কে জানে, তখনকার দিনে তো অত ছেলে মেয়েতে দেখা সাক্ষাত হতো না! সেজন্যই পেরেছিল হয়ত। এখন কত কী আছে চোখের সামনে! ফেসবুক, স্মার্টফোন, সিনেমা…কত কী! নিজের পাশের জনকে দেখতে বেশিদিন আর ভালো লাগে না। মনটা উড়ু উড়ু করে। পাশের বাসার ভাবীর সুন্দর সুন্দর ছবি দেখে বুকের মধ্যে চিলিক পাড়ে। মনে হয়…ইস! আমার বউটা তো অত সুন্দর না!’

কথাগুলো বলে ফেলেই ছোটমামা একটু লজ্জা পেয়ে গিয়েছিল। হয়ত ভাবছিল, ভাগ্নীকে এসব কী বলে ফেললো খেয়ালের বশে! তাড়াতাড়ি কাটিয়ে দেওয়ার জন্য বলেছে, ‘মানে… আমি বলতে চাইছি, এখন নিজের পাতে যা আছে সেটা আর বেশিদিন ভালো লাগে না বুঝলি? খালি আরেকজনের পাতে কী পড়লো সেদিকে চোখ পড়ে! সেটা নিজের করে পাইলে ভালো। না পাইলে শুরু হয় ভেতরে ভেতরে হিংসা…দলাদলি!’

ছোটমামার কথাগুলো আমার ভেতরটাতে গিয়ে ধাক্কা মেরেছে। কী ভীষণ সত্যি কথাগুলো! আমার মা-বাবা যদি এমনভাবে ভাবতে পারতো, তাহলে হয়ত সবকিছু অন্যরকম হলেও হতে পারতো।


আরো পড়ুন: খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি (পর্ব-১৩)


আমার মামীদের কথা আগেই বলেছি। মামাদের মতো তারাও সাদাসিধে মানুষ। না জানি কত দিনের জন্য দুটো উটকো সদস্য তাদের পরিবারে এসে জুটে গেছে…এই দুঃখবোধে তারা আক্রান্ত হয়নি। নিজেদের সন্তানদের সাথে তারা আমার আর নয়নের পাতটাকেও ভাগ করে নিয়েছে।

তবে জানিনা কেন… ইদানিং কিছু কিছু ব্যাপারে একটু যেন অন্যরকম সুর পাই। কী সেই অন্যসুর, চট করে হয়ত বোঝাতে পারবো না। আমি আর নয়ন আমরা যেন সবার মধ্যে থেকেও সবটাতে নেই। আমরা যেন স্থানচ্যুত দুটো মানুষ, জোর করে নিজেদেরকে অন্যায্য স্থানে স্থলাভিষিক্ত করতে চাইছি। এমন ভাবনা যে এমনি এমনি মনে হয়েছে ঠিক তাও নয়। হয়ত কোনো হাসির আড়ালে চাপা থাকা বিদ্রুপটা দপ করে জ্বলে উঠেছে কোনো একসময়। সেই বিদ্রুপ কখনো সেভাবে আড়ম্বর দেখিয়ে সামনে আসেনি। তবু তার উপস্থিতিকে অগ্রাহ্য করতে পারিনি।

নিজেকে তিরস্কার করেছি বহুবার। আমার মন ছোট, হয়ত সেজন্যই এরকম ভাবছি। ছোটবেলা থেকেই হীনমন্যতার সাথে বসবাস করতে গিয়ে হয়ত সবকিছু তীর্যককোণ থেকে দেখার অভ্যাসটা রপ্ত করেছি। তাই হবে হয়ত। তবু একদিনের ঘটনাতে মনের মধ্যকার তীর্যক ভাবনাটা একটু যেন নড়েচড়ে বসলো। মনে হতে লাগলো, হাসির আড়ালে চাপা পড়ে থাকা বিদ্রুপটা হয়ত এবারে একটু একটু করে মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইছে।

খুলেই বলি ঘটনাটা।

সেদিন ক্লাস থেকে ফিরে নয়নকে খুঁজছিলাম। ঐদিন পথে সুরমার সাথে হওয়া কথাটা মনের মধ্যে দাগ কেটে বসে গিয়েছিল। কেন যেন কিছুই ভালো লাগছিল না। সুরমা কয়েকবার কাছে এসে ইনিয়ে বিনিয়ে গেছে। আমি এটা সেটা বলে পাশ কাটিয়ে দিয়েছি। কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলাম না ওকে। মন চাইলো আর পুরনো ক্ষতে একটা খোঁচা মেরে দিলো!আমার মন চাইছিল কিছুদিন ওর মুখই যাতে না দেখি। কিন্তু সেটা তো আর হওয়ার জো নেই। প্রতিদিন ওর সাথেই কলেজে যেতে হয়। সুরমা বুঝতে পারছিল, আমি নিস্পৃহ থাকছি। তবু আমাকে ফর্মে ফেরানোর দায়িত্ব থেকে সে কিছুতেই অব্যাহতি নিতে রাজি নয়।

এটাতেও বিরক্ত লাগছিল আমার। বাসাতে মা-বাবার মধ্যে যখন ঝগড়াঝাঁটি হতো, কিছু সময় আমি আমার মতো খোলশের মধ্যে ঢুকে থাকতাম। এই সময়টা আমি নিজের মতো থাকতাম। মা-বাবা কিংবা নয়ন, কাউকেই আমার মনের খুব কাছাকাছি ঢুকতে দিতে চাইতাম না। মন আমাকে বোঝাতো, আমি মন দিয়ে মনের কথা শুনতাম। মাঝে মাঝে তর্কও করতাম। একসময় পরাস্ত হয়ে আমি কিংবা মন আমরা কেউ একজন হাল ছেড়ে দিতাম। যেই হারি না কেন, হার মেনে নিয়ে চুপচাপ থাকতাম আমরা। ইচ্ছের বিরুদ্ধে আরেকজনকে বিরক্ত করতাম না।

কিন্তু সুরমার হাত থেকে কিছুতেই নিস্তার পাচ্ছি না। একেকসময় ইচ্ছে করছে, ওকে বলেই ফেলি… ‘প্লিজ আমাকে অন্তত একটা দিনের জন্য আমার মতো থাকতে দে!’

ইদানিং নয়নের সাথেও আমার তেমন একটা দেখাই হয় না বলতে গেলে।

সারাদিন সুজনের সাথে কোথায় কোথায় যে টই টই করে বেড়ায় কে জানে! শুনেছি ক্লাসে নাকি বন্ধুবান্ধবও জুটে গেছে অনেক। তাদের নিয়ে এই কিছুদিন আগেই একবার পিকনিক করতে গিয়েছিল। ফিরে এসে গল্পের ভাণ্ডার খুলে বসেছিল আমার কাছ। ওর এগারো-বারো বছরের জীবনে এমন আনন্দের সময় খুব বেশি তো আর আসেনি! আনন্দের আতিশয্যে চোখ গোল গোল করে নিজের অভিজ্ঞতার গল্প বলছিল। এত ভালো লাগছিল শুনতে! ভাইটি আমার পুরনো ব্যথা ভুলে বন্ধুবান্ধব নিয়ে বেশ মশগুল হয়ে আছে…এটা দেখতে খুব ভালো লাগে আমার।

সেদিন বাসায় ফিরেই নয়নের খোঁজ করলাম। ওরা নাকি স্কুল থেকে এখনো বাসাতেই ফেরেনি! বাসার সবাই খুব চিন্তা করছে। সকলের মুখ দেখে বুঝতে পারলাম, এতক্ষণ এটা নিয়েই কথাবার্তা হচ্ছিলো।

বাইরে ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে প্রায়। আমি চিন্তিত গলায় বললাম, ‘এত দেরি তো কখনো করতে দেখিনি! আজ এত দেরি করছে কেন? ওদের বন্ধুদের বাসায় ফোন করে দেখলে হয়…’

‘এখন তো প্রায়ই দেখছি দেরি হচ্ছে! সুজন আগে একা একা ফিরতো। কোনোদিকে না তাকিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে চলে আসতো। এখন নয়নের সাথে মিলে দুজনের পাখনা গজিয়েছে! আমার কথা তো আর শুনতেই চায় না! দুজন মিলে কোথায় কোথায় যায়…কী করে আমি কোনো হদিসই পাই না এখন!’ আমার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে ছোটমামী একটানে কথাগুলো বলে গেল।

উপস্থিত সবাই কিছুক্ষণের জন্য কথা ভুলে গেল।

ছোটমামা মুহূর্তেই সম্বিত ফিরে পেয়ে ছোটমামীকে বললো, ‘এ্যাই…কী আবোলতাবোল কথা বলো! নয়ন হইলো বাচ্চা একটা ছেলে। ও ক্যামনে তোমার ছেলের পাখনা গজাইয়ে দিলো?’

কেউ কিছু বলার আগেই ছোটমামী আবার বললো, ‘তা কি বলছি নাকি? বলছিলাম, সুজন তো একটু বোকাসোকা। এই শহরে তো আর অত কিছু দেখেশুনে বড় হয়নি। তাই বুদ্ধিতে কাঁচা। এখন নয়ন থাকাতে বুদ্ধি খুলছে দুজনের। নয়ন ঢাকার ছেলে…কত কিছু জানে! তাই এখন দুজনে মিলে নানান কিছু করছে। আমি কি বলছি নাকি যে নয়নের জন্য…’ ছোটমামীর গলায় কিছু একটা জোড়াতালি দেওয়ার চেষ্টা।

বড়মামা গম্ভীর গলায় ছোটমামাকে বললো, ‘এ্যাই বাবু…তোরা দুজন এখন চেঁচামেচি থামা দেখি! ছেলেদুটা বাসায় আসছে না কেন খোঁজ নে! দ্যাখ কই গেল? আসল কাজ না করে বাচ্চাদের মতো চেচাচ্ছিস!’

ছোটমামা থামলো। সেই সাথে মামীও। আমি চুপচাপ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছি। এখানে কী করনীয় আমার, সেটা মোটেও নির্ধারণ করতে পারছি না। নানীও চুপ করে আছে। মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে দোয়া দরুদ পড়ার আওয়াজ শুনছি। শাড়ির জমিনের ওপর তিরতিরিয়ে নড়ে উঠছে নানীর হাতে ধরে রাখা তসবীহর অবয়ব।মনটা কেমন যেন বিষণ্ন হয়ে গেল মুহূর্তেই। মনে মনে বললাম… ‘কী পাপ করেছিলাম আমরা! কেন আমাদের দিকেই ইঙ্গিতের শিখা এভাবে বিস্ফোরিত হয়!’

এমনসময় বাইরের গেটে আওয়াজ শোনা গেল।

গল্প করতে করতে ঢুকছে নয়ন আর সুজন। দেরি করে ফেলার কারণে চোখেমুখে অপরাধবোধের ছায়ামাত্র নেই। আমি নয়নের দিকে চাইলাম। নয়নও এক ঝলক তাকালো আমার দিকে। দু’এক সেকেন্ডের দৃষ্টিপাত মাত্র। মাথা নিচু করে ফেললো নয়ন। হাতটাকে মুঠো পাকিয়ে কিছু একটা যেন লুকাতে চাইলো।

কীসের এক অজানা আশঙ্কায় আমার বুকের ভেতরটা থর থর করে কেঁপে উঠলো।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত