| 27 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
উপন্যাস ধারাবাহিক সাহিত্য

ধারাবাহিক উপন্যাস: খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি (পর্ব-৯)

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

আমার নানাবাড়ি দেশের উত্তরাঞ্চলের এক প্রত্যন্ত জেলায়। তবে ভালো রেল যোগাযোগ আছে। ঢাকা থেকে সরাসরি ট্রেনে চেপে বসলে প্রায় ছ’সাত ঘন্টা সময় লাগে।

নানা ছিলেন এই জেলারই একজন মাধ্যমিক স্কুলশিক্ষক। দুই ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে মোটামুটি সচ্ছলই একটা সংসার ছিল তার। সংসারে প্রাচুর্য না থাকলেও অভাব ছিল না। বিলাসিতা ছিল না বটে, তবে সেটা নিয়ে দিনরাত আফসোসের খিটখিটানিও ছিল না।

আমার বড়মামা আর ছোটমামার মাঝের জন হচ্ছে আমার মা। মাকে সবাই আদর করে পরি নামে ডাকতো। বড়মামার সাথে মায়ের বয়সের ব্যবধান প্রায় দশ বছর আর ছোটমামার সাথে পাঁচ বছর। এক সন্তান হওয়ার পরে দীর্ঘ দশ বছরের ফারাক হয়ে যাওয়ায় নানা- নানী ধরেই নিয়েছিল, তাদেরকে হয়ত এক সন্তানের মুখ দেখেই আজীবন সন্তুষ্ট থাকতে হবে। বড়মামার জন্মের দশ বছর পরে আমার মায়ের জন্ম হলো। আঁতুড়ঘরেই মায়ের ফুটফুটে মুখটি দেখে ধাত্রী বলেছিল, ‘মাস্টারসাবের ঘরেত তো পরি জন্মাইলো রে আল্লাহ্‌! এই পরিরে ওহন ক্যামনে সামাল দিবা কও!’

 

পরিকে সামাল দেওয়া সত্যিই বড় দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে গিয়েছিল। একে তো চেহারাটাই ছিল পরীর মতো, তার ওপরে প্রথম সন্তানের পরে দীর্ঘদিনের বিরতিতে জন্ম হওয়ায় তার আদর আহ্লাদ আর বায়নাক্কার সীমা ছিল না। মেয়ের নজর যে একটু উঁচুর দিকে, এটা নানা-নানী মেয়ের ছোটবেলাতেই বুঝতে পেরেছিল। একমাত্র মেয়ের নানারকম আবদার মেটাতে তারা নিজেদের সাধ্যের চেয়ে বেশিই করতো সবসময়।তবুও মেয়ের মন যেন ঠিক ভরতে চাইতো না। বন্ধুদের কারো কাছে ভালো জামা জুতা দেখলেই পরির মনের মধ্যে খচ খচ করতো। বাবার সাধ্যের সাথে নিজের সাধের কোনোই যেন মিল খুঁজে পেত না পরি। আর এই বিষয়টা নিয়েই সবসময় নিজের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতেও কুন্ঠাবোধ করতো না।

 

মা-বাবা আর ভাইয়ের নয়নের মণি পরিকে দেখে প্রত্যেকেরই চোখ টাটাতো। পরি কিন্তু কাউকে পাত্তা দিত না। কারো কথারও তোয়াজ করতো না। তবে তার কথাবার্তা আর আচার আচরণ মাঝে মাঝেই লাগামছাড়াও হয়ে যেত। কেউ কেউ আড়ালে বলতো, ‘অতি আদরে মাস্টারসাবের মেয়েটা বাঁদর হয়ে যাচ্ছে। এখন থেকেই লাগাম না টেনে ধরলে পরে পস্তাতে হবে!’

আমার নানী তার মেয়ের পায়ে রাশ টানার অনেক চেষ্টাই করেছিল। কিন্তু মেয়ে ছিল তার বাবার নয়নের মণি। কাজেই রাশ টানতে বাপ আর মেয়ে দুজনেরই শক্ত বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। নানী দিনরাত নানার সাথে খ্যাচখ্যাচ করতো, ‘অত আহলাদ দিও না গো। পরে সামলাইবার পারবা না!’

নানা সস্নেহে বলতো, ‘দশটা না পাঁচটা না…একটা মোটে মেয়ে, তাও তুমি এমন করো! মানুষের কথায় কান না দিলেই হয়!’

 

কিন্তু সময় যত এগুতে লাগলো, নানা নিজেই বুঝতে পারলো মানুষের কথায় কান না দিয়ে উপায় নেই। এখন সত্যিই মেয়েকে একটু টেনে ধরতে হবে। নইলে এর জের কতদূর গড়াবে বলা মুশকিল।

জের গড়ানোর জন্য খুব বেশিদিন অবশ্য অপেক্ষাও করতে হলো না। একটু বড় হতে না হতেই পরির রূপের অনেক সমঝদার হাজির হয়ে গেল। সেসব সমঝদারদের সমঝদারিত্তে পরির কচি মাথা স্বভাবতই একটু বেসামাল হয়ে গেল।

 

সংসার চালানোর তাগিদে নানাকে স্কুলের পাশাপাশি প্রাইভেট পড়াতে হতো। বিকাল থেকেই ছাত্র ছাত্রীরা আমার নানার কাছে প্রাইভেট পড়তে আসতো। ছাত্রীর চেয়ে ছাত্রের সংখ্যাই বেশি। তারা পড়ার ফাঁকে ফাঁকে আশেপাশে উঁকিঝুঁকি মারতো, যদি স্বর্গের পরি মর্তে এসে ধরা দেয়। একসময় নানাও জানতে পারলো, ছাত্রদের এই গোপন অভিষন্ধির খবর। মেয়েকে আশেপাশে ঘুরঘুর করতে নিষেধ করেও বিশেষ একটা লাভ হতো না। মেয়ে চলতো তার আপন খেয়ালখুশিতে। অন্যের মতামতের গুরুত্ব দেওয়ার ধাত আমার মায়ের ছোটবেলা থেকেই ছিল না।

নানাকে কড়া হতেই হলো, যখন বিষয়টাতে বেশিরকম বাড়াবাড়ি হলো। আশেপাশের পাড়াপ্রতিবেশিরা ফিসফাস জুড়ে দিলো এই নিয়ে।

‘মাস্টারসাবের মাইয়া তো যেইরকম পাড়াবেড়ানি। এই মাইয়া কতজনের মাথা ঘুরাইবো কেডা জানে!’

 

ছাত্রদের মধ্যে কেউ কেউ চুড়ান্ত বাড়াবাড়ি করলো। খাতার ভাঁজে চিঠি লিখে রেখে যেত, যদি সেই চিঠি কখনো মাস্টারমশাইয়ের মেয়ের হাতে পড়ে। মেয়ের আগে কিছু কিছু চিঠি মাস্টারমশাইয়ের হাতে পড়ে যেত। কৈফিয়ত দাবী করলে ছাত্ররা সাতপাঁচ নানারকম বাহানা বানাতো। নানা কয়েকজনের পড়ানো বন্ধ করে দেখতে পেল, বিপদ তাতে আরো বেশি। মান-সম্মান কিছুই আর থাকে না। ছাত্রদের মা-বাবারা এসে নানার কাছে নালিশ জানিয়ে গেল, ‘আমাদের ছেলের পড়ানো বন্ধ করে কী করবেন? আপনার মেয়েই তো যত গণ্ডগোলের গোড়া!’

 

নানা পড়লো বিপদে। এদিকে মেয়েকেও বেশিকিছু বলতে পারে না। দুইটার বেশি তিনটা কথা বললেই মেয়ে কেঁদেকেটে বাড়ি মাথায় তোলে। মেয়ে কোনো দোষেরই ভাগ নিতে রাজি নয়।ছেলেরা তাকে দেখে ছোঁকছোঁক করলে সে কী করবে? এমন যুক্তি মুখে সবসময়ই লেগে থাকে।

এই বিপদের পাশাপাশি তার নিত্যনতুন জামাকাপড়ের চাহিদা তো ছিলই! নানানানী চোখে এবারে সত্যি সত্যিই অন্ধকার দেখতে লাগলো। আমার মা তখন সবে কলেজে উঠেছে। পড়ালেখাতে যত না মনোযোগ, তারচেয়ে অন্য সব বিষয়েই আগ্রহ বেশি। কলেজে পড়ার সময়েই বান্ধবীদের মধ্যে পত্রমিতালীর ধুম ওঠে। কে কত হ্যাণ্ডসাম ছেলেকে পত্রমিতা বানাতে পারে, এটা নিয়ে একটা গোপন প্রতিযোগিতা লেগে থাকতো সবার মধ্যে। নিজের মা-বাবার চোখ বাঁচিয়ে আমার মাও বান্ধবীদের সাথে মিলে সাগ্রহে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিলো।


আরো পড়ুন: খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি (পর্ব-৮)

আমার বাবা তখন ইউনিভার্সিটিতে থার্ড ইয়ারে পড়ছে। দেখতে শুনতে খারাপ না। কিন্তু তারচেয়েও বড় কথা, বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর ছেলে। নিজের গাড়িতে চড়ে ইউনিভার্সিটিতে আসা যাওয়া করে। মাঝে মাঝে বন্ধুদের নিয়ে লংড্রাইভে বের হয়।বড়লোকের ছেলের তকমা লেগে থাকার কারণেই তার পেছনেও অনেক মেয়ের নজর আছে। কিছু বন্ধু মজা করে বাবার ঠিকানা কোনো এক জাতীয় দৈনিকের ‘বন্ধুসভা’র আসরে দিয়ে ফেললো। ঠিকানার পাশে বাবার একটা ছবি। ঝকমকে লাল মারুতি গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে তোলা বাবার সেই ছবিটা ঘটনাচক্রে আমার মায়ের চোখে পড়ে গেল।

ছেলেপুলে তো কবে থেকেই আমার মায়ের পেছনে লেগে আছে! কিন্তু এমন একজন গাড়িওয়ালা বাপের ছেলে তো তখন অব্দি মায়ের পেছনে লাগেনি। তাই এই ছেলেটাকেই আমার মায়ের মনে ধরে গেল। বলাইবাহুল্য, বাবার চেহারা বেশভূষা যতটা না তাকে আকৃষ্ট করলো, সুদৃশ্য গাড়িটাই অনেকবেশি আকর্ষণ করলো।

বন্ধুবান্ধবরা বাবার ঠিকানা এভাবে প্রকাশ্যে দিয়ে ফেলায় বাবা একটু রাগ দেখিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আমার মায়ের লেখা চিঠি পেয়ে আর তার সুন্দর ছবি দেখে সেই রাগ পানি হতে সময় লাগলো না।

গল্পের সূচনাটা এভাবেই। তারপর বন্ধুবান্ধব মিলে লংড্রাইভে বের হয়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের এক জেলায় ঢুঁ মেরে যাওয়াটা এমন কী আর বেশি কথা! আমার মা-বাবার ভালোবাসাবাসি আর কাছে আসার শুরুটাও এভাবে হয়েছিল।

 

এই গল্পটা জোড়াতালি লাগিয়ে এর ওর কাছ থেকে প্রায় পুরোটাই শুনে ফেলেছি আমি। আমাদের সুখের দিনগুলোতে মায়ের কাছ থেকেই শুনেছি কিছু অংশ। অবশ্যই নিজের বিলাসিতা বা আদর আহলাদের অংশটুকু অন্য কারো কাছ থেকে শোনা। সম্ভবত নানী মাঝে মাঝে এই অংশগুলো জুড়ে দিয়েছিল। সত্য মিথ্যা মিশিয়ে আমার কিশোরীমন এই গল্পকে নানাভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছে। যে যে অংশটুকু আমার মন গ্রহণ করতে রাজি হয়নি, তা মনের কোনো এক সুরক্ষিত অলিন্দে কষ্ট হয়ে জমা হয়ে আছে। সেই কষ্টকে আপন করতে পারিনি কখনো…তবু তাকে অস্বীকারই বা করি কীভাবে?

 

আমার দুই মামাই সাধাসিধে মানুষ। বড়মামাও নানার মতো শিক্ষকতা পেশাতেই থেকে গেছে। কিন্তু ছোটমামা তেমন সুবিধা করতে পারেনি। একটি সরকারি অফিসে কলম পিষে আর কেরানিগিরি করে তাকে চলতে হয়। আমার মামীরাও কেউ উচ্চাভিলাষী নয়। সাধাসিধে স্বামীর ঘরে সংসার করতে এসে নুন তেল পেঁয়াজ নিয়ে দুদিন পর পরই তারা মুখ কালো করে না। আমার বিধবা নানীকেও তার দুই বউ যত্নআত্তি কিছু কম করে না।

বড়মামার তিনমেয়ে। সুবর্ণা, সুরমা ও সুনেত্রা। বড়মেয়ে সুবর্ণা আপার বিয়ে হয়ে গেছে। মামার মেজ মেয়ে সুরমা আমার বয়সী। আর সুনেত্রা স্কুলে পড়ছে। আমাদের বাসায় বড়মামা মাঝে মাঝে তার এই তিন মেয়েকে নিয়ে যেত। সুরমার সাথে আমার মাখামাখিটা তখন সবে শুরু হয়েছে। আমাদের বাসায় আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও চিঠি আদানপ্রদানচলতো। তাই সম্পর্কের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে বিশেষ অসুবিধা হলো না।

ছোটমামার একটাই ছেলে বিজন, স্কুলে পড়ে। বিজনকে এর আগে একবার কী দুইবার দেখেছিলাম। প্রথম দু’একদিন আমাকে আর নয়নকে দেখে সে ভারী লজ্জা পেলো। তবে তা কেটে যেতেও সময় লাগলো না। নতুন দুইটি ভাইবোন পেয়ে আমার মামাতো ভাইবোনেরা খুব খুশি হয়ে উঠলো। বাড়িটা ছোটখাট আর বৈভববিহীন হলেও মনের বৈভবে তারা ভরপুর ছিল আগাগোড়া। দুইমামা আমাদের এই প্রাক্তন নানাবাড়িতেই দিনের পর দিন আঁটসাঁট হয়ে বাস করে আসছে। স্থানের স্বল্পতা তাদের মনের প্রাচুর্যকে সংকুলান করতে পারেনি ঠিকই, তাদের সংকুলান ভালোভাবেই হয়ে গেছে।

আমি আর নয়ন তাদের সেই আঁটসাঁট সংসারে গিয়ে অনাহুতের মতো জুড়ে গেলাম। আমাদের দুই মামা-মামী, মামাতো ভাই-বোন আর নানী আমাদের সাগ্রহে বুকে টেনে নিলো। আমাদের অতীতজীবন কিংবা মা-বাবার নতুন জীবন নিয়ে তাদের আগ্রহের ঔদাসীন্য আমাদের কিছুটা স্বস্তি দিলো। যদিও পাড়াপ্রতিবেশিরা সেই অভাব বেশ ভালোভাবেই মিটিয়ে দিলো।

 

নতুন আরেকটি অধ্যায় যুক্ত হলো জীবনে। আমি সেখানকারই এক কলেজে ভর্তি হলাম। নয়ন নতুন একটি স্কুলে। আর্থিক বিষয়টা নিয়ে তখনো ভাবনাচিন্তা করে দেখিনি। পরে শুনেছিলাম বাবা টাকা পাঠাতে চেয়েছিল। কিন্তু মামা সেই টাকা নিতে চায়নি। অবশ্য এসব গল্প শুনেছি অনেক পরে এসে।

ততদিনে আমাদের জীবনটা এখানে পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে। শিকড় ছড়িয়ে বসা মহীরুহ থেকে ছিটকে আসা দুটো চারাগাছে নতুন জলসিঞ্চনে আবার একটু একটু করেপ্রাণের স্পন্দন দেখা দিলো।

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত