Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Chocolate

বিশেষ প্রতিবেদন: চকলেটের দুনিয়া । নুসরাত জাহান

Reading Time: 3 minutes
চকলেট বলতে নানা প্রকার প্রাকৃতিক ও প্রক্রিয়াজাত খাবারকে বোঝায় যা গ্রীষ্মমন্ডলীয় কোকোয়া গাছের বীজ থেকে উৎপাদন করা হয়। গ্রীষ্মমন্ডলীয় দক্ষিণ আমেরিকার নিম্নভূমির স্থানীয় উদ্ভিদ কোকো অন্তত তিনশ’ বছর মধ্য আমেরিকা ও মেক্সিকোতে চাষ করা হচ্ছে, এবং এর ব্যবহারের সবচেয়ে পুরনো লিখিত প্রমাণ হল ১১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের।
খাবারের জগতে চকলেট একটি লোভনীয় নাম। ছোটরা তো বটেই, বড়রাও চকলেটের লোভ সামলাতে পারেন না সহজে। নানা ধরনের, নানা স্বাদের, নিত্য নতুন ধরনের চকলেট জিভে জল এনে দেয় সকলের। চকলেটের নাম চকলেট হলো কীভাবে, সে গল্পও বেশ মজার। ইংরেজি ভাষায় chocolate শব্দটা এসেছে স্প্যানিশ ভাষা থেকে। তবে স্প্যানিশ ভাষায় এই শব্দটা কীভাবে এসেছে, তা নিয়ে রয়েছে মতভেদ। ধারণা করা হয়, নাহুয়াতি ভাষা, অর্থাত্‍ অ্যাটজেকদের ভাষার শব্দ chocolatal থেকে এসেছে chocolate শব্দটি। এই chocolatal এসেছে xocolatl থেকে। xococ এর অর্থ হলো তেতো এবং atl এর অর্থ হলো তরল বা পানীয়। আবার অনেকের ধারণা, chocolate শব্দটা অ্যাজটেক ও মায়ান দু ভাষা থেকেই এসেছে! মায়ান ভাষায় chokol মানে গরম এবং নাহুয়াতি ভাষায় atl মানে পানীয়। এবং এ দুটো শব্দের সমন্বয় ও বিবর্তনেই এসেছে chocolate শব্দটি। মায়া সভ্যতার মানুষেরা পানীয় হিসেবে পান করতো চকলেট। তবে সেসময় শুধু ধনীদের খাবার ছিল এটি। ইউরোপীয়রা মায়া সভ্যতা আবিষ্কারের পর থেকে চকলেট জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সবার খাবারে পরিণত হয়।
চকলেট তৈরির মূল উপকরণ হলো কোকোয়া গাছের বীজ! দক্ষিণ আমেরিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকা আমাজন উপত্যকার উদ্ভিদ এটি। কোকোয়া গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Theobroma cacao। গ্রীক ভাষায় Theos মানে ঈশ্বর এবং broma মানে খাদ্য। অর্থাত্‍ এটি ঈশ্বরের খাদ্য! কোকোয়া শব্দটি এসেছে কাকাওয়া থেকে। এর অর্থও ঈশ্বরের খাবার। ১৫০০ থেকে ৫০০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দ পর্যন্ত মধ্য আমেরিকায় বসবাসকারী ওলমেক জাতিভুক্ত মানুষেরা এই নাম দিয়েছিল।
কোকোয়া গাছ খুব বেশি বড় হয় না। বড়জোর ২০-২৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। এটি চিরসবুজ বৃক্ষ এবং গাছের পাতা গাঢ় সবুজ রঙের। কাণ্ড ও ডালে সাদা ও গোলাপি রঙের ছোট ছোট, থোকা থোকা ফুল ফোটে। কোকোয়া ফল দেখতে অনেকটা নাশপাতির মতো। পেকে গেলে মেটে লাল বা হলুদ রং ধারণ করে। ভেতরে ছোট ছোট বীজ থাকে। এই বীজ শুকিয়ে নিয়ে গাজানোর পর তা গুঁড়ো করা হয়। এই গুঁড়ো থেকেই তৈরি হয় চকলেট। আসলে চকলেট তৈরিতে কোকোয়া ব্যবহার করা হয় দুভাবে। এর গুঁড়ো অথবা কোকোয়ার মাখন। সাধারণ মিষ্টি চকলেট বা মিল্ক চকলেটে ব্যবহার করা হয় কোকোয়ার মাখন, চিনি, দুধ ও অন্যান্য উপকরণ। এতে কোকোয়ার গুঁড়ো মেশানো হয় না। ডার্ক চকলেট তৈরিতে ব্যবহার করা হয় কোকোয়ার গুঁড়ো। প্রায় তিনশ বছর ধরে আমেরিকা ও মেক্সিকোতে কোকোয়া গাছের চাষ হচ্ছে। এর ব্যবহারের সবচেয়ে পুরোনো তথ্য পাওয়া গেছে লিখিতভাবে। এটি লেখা হয়েছিল খ্রীষ্টপূর্ব ১১০০ অব্দে! মেসোআমেরিকান লোকেরা কোকোয়া থেকে তৈরি করত বিশেষ ধরনের পানীয়। ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯৫ সালে মধ্য আমেরিকা থেকে কোকোয়ার বীজ ইউরোপে নিয়ে আসেন। চকলেট পানীয় তৈরি করতে ইউরোপীয়রা এতে দুধ ও চিনি যোগ করে, যা মেক্সিকানরা করতো না! পরে ফরাসীরা এই গাছের সন্ধান পায়। ১৬৫৭ সালে এক ফরাসী নাগরিক ‘চকলেট হাউস’ প্রতিষ্ঠা করে একে জনপ্রিয় করে তোলেন। দীর্ঘদিন চকলেট পানীয় হিসেবেই খাওয়া হতো। ১৯ শতকে Briton John Cadbury প্রথম চকলেটকে শক্ত আকার দিতে সক্ষম হন। বর্তমান সময়ের আধুনিক চকলেট বারের জনক তিনিই। ১৮৯০ থেকে ১৯৫০ সালে কোকোয়া চাষের প্রসার ঘটে। আমেরিকা-মেক্সিকো তো বটেই, এর চাষ শুরু হয় আইভরি কোস্ট, ঘানা, নাইজেরিয়া ও ক্যামেরুনে। মালয়েশিয়া, নিউগিনি ও ইন্দোনেশিয়াতেও কোকোয়া চাষ করা হয়।
চকলেট নানা উপলক্ষের উপহার হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। নববর্ষ, ঈস্টার, বড়দিন, জন্মদিন, ভালবাসা দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের চকলেট তৈরি করে থাকে চকলেট কোম্পানিগুলো। ডিম, খরগোশ, মুদ্রা ও হৃদয় আকৃতির চকলেট সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। চকলেট নিয়ে গবেষণারও অন্ত নেই! যাঁরা নিয়মিত চকলেট খান, তাঁদের স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে যায় এমনটা বলেছেন সুইজারল্যান্ডের কিছু গবেষক। তাঁরা প্রায় ৩৩ হাজারের বেশি নারীর ওপর একটা জরিপ চালিয়ে এই তথ্য দেন। তবে চকলেট অধিক পরিমাণে খাওয়া যাবে না। চকলেটে চর্বি ও চিনি থাকায় এতে উচ্চ পরিমাণে ক্যালরিও আছে! ডার্ক চকলেটে কোকোয়ার পরিমাণ বেশি থাকায় তা বেশি উপকারী। আরেকটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, প্রতিদিন চকলেট খেলে বৃদ্ধদের স্মৃতিভ্রম প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ গবেষণাটি করেছেন ইতালির লেককুইল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। ৯০ জন বয়স্ক, স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া রোগীর ওপর এ পরীক্ষণটি করা হয়। বৃদ্ধদের টানা আট সপ্তাহ কোকো পানীয় পান করানো হয় বিভিন্ন মাত্রায়। উচ্চ মাত্রার পানীয় যাঁদের দেয়া হয়েছিল, তাঁদের স্মৃতিশক্তি বাড়তে দেখা যায়!
শুধু কি গবেষণা! চকলেট দিয়ে তৈরি করা হয় স্থাপনাও! চকলেট দিয়ে সবচেয়ে বড় স্থাপনাটি তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ইরভাইনে অবস্থিত ‘ইনস্টিটিউট অব চকলেট অ্যান্ড পেস্ট্রি’। তারা তাদের প্রতিষ্ঠানের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত বছর এটি তৈরি করে। চকলেট উত্‍পাদনের ইতিহাসকে সম্মান জানাতে তারা মায়া সভ্যতার একটি মন্দির ‘চিচেন ইত্‍জা’র নকশা অনুযায়ী এটি তৈরি করে। ছয় ফুট উঁচু এবং ১০X১০ ফুট প্রশস্ত এই স্থাপনাটি তৈরি করতে প্রয়োজন হয়েছে ১৮ হাজার ২৩৯ পাউন্ড বা প্রায় ৯ টন চকলেট। এবং এর পুরোটাই খাবার যোগ্য। চকলেটের ৩০০০ বছরের পুরোনো ইতিহাসকে তুলে ধরার জন্য রয়েছে ‘চকলেট মিউজিয়াম’ও। জার্মানির কোলন শহরে অবস্থিত এই মিউজিয়ামটি বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র চকলেটের মিউজিয়াম। ৪০০০ বর্গমিটার জায়গাজুড়ে কাচ ও ধাতুর তৈরি এই মিউজিয়ামটি দেখতে ঠিক জাহাজের মতো! চকলেট কোম্পানি ‘স্টলভের্ক’-এর মালিক হ্যান্স ইমহোফ এটি তৈরি করেন ১৯৯৩ সালে। এখানে চকলেটের জন্ম থেকে শুরু করে চকলেট সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য রয়েছে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>