মুম রহমানের অনুবাদে কাফকার অণু গল্প


৩ জুন ফ্রানৎস কাফকার প্রয়ানদিবসে ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


পাহাড়ে পরিভ্রমণ
‘আমি জানি না,’ কেউ শুনল না কিন্তু আমি চিৎকার করে উঠলাম।, কেউ শোনেনি, ‘জানি না আমি। যদি কেউ না আসে, তাহলে কেউ আসবে না। আমি কারো কোনো ক্ষতি করিনি, কেউ আমার ক্ষতি করেনি, কিন্তু আমাকে কেউ সাহায্যও করবে না। একগুচ্ছ কেউ না। তথাপি সেটাই সকল সত্য নয়। কেবলমাত্র সেই কেউ না-ই আমাকে সাহায্য করে- অন্যদিকে একদল কেউ না-ই ভালো। আমি একটা আনন্দ ভ্রমণে যেতে ভালোবাসবো- কেন নয়?- একদল কেউ না-এর সাথে অবশ্যই পাহাড়ে, আর কোথাই বা? কী করে এই কেউ না- এর দল একে অপরকে গুতাচ্ছিল, তাদের সবার প্রসারিত বাহু একত্র ছিল, এই অগণিত পা খুব কাছ থেকে একে অপরকে মাড়িয়ে যাচ্ছিল! অবশ্যই তারা সবাই স্যুট পরা ছিল। আমরা এতো উল্লাস করতে করে যাচ্ছিলাম, বাতাস আমাদের মাঝখান দিয়ে এবং আমাদের অন্তবর্তী ফাঁকা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। আমাদের কণ্ঠস্বর ফুলে উঠছিল এবং পাহাড়ে মুক্ত হয়ে গেল! এটা বিস্ময়কর যে আমরা গানে গানে ফেটে পড়িনি।’

 

 

পথচারী
তুমি যখন তখন রাত্রিরে হাঁটতে বের হয়ে পথে এবং একটি লোক দূরে দৃশ্যমান- পথটি পাহাড়ের দিকে উঠে গেছে আর সেথায় পূর্ণিমার চাঁদ- তোমার দিকে এগিয়ে আসে, বেশ, তুমি তো তাকে ধরতে পারো না, এমনকি সে যদি ক্ষীণকায় এবং জীর্ণ প্রাণ হয়, এমনকি কেউ যদি তাকে চিৎকার করে তাড়া করে, তবু তুমি তাকে যেতে দাও।
কেননা এ হলো রাত্রিকাল এবং তুমি কোনো  সহায়তায় করতে পারবে না যদি পথটি তোমার আগেই চাঁদের আলোর দিকে যায় এবং তা ছাড়াও তারা দুইজন হয়তো নেহাত আনন্দের বশে একে অপরকে তাড়া করছিল, অথবা তারা দুইজন হয়তো তৃতীয় কাউকে তাড়া করছিল, হয়তো প্রথম যেন একজন নির্দোষ মানুষ এবং দ্বিতীয় জন তাকে খুন করতে চায় এবং তুমি হয়তো নেহাত একটি উপকরণে পরিণত হতে পারো, হয়তো তারা একে অপরের সম্পর্কে হয়তো কিছুই জানে না আর আলাদা ভাবেই ছুটে যাচ্ছে বাড়িতে বিছানার দিকে, হয়তোবা তারা নিশাচর, হয়তোবা প্রথম লোকটির হাতে অস্ত্র আছে।

এবং যে কোনভাবেই, তোমারই কি ক্লান্ত হওয়ার অধিকার নেই, তুমি কি যথেষ্ট পান করোনি? তুমি কৃতার্থ যে দ্বিতীয় লোকটি এখন তোমার দৃষ্টি সীমার বাইরে।

 

 

 

পোশাক
প্রায়শই আমি যখন পোশাকগুলোকে দেখি নানা ভাঁজে, কুচিতে বা ঝালরে যেগুলো দারূণ সব শরীরে মসৃণভাবে লেগে থাকে আমি তখন ভাবি এই মসৃণতা দীর্ঘক্ষণ রাখতে পারবে না তারা, কিন্তু হয়তো এমন ভাঁজের দাগ পরে যাবে যা ইস্ত্রি করলেও যাবে না, এম্ব্রয়ডারির উপরে এমন পুরুভাবে ধুলা জমবে যা ঝেরে ফেলা যাবে না, এবং কেউই এতোটা অসুখি আর নির্বোধ হতে চাইবে না যে একই মূল্যবান গাউন প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত পরতে চাইবে।

এবং তবুও আমি সেইসব মেয়েদের দেখি যারা যথেষ্ট সুন্দরী এবং তাদের আকর্ষণীয় পেশি ও ছোট্ট হাড় ও মসৃণ ত্বক এবং গুচ্ছ গুচ্ছ নরম চুল এবং যাই হোক তারা আসে আর যায় দিনের শুরুতে ও শেষে, সদাই একই মুখ সাজিয়ে একই হাতে হাত রেখে আর এইসব কিছুই আয়নায় প্রতিবিম্বিত হতে দেয়।
শুধু মাঝে মাঝে রাত্রিরে, কোনো এক পার্টি থেকে দেরিতে ঘরে ফেরে, তখন আয়নায় দেখে মনে হয় তাদের পোশাকগুলো বহুল ব্যবহৃত, ফাঁপা, ধুলাময়, ইতিমধ্যে এতো মানুষ দেখে ফেলেছে এবং সেগুলো সহজে পরিধানের উপযুক্ত নেই আর।

 

 

 

ট্রামে চড়ে
আমি ট্রামের শেষ প্লাটফর্মে দাঁড়াই এবং একেবারে অনিশ্চিত হয়ে উঠি এই জগতে, এই শহরে, এই পরিবারে আমার পা রাখার জায়গা আছে কিনা। এমনকি দৈবাৎ আমি কোনোরকম দাবি করতে পারি না যে আমি কোন পথেই সঠিকভাবে এগুচ্ছি। এই প্লাটফর্মে দাঁড়ানো, এই হাতল ধরে থাকা, এই ট্রামের আমাকে বয়ে নিয়ে যাওয়া, নয়তো এই যে লোকেরা ট্রামকে পথ দেয় অথবা একা ধীরে হেঁটে যায় অথবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দোকানের জানালা দেখে এমনকি স্বপক্ষেও আমার কোনো কিছু বলার নেই।

ট্রামটি একটি বিরতি স্থলে থামে আর একটি মেয়ে সিঁড়িতে তার অবস্থান নেয়, নামার জন্য তৈরি। সে আমার এতটা নিকটে যেন আমি তার উপর আমার হাত বুলাতে পারি। সে কালো পোশাকে সজ্জিত, তার স্কার্টের ভাঁজগুলো প্রায় স্থির হয়ে ঝুলছে, তার ব্লাউজটি আটোসাটো এবং কলারে সাদা সূক্ষ্ম লেসের বুনন আছে। ট্রামের বিপরীতে তার বা হাত সমান্তরাল, ডান হাতে ধরা ছাতাটি ট্রামের উপরের সিঁড়ির দ্বিতীয় ধাপে বিশ্রামরত। মুখ তার বাদামি, নাকটা পাশে সামান্য খাড়া আর মাথার দিকটা বড় গোলাকার। তার মাথা ভর্তি ঘন বাদামী চুল আর ডানদিকে কানের পাশে ছড়ানো চুর্ণকুন্তল। তার ছোট্ট কানদুটো ঘণ সংবদ্ধ, কিন্তু আমি যেহেতু তার কাছেই আছি আমি দেখতে পেলাম তার ডানকানের পুরো ঘের এমনকি কান ঘিরে ছায়াটিও।

এই প্রসঙ্গে আমি নিজেকেই জিজ্ঞেস করি : এটা কীভাবে সম্ভব যে সে নিজেকেই নিয়ে মুগ্ধ হয় না, কিভাবে সে তার ঠোঁট বন্ধ রাখে ও কোনো মন্তব্য না করে থাকে।

 

 

 

রেড ইন্ডিয়ান হওয়ার আকাঙ্খা
যদি কেউ শুধুমাত্র ইন্ডিয়ান হতো, সাথে সাথেই সতর্ক হতো এবং একটি রেসের ঘোড়ার উপর, বাতাসের বিরুদ্ধে কম্পিত ঝাঁকুনি দিত কম্পিত মাটির উপর, ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ ঘোরসওয়ারের পেরেকের জুতো থেকে পেরেক খসে যেতো, যেহেতু আর পেরেকের দরকার নেই, লাগামও ছুঁড়ে ফেলে দিত, কেননা লাগামেরও দরকার নেই এবং কায়ক্লেশে দেখতে পেতো আগের সেই জমিতে মসৃণ করে ছাটা গুল্ম ততক্ষণে ঘোড়ার ঘাড় ও মাথা পার হয়ে গেছে।

 

 

 

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত