| 20 এপ্রিল 2024
Categories
ইরাবতীর বর্ষবরণ ১৪২৮

ইরাবতীর ছোটগল্প: বামন অবতার । মৃত্তিকা মাইতি

আনুমানিক পঠনকাল: 13 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,irabotir golpo mritika maity

দীনেশ বিয়ে করে বউ নিয়ে ফিরছে। আজ আদিপুর গ্রামে এটাই বড় খবর।

এখানে ওখানে মোড়ের মাথায় বাচ্চা-বুড়ো, বউ-ঝি দলে দলে জটলা পাকাচ্ছে। অপেক্ষা করতে করতে কেউ কেউ ধুলোয় থেবড়ে বসেও পড়েছে। এ ওকে জিজ্ঞস করছে, ‘কী রে, বর-কন্যা দেখতে পেলি?’

কেউ উত্তর দিল, ‘কই আর, তুমি যেখানে আমরাও সেখানেই।’ বলে পা-দুটোকে মাটিতে কয়েকবার ঝাড়া দিয়ে সেও শাড়ির আঁচল পেতে বসে পড়ল।

দীনেশের বউ দেখার অপেক্ষায় পাড়ার বউ-মেয়েরা আজ বাড়ির কাজ শিকেয় তুলে রাস্তায় নেমে গল্পে মত্ত। বাড়ির কর্তারা তা মানবে কেন? দীনেশ কী এমন পাত্র যে তার বউ দেখার জন্যে চুলায় হাঁড়ি চড়বে না! সে কি যুদ্ধ জয় করে ফিরছে? খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে, ঘরদোর খোলা ছেড়ে রাস্তায় নামতে হয়েছে কেন? কর্তাদের রাগ তো সপ্তমে চড়বেই। তার ওপর দীনেশের বউভাতে খেতে যেতে পারবে কিনা ঠিক নেই। বামনের আবার বিয়ে, তার আবার নেমন্তন্ন! তাছাড়া যাকে এতদিন মানুষ হিসেবে মানুষের খাতায় বসায়নি তার বউভাতে পাত পেড়ে খেতে যেতে কেমন কেমন লাগছে।

হঠাৎ বাদল মাইতির নাতি বাবুলাল চেচিয়ে উঠল, ‘ওই দ্যাখো— বর-কন্যা আসছে।’ যারা দাঁড়িয়ে ছিল, তারা তির ছোড়ার মতো তাদের দৃষ্টি এদিক ওদিক ছুড়ে দিল। যারা ধুলোয় বসেছিল, ধুলো ঝেড়ে উঠে পড়ল। কিন্তু কাউকে দেখতে না পেয়ে বাবুলালের গালে একটা টোকা মেরে একজন বলল, ‘বড়দের সঙ্গে রহস্য হচ্ছে?’

বাবুলাল কাঁচুমাঁচু হয়ে বলল, ‘বড়খানথানের দিকে দ্যাখো না, আমি কি মিছা কথা বলছি!’

এতক্ষণ সবাই যেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চোখ ঝাপসা করে ফেলেছে এখন ঠিক তার উলটো দিকে ঘুরে গেল। একজন অবাক হয়ে বলল, ‘সামনের রাস্তা দিয়ে না এসে বড়খানথান ঘুরে আসছে কেন?’ তার কথা শোনার অপেক্ষায় কেউ যদিও দাঁড়ায়নি। সেদিকে ছুট লাগিয়েছে।

দীনেশ তার বউকে নিয়ে ভ্যানরিকশায় আসছে। বাসস্টপে নেমে ভ্যানে করে গ্র‌ামে ঢুকতে হয়। মাটির রাস্তা। দু’পাশে চাবরা চাবরা ঘাস, খেজুরগাছ, বাজবরণের ঝোপ। মাঝে মাঝেই খানা-খন্দ। ভোটের আগে পঞ্চায়েতের মেম্বার রাস্তায় মোরাম ফেলেছিল ক’বছর হয়ে গেল। সেই মোরাম বর্ষায় কবেই ধুয়েমুছে সাফ। রাস্তা ফের এবড়োখেবড়ো। আবার ভোটের আগে দেখা যাবে নতুন বউয়ের মতো সেজে গেছে। সেই রাস্তায় ঢকর ঢকর করে ঝাঁকুনি খেতে খেতে আসছে ভ্যান। দীনেশ পা ঝুলিয়ে বসে। রাস্তা থেকে অনেক উঁচুতে পা-দুটো এলোমেলো দোল খাচ্ছে। ভ্যানে বউয়ের সঙ্গে আর একজনও বসে, দীনেশের মাসি। দীনেশের বাবা আর বোনও তাদের সঙ্গেই ছিল তবে তারা আর এদিকে আসেনি। সোজা রাস্তায় বাড়ির দিকে গেছে।

বড়খানথানে এসে ভ্যান থেকে লাফ দিয়ে নামল দীনেশ। তারপর বউকে বলল, ‘লাফিয়ে নামো।’

বউয়ের পরনে লাল-হলুদের ডুরে শাড়ি। ঘোমটার ওপর দিয়ে শোলার মুকুট বাঁধা। মাথা ঝুঁকিয়ে বসে রয়েছে বলে নতুন বউয়ের মুখ দেখা যাচ্ছে না। এদিকের নিয়ম হল বিয়ের সময় বরকেও আলতা পরতে হয়। দীনেশের সেই আলতা পরানো পায়ে নতুন চটি, পরনে কোঁচানো ধুতি, পাঞ্জাবি, মাথায় টোপর। দেখে কেউ ভাবতে পারে ঠিক যেন বাচ্চারা খেলাঘরের বর-বউ সাজিয়েছে।

দীনেশ ভ্যানের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘আমি হাত ধরছি, তুমি নামো।’

বউ শাড়ির ভেতর থেকেই দেখতে পাচ্ছিল, তার দিকে অনেকে তাকিয়ে। কানে কানে কীসব বলাবলিও করছে। সে ঘোমটা আরও একটু সামনের দিকে টেনে নিয়ে ভ্যান থেকে লাফিয়ে পড়ল। তার লাফানো দেখে সেখানে যারা ছিল সবাই খিলখিল করে হেসে উঠল। পবন মণ্ডলের বউ চিন্তামণি বলল, ‘কী রে দীনেশ, আমাকে বললে আমিই না হয় তোর বউকে কোলে করে নামিয়ে দিতাম। তা আমাদেরকে কি চোখে দেখতে পাচ্ছিস না? বউ পেয়ে কি শিং গজাল? বউও তো তোর সেই চিরাগদানি!’

চিন্তামণি হাত-পা নেড়ে কথা শেষ করতেই সবাই হা হা হি হি হাসি শুরু করে দিল। দীনেশের মনে হল, দূরের কোনও মাঠ থেকে একসঙ্গে অনেক শেয়াল এসে মুখ ওপরে তুলে হুক্কাহুয়া শুরু করেছে।

***

এই বড়খানথানেই দীনেশকে নিয়ে মজার শেষ ছিল না। পাশেই মুসলিম পাড়া। বড় খাঁ সাহেবের নামে সিমেন্ট-বালি দিয়ে বাঁধানো এক গম্বুজওয়ালা থান রয়েছে, তার চারপাশে চার মিনার। থানের গা ঘেঁষে একটা বটগাছ। সেই গাছ থেকে কোনও ঝুরি নামেনি। বাচ্চারা সবসময় গাছটা বেয়ে বেয়ে ওঠানামা করে তার গা হড়হড়ে করে রেখেছে। পাড়ার কয়েকজন মাথা মিলে গাছের চারপাশে দেড় কাঠা মতো জমি মাটি দিয়ে ভিড়িয়ে দিয়েছে। আগে সবাই বড়-খাঁর-থান বলত। এখন কথাটা জুড়ে গিয়ে বড়খানথান হয়ে গেছে।

বিকেল হলেই আদিপুরের বাচ্চা, বুড়ো, জোয়ান সকলে সেখানে জড়ো হয়। এমনকী আশপাশের গ্র‌ামের লোকও আসে খেলা দেখতে। মাইতি পাড়ার জোয়ান ছেলের দল রীতিমতো বাজি ধরে কাবাডি খেলে। সেই খেলা চলার সময় হাওয়া এক একদিন এমন গরম থাকে যে কেউ কোনও ঠুনকো কথা বললে লাঠালাঠি পর্যন্ত হয়ে যায়।

মেয়েদের কাবাডি খেলতে দেওয়া হয় না। তাই তারা সীতাহরণ খেলে। কাঠি দিয়ে দাগ টেনে চৌকো দুটো ঘর আঁকা হয় মাটিতে। একটা ছোট, একটা বড়। ছোট ঘরে বউ বসবে, সে-ই হল সীতা। বড় ঘরে অন্যরা। বউ বসে পড়ে বলল, ‘কুড়ি চিকে রেডি, চারপাশ দিয়ে বারাও, চারপাশ দিয়ে ঢুকঅ।’ খেলার দান তার মানে কুড়িটা। বড় ঘর থেকে একজন করে বেরিয়ে আসে। তাদের কেউ বউয়ের দলের কাউকে ছুঁয়ে দিলেই সে মইর হয়ে গেল। খেলার ফাঁকে বউ যদি সুযোগ পায় তাহলে দৌড়ে অন্য ঘরে চলে যেতে পারে। কিন্তু বড় ঘরের দল তাকে চোখে চোখে রাখে। একবার ধরে ফেলতে পারলেই সীতাহরণ।

যারা একেবারে গুঁড়ি গুঁড়ি ছেলেমেয়ে তারা বটগাছ বেয়ে আবদুল খেলে। এ খেলার নাম কে আবদুল রেখেছিল তা কেউ বলতে পারবে না। খেলায় একজন বুড়ি সাজে। একটা এক হাত মাপের ছড়ি নিয়ে সে গাছের নীচে দাঁড়ায়। বাকিরা ছড়িটাকে দূরে ছুড়ে দিয়ে গাছ বেয়ে এ ডাল ও ডালে উঠে যায়। বুড়ি ছড়ি কুড়িয়ে এনে গাছের গায়ে এক-দুই-তিন ঘা মেরে নীচে থেকে ওপরের খেলুড়েদের ছোঁয়ার চেষ্টা করে। পারল তো ভাল, নয় তো যারা ওপরে রয়েছে তারা ডাল ঝুলে নীচে পড়ে ‘আবদুল’ বললেই বুড়িকে আবার যেতে হবে ছড়ি কুড়োতে।

দীনেশও যেত খেলতে। কিন্তু কাবাডিতে গেলে তার নিজেরই ছোটভাই তোতন বলত, ‘ও কী রে লিলিপুট, কাবাডি খেলতে এসেছিস? দুজন তোর ঠ্যাং ধরে ওপরে চড়ে পড়লে জান থাকবে? যা এখান থেকে।’

দীনেশকে তখনই সরে পড়তে হত। কারণ একজন রব তুললে বাকিরাও দূর দূর করবে।

সে মেয়েদের কাছে সীতাহরণ খেলতে গেলে তারা বলত, ‘তোকে নিলেই তো হারব রে ভূতকুড়ি মাছ। জোরে ছুটতে পারিস না। ওইটুকু পায়ে কী আর ছুটবি! রাবণরাজা এল রে সীতা হরণ করতে! খেলার বউ নিয়ে আর কাজ নেই, আসল বউ জোটা দেখি একটা! যা, ওদের কাছে গিয়ে আবদুল খেল।’

দীনেশকে তাই ছোটদের কাছেই যেতে হত। কিন্তু আবদুল খেলাতেও তাকে কেউ নেবে না কারণ সে গাছে চড়তে পারে না। ছোট মেয়েরা কিতকিত করে দৌড়য়। দীনেশও তাদের পাশে পাশে হাত-পা ছুড়ে কিতকিত করে দৌড়ে নিত। তার অঙ্গভঙ্গি দেখে সবাই খেলা ফেলে তাকে নিয়ে হাসি শুরু করে দিত।

দীনেশকে বেঁটে বললে বোঝা যাবে না। সে হল বামন। গায়ের রং কালো। বেশিরভাগ সময় ধুলোবালি মেখে দোমাটি হয়ে থাকে। ঠাকুরদের মধ্যে কার্তিককে বেঁটে করে বানানো হয় কেন তা পটুয়ারা বলতে পারবে। তবে দীনেশের হাত-পা আর আঙুলগুলো দেখলে মনে হবে ঠিক যেন কোনও কারিগর কার্তিক ঠাকুরের জন্যে গড়েছিল, ভুল করে দীনেশের গায়ে লাগিয়ে দিয়েছে। অবশ্য তার মাথার চুল কার্তিকের মতো বাবরি নয়। সে মিলিটারি ছাঁটে ছেটে রাখে, নয় তো ন্যাড়া হয়ে যায়।

দীনেশের ভাই তোতন তাকে বড়খানথানে দেখলেই খেঁকিয়ে ওঠে, ‘কী রে নাইলনটিকা, তোকে বারবার বারণ করি ঘর থেকে বেরোবি না। আসিস কেন এখানে?’

এমন অনেক দিন গেছে যখন দীনেশ একপাশে সরে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকত। তারপর একসময় হেলেদুলে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেত কোথাও। কিন্তু অতুল দাদুর কাছে গল্পটা শোনার পর একদিন এই বড়খানথানেই সে টের পেয়েছিল তার অন্য কিছু হচ্ছে।

সেদিন দীনেশের গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। হাতের শিরা ফুলে ওঠে। হাঁটুর কাছটা মটমট করে। নাক দিয়ে গরম হাওয়া বেরোতে থাকে। দীনেশ রেগে যায়। সকলের কথা শুনে রাগ জমতে থাকে তার। বুঝতে পারে, তার হাত-পা-শরীর সব বেড়ে যাচ্ছে। মাথা ঠেলে বাকি সকলকে ছাপিয়ে উঁচুতে উঠে চলেছে। লম্বা হয়ে যাচ্ছে সে। হতে হতে সবার মাথা ছাড়িয়ে বটগাছের ডালে গিয়ে ঠেকেছে। তারপর বটগাছও ছাড়িয়ে আরও উঠে তবে সে থামে। রাগে মাথা নিচু করে সবার দিকে দেখে তখন। খেলা ফেলে, তাকে খ্যাপানোর কথা ভুলে অবাক হয়ে সবাই তার দিকে মুখ উঁচু করে তাকিয়ে। তারা তো দীনেশের হাঁটুর কাছেও নয় আর। তাদেরই বামনের মতো দেখতে লাগে দীনেশের। ইচ্ছে করলে লম্বা লম্বা পা ফেলে মাঠ পেরিয়ে, পুকুর টপকে, গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে পারে সে। তবে যায় না। তার হাসি পায়। তবে হাসে না। বামনদের নিয়ে হাসতে নেই।

***

দাদার বিয়ে হবে না, ওকে আর কে বিয়ে করবে? আঠাশ বছর পার করে দিয়েছে। তাই সাততাড়াতাড়ি বছর একুশেই নিজে পছন্দ করে বিয়ে সেরে ফেলেছিল তোতন।

ঝন্টু বেরার তিনটি সন্তান। দুই ছেলে, এক মেয়ে। বড় ছেলে যে বেঁটে বামন হয়ে যাবে তা ঝন্টু ও তার বউ পার্বতী গোড়ায় বুঝতে পারেনি। তবে পরে আরও ছেলেমেয়ে হলেও দীনেশের দিকে সর্বদাই তাদের চোখ ছিল। দীনেশ কী খেতে পছন্দ করে, হাটবারে বাজার থেকে কী নিয়ে এলে সে আনন্দ পায় এইসব। তাই নিয়ে মেয়ে দোলা আর ছোটছেলে তোতন চুলোচুলি করত। ঝন্টু তাদের বোঝাতে পারেনি— দাদা তোদের মতো নয়, তাকে একটু বেশি দিতে হয়, তার মন বুঝতে হয়। ছেলে-মেয়ে ছোট থাকতে ছিল একরকম। কিন্তু বড় হতে হতে তারা যেন বাড়িতেই দীনেশের ঝগড়ুটে পড়শি হয়ে যাচ্ছিল। তারপর অবশ্য মেয়ের বিয়ে হয়ে গেল।

একচালা মাটির বাড়ি। তিন দিকে দাওয়া। মধ্যে একটা ঘর। তার বেশি করার সামর্থ হয়নি ঝন্টু বেরার। বড় ছেলের কথা সে বাদই দিল। ছোট ছেলেকে পড়াচ্ছিল। পড়াশোনা শিখে কিছু করবে। যদি শেখে। আদিপুরের বেশিরভাগ ছেলেই কিছুদিন স্কুলে যায়। তারপর পড়া ছেড়ে লুঙ্গি পরে কুঁচি হলায়। হাতে একটা সস্তার চায়না মোবাইল। কান ফাটানো হিন্দি গান চালিয়ে পাড়ায় টহল দেয়। তাছাড়া আর কোনও কাজ নেই তাদের। তোতনও নাইনে পড়তে পড়তে স্কুল ছেড়ে বাড়িতে বসে গেল। কয়েক বছর পরে বউও জোগাড় করে ফেলল।

দীনেশ দেখত, ছোটভাই বিয়ের পর আরও বেশি রহস্য করে। তাকে দেখিয়ে দেখিয়েই বউয়ের সঙ্গে হাসি ঠাট্টা। ভাই পাড়া বেড়িয়ে বাড়ি ফিরলেও বউমা তাকে কলসি থেকে জল গড়িয়ে খাওয়ায়। দীনেশ যে সম্পর্কে ভাশুর সে কথা তার ভাই-বউও ভুলে গেছে। ‘এই যে, ওই যে’ বলে কাজ চালিয়ে নেয়। ঘোমটা দেয় না, গায়ের কাপড় আলগা হয়ে গেলেও খেয়াল নেই।

আগে তোতন দাওয়ায় শুত। দীনেশের পাশে তার বিছানা হত, কারণ তোতন দাদার বিছানায় শুতে চাইত না। আর এক পাশের দাওয়ায় বাবা-মায়ের বিছানা। ঘরের মধ্যে শুত তাদের বোন দোলা। দোলার বিয়ের পর তোতন যখন বিয়ে করল, তার বদলি হল ঘরে। যতই হোক, বিয়ের পর বউ নিয়ে দাওয়ায় শোয়া চলে না। দীনেশের বিয়ে হলে প্র‌থম অধিকার তারই হত। কিন্তু এখন তোতনের।

দীনেশ নিজের মধ্যে একটা রিকরিকে আগুন চেপে দাওয়ায় শুয়ে থাকে। ঠিক তখনই তোতন এসে দাঁড়ায় দরজায়, সেই আগুনে ফুঁ দিয়ে দগদগে করতে। দীনেশ বিছানায় পাশ ফিরে মশারির ভেতর থেকে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকায়। ঘরের বাল্‌বের হলুদ আলোয় মুখটা দেখে। ভাই কি তার দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসছে? ভাবখানা এমন— তোর কপালে তো কোনও মেয়েই জুটবে না। দেখাই সার। দীনেশ উলটো পাশ ফিরে শোয়। দরজার হুড়কো লাগাবার শব্দ পায়।

***

বাপের রেখে যাওয়া এক বিঘে ধানি জমি ছাড়া ঝন্টু বেরার জায়গাজমি বিশেষ নেই। তাও আবার পাঁচ কাঠা খাল ধারে। সে জমি তো পতিত পড়ে থাকে। নোনা জলের জন্য চাষ করা যায় না। বাকি যে ক’কাঠা জমি হাতে আছে সেখানে চাষ করে কোনওরকমে টেনেটুনে সারা বছর চলতে হয়। আর আছে রেশনে দু’টাকা দরে চাল, গম। চালে যা গন্ধ, সে ভাত মুখে তোলা যায় না। ছোট ছেলে আগে যাও বা মজুর খেটে দু’পয়সা হাতে দিত, বিয়ের পর তাও দেওয়া বন্ধ করেছে। দীনেশ বাপের সঙ্গে গিয়ে নিজেদের জমিতে খাটে চাষের সময়। আবার অন্যের জমিতেও চাষের কাজ করে, ধানকাটার সময় খেটে যা পায় বাপের হাতে তুলে দেয়।

তবে দীনেশকে চাষে কী ধানকাটায় কেউ কাজে নিতে চায় না সহজে। বলে, ‘তোকে দিয়ে ক’টুকু কাজ হবে রে!’ আর নিলেও পুরো মজুরি দেয় না। মানুষ যদি গোটা না হয় তার আবার গোটা মজুরি কীসের! কাজ কিন্তু দীনেশ কম করে না। অন্য মজুররা দু’বিড়া ব্যান মাঠে পুঁতে আলে বসে জিরোয় আর বিড়ি খায়। দু-একটা মজার গল্প ফেঁদে অন্যদের শোনায়। দীনেশ সেই যে মাঠে নামে, একেবারে কাজ শেষ হওয়ার সময় মাঠ থেকে মুখ তোলে। তাতেও অন্যরা শান্তি পায় না। দীনেশকে আওয়াজ দেয়— ‘কী রে বাঁটকুল, ধানের গোড়ায় মুখ গুঁজে বসে আছিস না কি? এত কাজ করিস কেন? খাবে কে? তোর তো বিয়েও হবে না। আমাদের কথা শোন, সার্কাসে চলে যা। লোকে তোকে দেখে মনের দুঃখ ভুলে আনন্দ পাবে। সেখানে তোর মতো আরও পাবি, তাদের সঙ্গে থাকতে পাবি।’

এইসব কথায় দীনেশের হাত থেকে ব্যানচারা পড়ে যায়। তার দু’টো হাত মুঠো হয়ে গেছে। ফোঁস ফোঁস করে শব্দ বেরোচ্ছে  নাক দিয়ে। সে রাগতে শুরু করেছে। রাগলেই তো লম্বা হতে থাকে সে। তার পায়ের আঙুল নরম জমিতে এঁটে বসে যায়। বাড়তে থাকে দীনেশ। চারপাশ ছাড়িয়ে উঠতে থাকে। নীচে পড়ে থাকে ধানের খেত, ধানচারা। বাকি মানুষগুলো সব বেঁটে হয়ে গেছে। দীনেশ লম্বা হয়ে যাচ্ছে। সকলের কথা বন্ধ। তারা কাজ ফেলে ঘাড় বাঁকিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে দীনেশের দিকে। দীনেশ যদি এখন তাদের বলে, তোরা সার্কাসে যা—  কেমন হয়? তবে বলবে না সে। সেখানে পয়সা দিয়ে লোকে খেলা দেখতে যায়, বামন দেখে হাসতে যায়। তাকেও তো একবার সবাই মিলে সেখানেই পাঠাতে চাইছিল।

***

প্রত্যেক বছর শীতকালে আদিপুর গ্রামে গাজি সাহেবের মেলা বসে। নাগরদোলা, মরণকুয়া, খেলনা রেলগাড়ি, আরও কত কিছু। সে বছর সার্কাসও এসেছিল। সেখানে ছোট মেয়েরা সরু দড়ির ওপর দিয়ে দু’দিকে দু’টো হাত মেলে ধরে এ মাথা থেকে ও মাথা হাঁটে। নয়তো দড়ির ওপর সাইকেলের রিং চাপিয়ে পায়ের বুড়ো আঙুলের ভরে খেলা দেখায়। কতরকমভাবে ডিগবাজি খায় ছোট ছেলেরা, উল্টো সাইকেল চালায়। আর সেইসব খেলার ফাঁকে ফাঁকে জোকাররা ঢুকলেই লোকেরা হেসে গড়াগড়ি যায়। তাই দেখে দীনেশর পিছনে পড়ে গিয়েছিল সবাই।

‘দীনেশ, তুইও যা সার্কাসে। বেঁটে আছিস, ভাল হাসাতে পারবি।’

এই নিয়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল গ্রামে। দীনেশ সার্কাসে গেল বলে। বাড়ি থেকে বেরোনোই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল দীনেশের। তার বাপের কাছেও এসেছিল কয়েকজন। ‘পাঠিয়ে দাও দীনেশকে। টাকা রোজগার হবে। তোমারই তো হাতে আসবে।’

একজন বলেছিল, ‘আমরাও তো বলতে পারব, আমাদের পাড়ার একটা বামন সার্কাসে আছে।’

ভাই তোতন বলেছিল, ‘পাঠিয়ে দাও বাবা। এখানেও তো ওকে দেখে সকলে হাসেই!’

চুপ করে ঘরে বসে ছিল দীনেশ। কী-ই বা বলবে এদের! গ্রামে এক দাদু আছে, খুব লম্বা। সাত ফুট হবে মনে হয়। বিয়ে করেছিল যে মেয়েকে সে তো বলতে গেলে তার কাছে বেঁটেই। সেই দাদুকে দেখলেই সবাই তার পিছনে পড়ে যায়। বলে— তালঢ্যাঙা, বাঁশপাতা। এত লম্বা যে তার নাকি হাত-পা লড়লড় করে, তাই ডাকে— লড়মা। আট বলে এক লম্বা মেছো ভূতের নামে দাদুর নামও আট। আবডাল থেকে এইসব ডাক ছুড়ে দেয় কেউ। দীনেশের কিন্তু ভাল লাগে অতুল মাইতিকে। কত কিছু জানে দাদু। রামায়ণ, মহাভারত থেকে গল্প করে শোনায়। দীনেশ মাঝে মাঝে গিয়ে বসে দাদুর কাছে।

কেউ খুব লম্বা হলেও দোষ। আবার কেউ খুব বেঁটে হলেও দোষ। কী চায় এরা! সবাই তাদেরই মতো মাঝারি হবে? কাউকে কিছু বোঝাতে যায়নি দীনেশ। শুধু ভেবে নিয়েছিল, সার্কাসে গিয়ে জোকার সাজবে না কোনওদিন।

***

দীনেশকে যখন চাষের কাজে কেউ নেয় না তখন সে নিকুঞ্জপুরের ইটভাটায় কাজে চলে যায়। চাকা লাগানো, হাতে ঠেলা ঠেলাগাড়ি করে ইট বয়। ইটভাটার মালিক কারও চেহারা দেখে না। যে যত ইট বয়ে দেবে তার সেরকম টাকা। সারা সপ্তাহ যে যত ট্রলি ইট বইতে পারে, ভাটার ম্যানেজার তাকে তত কড়ি দেয়। সাতদিনের শেষে হপ্তাবারে কড়ি জমা দিয়ে টাকা তুলতে হয়।

খামার থেকে কাঁচা ইট নিয়ে চুল্লির কাছে আসতে হয়। চুল্লিতে যে কাঁচা ইটগুলো পুড়িয়ে পাকানো হয় সেগুলো আবার বয়ে নিয়ে খামারে সাজিয়ে রাখতে হবে। সেখান থেকেই ইট লরি বোঝাই হয়ে এখানে ওখানে যায়। ভাটা থেকেই ট্রলি দেওয়া হয়। হপ্তাবারে টাকা তোলার সময় ট্রলির ভাড়া বাবদ কিছু টাকা কেটে নেয়। অনেকেই আছে যারা ট্রলি নেয় না। মাথায় গামছার বিড়া বেঁধে, তার ওপর একটা চৌকো তক্তা দিয়ে পাশাপাশি দু’টো করে ইট রেখে, পাঁচটা পাঁচটা দশটা ইট একসঙ্গে নিতে পারে। তাহলে আর হপ্তাবারে ট্রলির জন্য টাকা দিতে হয় না।

দীনেশ যখন ট্রলিতে ইট বোঝাই করে তখন অনেকেই তাকে বলে, ‘এত মাল লোড করছিস, টানতে পারবি? পেছন দিয়ে তো গু বেরিয়ে যাবে। তিন ফুট মালের সাহস তো কম নয়!’

দীনেশের মধ্যে রাগ পাকিয়ে ওঠে। সেই রাগ তাকে লম্বা করতে শুরু করে। চিমনি ছাড়িয়ে মাথা তোলে দীনেশ। ট্রলি, ইট, ইটভাটা তখন তার পায়ের কাছে। আশপাশের তাল, নারকলেগাছও নিচুতে। অন্য মজুররা মাথা থেকে ইট ফেলে দিয়ে হাঁ করে উঁচুতে তাকায়। এ কে রে!

দীনেশ তখন আবার নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকে। ছোট করে আনে শরীর। আগের মতো হয়ে যায় সে। তারপর ছোট ছোট পায়ে গুড়গুড়িয়ে ট্রলি টেনে ঠিক জায়গামতো পৌঁছে যায়।

***

‘ত্রেতা যুগে একবার দৈত্যরাজ বলী ইন্দ্রের সিংহাসনে বসার বাসনায় বিরাট এক যজ্ঞ করেছিল। যজ্ঞ থেকে সে একটা সোনার রথ, চারটে ঘোড়া, তির-ধনুক-খড়গ এসব পেল। তারপর সেই রথে চড়ে সৈন্যসামন্ত নিয়ে ইন্দ্রপুরী আক্রমণ করল। দেবতারা তো হেরে গিয়ে স্বর্গ ছেড়ে পালিয়ে বাঁচল। আর বলী তখন অনায়াসে স্বর্গ ভোগ করতে থাকল।’

অতুল দাদুর ঘরের দাওয়ায় বসেই একদিন এই গল্প শুনেছিল দীনেশ। দাদু খুব সুন্দর বলে।

‘তখন দেবমাতা অদিতি তার ছেলেদের জন্য কাতর হয়ে ভাবছেন কী করবেন। এমন সময় কশ্যপ মুনি আশ্রমে ফিরলেন। অদিতি স্বামীকে সব বললেন। কশ্যপ বললেন, বিষ্ণুর সাহায্য চাও, তিনিই মঙ্গল করবেন। অদিতি তখন নারায়ণ সেবায় বসলেন। নারায়ণ প্র‌সন্ন হয়ে অদিতিকে এক বর দিলেন। কী বর? বললেন, স্বামীর সঙ্গে মিলনের সময় সন্তান কামনায় আমাকে ধ্যান করবে, তাহলেই তোমাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে।

‘তারপর দশ মাস পেরিয়ে ভাদ্র মাসের শুক্লাপক্ষের দ্বাদশী তিথিতে ভগবান জন্ম নিলেন। কী রূপে জন্ম নিলেন? না বামন রূপে। সকলে জানল কশ্যপের একটি বামন পুত্র জন্মেছে।’

এই পর্যন্ত শুনেই দীনেশের মনে পড়েছিল, তাদের ঘরে ক্যালেন্ডারে বিষ্ণুর ছবি আছে। সাপের ওপর শুয়ে, মাথার কাছে লক্ষী।

‘ওদিকে তো বলীরাজ ত্রিভুবন জয় করে অশ্বমেধ যজ্ঞ আরম্ভ করে দিয়েছে। ততদিনে বামন এই কথা জানতে পেরে সেখানে গিয়ে উপস্থিত। পুরোহিতরা বামনকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। কেউ বলে সূর্যদেব এসেছেন, কেউ বলে, অগ্নিদেব এসেছেন। এমন সময় বলীরাজ নিজে আসন থেকে নেমে এসে বামনদেবের পা ধুইয়ে পুজো করল। আর বলল, আপনার আগমনে আমার এই যজ্ঞ সফল হয়েছে। আপনি বোধহয় কিছু চাইতে এসেছেন। গোরু, জমি, সোনা যা আপনার ইচ্ছা করবে, আমি তাই দেব।

‘বামন বলল, ত্রিভুবনে যতজন দাতা আছে, তুমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দাতা। তবে অত কিছু আমার চাই না। মাত্র ত্রিপাদ ভূমি পেলেই হবে।’

দীনেশ জানতে চায়, ‘সেটা কী গো দাদু?’

অতুল মাইতি ভেঙে বলল, ‘বামন বলেছিল তিনটে পা রাখতে পারি এমন তিনটে জায়গা পেলেই আমি সন্তুষ্ট হয়ে যাব।’

দীনেশ শুনে অবাক। ‘দুর্গা ঠাকুরের দশটা হাত, কালী ঠাকুরের চারটে, আরও কত ঠাকুরের তো চারটে করে হাত আছে। মানুষের তো অমন থাকে না। কিন্তু ঠাকুরদের পা তো সব মানুষের মতোই। কারও দুটোর বেশি দেখিনি কখনও!’

হাসল অতুল মাইতি। ‘শোন না, বলছি। বামনের কথায় বলী বলল, আমি ত্রিভুবনের ঈশ্বর, আমি মনে করলে আপনাকে একটি ভুবন দান করতে পারি, আপনি এমন অবোধ যে মাত্র ত্রিপাদ ভুমি চাইলেন! তখন বামন বলল, ব্রাহ্মণ তার ইচ্ছেমতো জিনিস পেয়ে সন্তুষ্ট থাকলেই তার তেজ বাড়ে। তাই ওইটুকু জমি পেলেই আমার চলবে। এই সময় দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য তার শিষ্য বলীকে সাবধান করেছিল। বলেছিল, এই বামন সাক্ষাৎ বিষ্ণু। তোমার কাছ থেকে সব কেড়ে নিয়ে আবার ইন্দ্রকে দিয়ে দেবে। বিষ্ণু একপায়ে পৃথিবী, আরেক পায়ে স্বর্গ আর তারপর বিরাট শরীর নিয়ে আকাশ ভরিয়ে দেবে, তখন আরেকটা পায়ের জায়গা কোথায় পাবে? তুমি দিও না।

‘বলী কিন্তু শোনেনি। সে বলল, তা হবে না। বিষ্ণু আমাকে বর দিতেই আসুক কিম্বা বিনাশ করতেই আসুক, আমি যা দেব বলেছি তা দেবই।’

‘রাজা কি জমি দিল?’

‘দিল তো। দিতে না দিতেই বিষ্ণু তার চেহারা বাড়াতে লাগলেন। বাড়তে বাড়তে এমন হল যে এক পায়ে পুরো পৃথিবী ঢাকা পড়ে গেল, আর অন্য পায়ে স্বর্গ ছেয়ে গেল। এইবার তখন নারায়ণ তার নাভি থেকে আরও একটা পা বের করলেন। কিন্তু সে পা যে কোথাও রাখবে তার জায়গাই তো নেই। তখন বিষ্ণু বলীকে বললেন, এই পা রাখার জায়গা দাও, নয় তো সত্য ভঙ্গ করার পাপে নরকে যাও। শুনে বলী বলল, আমি কথা যখন দিয়েছি তখন তা রাখবই। আপনি আমার মাথায় আপনার পা রাখুন। বিষ্ণু তখন বলীরাজার মাথায় তার পা চাপিয়ে দিয়ে তাকে পাতালে পাঠিয়ে দিলেন।’

বেশিক্ষণ পা মুড়ে বসে থাকলে হাড়ে ব্যথা করে। দীনেশ দাওয়া থেকে ঝপ করে নেমে পড়ল। বামন তাহলে চাইলে লম্বা হতে পারে!

সে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। অতুল মাইতি বলল, ‘বিষ্ণুর দশ অবতার জানিস তো? এক এক যুগে তিনি এক একরকম চেহারায় এসেছিলেন। মৎস অবতারের সময় পৃথিবীতে মাটি ছিল না, শুধু জল। যখন কচ্ছপ হয়ে দেখা দিলেন তখন সেই কূর্ম অবতারের সময় কোথাও কোথাও কাদামাটি মিলল। তারপর বরাহ অবতার। সে সময় গাছপালা হতে থাকল। আর বামন অবতারের সময় দেখা দিল মানুষ। তার মানে হল ওই বামন দিয়েই মানুষের শুরু। কে বেঁটে আর কে লম্বা তা দিয়ে তার পরিচয় হয় না। তুই দুঃখ পাস কেন?’

‘তোমার রাগ হয় না দাদু? তুমি এত লম্বা বলে তোমায় নিয়ে যে ওরা হাসে।’

দাদু বলল, ‘নাঃ, রাগ করব কেন? মাঝারিদের ধর্মই তো তাই রে ভাই। সৃষ্টি নিয়মের বাইরে গেলেই মাঝারিরা তাকে আর নিতে চায় না।’

দীনেশ বলল, ‘এটা কি মাঝারিদের যুগ চলছে দাদু?’

অতুল বলল, ‘তাই হবে, কিন্তু তুই দুঃখ পাস না। তুই যে বামন অবতার।’

‘আমার রাগ হয় দাদু।’

‘রাগ থাকা ভাল। ওতে ভেতরের তেজ বাড়ে।’

***

খড়গপুর থেকে দীনেশের মাসি খবর পাঠিয়েছিল তার বাবাকে। ‘একটা মেয়ে পাওয়া গেছে। ছেলে বিয়ে করাবে? তাহলে দিদিকে নিয়ে আমার কাছে চলে এসো।’

ঝন্টু আর পার্বতী বেরা কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। এমন হয় নাকি! সে মেয়ে কীরকম? তার বাড়িই বা কেমন যে বামন ছেলে জেনেও মেয়ের বিয়ে দিতে চায়?

মাসি বলল, ‘এসো না, দেখতে পাবে।’

দীনেশকে তার মা বলেছিল, ‘তুইও চল আমাদের সঙ্গে, তোকেই তো পছন্দ করতে হবে।’

যায়নি দীনেশ। মাকে বলেছিল, ‘তোমরা পছন্দ করলেই হবে। আমার মেয়ে দেখার দরকার নেই।’

তার বাবা-মা চলে যায় খড়গপুর। তাতেও রেহাই মেলেনি দীনেশের। ভাই, ভাই-বউ, জ্যাঠতুতো, খুড়তুতো বউদিরা বলল, ‘ঠাকুরপো, তুমি তো মহাপুরুষ গো। মেয়ে না দেখেই বিয়ে করবে? মেয়ে যদি তোমার চেয়ে লম্বা হয়? সে কি তোমায় কোলে নিয়ে ঘোরাবে?’ বলেই খিলখিলিয়ে হাসি।

ফিরে এসে বাবা বলেছিল, মেয়ে তাদের পছন্দ। গায়ের রং ফর্সা, মাথা ভর্তি লক্ষ্মী ঠাকুরের মতো কোঁকড়া কোঁকড়া চুল। আর হ্যাঁ, লম্বায় দীনেশের মাথায় মাথায় হবে। তারা পাকা কথা বলে এসেছে। মেয়ের দুই ভাই আর তাদের এই একটাই বোন। ভাইয়েরা তো ভেবেই নিয়েছিল বোনকে আর ঘাড় থেকে নামাতেই পারবে না। বাবা-মা চেষ্টা করেছিল, কিন্তু মেয়ের জন্যে ছেলে জোটাতে পারেনি। এখন যখন ছেলের বাবা-মা তাদের মেয়েকে পছন্দ করে আশীর্বাদ করে গেল তখন তারা নিজেদের খুশি রাখে কোথায়!

দীনেশ ভেবে দেখেছিল সেই মেয়েকে। কেমন হবে সে? আর সকলের বউয়ের মতো পায়ে আলতা পরে, কপালে লাল টুকটুকে সিঁদুরের টিপ বসিয়ে, মাথায় ঘোমটা দিয়ে, ছোট ছোট পায়ে গুটি চালে দীনেশের সামনে ঘুরে বেড়াবে? বামন বলে তাকেও কি কষ্ট পেতে হয়েছে? হাসি মশকরার চাপে আরও বেঁটে হতে হয়েছে? তাদের ওখানেও কি বড়খানথান আছে?

***

থানের সামনে ভেট রেখে দীনেশের মাসি নতুন বউকে বলল, ‘হাঁটু মুড়ে বসে, মাথা ঠুকে প্র‌ণাম করো বাসন্তী।’

নতুন বর-কনেকে পাড়ায় ঢুকতে হলে শীতলা মন্দিরে প্র‌ণামী আর বড়খানথানে ভেট দিয়ে ঢুকতে হয়। শীতলা মন্দির অনেকটা আগে পড়ে। নেমেছিল ওরা। সেখানে তখন কেউ ছিল না যদিও। এবার থানে এসেছে। প্র‌ণামী আর ভেট দু’জায়গাতেই এক। একটা গোটা পানের ওপর গোটা সুপুরি রেখে তার ওপর আর একটা গোটা পান পাকিয়ে খড় দিয়ে বেঁধে দিলেই প্র‌ণামী তৈরি। কিন্তু অন্য বর-কনেরা যা করে দীনেশ আর তার বউও তাই করবে! ওরা কি সকলের সমান হল! যারা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল তাদের কারওরই ব্যাপারটা হজম হচ্ছিল না। এ তো হাসির ওপর হাসি।

দীনেশও বউয়ের পাশে গিয়ে তিনবার মাথা ঠুকছিল।

চিন্তামণি বলল, ‘কর কর, ভাল করে প্র‌ণাম কর। বুড়ো খাঁকে বল, বাচ্চাগুলো যেন লম্বা হয়।’

বটগাছের ডালে একটা কাক অনেকক্ষণ থেকে কা কা করছে, দীনেশের কানেও যাচ্ছিল আওয়াজটা। সে হঠাৎ চিন্তামণিকে বলল, ‘আচ্ছা জেঠিমা, পাখি তো অনেক আছে, কাককে কে কাক বলে আলাদা করেছে বলো দেখি?’

আচমকা দীনেশের মুখে এই কথা শুনে চিন্তামণি চুপ। বাকিদের মুখেও কথা জোগাল না আর।

ভ্যানরিকশাটা এখনও দাঁড়িয়ে। দীনেশ ভ্যানে না উঠে সকলের সামনে বউয়ের হাত ধরল। বলল, ‘বেশি দূর নয়, হেঁটে যেতে পারবে?’

বউ ঘোমটার আড়ালে মাথা হেলিয়ে দিল। হাঁটতে শুরু করল দুজনে। তখনই বউ ঘোমটার ভেতর থেকেই বলল, ‘আমাদের ওখানেও আমায় নিয়ে ওরা খুব হাসি-রহস্য করত।’

দীনেশ বলে, ‘আর কেউ কিছু করতে পাবে না। চলো।’

ওরা হাঁটতে থাকে। সূর্য অনেকখানি পিছিয়ে গেছে বলে রোদ এসে পড়েছে তাদের পিঠে। বড়খানথান থেকে সবাই দেখতে পাচ্ছে, দুই নারী-পুরুষের ছায়া লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত