| 24 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
প্রবন্ধ সাহিত্য

শিলাইদহ ও রবীন্দ্রনাথ

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

সালেহা বেগম

রবীন্দ্র জীবনবোধ নানা বিচিত্রতা নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাত্রায় বিকশিত হয়েছে।  শিলাইদহ ও পতিসর এলাকায় দীর্ঘদিন অবস্থান কবির চিন্তা-চেতনায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। সৌন্দর্যপিপাসু কবি নতুন নতুন কাব্য ও সাহিত্য চিন্তায় বিভোর যেমন হয়েছেন তেমন সমাজ উন্নয়ন ও জনহিতকর কাজে ভূমিকা রেখেছেন। কলকাতায় অভিজাত ঠাকুর পরিবারের শিক্ষা-সংস্কৃতিতে তিনি লালিত হয়েছেন এবং কাব্যচর্চা শুরু করেছিলেন সেখান থেকেই। মৈত্রেয়ী দেবী ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ প্রবন্ধে লিখেছেন—‘এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ঐ নদী কূলেই কবির জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল। চারপাশের সুখ-দুঃখ, জীবন সংঘাত থেকে বিচ্ছিন্ন, চাঁদের পানে চক্ষু রাখা নয়, নদীর কলধ্বনি মেশান মানুষের ছোট ছোট কলগানই কবির জীবনের সেই বৃহৎ অধ্যায়ের ভূমিকা’।  ১৮৭৫ সালের ডিসেম্বর মাসে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে অল্প সময়ের জন্য একবার এসেছিলেন তাঁর পিতার সহযাত্রী হয়ে। এরপর ১৮৭৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি দাদা জ্যোতিরন্দ্রনাথের সঙ্গে বেড়াতে এসেছিলেন। পরবর্তীতে পিতৃ জমিদারি দেখাশোনা করার দায়িত্ব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ১৮৯০ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময় কাটিয়াছেন কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, পাবনার শাহজাদপুর এবং রাজশাহীর পতিসরে। শিলাইদহ গ্রামের উত্তরে পদ্মা এবং পশ্চিমে গড়াই নদী প্রবাহিত। দুটি নদী শিলাইদহকে অর্ধ-চন্দ্রাকারে ঘিরে রেখেছে। রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহের কুঠিবাড়ীতে বসবাস করতেন। মাঝে মাঝে পদ্মা নদীতে বোটে কখানি বই নিয়েও অবস্থান করতেন। সপরিবারে তিনি ১৮৯৮ সালে এই কুঠিবাড়ীতে উঠে এসেছেন এবং থেকেছেন দীর্ঘ সময়।

শিলাইদহের প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে যে বিচিত্র বর্ণালি আলো কবি দেখেছেন—‘তা তার অন্তর্লোকে নিমগ্ন হয়ে মনন করেছেন—চোখে যা’ দেখেছেন, যা ঘটেছে সেসব ছাড়িয়ে তাঁর অন্তরের সত্যকে তিনি আবিষ্কার করেছেন। গভীর চিন্তার সূত্র ধরে পৌঁছেছেন জ্ঞানালোকে। যেমন—গ্রামের ঘাটে বাঁধা থাকত বোট, কবির উপলব্ধিতে অনুপ্রবেশ করত অবারিত ধানের খেতের উত্তাল বাতাস—মিষ্টি মৃদু ঘ্রাণ ভরিয়ে দিত তাঁর অন্তর, ঘননীল আকাশে নানা বর্ণে ফুলঝুরি পুলকিত করত তাঁকে, জোত্স্নাপ্লাবিত রাতে কবি আপন মনে ডুবে যেতেন জীবনভোগের আনন্দোৎসবে। তাই তিনি লিখেছেন—‘এই সুন্দর শরৎ প্রভাতের সংগে, এই জ্যোতির্ময় শূন্যের সংগে আমার এই যে চিরকালের নিগূঢ় সম্বন্ধ সেই সম্বন্ধেরই প্রত্যক্ষ ভাষা এই বর্ণ-গন্ধ-গীত’।

পদ্মা তীরের জীবনের নানা অনুষঙ্গ তিনি তুলে ধরেছেন বিভিন্ন জনের কাছে লেখা তাঁর চিঠিতে। চিঠিগুলোতে পদ্মার সীমাহীন অপরূপ রূপের বর্ণনায় কবির অন্তরের গভীর ও একান্ত অনুভব তিনি ছিন্নপত্রের পাতায় পাতায় লিখে গেছেন। ছিন্নপত্রের প্রথম ক’খানি ছাড়া সব চিঠিই ইন্দিরা দেবীকে লেখা। ইন্দিরা দেবী ছিলেন কবির ভ্রাতুষ্পুত্রী। এই চিঠিগুলো তিনি প্রায় আট নয় বছর ধরে লিখেছেন। তখন তাঁর বয়স ছিল পঁচিশ থেকে তেত্রিশের মধ্যে আর ইন্দিরা দেবীর বার থেকে বিশ। শিলাইদহের অবারিত মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি—যেখানে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ, উন্মুক্ত নীল আকাশ, নদীর কলধ্বনি কবি চেতনায় ভিন্ন এক বার্তা এনে দেয়, স্তব্ধ নির্জনতা, সীমাহীন আকাশ এক উদাসীনতার জন্ম দেয় কবি মনে, সে ভাবের মধ্যে নিমগ্ন থেকে কবি তাঁর মনের নিগূঢ় সত্য উদ্ঘাটন করেছেন। তাই সেখান থেকে লেখা চিঠিগুলোতে এর প্রকাশ গভীরভাবে অনুভূত হয়, তেমনি মনে হয় অন্য কোথাও হয়নি। তবে কবির জীবনের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ কখনই কাব্যে ব্যক্তিগতভাবে প্রকাশ করেননি, যখন জীবন ভোগের রস সবার হয়ে উঠত তখনই কেবল তা তাঁর কাছে কাব্যের যোগ্য বলে সাহিত্যে স্থান পেত। আমরা তাই কাব্যে তাঁর জীবনটি ঠিক স্পষ্টভাবে খুঁজে পাই না। তিনি জানতেন তাঁর সুখ-দুঃখ তাঁর নিজেরই কিন্তু সেই সুখ-দুঃখ ভেদ করে যে ভাব উঠছে তা সবার। পদ্মার বিস্তৃত ও নিভৃত চরের, নিঃসঙ্গ সৌন্দর্য উৎসরণের মধ্যে বসে, কখনো বা জমিদারির কাজে তাঁর কাছে আসা সহজ-সরল গ্রামের মানুষদের সঙ্গে আলাপচারিতা এবং সম্ভাষণ বিনিময়ের সময় তিনি তাদের আন্তরিকতায় অভিভূত হয়ে নিজের মনে প্রতিদিনের চিন্তা-ভাবনার জাল বুনতেন। আর এই আবেগ-অনুভূতিগুলোই বেরিয়ে আসত সেই চিঠিগুলোতে। প্রকৃতির সঙ্গে এমন আত্মিক যোগের সহজ-সরল প্রকাশ চিঠি ছাড়া যেন অন্য কোথাও হতে পারত না। এক সময় কবি ইন্দিরা দেবীর কাছ থেকে তাঁর চিঠিগুলো চেয়ে নিলেন। ইন্দিরা দেবী তা’ থেকে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়গুলো বাদ দিয়ে কবিকে দিলেন। কবি আবার সেই চিঠিগুলো থেকে কিছু কিছু অংশ নিয়ে ‘ছিন্নপত্র’ নামে প্রকাশ করলেন। ছিন্নপত্রের পাতায় পাতায় প্রতিটি বক্তব্যে জীবন ও সৌন্দর্যের বর্ণনায় রয়েছে কবির মনের গভীর বোধের তাৎপর্যময় প্রকাশ।

এক জায়গায় কবির স্বীকারোক্তি— ‘বাস্তবিক পদ্মাকে আমি বড় ভালবাসি। … এখন পদ্মার জল অনেক কমে গেছে, বেশ কৃশকায় হয়ে এসেছে, একটি পাণ্ডুবর্ণ ছিপছিপে মেয়ের মতো নরম শাড়ী গায়ের সংগে বেশ সংলগ্ন। সুন্দর ভংগীতে চলে যাচ্ছে আর শাড়ীটি বেশ গায়ের গতির সংগে সংগে বেঁকে যাচ্ছে। আমি যখন শিলাইদহে বোটে থাকি তখন পদ্মা আমার পক্ষে সত্যিকার একটি স্বতন্ত্র মানুষের মতো, অতএব তাঁর কথা যদি কিছু বাহুল্য করে লিখি তবে সে কথাগুলো চিঠিতে লিখবার অযোগ্য মনে করা উচিৎ হবে না।’ শিলাইদহের গ্রাম সম্পর্কে এক জায়গায় লিখেছেন— ‘এতদিন সামনে ঐ দূর গ্রামের গাছপালার মাথাটা সবুজ পল্লবের মেঘের মতো দেখা যেত, আজ সমস্ত বনটা আগাগোড়া আমার সম্মুখে এসে উপস্থিত হয়েছে। ডাঙ্গা এবং জল দুই লাজুক প্রণয়ীর মত অল্প অল্প করে পরস্পরের কাছে অগ্রসর হচ্ছে। লজ্জার সীমা উপচে এলো বলে প্রায় গলাগলি হয়ে এসেছে।’ শুধু প্রকৃতিই নয়, জীবন ও জনপদ নিয়েও ছিল রবীন্দ্রনাথের পর্যবেক্ষণ যা গল্প, কবিতায় স্থান পেয়েছে এবং গভীরভাবে তাঁর মনকে স্পর্শ করেছে। তিনি ছিলেন মানবতার কবি। বাংলার গ্রামের গরিব-দুঃখী, সুখ-দুঃখ কাতর মানুষের প্রতি ছিল তাঁর অপরিসীম শ্রদ্ধা, স্নেহ, ভালোবাসা ও সমবেদনা, যদিও তারা শিক্ষিত, সুসভ্য, ধনী এবং মার্জিত ছিলেন তা’ নয়। তাঁর লেখাতে এর প্রকাশ পাওয়া যায়— ‘আমার কাছে এই সব সরল বিশ্বাসপরায়ণ অনুরক্ত প্রজাদের মুখে বড়ো একটা কোমল মাধুর্য প্রকাশ পায়। বাস্তবিক এরা যেন আমার দেশজোড়া এক বৃহৎ পরিবারের লোক। এই সমস্ত নিঃসহায়, নিরুপায় নিতান্ত নির্ভরপর, সরল চাষাভূষোদের আপন লোক মনে করতে একটা সুখ আছে—এরা অনেক দুঃখ অনেক ধৈর্য সহকারে সয়েছে তবু তাদের ভালবাসা কিছুতে ম্লান হয়নি। এদের উপর যে আমার কতখানি শ্রদ্ধা হয়, আপনার চেয়ে যে এদের কতখানি ভাল মনে হয় তা এরা জানে না।’ কবি গ্রামের সরল মানুষগুলোর হৃদয়ের মধ্যে দেখেছেন স্নেহের সুধা, শ্রদ্ধা ও ভক্তির অপরূপ সৌন্দর্য। তাঁর হৃদয়ও বিগলিত হয়ে পৌঁছছে তাদের হৃদয়ের কাছে। অনেক ঘটনা এমনভাবে তাঁকে প্রভাবিত করেছে যে, তিনি লিখেছেন —‘এখানকার প্রজাদের ওপর বাস্তবিক মনের স্নেহ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে, এদের সরল ছেলেমানুষের মতো আবদার শুনলে মনটা আর্দ্র হয়ে উঠে, যখন তুমি বলতে তুই বলে, যখন আমাকে ধমকায় ভারী মিষ্টি লাগে।’ মানুষের স্নেহ ভালোবাসা তিনি যে কেমন করে অন্তরে ধারণ করেছেন তা এই ছিন্নপত্রের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি। শিলাইদহের স্মৃতি কবির মনের গভীরে-নিভৃত যতনে নিরন্তন ধ্বনিত হয়েছে এবং তাঁর মনকে আন্দোলিত করেছে। তা’ লক্ষ্য করা যায় শেষ জীবনে লেখা ‘ছেলেবেলা’-য়, যেখানে তিনি শিলাইদহের উজ্জ্বল হৃদয়স্পর্শী বর্ণনার মাধ্যমে তাঁর মনের উত্তাপ সবার মধ্যে সঞ্চারিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথের অনেক ছোট গল্পের বিষয়বস্তু শিলাইদহ অঞ্চলের সংঘটিত ঘটনার থেকে নেওয়া হয়েছে। তাঁর ছোটগল্প ‘জীবিত ও মৃত’-র ভিত্তি শিলাইদহের একটি ঘটনা। ‘বৈষ্টমী’ গল্পের আখ্যানবস্তু সর্বক্ষেপী নামের এক স্থানীয় বৈষ্ণবীর জীবন থেকে নেওয়া। তাঁর সোনার তরী, মনসা সুন্দরী, উর্বশী, চিত্রা, ক্ষণিকা, গীতাঞ্জলি ও গীতিমাল্যের কবিতা ও গান শিলাইদহে রচিত হয়েছিল। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আমার ধারণা বাবার গদ্য ও পদ্য দু’রকম লেখার উৎসই যেন খুলে গিয়েছিল শিলাইদহে। এমন কোথাও আর হয়নি। এই সময় তিনি অনর্গল কবিতা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প লিখে গেছেন, একদিনের জন্যও কলম বন্ধ করেননি।’ প্রমথনাথ বিশী বলেছেন, রবীন্দ্রজীবনের চতুর্থ দশকটি তাঁর প্রতিভা স্ফুরণ ঘটেছে সফলতমভাবে। প্রমথনাথ এ কথাও উল্লেখ করেছেন, তৃতীয় দশক থেকেই তিনি লিখেছেন এবং দশকের শেষের দিকে প্রকাশিত হয়েছে রাজা ও রানী, বিসর্জন ও মানসী। তবে চতুর্থ দশকে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির যে সোনার ফসল ফলেছে তার তুলনা নেই। শিলাইদহের প্রথম ফসলের মধ্যে ছিল সোনার তরী, চিত্রা ও চৈতালি। সোনার তরীর মোট তেতাল্লিশটি কবিতার মধ্যে তেরটিতে রয়েছে হয় নদী, নয় সমুদ্র, নয় নদীর তীরের গ্রাম। চিত্রা কাব্যে নদীময় কবিতা কমে এসেছে এবং এতে ছিল মাত্র চার পাঁচটি। কবির দৃষ্টি তখন নদী থেকে নদী তীরের দিকে ধাবিত হয়েছে। কারণ তখন বর্ষার বেগ কমে এসেছিল। কবিতায় তখন ধ্বনিত হয়েছে—অন্তর্যামী, জীবন দেবতা, সাধনা সিন্ধুপারে, মৃত্যুর পর, উর্বশী ইত্যাদি কবিতা। চিত্রার অন্যান্য কবিতা প্রেমের অভিষেক, স্বর্গ হতে বিদায়, এবার ফিরাও মোরে, সন্ধ্যা এসব কবিতার কাহিনী ও প্রেরণা স্থানীয় অভিজ্ঞতার ফসল বলেই মনে করা হয়। চিত্রা নিটোল সৌন্দর্যবোধের কাব্য, এর শ্রেষ্ঠ কবিতা উর্বশী, জোত্স্না রাত্রে ও বিজয়িনী। চৈতালিতে নানা বিষয়ের কবিতা রয়েছে; কালিদাস সম্পর্কিত কিছু কবিতা, এতে আরও রয়েছে ভ্রান্ত-বৈরাগ্য, দেবতার বিদায়, সামান্য লোক, দুর্লভ জন্ম দিদি, পুঁটু ইত্যাদি। চৈতালি কাব্য পদ্মার মানুষ ঘেঁষা রূপ ও গদ্য কবিতার প্রাণময় প্রকাশ ঘটেছে। কবি জীবনে চতুর্থ দশকের বিশিষ্ট সৃষ্টি গল্পগুচ্ছ। অনেক রবীন্দ্র গবেষক মনে করেন, পদ্মা নদী বিশেষভাবে রবীন্দ্র প্রতিভার বাহন হিসেবে কাজ করেছে। অধিকাংশ ছোটগল্পের পট বা পাত্র তথা নদী পাড়ের জনপদের ব্যক্তিদের নিয়ে লেখা হয়েছে। ১৮৯১ সাল (বাংলা ১২৯৮) থেকে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প রচনার সূত্রপাত এবং তা সাময়িক ছেদ পড়লেও প্রবহমান ছিল ১৯৪০ সাল পর্যন্ত। ছোট গল্পের মানবজীবন ও প্রকৃতির টানাপড়েন নিয়ে রচিত হয়েছে। পল্লী জীবনের মৃন্ময় অংশ বাদ দিলে ‘সমাপ্তি’ গল্পের মৃন্ময়ী অসম্পূর্ণ থাকত। পল্লীগ্রাম ও নদী না থাকলে ’পোস্টমাস্টার’ গল্পটি হতো অতি সাধারণ গল্প। পদ্মার রহস্যময় ক্ষুধার উপরেই খোকা বাবুর প্রত্যাবর্তন গল্পের ভিত্তি। ‘মেঘ ও রৌদ্র’ গল্পে প্রকৃতির মেঘ ও রৌদ্র সমানভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। শুভা গল্পে পল্লী গ্রামের নদীতীরের মেয়ে শুভা প্রকৃতির মতোই ভাষাহীন ছিল। তাই দুজনেই মিলেমিশে গিয়েছিল। শহরে এনে ওকে বিয়ে দেওয়ার পরই যখন ধরা পড়ে মেয়ে বোবা, তখনই তাকে নিয়ে নানা বিপত্তি। ছুটি গল্পে গাঁয়ের ছেলে ফটিক বেশ আনন্দেই দিন কেটেছে গ্রামে, শহরে ওকে পড়তে পাঠানোর পর সে গাঁয়ের কথা ভুলতে পারেনি, শেষে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং মারা যায়। কিছু কিছু গল্পে তিনি পল্লীর প্রকৃতির চেয়ে পল্লীর মানুষের বৃহত্তর ভূমিকা তুলে ধরেছেন। কোন কোন গল্প গ্রামের বাতাসে ভেসে বেড়ানো লোকের কানাঘুষা গল্পের সূত্র ধরে তিনি সেসব কাহিনীকে পূর্ণাঙ্গ করে তুলেছেন। গ্রামের রথযাত্রার মেলায় তাল পাতার বাঁশির সুরে শিশুর আনন্দ, একটি রাঙ্গা লাঠি কিনতে না পারায় অন্য শিশুর দুঃখ, মাঠের ক্ষণিক দেখার বিহ্বলতা, শর্ষে খেতের মৌমাছিদের গুঞ্জন, জলের ধারে বেঁকে পড়া খেজুর গাছটির ওপর মাছরাঙা পাখিটি, ঘোর বর্ষায় ভূলুণ্ঠিত রজনীগন্ধা ফুল ইত্যাদি তাঁকে উদ্বেলিত করেছে কবিতা লেখায়। বর্ষণমুখর আষাঢ়ে কবি লিখেছেন :

পুবে হাওয়া বয় কূলে নেই কেউ,

দুকূল বাহিয়া ওঠে পড়ে ঢেউ,

দরদর বেগে জলে পড়ি জল

ছলছল ওঠে বাজিরে—

কথা ও কাহিনী কাব্যের গানভঙ্গ, পুরাতন ভৃত্য ও দুই বিঘার বক্তব্যে শিলাইদহের প্রভাব অত্যন্ত পরিষ্কার। প্রমথনাথ বিশীর গবেষণায় তিনি লক্ষ্য করেছেন ১৮৯২ (বাংলা ১২৯৮) থেকে রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প লেখার সূত্রপাত ঘটে। ‘ভিখারীনি’ গল্পটি বাদ দিলে তার আগে তিনটি মাত্র গল্প তিনি লিখেছেন, ঘাটের কথা ও রাজপথের কথা ১৮৮৪ সালে, আর মুকুট গল্পটি ১৮৮৫ সালে। তিনি আরও বলেছেন ১৮৯১ থেকে ১৮৯৫, (বাংলা ১২৯৮-১৩০২) এ সময়ে চুয়াল্লিশটি গল্প, সমগ্র গল্পগুছের অর্ধেকের কিছু বেশি, প্রায় প্রত্যেক মাসে একটি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধনা পত্রিকার জন্য লেখা হয়েছে। এই কয়েক বছর সোনার তরী ও চিত্রা কাব্য রচনার সময়। তিনি আরও লক্ষ্য করেছেন ১৮৯৮ (বাংলা ১৩০৫) সালে কাহিনীমূলক কাব্যের বদলে গল্প বলার ধারাটা গদ্যের খাতে ফিরে গেছে এবং এই সময় আমরা সাতটি গল্প পাই। অতঃপর ১৯০০ (বাংলা ১৩০৭) সালে আটটি ছোট গল্প। ১৯০১ থেকে ১৯১২ সালের মধ্যে সবসুদ্ধ আটটি মাত্র গল্প রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন। এই স্বল্পতার কারণ— গল্পের টুকরোগুলো জমিয়ে এক জোটে উপন্যাস আকারে রূপ দেওয়া। এই সময় তিনি তিনটি উপন্যাস রচনা করেন— চোখের বালি, নৌকাডুবি ও গোরা। ১৯১৫ ও ১৯১৬ সালে ছোট গল্পের বদলে আমরা উপহার পেয়েছি ঘরে বাইরে এবং চতুরঙ্গ।

প্রকৃতিপ্রেমী ও মানবতাবাদী কবি রবীন্দ্রনাথের ব্যাপ্তি সুদূরপ্রসারী এবং বিস্তৃত। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সাহিত্যিক, চিত্রকর, সমাজ-সংস্কারক এবং চিন্তাবিদ। রবিঠাকুরের লেখা নিয়ে একটা সমালোচনা আছে যে তিনি বাস্তববাদী নন, বস্তুজগতের সঙ্গে সম্পর্কচ্যুত এবং সমাজের দ্বন্দ্ব থেকে বিমুখ— কল্পলোকে বিচরণ করেন এবং স্বরচিত মনোলোকে তাঁর ভ্রমণ ইত্যাদি। যারা এসব বলেন তারা কবির জীবন পর্যালোচনা করলেই জানতে পারতেন তিনি তাঁর কাছে আসা মানুষকে কী দৃষ্টিতে দেখেছেন। গরিব-দুঃখী প্রজারা সামনে এলে ওদের দেখে তিনি ব্যথিত ও পীড়িত হয়েছেন এবং তখনই অন্তর দেবতার কাছে বলেছেন—

‘এই সব ম্লান মূঢ় মুখে দিতে হবে ভাষা,

এই সব শীর্ণ শুষ্ক ভগ্ন বুকে ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা।’

রবীন্দ্র পাঠক মাত্রই জানেন, কাব্য তাঁর অবসর বিনোদন বা স্বপ্ন সুখ উপভোগ মাত্র ছিল না, জীবন সাধনার সূত্রে গ্রথিত ছিল। মানুষের প্রতি তাঁর গভীর আকুতি কখনো রূপ নিয়েছে কাব্যে, কখনো কর্ম-সাধনায়। ঠাকুর পরিবারের জমিদারি ভাগবাটোয়ারা হয়ে যাওয়ার পর শিলাইদহের সঙ্গে কবির যোগসূত্র ছিন্ন হয়ে যায় ১৯২২ সালে। তিনি শেষবারের মতো জমিদারির তৎকালীন মালিক তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুরোধে ১৯২৩ সালে শিলাইদহে আসেন। তবে শিলাইদহের স্মৃতি তিনি চিরকাল মনে রেখেছিলেন।  মৃত্যুর কিছুকাল আগে (১৯৩৮ সালে) শিলাইদহের একজনের চিঠির জবাবে তিনি লিখেছেন—‘শিলাইদহে দীর্ঘকাল তোমাদের সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রে যুক্ত ছিলাম, আজো তোমাদের মন থেকে তা’ ছিন্ন হয়ে যায়নি, তার প্রমাণ পাওয়া গেল তোমার চিঠিখানিতে।  শ্রদ্ধার দান নানা স্থান থেকে পেয়েছি, তোমাদের অর্ঘ্য সকলের চেয়ে মনকে স্পর্শ করেছে’।

শিলাইদহে থাকাকালীন অনেক কবিতা ও সাহিত্য রচনার পাশাপাশি তিনি এ অঞ্চল থেকে আহরণ করে নিয়েছেন লেখার অনেক উপাদান যা পরবর্তীকালে এখান থেকে চলে  যাওয়ার অনেক পরেও তাঁর সাহিত্য রচনার রসদ হিসেবে কাজে লেগেছে।

            লেখক : প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক, বার্ড।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত