| 17 জুন 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প ধারাবাহিক

ভারত গৌরব জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা (পর্ব-২৩) । বাসুদেব দাস

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

পৃথিবীর সমস্ত মানুষের মঙ্গল কামনা করা প্রতিটি মানুষেরই’সাম‍্য’ সম্পর্কে একটি স্বপ্ন রয়েছে। জ্যোতিপ্রসাদের এই সাম্যবাদী স্বপ্ন হল’ শিল্পীর সভ্যতা’। কোন এক রহস্যময় কারণে আমরা বিস্মৃত হয়ে থাকতে চাই যে মার্ক্সবাদ এবং সাম্যবাদ সম্ভবত এক জিনিস নয়। সাম্যবাদে যে আদর্শ সমাজের কথা বলা হয়ে থাকে, সেই সাম্যবাদী সমাজের স্বপ্ন মার্ক্সের আগেও অনেকে দেখেছেন। সাম্যবাদ মার্ক্সের আবিষ্কার নয় এবং সাম্যবাদী হওয়ার জন্য মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। সাম্যবাদ এক আদর্শ সমাজের ধারণা অথবা চিত্র কিন্তু মার্ক্সবাদ একটি পথ অথবা প্রয়োগ পদ্ধতি।ন্যায় এবং সমতার ভিত্তিতে যে আদর্শ সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন সেই সাম্যবাদের স্বপ্নের সঙ্গে জ্যোতি প্রসাদের  স্বপ্নের বিশেষ কোনো পার্থক্য ছিল না; কিন্তু লক্ষ্যের এই মিলের জন্যই পথের মিলও মেনে নেওয়াটা যুক্তিহীন এবং কেবলমাত্র সেই জন্যই জ্যোতিপ্রসাদকে মার্ক্সবাদের বৃত্তের ভেতরে আবদ্ধ করার প্রয়াস হবে এক ধরনের সংকীর্ণতা এবং অসাধুতা। মার্ক্স দেখানো পথে বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর দেশে বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে শ্রমিকশ্রেণীর দ্বারা ক্ষমতা দখল করা সম্ভব হয়েছে কিন্তু তার দ্বারা সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জ্যোতিপ্রসাদ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমাজ নির্মাণের সমগ্র প্রক্রিয়াকে একটি নীতির দ্বারা বেঁধে নিতে চেয়েছিলেন, যেভাবে গান্ধী চেয়ে ছিলেন। গান্ধীর সেই নীতির নাম যদি ‘ অহিংসা’ তাহলে জ্যোতিপ্রসাদের   সেই নীতি হল সংস্কৃতি। গান্ধীর অহিংসা যেভাবে নিষ্ক্রিয়তা নয়, সেভাবে জ্যোতি প্রসাদের ‘ সংস্কৃতি’ ও অন্যায় থেকে সরে গিয়ে’ শিল্পের জন‍্য  শিল্প’ সৃষ্টিতে নিমগ্ন থাকা বোঝায় না।এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে মার্ক্স লেনিনের তত্ত্বে হিংসাত্মক বিপ্লবই সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার পথ বলে ইঙ্গিত রয়েছে, যদিও জীবনের শেষের দিকে মার্ক্স বলেছিলেন যে কোথাও কোথাও শান্তিপূর্ণ পথেও সমাজতন্ত্র অভিমুখে এগিয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। হিংসা এক সংক্রামক ব‍্যাধি, এক ধরনেরহিংসা জন্ম দেয়  অন্য এক হিংসার। আর এই হিংসাকে যখন আদর্শের নামে আহ্বান করা হয়, তখন এটা এমন এক রূপ লাভ করে যা ধীরে ধীরে সমগ্র সমাজ, সমগ্র নীতি-নিয়মকে ধুলিসাৎ করে দেয় । অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের যে  সংগ্রাম তাতে  যদি হিংসা প্রাধান্য লাভ করে আদর্শের রূপে, তখন হয়তো ক্ষমতা দখল করা যাবে, কিন্তু সেই বিজয়ে সুখ শান্তি আর আনন্দের স্বপ্নের মৃত্যু ঘটবে, ন‍্যায়ের  আদর্শের পরাজয় ঘটবে অত্যাচারী নাম-ঠিকানার খুব বেশি পরিবর্তন হবে না। এই ঐতিহাসিক সত্যের ধ্বনি প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই জ‍্যোতিপ্রসাদের  রচনায়।–’ দুষ্কৃতিকে ধ্বংস করতে গিয়ে সংস্কৃতি যদি দুষ্কৃতির উপায় হিংসা, কূটনীতি, ছলচাতুরি, এইসবের ব্যবহার করে তাহলে সংস্কৃতিও এইসব সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে এবং সেই ব্যাধির কবলে পড়ে নিজে নষ্ট হয়।’


আরো পড়ুন: ভারত গৌরব জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা (পর্ব-২২) 


মহাত্মা গান্ধীকে জ্যোতিপ্রসাদ ‘ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতীক’ বলে অভিহিত করেছেন। গান্ধীর আদর্শ এনে দেওয়া স্বাধীনতা লাভের পরেই রাষ্ট্রযন্ত্রের ভ্রষ্টাচার, স্বার্থপরতা,  দেখে তিনি কীভাবে বিচলিত হয়ে উঠেছেন, তার এক স্বতঃস্ফূর্ত চিত্র নালীয়াপুলের বিপদ সংকেত, এর থেকেই আভাস পাওয়া যায় যে, যে দলই রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করুক না কেন, তাদের যেকোনো দুষ্কৃতির বিরুদ্ধে জনতার পক্ষে দাঁড়ানো সবচেয়ে সরব প্রতিবাদী ব্যক্তিটি হলেন জ্যোতিপ্রসাদ। মহাত্মাজীর প্রতিরোধের দর্শন’ অহিংসার’ওপরে জ‍্যোতিপ্রসাদের আস্থা ছিল গভীর; কিন্তু এর প্রায়োগিক প্রণালী যে প্রতিরোধের এক ইফেক্টটিভ অস্ত্র হিসেবে মহাত্মার মতো উচ্চস্তরের মানসিকতার অধিকারী না হওয়া সাধারণমানুষও যেকোনো পরিস্থিতিতে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার জন্য আরও অধিক চিন্তাচর্চার প্রয়োজন হবে, সেকথা জ্যোতিপ্রসাদ অনুভব করেছিলেন। তিনি অহিংসাকে এক সক্রিয় পজিটিভ এক অভিনব উপায়’ বলে অভিহিত করে এভাবে বলেছিলেনঃ

‘ এই আবিষ্কার এখনও পরীক্ষার স্তরে, একে সমস্ত ক্ষেত্রে দুষ্কৃতীর বিরুদ্ধে, সহিংস অস্ত্রের পরিবর্তে প্রয়োগ করার জন্য, এর আর ও বৈজ্ঞানিক উন্নতি করা আবশ্যক।'( শিল্পীর পৃথিবী)জ্যোতিপ্রসাদের এই স্বীকারোক্তি তাঁর সমস্ত গোঁড়ামি থেকে মুক্ত এক dynamic মানসিকতা, বাস্তব এবং ইতিহাসের জ্ঞান দূরদর্শিতার ইঙ্গিত দান করে। অহিংসা সম্পর্কে তাঁর কোনো মেজর সন্দেহ অথবা দ্বন্দ থাকার কথা বোঝায় না। 

জ্যোতিপ্রসাদের সুসংস্কৃত মন সব সময় চেয়েছিল দুষ্কৃতিকে ধুলোয় মিশিয়ে সংস্কৃতির জয়যাত্রা। সমগ্র মানব জীবনই তাঁর মতে সংস্কৃতির অভিযান। মানুষের ভ্রান্তি ,হিংসা,দ্বেষ,অসূয়া, অজ্ঞানতা দূর করে এই পৃথিবীর জীবনকে উজ্জল আনন্দময় করে তোলাই সংস্কৃতির লক্ষ্য কিন্তু এই পথ কাঁটায় পরিপূর্ণ। নিজের জ্ঞানের প্রভাবে যেদিন মানুষ এই কণ্টকাকীর্ণ পথ পার হতে পারবে সেদিনই সংস্কৃতির স্বর্গরাজ্য রচিত হবে– গান্ধীজির রামরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হবে। জীবনের মহা শিল্পী গান্ধীজি পৃথিবীর ইতিহাসে যে অভিনব সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা  করে গেল সেই বিপ্লবের আগুনে আমরা ভারত বর্ষ পুড়িয়ে তথা নিখিল বিশ্বকেই পুড়িয়ে সোনা করতে হবে।’– এটাই ছিল জ‍্যোতিপ্রসাদের অন্তরেরও অন্তরের কথা ।’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত