৩০৪ নং কেবিন (পর্ব ৩)

দ্বিতীয় পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন

গত পর্বের পরে…

নার্সিংহোমের যে ঘরটায় মেঘ রয়েছে , তার সবটাই ঘিয়ে রঙের দু’দিকে দেওয়াল, একদিকে দরজা , একদিকে কাচের জানলাজানলার পাশে এসিবিছানার মুখোমুখি দেয়ালে জয়পুরী প্রিন্টের সরু একখানা ছবি, একফালি চাঁদের মতো ঝুলেতার নিচে খয়েরি রেক্সিন দেওয়া সোফা ওখানেই ভিজিটররা বসেন, রাতে অ্যাটেন্ডেন্ট ঘুমোনঠিক তার পাশে বাথরুমমোটামুটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন মাঝারি মাপেরতার বাঁদিকে একটা ছোট  দেরাজ, ওষুধ, জলের জার, গ্লাস রাখার পাশাপাশি পেশেন্টের টুকিটাকি জিনিস রাখাও সেখানেই তার পাশেই কাঠের আলমারি বিছানার চাদর, কম্বল ইত্যাদি থাকে তাতেএই আলমারির গায়েই ছোটো একটা টিভিরাতের আয়া মাসি এসেই টিভি খুলে বসার চেষ্টা করতেই, ধমক খেয়ে আর দ্বিতীয়বার সে ভুল করেনি

আর কেমন করে যেন সবাই সেই মুহুর্তে জেনে গেছিল, নতুন পেশেন্ট টিভি দেখে না, গল্প করেমনের দুঃখের কথা শোনে ভালোবেসে কথা বলে, মা সম্বোধন করে. . . 

বা্স, সেই থেকে প্রতিটি মাসি-দিদির কত গোপন যন্ত্রণার কথা শুনলো মেঘ এই সাতদিনেশর্মিলাদি, পিয়ালি, ঝুমা মাসি, কাত্যায়নী . . . 

তেমনি এক দিদি রিনা দি লম্বা, সুন্দরী, এক নজরে দেখলে দক্ষিণী কোনো নায়িকা মনে হবে সে মেঘের অ্যাটেন্ডেন্ট নয়অন্য পেশেন্ট সামলে আসে দেখভাল করতে তার সঙ্গেও কাজের ফাঁকে আড্ডা জমে

১০ বছর আছে এই পেশায় বরের গার্মেন্টসের ব্যবসা ছিল যৌথ ভাবে সুখী পরিবার, নিজেদের বাড়ি ভরা সংসার ছোট মেয়ে হবার ১ বছরের মাথায় ধরা পরল  কিডনির সমস্যা।

সাতদিনের অসুখে চলে গেল জ্বলজ্যান্ত মানুষটা দিদি রিনাদির চোখে জল

জানো দিদি, বর না থাকলে শ্বশুর বাড়িতে ছেলের বৌয়ের কোনো অধিকার থাকে না১ মাসের মাথায় আমাকে ২ মেয়ে নিয়ে বের করে দিলঅপয়া মেয়েমানুষ, স্বামী খেয়েছিকী করব বলো! সেই লড়াই শুরু হল

তোমার বরের ব্যবসা ? 

ও ব্যবসা দেওর নিয়ে নিল শাশুড়ি বলল, তোমার বরের আবার কী? সব আমার ছেলের ছিল, তাকেই তো . . 

রিনাদির চোখ বেয়ে জল নামে

মামলা করোনি?

পাগল? ওসব করলে আর দেখতে হতো না। হয়তো মেরেই দিত।

এইতো বোকার মত ভাবনা! দেশে আইন কানুন কিছু নেই নাকি? মেঘ বলে।

ওসব বড়লোকদের জন্য। গরীবের কিছু নেই।শুধু হাত পা আছে।তাই দিয়ে খেটে খাওয়া।রিনাদি বলে।

মেঘ হেসে ফেলে। সে গরীব বড়লোক সবাইকেই খেটেই খেতে হয় গো। কেউ কাউকে বসিয়ে খাওয়ায় না ।

কী বলো দিদি? তোমাকে খেটে খেতে হয়? দেখলেই বোঝা যায় তুমি তুলোয় মোড়া।

মেঘ শব্দ করে হেসে ওঠে। রিনাদি, আমাকেও বাড়ির সব কাজ সামলে অফিস যেতে হয়, কাজ করতে হয়। হ্যাঁ, হয়তো তোমার মতো এমন কাজ নয়, কিন্তু সেখানেও অনেক কাজ করতে হয়।

রিনাদি বলে, সে তুমি শখ করে করো। বাধ্য হয়ে তো নয়। মাথার উপর থেকে হঠাৎ করে ছাদ উড়ে গেলে যে কী অবস্থা হয় সে খালি যাদের হয় তারাই বোঝে।       

মেঘ চুপ করে থাকে এর উত্তরে কী বলবে সে! এ ছবি তো গরীব বড়লোক মধ্যবিত্ত বলে আলাদা কিছু নয় , এ তো সব মেয়েদের যন্ত্রণা, অপমানের যুগ যুগ ধরে চলে আসা এক দৃশ্য কেবল স্থান, বদলে যায়

রিনাদি আবার বলতে শুরু করে, আগে বাড়ির কাছেই আয়ার কাজ করতাম পড়াশোনা তো বেশি দূর করিনিএছাড়া কীই বা করব! তবে বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছি সকলের আশির্বাদেজামাই বেশ ভালো বলতে নেই, মেয়ে আমার ভালো আছে

মেঘ মনে মনে বলে, তাই যেন থাকে ঈশ্বর মাকে আর চোখের জল ফেলিও না

কিন্তু রিনাদির মুখ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে যখন ছোট মেয়ের কথা বলেজানো দিদি, আমার এ মেয়ে পড়াশোনা, নাচ সবেতেই দারুণ কত প্রাইজ নিয়ে আসে নাচ করে

ভালো তো, আজকাল নাচ তো ভালো পেশা

মেয়েও তাই বলেতবে এখন কদিন বন্ধ আছে আপেন্ডিসাইটিস অপারেশন হয়েছে তাছাড়া আর একটাও বিষয় আছে আগে মেয়ে ছোটো ছিলনাচ করলে পাড়ার লোকেরা কি়ছু বলত নাকিন্তু এখন নোংরা কথা বলেআমাদের ওখানটা তো গাঁ।  আমি সারাদিন বাইরে থাকিতাই ভয় হচ্ছে কেউ না আবার কিছু করে দেয় দিনকাল তো ভালো নয়

অত ভেবো না মেয়েকে বলো, যেটা করছে মন দিয়ে করতেএখন ডান্স বাংলা ডান্সের মাধ্যমে দেখছ না কত মেয়ে উঠে আসছে খারাপ হলে বাবা মা ছাড়ত? মেঘ আশ্বাস দেবার চেষ্টা করে

মেয়েও তাই বলেতবে আমার ভাগ্য তো ভালো নয়ভয় হয়

ভয় পেও না কে বলেছে তোমার ভাগ্য খারাপ? দুই মেয়েকে একা হাতে মাথা উচু করে সম্মানের সঙ্গে মানুষ করছ, এ কী কম প্রাপ্তি! নিজেকে অপয়া ভাববে না কখনোদেখো সব ভালো হবেমেঘ সান্তনা দেয়এর বাইরে তো কিছু করার নেই 

কিন্তু এতেই রিনাদির মুখে হাসি ফোটে ঠিক বলেছ, এই যে এত মানুষের দিন রাত ভালোবাসা পাচ্ছি , তোমার মতো মানুষ এত গল্প করছ, এটা কী কম প্রাপ্তি ! তারপরেই বলে, তোমার কোনো অসুবিধা হলে আমাকে ডাকবে, কোনো সংকোচ কোরো না

মেঘ মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় রিনাদি চলে যায়

মেঘ বন্ধ হয়ে যাওয়া দরজার দিকে তাকিয়ে ভাবে, এই যে এ’কদিনের বাস আমার এখানে , এরা আছে বলেই না আমি থাকতে পারছি, নইলে এইতো একটা ছোট্ট ঘর, স্যালাইন, অক্সিজেন, ওষুধের গন্ধ, বাঁচব কী করে আমি. .  .   . 

সারাদিন মোবাইলে ব্যস্ত পিয়ালির আবার বিয়ের একবছরের মাথায় বর ছেড়ে চলে গেছে পেটে তখন ছেলেবাপ ছেলের মুখ দেখেনিসেই ছেলে এখন ৭ বছরথাকে দাদু দিদার কাছেস্কুলে পড়েমেদিনীপুরে বাড়িঘন ঘন তার ছেলে ফোন করে মা মা করে

মোবাইলের গ্যালারি খুলে পিয়ালি দেখায় ছেলের ছবিমিষ্টি একটা হাসি খুশি বাচ্চার মুখচোখ দুটো যেন কত কথা বলছে ছেলের নাম শুভ্রনীল

মায়া হয় সে মুখের দিকে তাকিয়ে আমিও তো মাহঠাৎই মেয়ের জন্য বুকটা টনটন করে ওঠে কতদিন হয়ে গেল মেয়েটাকে ছেড়েআমাকে পাশে না পেলে রাতে তার ঘুম আসে না নিজের মনেই বিড়বিড় করে মেঘ।

তারপর বলে , ছেলেকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হয় বল! 

শুনেই চোখ জলে ভরে ওঠে বেশ সুন্দরী টলটল মুখের পিয়ালির

পরমুহূর্তে সামলে নেয় কী করব দিদি! পেটের দায়ে রেখে আসতে হয়েছে মানুষ করতে হবে তো! 

বাড়ি যাস নিয়মিত ? 

আগে প্রতি সপ্তাহে যেতামশুক্রবার ভোরে গিয়ে রবিবার রাতে ফিরে সোমবার ডিউটি করতাম কিন্তু অনেক টাকা চলে যায় ছেলের পিছনে খরচ বাড়ছে এখন তাই মাসে সাতদিন যাই ছুটি নিয়ে, একেবারে টানা থেকে আসিতাতে খরচটা কমে যায়। তবে ছেলের ছুটি থাকলে খুব মা মা করে, তখন যেতেই হয়

মেঘ তার কথা শুনতে শুনতে ভাবে, পৃথিবীতে সব যন্ত্রণা কী মায়েদের একা ভোগ করতে হয়! কবে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, সহ আরো কত মহান ব্যক্তি মেয়েদের জন্য ভেবে, তাদের আলো দেখাতে চেষ্টা করেছেন, অথচ এখনো সেই আলোর নিচে অন্ধকারেই পরে আছি, এর থেকে কী মুক্তি নেই! নাকি আমরা মেয়েরাই পিছিয়ে রাখছি নিজেদের! কে জানে!

শুধু প্রার্থনা করে, হে ঈশ্বর জগতের মানুষের মঙ্গল করো. . .

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত