| 14 এপ্রিল 2024
Categories
শিশু-কিশোর কলধ্বনি

ফলদ বৃক্ষ

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট
হাইস্কুলে বাংলা ক্লাস নিচ্ছেন মালেক স্যার। হঠাৎ পাশের রাস্তা দিয়ে একটা ঘোষণা বিকট শব্দ করে চলে গেল। তিন মিনিট পড়ানো বন্ধ করে চুপ হয়ে বসে থাকলেন স্যার। সাদা মুখ রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। লম্বা ছিপছিপে শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে।
ছাত্ররা ভয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারছে না। আবার স্যারের এমন উত্তেজনার কারণটাও বুঝতে পারছে না।
লিটনের মুখটা প্রশ্ন করার জন্য উসখুস করছে। একবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টাও করল। দু’পাশ থেকে উত্তম-বনিক একরকম চেপে ধরে লিটনের দাঁড়ানো থামিয়ে দিল। পেছন থেকে মামুন ফিসফিস করে বলে উঠল,
-পাগল হয়েছিস, উঠে দাঁড়াচ্ছিস যে? স্যার নাভির উপর এমন একটা মোচড় দেবে না, সাহস বেরিয়ে যাবে তোর।
লিটন কী বুঝল জানি না, মৃদু স্বরে একটু হেসে নিল।
স্যার ছাত্রদের চঞ্চলতা টের পেলেন। রাগত স্বরে প্রশ্ন করলেন,
-মাইকে কি ঘোষণা দিয়ে গেল শুনেছিস একবার?
লিখন উঠে দাঁড়িয়ে, 
-শুনেছি স্যার।
-কী শুনেছিস?
-গতকাল থেকে উপজেলা চত্বরে বৃক্ষ মেলা শুরু হয়েছে, মেলায় ‘ফলজ’, ‘বনজ’ ও ‘ঔষধি’ গাছ বিক্রি হচ্ছে, ঘোষণায় এটাই শুনেছি।
স্যার ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
-কি রে ‘ফলজ’ গাছও বিক্রি হচ্ছে? 
ইসমাইল উঠে দাঁড়িয়ে, 
-জী স্যার। গতকাল বৃক্ষ মেলা থেকে আমি একটা আমগাছ কিনেছি।
আনোয়ার দাঁড়িয়ে বলে উঠল,
-আমিও একটা ‘ফলজ’ গাছ কিনেছি স্যার, থাই পেয়ারা।
আরো কিছু ছাত্র উঠতে চাচ্ছিল, স্যার ভয়ানক রেগে গিয়ে, 
-চুপ কর। বোস সবাই। আমার বাংলা পড়ানোটাই বৃথা হলো। ভস্মে ঘী ঢাললাম, নাকি উলু বনে মুক্তা ছড়ালাম, আল্লা জানে!
ছাত্ররা ভ্যবাচেকা খেয়ে গেল। কী হলো স্যারের? এমন রেগে যেতে তো আগে দেখিনি কখনো? রকি মুখ কাচুমাচু করে বসে ছিল। রকির আব্বা হাসপাতালে চাকরি করেন। মালেক স্যার বলতেন, তোর তো হাসপাতালে বাসা, ভালো করে পড়াশোনা কর, তোকে ডাক্তার হতে হবে।
রকির উপর ভরসা নিয়ে স্যার বলে উঠলেন,
-তুই বল তো, ফলজ মানে কি?
রকি কোন চিন্তা না করেই দৃপ্ত ভঙ্গিতে বলে উঠল,
-স্যার ‘ফলজ’ মানে ‘ফলদানকারী গাছ’।
স্যার চোখ পাকিয়ে দাত কটমট করে বলে উঠলেন,
-তোর মাথা, বোস বেঞ্চিতে। 
ছাত্ররা ‘ফলজ’ শব্দের অর্থ না জানলেও, স্যারের কাছে রকি ধমক খাওয়াতে হো হো করে হেসে উঠল।
স্যার টেবিলের উপর সপাসপ দু’টো বেতের বাড়ি মেরে, 
-দাঁত বের করে এত হাসাহাসির কী হলো? চুপ কর সবাই। 
স্যার ঢোক গিলে আবার বলে উঠলেন, 
-তোদের মধ্যে থেকে কেউ একজন বল তো, ‘বনজ’ শব্দটির অর্থ কী?
মাসুদ বাংলা ব্যাকরণে ভালো ছিল। ইচ্ছে ছিল কলেজ শিক্ষকতা করার। সে বলে উঠল,
– স্যার ‘বনজ’ মানে ‘বনে জন্মায় যা’ অর্থাৎ ‘বনে জাত’।
-কীভাবে বুঝলি? 
-স্যার আপনি সমাস পড়ানোর সময় বলেছিলেন, ‘বনজ’ উপপদ তৎপুরুষ সমাসসাধিত শব্দ। ‘বনজ’-র ব্যাসবাক্য ‘বনে জন্মায় যা’।
-এই ধরণের আর কোন শব্দ আছে? অন্যরা জানলে বলতে পারিস,
রকি বলল, 
-স্যার, যেমন ধরুণ ‘পঙ্কজ’, ব্যাসবাক্য=পঙ্কে জন্মায় যা।
খাজা বলল,
-স্যার, আরেকটা শব্দ ‘জলজ’= জলে জন্মায় যা।
মেহেদী বলল,
-স্যার, আরো আছে, যেমন ‘অগ্রজ’=অগ্রে জন্মে যে।
বনিক বলে উঠল,
-স্যার, আমি একটা শব্দ জানি, ‘অনুজ’= অনুতে অর্থাৎ পশ্চাতে জন্মে যে।
উত্তম বলল,
-স্যার আরো একটা শব্দ আছে ‘আত্মজ’, যার ব্যাসবাক্য, আত্ম অর্থাৎ নিজ থেকে জন্মে যে।
ছাত্রদের কথা শুনে স্যারের মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মনে মনে বললেন, না, আমার ছাত্ররা মোটেও গর্দভ নয়। তারপর মুখটা হাসিহাসি করে নিজ থেকে বলে উঠলেন,
-তোরা মন দিয়ে শোন, একটা ধাতু আছে ‘জন্’। এটা জন্ম শব্দের ধাতু। জনক, জননী প্রভৃতি শব্দ এই ধাতু থেকেই উৎপত্তি হয়েছে। এই ‘জন্’ ধাতুর সঙ্গে ‘অ’ প্রত্যয় মিলে ‘জ’ গঠিত হয়েছে। ‘জ’ জানিস তো কি? ‘জ’ একটা কৃদন্ত পদ। স্ত্রীবাচকতায় ‘জা’। বুঝলি তোরা?
ছাত্ররা সমস্বরে বলে উঠল 
-‘জী স্যার, বুঝতে পারছি।
স্যার আবার বলতে শুরু করলেন, 
-এই ‘জ’ কৃদন্ত পদটি, ‘বন’, ‘জল’, ‘অগ্র’, ‘অনু’, ‘আত্ম’ এই উপপদগুলোর সঙ্গে বসে যথাক্রমে বনজ, পঙ্কজ, অগ্রজ, অনুজ, আত্মজ শব্দ গঠন করেছে।
ছাত্ররা আবার সমস্বরে বলে উঠল, 
-জী স্যার, বুঝেছি স্যার।
স্যার হাসিমুখে বললেন, 
-খুব ভালো কথা। দেখ শব্দগঠনের তো একটা ধারা আছে? আছে না? 
-জী, আছে স্যার।
-এই ধারায় ‘ফল’ শব্দটির সঙ্গে ‘জ’ কৃদন্ত পদটি যুক্ত হওয়ার কোন অবকাশ নেই। যদি জুড়েও দিস, সেটা কোন অর্থই প্রকাশ করবে না। বরং ‘ফল’- এর সঙ্গে ‘দ’, ‘প্রদ’, ‘দায়ক’, ‘দায়ী’ এই কৃদন্ত পদগুলো যুক্ত হয়। যুক্ত হয়ে উপপদ তৎপুরুষ সমাস গঠিত হয়। যেমন ‘ফলদ’ অর্থ ফলদান করে যা। উদাহরণ, ফলদ গাছ। বুঝলি তোরা? ছাত্ররা বলল বুঝেছি স্যার। ছাত্রদের মধ্য থেকে মাসুদ বলে উঠল, 
-স্যার, আগের ‘ফলজ’ শব্দটার ব্যাসবাক্য করলে হয় ‘যা ফলে জন্মে’, বাস্তবে কথাটার অর্থ হাস্যকর। আর ‘ফলদ’ শব্দের অর্থ ‘ফল দেয় যে’, বাস্তবে কিছু গাছ আছে, যা ফল দেয়। এজন্যই কি আমরা ‘ফলজ বৃক্ষ’ না বলে ‘ফলদ বৃক্ষ’ বলব?
-একদম ঠিক ধরেছিস। তবে কী জানিস? বাংলাভাষায় ‘ফলজ’ বলে কোন শব্দের অস্তিত্বই নেই। এটা পুরোপুরি ভুল প্রয়োগ। যেমন ধরে, ‘ফলজ গাছ’ অর্থ হবে ‘ফলে জন্মায় যে গাছ। এর থেকে আজগুবি কথা আর কিছু হতে পারে?
সবুজ বলে উঠল, 
-স্যার ‘ফলদ’ জাতীয় শব্দের আর কোন উদাহরণ আছে?
স্যার হেসে উঠলেন, তারপর নরম কণ্ঠে বলে উঠলেন,
-তোরাই খুজে বের কর?
মাসুদ উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
-স্যার, একটা শব্দ আছে ‘করদ’= কর দান করে যে, যেমন করদ রাজ্য।
আনোয়ার বলল,
-স্যার, আরেকটা শব্দ ‘জলদ’= জলদান করে যে, অর্থাৎ মেঘ।
মিলন উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, 
-স্যার, এ জাতীয় আর কোন শব্দ আছে?
ছাত্রদের শেখার অগ্রহ দেখে স্যার বেজায় খুশি। তিনি বলে উঠলেন, 
-এতক্ষণ ধরে তোরা ‘ফল’, ‘জল’ বা ‘কর’ শব্দের পরে যে ‘দ’ কৃদন্ত পদটি যুক্ত করলি না? সেটা কোথা থেকে এসেছে জানিস?
ছাত্ররা জানতে চাইল, 
-কোথা থেকে এসেছে স্যার?
-তবে মন দিয়ে শোন, ‘দা’ একটা ধাতু। দান শব্দের ধাতু ‘দা’। দান, দাতা, দত্ত এইসব শব্দ, এই ‘দা’ ধাতু থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এই ‘দা’ ধাতুর সঙ্গে ‘অ’ প্রত্যয় মিলে ‘দ’ গঠিত হয়েছে? এবার বুঝেছিস?
-জী স্যার, বুঝেছি।
-শোন, এই ‘দ’ একটা কৃদন্ত পদ। স্ত্রীবাচকতায় হয় ‘দা’। এই ‘দ’ বা ‘দা’ বিভিন্ন উপপদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ‘দানকারী’ অর্থ প্রকাশ করে। যেমন তোরা বললি না, ফলদ, জলদ বা করদ? এই শব্দগুলো দ্বারা কিন্তু ফল, জল বা কর দান করা বুঝাচ্ছে।
-জী, স্যার বুঝতে পারছি, ছাত্রদের সম্মিলিত উত্তর। ছাত্রদের আগ্রহে স্যার আবার বলতে শুরু করলেন।
-দেখ, শুধু ‘দ’ নয়। আগেই তো বলেছি, ‘প্রদ’, ‘দায়ক’ বা ‘দায়ী’, এই কৃদন্ত পদগুলোও যুক্ত হয়ে উপপদ তৎপুরুষ সমাস গঠিত হয়। যেমন, ‘চমকপ্রদ্র’ ব্যাসবাক্য, চমক দান করে যা। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, এটা চমকপ্রদ ঘটনা।
গণেশ বলে উঠল,
-স্যার, একটা শব্দ আছে অন্নদা। অন্ন অর্থাৎ ভাত বা আহার্যদ্রব্য দান করে যে।
উজ্জ্বল বলল,
-স্যার, একটা শব্দ বরদা। বর অর্থাৎ আশীর্বাদ দান করে যে।
স্যার খুব উৎফুল্ল। ছাত্রদের শেখার আগ্রহে ভীষণ আনন্দিত।  তিনি বলে উঠলেন, 
-চমৎকার বলেছিস তোরা, দেখ, ‘ফল দেয় যে’ এই অর্থ বোঝাতে অবশ্যই ‘ফলদ’ লিখতে হবে। ফলদ-র সমর্থক শব্দ হিসেবে ‘ফলদায়ক’, ‘ফলদানকারী’, ‘ফলপ্রদ’ কিংবা ‘ফলদায়ী’ লেখা যায়।  কিন্তু ফলজ লেখা যায় না। কারণ শব্দটা ভুল। এমনকি হাস্যকরও বটে।
ছাত্ররাও স্যারের মুখে হাসি দেখে হেসে উঠল। 
স্যার বলে উঠলেন, 
-এবার বুঝলি তো, আমি কেন রেগে গিয়েছিলাম? 
ছাত্ররা সমস্বরে বলে উঠল,
-বুঝেছি স্যার। এখন থেকে আমরাও ফলদানকারী বৃক্ষ বোঝাতে শুদ্ধ শব্দ ‘ফলদ’ ব্যবহার করব। কোন ভাবেই ভুল শব্দ ‘ফলজ’ বলব না।
ছাত্রদের কথায় স্যার মুগ্ধ হলেন। বলে উঠলেন,
-তোরা পারবি বাংলা শিখতে। মন দিয়ে পড়াশোনা কর। মানুষের মতো মানুষ হতে হবে তো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত