লাকি বাম্পার

 

‘বন্ধুগণ, আজ বালিমঞ্চ মাঠে এক বিরাট লটারি খেলার আয়োজন করা হয়েছে। খেলা শুরু হবে বিকাল তিনটেয়। আপনারা দলে দলে আসুন। আমাদের অনুষ্ঠানকে সাফল্যমণ্ডিত করে তুলুন।’
মাইকে যে বন্ধুদের ডাকার হিড়িক তাদের অনেকেই এসে গেছে বারোটা-একটা থেকে। আগেভাগে কাপড় নয়তো চটের বস্তা বিছিয়ে জায়গা দখল করেছে স্টেজের কাছাকাছি। কিছু মানুষ বসে তো কিছু দাঁড়িয়ে। ডালা নিয়ে পান-বিড়িওয়ালা, বাদামভাজা, চানাচুর, কুলপিওলারাও নিজের নিজের মতো করে ঘুরে ফিরি করছে। মানুষের হাট লেগেছে মাঠে।
ফাল্গুন মাসের শেষ। বর্ষাতি ধান উঠে গেছে সেই অঘ্রাণে। জমিনের জল শুকিয়ে গেছে। মাটি ফেটে হাঁ। ধান উঠে যাওয়ার পর গোড়ার শুকনো গোছা মুখ উঁচিয়ে। ছোট, বড়, মাঝারি মাপের ল্যাড়া। পায়ে, পিছনে খোঁচা লাগছে। সেসব কেউ মাথায় নিচ্ছে না। নিজেদের ভাগ্যবান ভেবে নিয়ে জুলজুল করে তাকিয়ে আছে স্টেজের জিনিসগুলোর দিকে।
এই জায়গাটুকু বাদ দিয়ে সামনে পিছনে যতদূর দেখা যায় ধূধূ ফাঁকা মাঠ। মাঝে মাঝে থাম গাড়া। তারা ওপর দিয়ে তার বয়ে নিয়ে গিয়েছে। কারেন্টের হাইটেশন লাইন। বেখেয়ালে বসতে গিয়ে কয়েকটা পাখি ধরা পড়েছে তাতে। শালিক, ঘুঘু, কাক, প্যাঁচা। পা ওপরে, মাথা নীচে। ঝুলছে তারা। তবে চোখ তুলে কেউ দেখছে না তাদের।
মাঠের দু’পাশে গ্র‌াম। সেখানে এদিক ওদিক কেব্‌ল টিভির তারও ছড়ানো আছে। তবে সেসব নির্দোষ। নেহাতই ডিজিটাল ইন্ডিয়া। যদিও কলের জল বসেনি এখনও। পুকুরই ভরসা। মাছের মতো আরও কত ছোট প্র‌াণীর ঢেকুর তোলা জলই ব্যবহার করতে হয়।
তেমনই কোনও কোনও বাড়ির বউ পুকুরঘাটে এসে এঁটো বাসন হাতে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। ল্যাড়া জমিনে আজ বাঁশ-কাঠ দিয়ে স্টেজ হয়েছে। নীল কাপড় উড়ছে। স্টেজের ওপর বাইক আর কয়েকটা সাইকেল একে অপরের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। প্যান্ডেলের মাথায় বাঁশের আগায় বাঁধা মাইক। তারস্বরে চেঁচাচ্ছে— জিলে লে, জিলে লে, আয়ো আয়ো জিলে লে। ফাঁকে ফাঁকে ঘোষণা। ‘এলাকার যুব উন্নয়ন প্র‌কল্পে, বালিমঞ্চ ক্লাব আয়োজিত বিরাট লাকি বাম্পার লটারি। প্র‌থম পুরস্কার ন্যানো গাড়ি, দ্বিতীয় পুরস্কার বাইক, তৃতীয় পুরস্কার ফ্রিজ, চতুর্থ পুরস্কার এল ই ডি টিভি, পঞ্চম পুরস্কার নগদ কুড়ি হাজার টাকা, ষষ্ঠ পুরস্কার সাইকেল। এছাড়াও আছে অনেক সান্ত্বনা পুরস্কার— ছাতা। আসুন, নিজেদের ভাগ্য যাচাই করে যান।’
জায়গাটা থেকে কিছুটা দূরে একটা বাবলাগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে নব প্র‌ামাণিক। অনেকক্ষণ এই রগড় দেখছে। অবশ্য তার পকেটেও একটা টিকিট। ইটভাটায় কাজ করে নব। সপ্তাহের ছ’টা দিন ভেজা গামছা নিংড়ানোর মতো নিংড়ে যায়। শনিবার হাতে আসে হপ্তার টাকা। গ্র‌ামের খেলা। টিকিট না কিনলে ক্লাবের ছেলেরা ছাড়বে না। তারা এক আসে ভোটের আগে, বাড়ি পিছু ক’টা ভোট পাবে গুনতে। তাছাড়া রোজ দিনের বেশিরভাগ সময়টাই কাটায় ক্লাবঘরের ফাঁকা মেঝেয় বসে তাস পিটিয়ে। সেও টাকার খেলা। কিছু জমে গেলে, সঙ্গে আরও চাঁদা তুলে ডি জে বাজায়। মনসা পুজো, দোল। আর যখন কোনও উৎসবই থাকে না তখন এমনিই মাঝে মাঝে ডি জে বাজিয়ে মন চাঙ্গা করে।
‘কি রে, কী ভাবুটু? গাড়িটা পেলে লিয়া কী করবি তাই?’ পাড়ার বাবলু পাত্র এসে দাঁড়াল নবর পাশে। সেও টিকিট কিনেছে। বাবলু নবর সঙ্গেই ভাটায় যায় কিন্তু হপ্তাবারের তার অনেক টাকাই খরচ হয় ডেইলি লটারির টিকিটের গোছা কিনতে। রোজ ভাগ্যের দরজায় কড়া নাড়ে। খোলে না যদিও। তার মতো আরও আছে। ডেইলি লটারি এখন রমরম করে চলছে। টাকা শুষে নিচ্ছে।
নব ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে রেখে বলল, ‘সে ভাবনা এঠি আরও অনেক লোকের আছে ভাই।’
বাবলু বলল, ‘হ্যাঁ রে, এই যে যুব উন্নয়ন যুব উন্নয়ন বলে এত চেঁচাটে? ব্যাপারটা কী?’
নব বলল, ‘টিকিট বেচা ওদের উন্নয়ন আর জিনিস পেলে আমাদের সকলের।’ এই কথাটায় যা বোঝার বুঝে নেওয়ার মতো করে দু’জনে হেসে নিল একচোট।
বাবলুর ভেতর ছটফটানি। ‘আমি স্টেজের কাছে যাইটি বুঝলি। দেখি গিয়ে।’
নবও ঘুরে ঘুরে দেখছিল। কিছু লোক পানওয়ালাকে ঘিরে ধরেছে। ওদিকে আবার বাদামওয়ালার ঠোঙা বানানোর বিরাম নেই। শুনতে পেল একজন বলছে, ‘ন্যানো গাড়িটা কাই গা? দেখতে পাইটিনি তো!’
‘ন্যানো গাড়ি! ও জিনিস দেখা যায় না, শুধু শোনা যায়।’
‘তবে ওরা যে বলছিল গাড়ি দেবে? তাই তো টিকিট কিনছি। না দিলে কিন্তু ভোট দিবানি।’
ওই দু’জনের কথার মধ্যে একটি ছেলে চেঁচিয়ে উঠল। ‘ভুলি যাও ভুলি যাও, গাড়ির কথা ভুলি যাও। লোভ দেখিয়া টিকিট বিককিরি করছে।’
ছেলেটির কথায় আশপাশের লোকজন অস্থির হয়ে পড়ল। কেউ বলছে, তিনটে কেটেছি। কেউ বলছে দুটো। ‘আমাদের টিকিটের কী হবে তাহালে!’
এসব কথা হয়তো আগেই মাইক অবধি পৌঁছে গিয়েছিল। তাই এবার সেখানে বলা শুরু হল, ‘ভয় পাবেন না। কারও টিকিট মার যাবে না। খেলা হতে দিন। ভাগ্য যদি আপনাদের সঙ্গে নাও থাকে, আমরা তো আছি। সান্ত্বনা পুরস্কার একটি করে ছাতা। যেটা কিনা রোদ, জল, ঝড় থেকে আপনাদের বাঁচাবে। যারা এখনও টিকিট নেননি, তাদের জন্য সুখবর। আমাদের কাউন্টারে টিকিট সেল হচ্ছে। তাড়াতাড়ি কিনে ফেলুন। এ সুযোগ গেলে আর পাবেন না। মাত্র দশ টাকার বিনিময়ে আপনি পেতে পারেন—।’
অনেকের মনেই সন্দেহ জাগছে। মাঝবয়েসি একজন বলল, ‘এখনও টিকিট বিক্রি করেটে! তবে কি পুরো টাকা ওঠেনি? সউজানে কি গাড়ি নেই, ফ্রিজ, টিভি নেই? খেলা হবে তো?’ লোকটি কথা চাপা পড়ে গেল মাইকের গানে। জিলে লে জিলে লে, আয়ো আয়ো জিলে লে।
সন্দেহ নবরও পেট আঁচড়াচ্ছিল। চল্লিশ বছরের জীবনে কোনওদিন কোনও লটারিতে কিছু ওঠেনি তার। এখানে তো শুধু বাইক আর সাইকেল রেখেছে। সত্যিই কি খেলতে চাইছে না ওরা? তা কেন হবে? খেলা হলে কেউ না কেউ কিছু না কিছু তো পাবেই। ভাবনা নিয়েই ভিড়ের ভেতরে ঘুরছিল নব। হঠাৎ ঠ্যাঙের নীচের দিকে খোঁচা। ফিরে দেখে এক বুড়ো। ষাট-বাষট্টি হবে। মাথায় পাতলা কয়েকগাছি সাদা চুল। লুঙ্গির ওপর ফতুয়া। চটিজোড়া পিছনে ঠুসে দিয়ে বসেছে। তবে মাটি সমান নয় বলে বুড়ো হড়কে হড়কে পড়ছে।
নব জানতে চাইল, ‘কী হচে?’
‘আগুন হবে? একটা বিড়ি ধরাতাম।’
কেমন মায়া হল নবর। গাল দুটো তোবড়ানো। চোয়াল বেরিয়ে। কতক্ষণ বসে আছে কে জানে। গরমে যেন ভাপা হয়ে গেছে। পকেট থেকে লাইটার বের করে দিল সে।
বুড়ো নবর দিকে একটা বিড়ি এগিয়ে দিল। ‘দাদা রে, খেলা কখন শুরু হবে কও তো? বিকাল গড়াতে চলল। পরিবার লিয়া আসছি। মেয়েমানুষ, আর তো সে পারে না। খরায় আমিও চোখে অন্ধকার দেখিটি।’
নব দেখল বুড়োর গা ঘেঁষে বসে তার বুড়ি। এই গরমেও আগাগোড়া কাপড়ে মোড়া।
গলা খাঁকারি দিয়ে পাশে বসে পড়ল নব। ‘কাইনু আসা হচে?’
বিড়ির ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বুড়ো বলল, ‘সেই পাঁচুড়িয়া গ্র‌ামে আমার ঘর।’
অবাক হয়ে গেল নব। ‘সে তো অনেক দূর! অতদূরনু আসছ?’
‘হ্যাঁ। বারোটায় ভাত খায়া বাসে চাপিয়া বুসথিলি। টিকিট কাটছি যে দুটুয়া। কিন্তু এদের খেলার দেখা নেই কেনি?’
‘এখানে খেলা হবে তোমরা জানল কেমন করিয়া?’
‘জানব না কেনি? আমাদের গেরামে গিয়েছিল তো মাইক লিয়া প্র‌চারে।’
নব জানে, আগে ছিল শুধু ভ্যানরিকশা। এখন অটো আর টোটো এসে যাওয়ায় সুবিধে হয়েছে। এপাড়া-ওপাড়ায় যাওয়া যায়। একেবারে মনের গলিতে ঢুকে সুড়সুড়ি দিয়ে আসে মানুষের লোভে। অত দূরে দূরে গিয়ে টিকিট বিকিয়ে টাকা তুলেছে! এদিকে খেলার কোনও গা নেই। তাহলে কি ওই ছেলেগুলোর কথাই ঠিক! খেলাও হবে না, জিনিসও পাওয়া যাবে না?
বুড়ো জানতে চাইল, ‘তুমার কাইনু আসা হচে দাদা?’ প্র‌ায় চেঁচিয়েই বলতে হল বুড়োকে। কারণ মৌচাকে ঢিল পড়লে মৌমাছি যেমন ভনভন করে, আজ মানুষেরও সেই অবস্থা।
নব বলল, ‘আমার বাড়ি এই পাশের গেরামে।
‘তাহালে তো ভাই তুমার ঝক্কি নেই। গাড়ি বা মটরসাইকেল, যাই পাওনা কেনি, চট করিয়া পালিতে পারব। অন্ধকার হলেও অসুবিধা হবেনি।’
এতসব মানুষ লোভে লোভে জড় হয়েছে! এদের মধ্যে সেও একজন। এদিকে কী যে হয়! মনের মধ্যে কথাটা নাচিয়ে নিল নব। মুখে কিছু বলতে যাচ্ছিল। পারল না। এক কুলপিওয়ালা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বুড়োকে বলল, ‘দাদু, কুলপি খাব নাকি?’
বুড়ো আলাপে ব্যস্ত। বলল, ‘যাঃ, তুই অন্যমা যা।’
ছোকরা নাছোড়। ‘ঠাক্‌মাকে একটা কিনি দাও। এ খরায় ঠাক্‌মার তো গলা শুকিছে।’
বুড়ো হাত নেড়ে তাড়াবার ভঙ্গিতে ছিল। ছোকরার কথায় যেন যুক্তি পেল। বউকে বলল, ‘কুলপি খাব?’ ঘোমটার ভেতর থেকে মাথা নড়ে উঠল। বুড়ো ছেলেটাকে বলল, ‘দে একটা।’
সামনে চেঁচামেচি। কতগুলো মেয়ে-বউ আর একদল ছেলের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়েছে। আগে বসে থাকা লোকগুলোকে টপকে টপকে নব গেল জটলার কাছে। ‘কী হচে ভাই? তোমরা এরকম করটঅ কেনি? শান্ত হয়া বুসো না।’
একজনকে সরানোর চেষ্টা করতেই অন্যজন বুক চিতিয়ে ধাক্কা দিল নবকে। ‘তুমাকে কইতে যাবা কেনি? তুমি কে? ভলেন্টিয়ার?’
নব কিছু বলার আগেই বউগুলো চেঁচিয়ে উঠল— ‘কইবেনি কইবেনি, কওয়ার মুখ রইলে তো কইবে। টিকিট কাটেনি যে। গণ্ডগোল পাকাইতে এসছে।’
এরা তেড়ে গেলে ওরাও খেদিয়ে আসে। কাউকেই থামানো যাচ্ছে না। নব পাশে দাঁড়ানো এক বউকে জিজ্ঞেস করল, ‘ওরা টিকিট কাটেনি তুমি জানল কেমন করিয়া বউদি?’
‘পাশে বুসিয়া গল্প করছিল তো, কে কী লিবে। কারা সাইকেল লিবে, কারা বাইক লিবে— এইসব শলা-পরামর্শ হচ্ছিল।’ মহিলা বলেই চলেছে, ‘এক মাস আগে থেকে টিকিট কিনছি। গণ্ডগোল পাকাইলে আমরাও কি ছাড়ি দিবা।’ ঝগড়ার চোটে এতক্ষণ তার মাথায় কাপড় ছিল না। এখন ঘোমটা নিতে নিতে বলল, ‘ওদের চিনি আমি। বাউন্ডুলে গুন্ডা এক একটা।’
এরমধ্যে একজন স্টেজে উঠে এল। হাতে মাইক। ‘বন্ধুরা, শান্ত হোন। আপনাদের অপেক্ষা শেষ হতে চলেছে। এইবার হবে লটারি খেলা। আর মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই জেনে যাবেন— কে নিয়ে যাবে গাড়ি, কোন বন্ধু পাবে বাইক, ফ্রিজ, টিভি। কেই বা পাবে নগদ কুড়ি হাজার টাকা, সাইকেল পাবে কারা আর কাদের কপালে আছে সান্ত্বনা পুরস্কার।’
এমনিতেই ব্যাপারটা উসখুসাচ্ছিল। এবার লোকজন তেতে উঠল। চড়া গলা শোনা যেতে লাগল। ‘এই শালা টেকো, তুই স্টেজ থেকে নাম। খেলা আরম্ভ কর। দুপুর থেকে বাতেলা শুনছি। ন্যানো গাড়ি কাই? তার রূপই তো কেউ দেখেনি এখনও। এরপর কি অন্ধকারে দেখাইব চাঁদু?’
হাসি এসে গেল নবর। স্টেজের লোকটা চেনা। ক্লাবেরই পাণ্ডা। তবে হাসিটা সেজন্য নয়। তার মাথাজোড়া টাক আর নামটা সত্যিই চাঁদু।
‘টাকা লিয়া আমাদের ভেলকি দেখাওটঅ? আর ওসব চলবেনি।’
মাতব্বর পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছে নিতে নিতে বলল, ‘অন্য কারও কথায় কান দেবেন না। এতক্ষণ আপনারা সহযোগিতা করেছেন, আর কিছুক্ষণ ধৈর্য ধরুন। টিকিট বিক্রি শেষ হলেই আমরা সবাই মিলে খেলব।’
এমন ভাবে বলছে যেন লটারি নয়, পাতা হুঁশ নয়তো ডিঙি নৌকা খেলা খেলতে চায়। তবে সে পরের কথায় যাওয়ার আগেই একটা ঢিল পড়ল তার পায়ের কাছে। যদিও লোকটা মাথা বাঁচাতে হাত তুলে ছিটকে সরে গেল।
অনেকে দাঁড়িয়ে উঠে খিস্তি লাগিয়ে দিয়েছে। ল্যাড়া সমেত মাটির ঢেলা সোঁ সোঁ করে উড়ে গিয়ে স্টেজে পড়তে শুরু করল। তখনই হেলমেট পরা দু’জন এসে টেনে নিয়ে গেল সেই চাঁদুকে।
হেলমেট দেখে আরও তেতে উঠল মানুষ। ‘পুলিশের লোক নাকি রে! দেখেছিস! ওরা তৈরি ছিল— কখন গণ্ডগোল বাঁধবে। আমরা ছাড়বানি কয়ে দিচ্ছি। খেলা হউ আর না হউ, জিনিস বুঝি লিবা।’
এবার আরও বেড়ে গেল ঢিলের চোট। এতক্ষণ স্টেজের আশেপাশে ক্লাবের যেসব ছেলে-ছোকরা টহলদারিতে ছিল তারা সটকে পড়েছে। হুড়মুড়িয়ে হামাগুড়ি দিয়ে কয়েকজন উঠে পড়ল স্টেজে। ছিঁড়ে দিল লাকি বাম্পারের ব্যানার। তাদের দেখে বাকিরাও চারপাশ থেকে ছেয়ে ফেলল। কেউ সাইকেল ধরে টানছে তো কোনও দল বাইক টেনে নামাচ্ছে। তাছাড়াও অন্য কিছু খুলে নেওয়ার চেষ্টায় রয়েছে কেউ কেউ। যাদের হাতে কিছুই আসেনি তারা হয় একে অন্যের সঙ্গে মারামারি লাগিয়েছে নয়তো ঢিল ছুড়ছে।
তখনও আড়াল থেকে কে যেন মাইকে বলছে— ‘আপনারা অশান্তি করবেন না। দয়া করে শান্ত হন। এখানে পুলিশ আছে কিন্তু।’
কে কার কথা শুনছে। স্টেজে ভূমিকম্প। অত মানুষের ভার বইতে না পেরে থরথর করে কাঁপছে। এক বুড়ো ভিড়ের ধাক্কায় কাত হয়ে পড়ে যেতে যেতে বলে চলেছে— ‘লোভ দেখি দেওয়ার পর আর সামলানো যায়? ফোকটের জিনিস কউ নেই লিয়া ছাড়ে? ওদের স্বভাব খারাপ হইছে। এখন পুলিশ কেনি, কোনও নেতা-মন্ত্রী আসিয়াও সামাল দিতে পারবেনি।’
কারা যেন পটাপট টান মেরে স্টেজের কাপড় অবধি খুলে নিচ্ছে। সাইকেল, বাইক, ছাতা তো গেছেই। বাঁশগুলোও হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। কাছাকাছি বাড়ির যে মেয়ে-বউরা এতক্ষণ উঁকি দিচ্ছিল তারাও বেরিয়ে এসেছে। নিয়ে যাচ্ছে সেগুলো। উঠোনে ফেলে রেখে দিয়ে আবার আসছে। যদি আরও পাওয়া যায়।
দূরে দূরে যে বাচ্চা, বুড়ো-বুড়িরা ছিল তারা উলটো পথে দৌড়চ্ছে। কেউ নিজের প্র‌াণটুকু নিয়ে ছুটছে তো কারও কাঁধে সাইকেল, কিংবা হাতে ছাতা। সবাই পালাচ্ছে।
নব দেখতে পেল সেই দলে তাদের গ্র‌ামের অনেকেই রয়েছে। পাড়ার সেই বাবলু পাত্রও চলেছে। কাঁধে চাপানো বাঁশ। সে দাঁড় করাল তাকে। ‘বাঁশ নিলি? খেলা হলে কিছু তো পেতিস।’
‘যদি না পেতাম? খেলা হওয়ার অপেক্ষায় রইলে কিছুই হাতে লাগত না। বাঁশটা পেলাম, নিজেই নিয়ে নিলাম।’ কোনওমতে কথা শেষ করেই আবার দৌড়ল সে।
কিছুক্ষণের মধ্যে মাঠ ফাঁকা হয়ে গেল। মনেই হচ্ছে না এখানে একটা স্টেজ ছিল, মানুষের ভিড় ছিল। জমিনটাকে দেখলে মনে হবে একসঙ্গে কয়েক হাজার শুয়োর চরিয়ে নিয়ে গেছে কেউ। এখানে ওখানে প্লাস্টিক, ছেঁড়া কাপড়, চটের বস্তা আর বাদাম খাওয়ার সাদা ঠোঙাগুলো চোখে পড়ছে আবছা অন্ধকারে। হাওয়ায় ঘুরপাক খাচ্ছে মাটি ওপড়ানো, ল্যাড়া দোমড়ানো গন্ধ।
মাঠ ছেড়ে সিমেন্টের বাঁধানো রাস্তায় উঠল নব। একদল লটারির নামে টিকিট বিকিয়ে টাকা তুলেছে। অন্য দল খেলার অপেক্ষায় না থেকে লুটে নিয়ে চলে গেল। উন্নয়ন যার যেমন হয়।
কিছুদূর গিয়ে একটা ভ্যানরিকশা দেখতে পেল নব। ওপরে একটা বাইক শোয়ানো। চার-পাঁচটা ছেলে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। বলাবলি করছে, ‘তাড়াতাড়ি পা চালা। কউ আসি পড়লে বিপদ হবে।’ অন্ধকারের মধ্যে তাদের বিড়ির আগুন দেখে নবর হঠাৎ মনে হল কোনও ডাকাত-রাজ্যে ঢুকে পড়েছে বুঝি! রিকশাটা প্র‌াণপণে ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে গেল তারা।
একটু পরেই নব বুঝতে পারল পিছনে একটা পুলিশ ভ্যান। বোধহয় ওদেরই ধাওয়া করেছে। হেডলাইটের আলোয় দেখল একটা লোক গামছা মুড়ি দিয়ে রাস্তার পাশে ঝোপের আড়ালে নিজেকে লুকোনোর চেষ্টা করছে। এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখতেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সে। ‘এ বাবা গো, আমাকে ছাড়ি দাও গো, আমি কিছু লেইনি।’
‘সে তো দেখতে পাইটি। তাহালে লুকাওটঅ কেনি? ঘর না গিয়ে এখানে কি করটঅ?’ বুড়োকে চিনতে পেরেছে নব।
‘তুমি কে গা? পুলিশের লোক না?’
‘বিকেলে যে বিড়ি খাওয়ালে। চিনতে পারনি?’
পুলিশ নয়! চেনা লোক জেনে বুড়ো আরও জোরে কেঁদে উঠল। ‘কিছু মনে করতে পারিটিনি দাদা রে। পুলিশ পুলিশ বলে সবাই এমন ভয় দেখাল। ছুটতে ছুটতে বউটা কোথায় হারা হইছে। তাকেই খুঁজছি কিন্তু পুলিশের ভয়ে বড়রাস্তায় উঠতে পারটিনি।’
‘তুমার কাছে তো টিকিট আছে। ভয় পাওটঅ কেনি?’
‘যা ঘটি গ্যালা! ওরা আর টিকিট দেখব্যা? এখন যাকে পাবে তাকে ধরবে। তুমি দাদা আমার বুড়িটাকে খুঁজি দাও।’
‘আচ্ছা বিপদ হল। এই অন্ধকারে আমি এখন কোথায় পাব। দ্যাখো গিয়ে ঘরে পৌঁছিছে।’
নব ভরসা দেওয়ার চেষ্টায় ছিল। বুড়ো তা মানবে না। বলল, ‘সে একলা ঘর যেতে পারবেনি। রাস্তা চিনেনি তো।’
‘তাহালে?’
‘আমার বউর কাছে ফোন আছে।’
‘কী কও? মোবাইল! কোথা থেকে পাইল?’
‘নাতি দিছে। সে একটা নতুন ফোন কিনেছে, ওই যে আঙুল ছোঁয়ালে চলে। বাতিলটা আমাকে দিছে।’
‘তাহালে ফোন করো।’
বায়না ধরা বাচ্চাদের মতো হয়ে গেল বুড়োর মুখটা। কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘আমার কাছে তো ফোন নেই।’
একে অন্ধকার তার ওপর গরম, সঙ্গে মশা কামড়াচ্ছে। রাগে গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেছে নবর। এ কী ঝক্কি রে ভাই! তবু সে বলল, ‘নম্বর আছে?’
বুড়ো লুঙ্গির ট্যাঁক থেকে ছেঁড়াখোঁড়া কতগুলো কাগজ বের করল। তবে অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। পাশে ল্যাম্পপোস্টের কাছে গেল নব। কাগজে প্র‌চুর কাটাকাটি আর কয়েকটা নম্বর লেখা রয়েছে। এখন অনেকের কাছেই থাকে এমন। সবাই সবাইকে মিস কল দেয়। একটা নম্বরে আঙুল রাখল বুড়ো।
ফোন করল নব। কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ওপাশে একটা মেয়েলি গলা কাঁদতে শুরু করল। ‘আমি হারা হইছি। আমাকে লিয়া যাও।’
বুড়োকে ফোন দিয়ে দিল নব। ‘দাদু, কী কটে শোনো। আর কুনঠি আছে জিজ্ঞেস করো।’
কিছুক্ষণ হ্যাঁ, না, বলে ফোন ফেরত দিল বুড়ো।
‘কী কইলা দাদু? বাড়ি পৌঁছিছে?’
‘না। মাঠে যেতে কইলা তো।’
‘এখনও মাঠে! কী করেটে?’
ঠোঁট উলটে বুড়ো বলল, ‘হাত ছাড়ি যাওয়ার পর একলা বেশি দূর যেতে পারেনি। কোন বাবলাগাছের নীচে বুসি আছে।’
নব বলল, ‘যাও তাহালে। সন্ধ্যা হইচে, ঠাক্‌মাকে লিয়া ঘর যাও।’
‘একলাটা কোথায় খুঁজব দাদা। তুইও চল আমার সঙ্গে। বউটাকে খুঁজি দে। লটারি তো জিততে পারিনি। বুড়িটাকে অন্তত ফিরে পাই।’
আবার মাঠে নামল ওরা। ফোন রাখতে গিয়ে পকেট থেকে লটারির টিকিটটা হাতে উঠে এসেছিল নবর। কাগজটাতে আঙুল বোলাচ্ছিল। নম্বর বোঝা যাচ্ছে না। কুচিকুচি করে ছিঁড়ে অন্ধকারেই ছড়িয়ে দিল সে। তারপর চোখ থেকে অন্ধকার সরাবে বলে মাথা তুলে দেখতেই ধক করে উঠল বুকটা। ওগুলো কী? আকাশের হালকা আলোয় এতক্ষণে চোখ পড়ল পাখিগুলোর দিকে। বেখেয়ালে আটকে পড়েছে যারা। পা ওপরে, মাথা নীচে। তারে ঝুলছে সবাই। পরপর।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত